বৈশাখের অপরাহ্নে বদলেছে নববর্ষের রঙ
একসময় বঙ্গাব্দের প্রথম দিনটিই ছিল বইপাড়ার বড়দিন। নতুন বছরে সাজো সাজো রব উঠত গোটা কলেজ স্ট্রিট চত্বর জুড়ে। লেখক, প্রকাশক এবং পাঠক সব মিলিয়ে চাঁদের হাট। দিনভর চলত আড্ডা, খাওয়াদাওয়া। আগে বছরপহেলাতেই বইপাড়া থেকে নতুন বই প্রকাশ হতো। এখন অবশ্য বইমেলা আছে। মানুষের বই পড়ার অভ্যাস কমলেও, নতুন বছরে কলেজ স্ট্রিটের উষ্ণতা খুব একটা কমেনি।
রীতি বদলেছে, পাল্টেছে পালনের ধরনও। কিন্তু আবেগ আজও একই। আসলে বাঙালি মানেই তো পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজের শিকড়কে আঁকড়ে ধরে রাখা।
এখনও স্মৃতিতে উজ্জ্বল সেসব দিন। বাঙালির নববর্ষ বলে কথা, সকাল থেকে কত তোড়জোড়। বিকেলে আবার হালখাতা করতে যাওয়ার তাড়া। সপ্তাহখানেক মিষ্টির বেশ একটা পাকা বন্দোবস্ত হতো বাঙালি বাড়িগুলিতে। দোসর, নতুন একখান ক্যালেন্ডার। তাতে কী ছবি আছে তা আবিষ্কারের আনন্দও ছিল অন্যরকম।
নিরামিষের খুব একটা বালাই থাকত না এদিন। বিশেষ উল্লেখ্য, নতুন জামা, বিশেষত ওই বাটিক প্রিন্ট আর নকশি করা জামাকাপড়, ওটা মাস্ট। তবে এখন বসে ভাবলে সবটাই কেবল নস্টালজিয়া মনে হয়। সময় বদলেছে। রীতি-নীতি, জীবনশৈলী সবটাই কালচক্রের নিয়মে পরিবর্তিত বটে। এখন নিউইয়ার-নববর্ষ আসে ঠিকই তবে শৈশবের উচ্ছ্বাসে যে ভাটা পড়েছে অক্লেশে তা স্বীকারে দ্বিধা নেই।
বৈশাখ আজও রঙিন। সাবেকিয়ানার সঙ্গে আধুনিকায়নের মেলবন্ধন বৈশাখের প্রথম দিনটিকে দরবিগলিত করেছে ঠিকই, তবে তার সাদামাটা মাধুর্য হারিয়েছে। বৈশাখী সন্ধ্যায় আত্মীয় সমাগম, উপহার বিনিময়, আড্ডা— পাড়ায় পাড়ায় মঞ্চ বেঁধে গান-নাটক-কবিতা, মেলা, দোকানে দোকানে গরম নিমকি গজার সমাহার— সবকিছুরই পসার কমেছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
অনেকের মতেই মোগল সম্রাট আকবর চালু করেন পহেলা বৈশাখ কিন্তু আকবরের আগে কৃষিপ্রধান বাংলায় কি নতুন বছরের উদ্যাপন হতো না? পণ্ডিতেরা বলছেন, হতো। বাংলাদেশের সেই পণ্ডিতদের মতেই নববর্ষের উৎসব প্রাচীন বাংলাতেও ছিল, কৃষির প্রথম যুগে।
উৎসব এখন মানুষমুখী নয় বরং মোবাইলমুখী। সোশ্যাল সাইটের পরিমিত জায়গায় আবদ্ধ সকলে। আনন্দ, আবেগ, উচ্ছ্বাস, উন্মাদনা, উদ্বেগ এবং ভালবাসা প্রায় সব অনুভূতি প্রকাশের খোলাবাজার এখন ওই একটিই। এসবের ভিড়ে অনুভূতি অনুভূত হওয়ার গুরুভার আমাদের মনের পরিবর্তে সোশ্যাল মিডিয়া যে নিয়ে নিল, পারতপক্ষে আমরা তা টের পাইনি।
নববর্ষের সন্ধ্যায় হালের বালাই কমেছে। সেই জায়গা নিয়েছে ডিজিটাল লেজার। শুভেচ্ছাবার্তা টেক্সট কিংবা পোস্টার নির্ভর। একগাল হাসি মুখে, ‘নতুন বছর ভালো কাটুক ’ এটা বলার পিছনে যে নির্ভেজাল সুখটুকু লুকিয়ে থাকে তার সঙ্গে এর তুলনা করা বৃথা। ধুতি-পাঞ্জাবি আর পাটভাঙ্গা শাড়িটা আজও আছে ঠিকই তবে তার বেশিরভাগটাই সোশ্যাল মিডিয়ায় জন্য। উল্লেখ্য, এই একটা দিন নিজেকে বাঙালি সাজাতে অনেকে বাঙালিই ভালবাসেন। বাঙালি খাবার ঠিক আছে, তবে রেস্তোরাঁয় কব্জি ডুবিয়ে পাশ্চাত্যের রসাস্বাদন না করলে যে নতুন বছরে ঠিক আত্মতৃপ্তি ঘটে না, মোবাইল খুললে তা বোঝা যায়। অনেক বাড়িতেই সেদিন রান্নাবান্না বন্ধই থাকে। আউটিং— ক্লাব, ক্যাফে শেষে রেস্তোরাঁ হয়ে বাড়ি।
মোদ্দা কথা, বাঙালি বাফে, থিমড পার্টি, অনলাইন ডেলিভারিতে মিষ্টি এবং রিল— এই হয়েছে নতুন শৈলী। এদিন ইলিশ পান্তা খাবার একটা রীতি, হালে শুরু হয়েছে। ১৯৮০-র পর এর যাত্রা শুরু হয়েছিল বটে তবে ইদানীং সোশ্যাল মিডিয়ায় দৌলতে এটা এখন একটা ‘ট্রেন্ড’। ছোট বড় বহু রেস্তোরাঁই এদিন আলাদা করে খাদ্যতালিকায় ইলিশ পান্তার বাহারি সাজায়। প্রসঙ্গত, পান্তা গ্রামীণ বাঙালির প্রাচীন খাদ্যাভ্যাস— চৈত্রের শেষ বৈশাখের শুরু, গরমে মাঠে কাজ, নতুন ধান কাটা— শরীর ঠিক রাখতে গ্রামবাংলায় পান্তার চলন। ইলিশ কিন্তু শহুরে আভিজাত্যেরই প্রতীক। অর্থাৎ, ইলিশ পান্তা নিঃসন্দেহে শহর ও গ্রামীণ পন্থার সংমিশ্রণ।
একসময় বঙ্গাব্দের প্রথম দিনটিই ছিল বইপাড়ার বড়দিন। নতুন বছরে সাজো সাজো রব উঠত গোটা কলেজ স্ট্রিট চত্বর জুড়ে। লেখক, প্রকাশক এবং পাঠক সব মিলিয়ে চাঁদের হাট। দিনভর চলত আড্ডা, খাওয়াদাওয়া। আগে বছরপহেলাতেই বইপাড়া থেকে নতুন বই প্রকাশ হতো। এখন অবশ্য বইমেলা আছে। মানুষের বই পড়ার অভ্যাস কমলেও, নতুন বছরে কলেজ স্ট্রিটের উষ্ণতা খুব একটা কমেনি।
একই গল্প কলকাতার যাত্রাপাড়া জুড়েও। বৈশাখের প্রথম দিন হৈ হৈ পড়ে যেত যাত্রাপাড়ায়। চৈত্র-বৈশাখ মানেই গৃহ লক্ষ্মীর আগমন— গাজন, চড়ক, চৈত্র সংক্রান্তি, নববর্ষ! নিয়ম করে সাজত যাত্রার অফিসগুলি। শিল্পীরা আসতেন, শিল্পানুরাগীরাও আসতেন। সেসময়, যাত্রার অফিসগুলিতে হালখাতা হতো। আজ সেসবেরই পাট চুকেছে।
পরিবর্তন প্রকৃতির নিয়ম। সেই নিয়ম মেনেই বদলে গিয়েছে বৈশাখের রূপ। ধুলোমাখা মেলার মাঠের বদলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মাল্টিপ্লেক্স হয়তো এখনের বৈশাখের ঠিকানা। বাড়িতে পাত পেড়ে লুচি-ছোলার ডাল আর কচি পাঁঠার ঝোলে কব্জি ডোবানোর বিকল্প এখন ‘আউটডোর ডাইনিং’। গড়িয়াহাট, বাগুইহাটি, নিউ মার্কেট, হাতিবাগানে ভিড় ঠেলে কেনাকাটা বদলেছে অনলাইন শপিং-এ। বাড়িময় খড়িমাটির আল্পনার বদলে বাজারজাত আল্পনার স্টিকারই বেশি চিত্তাকর্ষক এখন।
আসলে রীতিটা খানিক বদলেছে যুগের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পাল্টাচ্ছে নববর্ষ উদযাপনের ধরনও। কিন্তু আবেগটা চিরন্তন। বাঙালি মানেই তো পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজের শিকড়কে আঁকড়ে ধরে রাখা। বাঙালি হয়েও আরেকবার বাঙালি সাজা।







