নারী নিরাপত্তার খাতিরে পিঙ্ক বুথ, কিন্তু রাতেই বন্ধ!
Pink Booth Kolkata: দেখা যাচ্ছে, রাত ১১টার পর যখন বুথগুলো সবথেকে বেশি প্রয়োজন, ঠিক তখনই সেগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কাঁকুড়গাছি বা হাডকো ক্রসিংয়ের মতো জায়গায় অনেক সময় বুথগুলো খালি থাকছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি বিকেলে শ্যামবাজারের পাঁচ মাথার মোড়ে যখন প্রথম পিঙ্ক বুথটির উদ্বোধন হলো, তখন ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা এক কলেজ পড়ুয়া তরুণীর চোখেমুখে ছিল পরম তৃপ্তি। তিনি ভাবছিলেন, এবার হয়তো টিউশন সেরে বাড়ি ফিরতে রাত হলে আর ভয় পেতে হবে না। শুধু শ্যামবাজার নয়, কাঁকুড়গাছি, হাডকো ক্রসিং, গড়িয়াহাট আর বেহালা চৌরাস্তাতেও তৈরি হলো এই বিশেষ গোলাপি রঙের ঘরগুলো।
কী এই পিঙ্ক বুথ?
এগুলো পরিচালনা করেন শুধুমাত্র মহিলা পুলিশ কর্মীরা। ভিতরে আছে প্রাথমিক চিকিৎসার বাক্স, জরুরি প্রয়োজনে ফোন করার সুবিধে, সিসিটিভি নজরদারি আর সরাসরি থানায় যোগাযোগ করার ব্যবস্থা। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘শাইনিং’ নামের বিশেষ টহলদারি ভ্যান। রাত ৮ টা থেকে ২ টো পর্যন্ত যা শহরের অলিগলিতে নজর রাখে।
ঠিক এক মাস পরের এক ঘটনা। মার্চ, ২০২৬-এর এক রাত। ঘড়িতে তখন রাত ১১টা। শ্যামবাজারের পিঙ্ক বুথের সামনে এসে দাঁড়ালেন এক নারী কর্মী। অফিস থেকে ফিরতে দেরি হয়ে গিয়েছে, কোনোভাবে একটু সাহায্য প্রয়োজন। কিন্তু গিয়ে দেখলেন, বুথের পাল্লা বন্ধ। ভিতরে কোনো মহিলা পুলিশ নেই।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Housewives' Labor: গৃহিণীদের এই ‘অদৃশ্য’ পরিশ্রম দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখে, প্রায় ৭.৫ শতাংশ জিডিপির সমান। তবুও এই কাজের কোনো আর্থিক স্বীকৃতি বা মূল্য আজও দেওয়া হয় না।
২০২২ সালে ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো বা এনসিআরবি-র একটি রিপোর্ট কলকাতা পুলিশের ফেসবুক পেজে দেখে শহরবাসী বেশ আশ্বস্ত হয়েছিলেন। রিপোর্টে দেখা গিয়েছিল, দেশের ১৯টি বড় শহরের মধ্যে কলকাতাই সবচেয়ে নিরাপদ।
দিল্লিতে যেখানে এক বছরে ৪০০-র বেশি খুনের মামলা জমা পড়ে, সেখানে কলকাতায় সেই সংখ্যাটা ছিল মাত্র ৪৫। চুরির নিরিখে দিল্লির সংখ্যাটা যখন প্রায় দুই লাখের ঘর ছুঁইছুঁই, কলকাতা সেখানে ১২৪৬। শুধু ২০২১ নয়, তার আগের চার বছরের মধ্যে তিনবারই কলকাতা এই সেরার মুকুট পেয়েছে।
পুলিশের দেওয়া তথ্য বলছে, ২০২৬-এ অপরাধের হার কমে হয়েছে ৮৩.৯ শতাংশ।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিলোত্তমার মেয়েদের সুরক্ষার জন্য কলকাতা পুলিশ এক নতুন উদ্যোগ নিল— 'পিঙ্ক বুথ'।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Abhaya mother joins BJP: যে বিজেপি আগে উদ্যত হলো না অভয়াকে ন্যায় বিচার পাইয়ে দিতে, তারা ভোটের সময় অভয়ার বাবা-মাকে শুধু প্রচারের জন্য ব্যবহার করছে না তো? এই প্রশ্নের উত্তরে অভয়ার বাবা বলেন, "অবশ্যই ব্যবহার করছে। আর আমরা এটা মেনে নিয়েছি। রাজনীতিতে পরস্পরের সুবিধা তো দেখবেই। "
কিন্তু ঠিক এক মাসের মাথায়,
দেখা যাচ্ছে, রাত ১১টার পর যখন বুথগুলো সবথেকে বেশি প্রয়োজন, ঠিক তখনই সেগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কাঁকুড়গাছি বা হাডকো ক্রসিংয়ের মতো জায়গায় অনেক সময় বুথগুলো খালি থাকছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পরিকল্পনাটি চমৎকার হলেও তার বাস্তবায়নে কিছু ফাঁক রয়ে গেছে। নারীরা চাইছেন এই পরিষেবা হোক ২৪ ঘণ্টার। কারণ, বিপদ তো আর ঘড়ি দেখে আসে না! তাছাড়া দু'ডজনেরও বেশি বুথ করার পরিকল্পনা থাকলেও বর্তমানে সংখ্যাটা মাত্র ৫। ফলে শহরের একটা বড় অংশ এখনও এই পরিষেবার বাইরে।
২০২৬-এর নির্বাচনের ঠিক আগে এই পিঙ্ক বুথ চালু হওয়ায় অনেকেই একে ‘রাজনৈতিক চমক’ বলে সমালোচনা করেছেন। বিরোধীদের মতে, ভোটের আগে ভোটব্যাঙ্ক গোছাতে এই আয়োজন। তবে রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে যদি সাধারণ মানুষের কথা ভাবা যায়, তবে উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।
তবে, পিঙ্ক বুথগুলো যদি শুধু শো-পিস না হয়ে রাতের বেলাতেও সক্রিয় থাকে, এবং সংখ্যাটা আরও বেশি বাড়ে তবেই সাধারণ মেয়েদের মনে পুলিশের প্রতি ভরসা বাড়বে।
আমরা আজও ভুলে যাইনি ২০২৪-এর সেই অভিশপ্ত অগাস্টের আরজি কর হাসপাতালের রাতের ঘটনা, কামদুনির সেই দুপুর, পার্ক স্ট্রিটের সেই চলন্ত গাড়ি, কিংবা অতি সম্প্রতি বেহালা বা খিদিরপুরের অলিগলিতে ঘটে যাওয়া নারী নিগ্রহের ঘটনাগুলো।
তাই পরিসংখ্যান সহজেই শহরকে নিরাপদ বললেও মেয়েদের নিজেদের নিরাপদ ভাবাটা বোধহয় এখনও ততটা সহজ হয়ে ওঠেনি। পিঙ্ক বুথ বা শাইনিং ভ্যান কেবল শুরু মাত্র। লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন এক কলকাতা তৈরি করা, যেখানে কোনো বিশেষ বুথের প্রয়োজন পড়বে না; বরং পুরো শহরটাই হবে একটা বড় সেফ জোন বা নিরাপদ এলাকা। প্রকৃত নিরাপত্তা আসে মানুষের মনে যখন ভয় থাকে না।





