হয় বাক স্বাধীনতা নয় কাজ
Film Industry Politics: আমরা দর্শক হিসেবে কী চাই? কাদের চাই? ‘ইয়েস স্যার’ বলা একদল অনুগত কর্মী, নাকি অনির্বাণ-ঋদ্ধির মতো ক্ষুরধার শিল্পী যারা পর্দায় জাদু তৈরি করতে পারেন? যখন রাজনীতি বা ইগো শিল্পের টুঁটি চেপে ধরে, তখন ক্ষতিটা কোনো নির্দিষ্ট অভিনেতার হয় না, ক্ষতিটা হয় আমাদের—দর্শকদের, বাংলার সংস্কৃতির।
আজকের টলিউডের ছবিটা বড়ই অদ্ভুত। একদিকে অনির্বাণ ভট্টাচার্যের মতো মেধাবী অভিনেতা-পরিচালক কাজ পাচ্ছেন না কারণ তিনি নাকি ‘ক্ষমতা’র কাছে মাথা নত করেননি। অন্যদিকে ঋদ্ধি সেন, যিনি ‘নগরকীর্তন’-এর জন্য জাতীয় পুরস্কার এনে দিলেন বাংলার ঘরে, তাঁকেও শুনতে হচ্ছে অলিখিত ‘না’। কারণ? তিনি স্পষ্টবক্তা, তিনি প্রশ্ন তুলতে জানেন।
শুধু বাংলা নয়, এই অসুখ ছড়িয়েছে মুম্বইতেও। খোদ এ আর রহমান—যিনি বিশ্বমঞ্চে ভারতের মুখ—তাঁকেও কোণঠাসা হতে হয় বলিউডের ‘গ্যাঙ কালচার’-এর চাপে।
প্রশ্নটা হলো, আমরা দর্শক হিসেবে কী চাই? কাদের চাই? ‘ইয়েস স্যার’ বলা একদল অনুগত কর্মী, নাকি অনির্বাণ-ঋদ্ধির মতো ক্ষুরধার শিল্পী যারা পর্দায় জাদু তৈরি করতে পারেন? যখন রাজনীতি বা ইগো শিল্পের টুঁটি চেপে ধরে, তখন ক্ষতিটা কোনো নির্দিষ্ট অভিনেতার হয় না, ক্ষতিটা হয় আমাদের—দর্শকদের, বাংলার সংস্কৃতির।
জাতীয় পুরস্কার কি তবে কেবল শোপিসের জন্য? নাকি মেরুদণ্ড সোজা রাখার দাম আজ এতটাই চড়া যে, নিজের কর্মক্ষেত্রেই ব্রাত্য হয়ে থাকতে হয়?
আজকের এই প্রতিবেদনের কেন্দ্রবিন্দুতে তিনজন অসামান্য প্রতিভাবান শিল্পী—বাংলার অনির্বাণ ভট্টাচার্য ও ঋদ্ধি সেন, এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতনামা সঙ্গীত পরিচালক এ আর রহমান। এঁদের কারুরই প্রতিভার প্রমাণের প্রয়োজন নেই। অথচ, অদ্ভুতভাবে এঁরা সকলেই কোনো না কোনোভাবে ‘অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা’ বা ‘কাজ না পাওয়ার’ এক অদৃশ্য ষড়যন্ত্রের শিকার। কিন্তু কেন? তিনজনের ক্ষেত্র আলাদা, প্রেক্ষাপট আলাদা, তবু যন্ত্রণার সুরটা কোথাও গিয়ে এক।
অনির্বাণ ভট্টাচার্য
বাংলা বিনোদন জগতে বর্তমান প্রজন্মের অন্যতম বুদ্ধিদীপ্ত অভিনেতা ও পরিচালক অনির্বাণ ভট্টাচার্য। তাঁর অভিনয় দক্ষতা বা পরিচালনার মুন্সিয়ানা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সাহস সম্ভবত তাঁর অতিবড় শত্রুরও নেই। তবু তিনি আজ ‘ব্যানড’ বা অনানুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ।
কেন কাজ পাচ্ছেন না অনির্বাণ?
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Zubeen Garg: অসুস্থ শরীরে মদ্যপান কেন? জুবিন গর্গ দীর্ঘদিন ধরে এপিলেপসি (মৃগী রোগ) এবং উচ্চ রক্তচাপজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন। তাঁর ঘনিষ্ঠ মহল এবং অভিযুক্তরা—সবাই এই বিষয়ে অবগত ছিলেন। অসম পুলিশের প্রশ্ন, জেনেবুঝে একজন অসুস্থ ব্যক্তিকে কেন এত বিপুল পরিমাণ মদ্যপান করতে দেওয়া হলো?
সমস্যার মূলে রয়েছে 'ফেডারেশন অফ সিনে টেকনিশিয়ান্স অ্যান্ড ওয়ার্কার্স অফ ইস্টার্ন ইন্ডিয়া' এবং তার সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাসের সঙ্গে অনির্বাণের এক পুরনো আইনি লড়াই। অতীতে ফেডারেশনের কিছু অযৌক্তিক নিয়ম এবং খবরদারির বিরুদ্ধে অনির্বাণ আইনি পথে হেঁটেছিলেন। তিনি একা ছিলেন না, অনেকেই ছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাকিরা নতি স্বীকার করেছেন। ফেডারেশনের অন্দরমহলের খবর অনুযায়ী, যারা অতীতে ফেডারেশনের বিরোধিতা করেছিলেন, তাঁদের অনেককেই ফেসবুকে ভিডিও পোস্ট করে বা মুচলেকা দিয়ে ক্ষমা চাইতে হয়েছে। তাঁরা ‘ভুল স্বীকার’ করে পুনরায় কাজ শুরু করেছেন।
কিন্তু অনির্বাণ ভট্টাচার্য এই ‘ক্ষমা চাওয়া’র সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী নন। তাঁর যুক্তি স্পষ্ট—তিনি কোনো অন্যায় করেননি, তিনি কেবল নিজের অধিকার এবং শিল্পের স্বাধীনতার পক্ষে আইনি লড়াই লড়েছেন। আর এখানেই 'ইগো'র সংঘাত। ফেডারেশনের কর্তাব্যক্তিদের কাছে এটি আর নিয়মের লড়াই নয়, এটি এখন ‘ক্ষমতা প্রদর্শনের’ লড়াই। অনির্বাণ যেহেতু মাথা নত করে ক্ষমা চাইতে রাজি নন, তাই অলিখিত ফতোয়া জারি রয়েছে তাঁর উপর। টেকনিশিয়ানরা তাঁর সঙ্গে কাজ করায় ‘না’ বলছেন—এমনই এক অদৃশ্য দেওয়াল তুলে দেওয়া হয়েছে, যা আসলে উপরতলার নির্দেশ। ফলে, মেধা থাকা সত্ত্বেও, কেবল মেরুদণ্ড সোজা রাখার ‘অপরাধে’ অনির্বাণ আজ বাংলা ছবিতে ব্রাত্য।
ঋদ্ধি সেন
‘নগরকীর্তন’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য ভারতের সেরা অভিনেতার জাতীয় পুরস্কার যার ঝুলিতে, সেই ঋদ্ধি সেন আজ বাংলা ছবিতে কাজ পাচ্ছেন না। সুমন ঘোষের ‘শ্রীরামপুর ডায়ারিজ’ ছবিতে তাঁর কাজ করার কথা থাকলেও, শেষ মুহূর্তে জানা যায় টেকনিশিয়ানরা তাঁর সঙ্গে কাজ করবেন না।
কেন কাজ পাচ্ছেন না ঋদ্ধি?
ঋদ্ধির ক্ষেত্রে কারণটি সরাসরি রাজনৈতিক এবং মতাদর্শগত। গত বছর ১৬ নভেম্বর ফেসবুকে ঋদ্ধি একটি দীর্ঘ পোস্ট লিখেছিলেন। সেখানে তিনি বাংলা চলচ্চিত্র জগতের বর্তমান অবস্থাকে ‘তৃণউড’ (তৃণমূল + টলিউড) বলে কটাক্ষ করতেও ছাড়েননি। তাঁর মূল বক্তব্য ছিল ইন্ডাস্ট্রির দ্বিচারিতা নিয়ে।
ঋদ্ধি প্রশ্ন তুলেছিলেন, যখন রাজ্যে নিয়োগ দুর্নীতি নিয়ে তোলপাড়, যোগ্য প্রার্থীরা রাস্তায় বসে কাঁদছেন, তখন টলিউডের তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা মৌন ছিলেন। অথচ, যেই মুহূর্তে টেকনিশিয়ানদের পেমেন্ট বা ইন্ডাস্ট্রির অভ্যন্তরীণ কোনো সমস্যা হলো, তখনই তাঁরা সমাজমাধ্যমে সহানুভূতির নাটক শুরু করলেন।
ঋদ্ধি স্পষ্ট ভাষায় লিখেছিলেন, “ওই যুদ্ধে যারা বন্দুকের ব্যবসা করে তারাই ব্যান্ডেজ সাপ্লাই করে।” তিনি আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিলেন, কীভাবে একসময়ের প্রতিবাদী শিল্পীরা আজ ক্ষমতার অলিন্দে ‘সুবিধাবাদী’ হয়ে উঠেছেন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Supriya Devi: উত্তম কুমার ও সুপ্রিয়া দেবীর সম্পর্ক নিয়ে চর্চা, আলোচনা বা জল- ঘোলা যা-ই বলা হোক না কেন, তার অভাব নেই। কিন্তু এই চর্চার কারণে মহানায়কের ছায়ায় যে প্রতিভাটি অনেকাংশে ঢেকে যায় তা হলো সুপ্রিয়া দেবী।
এই সত্য কথন সহ্য হয়নি ইন্ডাস্ট্রির ‘দাদাদের’। অভিযোগ, ফেডারেশনের তরফে ঋদ্ধিকে ক্ষমা চেয়ে চিঠি দিতে বলা হয়। কিন্তু ঋদ্ধি অনড়। তিনি সংবাদমাধ্যমকে স্পষ্ট জানিয়েছেন, “আমি ক্ষমা চাওয়ার মতো কোনও কাজ করেছি বলে মনে করি না। এটা আমার বাক স্বাধীনতা।”
ঋদ্ধির এই ‘না’ বলার সাহসই কাল হলো। ফেডারেশন বা গিল্ড হয়তো কাগজে-কলমে কোনো নিষেধাজ্ঞা জারি করেনি, কিন্তু ‘অসহযোগিতা’র অস্ত্র ব্যবহার করে তাঁকে কোণঠাসা করা হচ্ছে। ঋদ্ধির ঘটনা প্রমাণ করে, বর্তমান টলিউডে কাজ পেতে গেলে শুধু অভিনয় জানলে হবে না, জানতে হবে ‘চুপ’ থাকার বিদ্যা এবং তোষামোদির কৌশল।
এ আর রহমান
এবার টলিউড পেরিয়ে একটু বলিউডে যাওয়া যাক। এ আর রহমান—যিনি ভারতকে জোড়া অস্কার এনে দিয়েছেন, যার সুরের জাদুতে বিশ্ব মুগ্ধ। কিছুদিন আগে তিনি নিজেই এক সাক্ষাৎকারে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, হিন্দি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে (বলিউড) একটি ‘গ্যাঙ’ সক্রিয়, যারা ক্রমাগত তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে এবং তাঁকে কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
কেন কাজ পাচ্ছিলেন না রহমান?
বাংলার মতো এখানে কোনো রাজনৈতিক ফেডারেশন বা ইউনিয়নের ফতোয়া নেই। এখানে খেলাটা আরও সূক্ষ্ম এবং ভয়াবহ। রহমান জানিয়েছিলেন, তিনি ভালো কাজ ফিরিয়ে দেন না, কিন্তু তাঁর কাছে ভালো কাজ পৌঁছতেই দেওয়া হয় না। বলিউডের কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠী বা লবি, পরিচালকদের কাছে গিয়ে রহমানের নামে মিথ্যে গুজব ছড়ায়। বলা হয়—রহমান অধরা, তিনি সময় দেবেন না, কিংবা তিনি এখন আর আগের মতো সুর দিতে পারেন না।
রহমানের ক্ষেত্রে কারণটি হলো ‘মিডিওক্রিটি’র (মাঝারিমাপের মেধার) নিরাপত্তাহীনতা। রহমান এমন এক উচ্চতার শিল্পী, যাঁর সঙ্গে আপস করা যায় না। তিনি ‘কপি-পেস্ট’ বা ‘রিমেক’ সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী নন। অন্যদিকে, বলিউডের একটা বড় অংশ এখন মিউজিক মাফিয়াদের দখলে, যারা সস্তা এবং দ্রুত জনপ্রিয়তা চায়। রহমানের মতো স্বতন্ত্র এবং আপসহীন প্রতিভা সেখানে বেমানান। তাছাড়া, রহমান কারুর ‘ক্যাম্পে’র লোক নন। বলিউডের লবিবাজিতে যিনি কারুর তাঁবেদারি করেন না, তাঁকে একঘরে করে দেওয়ার রেওয়াজ বহুদিনের। সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যুর পর এই বিষয়টি আরও প্রকট হয়েছিল। রহমান সেই ‘বহিরাগত’ সিন্ড্রোমের শিকার, যেখানে ঘরের ছেলে হয়েও তিনি যেন পর।
কিন্তু, কেন এই পরিস্থিতি?
তিনটি ঘটনাকে পাশাপাশি রাখলে একটি ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে। অনির্বাণ, ঋদ্ধি এবং রহমান—তিনজনের ক্ষেত্রেই মূল সমস্যা ‘প্রতিভা’ নয়, সমস্যা হলো ‘মেরুদণ্ড’।
টলিউডে ফেডারেশন বা রাজনৈতিক দাদারা চান নিরঙ্কুশ আনুগত্য। অনির্বাণ বা ঋদ্ধির মতো শিল্পীরা যখন সেই আনুগত্য দেখাতে অস্বীকার করেন, তখন তা দাদাদের ইগোতে আঘাত করে। তাঁরা প্রমাণ করতে চান, “আমরাই শেষ কথা, তোমার প্রতিভা এখানে গৌণ।”
ঋদ্ধি সেনের পোস্টে যে ‘চুপ থাকার’ সংস্কৃতির কথা বলা হয়েছে, তা আসলে ভয়ের সংস্কৃতি। নতুনরা দেখছে, জাতীয় পুরস্কার পাওয়ার পরেও যদি ঋদ্ধি সেনকে বসিয়ে রাখা যায়, বা অনির্বাণের মতো জনপ্রিয় তারকাকে আটকে দেওয়া যায়, তাহলে সাধারণদের অবস্থা কী হবে! এই ভয় দেখিয়েই ‘হ্যাঁ-তে হ্যাঁ’ মেলানোর দল তৈরি করা হচ্ছে।
এ আর রহমানের ক্ষেত্রে বিষয়টি নিরাপত্তাহীনতার। যখন কোনো শিল্পী তাঁর কাজের মাধ্যমে অন্যদের ছাপিয়ে যান এবং সিস্টেমের গোলাম হতে অস্বীকার করেন, তখন ‘সিস্টেম’ তাঁকে রিজেক্ট করার চেষ্টা করে। কারণ, সিস্টেম চায় গড়পড়তা বা ‘অ্যাভারেজ’ মানুষ, যাদের নিয়ন্ত্রণ করা সহজ। জিনিয়াসদের নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।
বাংলা তথা ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতে এখন এক সন্ধিক্ষণ চলছে। একদিকে ওটিটি প্ল্যাটফর্মের হাত ধরে কাজের সুযোগ বাড়ছে, অন্যদিকে স্থানীয় রাজনীতির নোংরা খেলায় প্রতিভারা শ্বাসরুদ্ধ হয়ে পড়ছেন।
অনির্বাণ ভট্টাচার্য বা ঋদ্ধি সেন যদি কাজ না পান, তবে তাতে তাঁদের ব্যক্তিগত ক্ষতি হয়তো হবে, কিন্তু তার চেয়ে ঢের বেশি ক্ষতি হবে বাংলা সিনেমার। দর্শক বঞ্চিত হবেন ভালো অভিনয় থেকে। আর এ আর রহমানের মতো কিংবদন্তিকে যদি ষড়যন্ত্রের শিকার হতে হয়, তবে তা ভারতীয় সংস্কৃতির জন্য লজ্জার।
শিল্পের ধর্মই হলো সত্য বলা এবং প্রশ্ন তোলা। কিন্তু সেই প্রশ্ন তোলার জেরে যদি শিল্পীকে কর্মহীন হতে হয়, তবে বুঝতে হবে—আমরা আর শিল্পের উপাসক নই, আমরা এখন কেবল ক্ষমতার ক্রীতদাস।
অনির্বাণ, ঋদ্ধি বা রহমানরা হয়তো সাময়িকভাবে থমকে যাবেন, কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী আছেক্ষমতার আস্ফালন একসময় ধুলোয় মিশে যায়, কিন্তু সৃষ্টি বেঁচে থাকে অনন্তকাল। এখন দেখার বিষয়, এই ‘অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা’র দেওয়াল কবে ভাঙে, নাকি প্রতিভাদের এভাবেই একঘরে হয়ে লড়াই চালিয়ে যেতে হয়।







