দুর্ঘটনা না খুন? জুবিন গর্গের মৃত্যু ঘিরে সিঙ্গাপুর বনাম আসাম পুলিশের মুখোমুখি লড়াই
Zubeen Garg: অসুস্থ শরীরে মদ্যপান কেন? জুবিন গর্গ দীর্ঘদিন ধরে এপিলেপসি (মৃগী রোগ) এবং উচ্চ রক্তচাপজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন। তাঁর ঘনিষ্ঠ মহল এবং অভিযুক্তরা—সবাই এই বিষয়ে অবগত ছিলেন। অসম পুলিশের প্রশ্ন, জেনেবুঝে একজন অসুস্থ ব্যক্তিকে কেন এত বিপুল পরিমাণ মদ্যপান করতে দেওয়া হলো?
১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫। সিঙ্গাপুরের ল্যাজারাস দ্বীপের কাছে নোঙর করা একটি বিলাসবহুল ইয়ট। চারপাশে আদিগন্ত নীল জলরাশি। সেই জলরাশিই যে কিছুক্ষণ পর গ্রাস করে নেবে অসমের 'হার্টথ্রব', ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী জুবিন গর্গকে, তা হয়তো কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। কিন্তু ঘটনা সেটাই ঘটেছিল। জুবিন গর্গ আর ফিরে আসেননি। তাঁর এই আকস্মিক প্রস্থান কেবল বিনোদন জগতকে স্তব্ধ করে দেয়নি, বরং জন্ম দিয়েছে এক বিশাল প্রশ্নচিহ্নের।
আজ ঘটনার চার মাস পর, সেই প্রশ্নচিহ্ন আরও গাঢ় হয়েছে। জুবিন গর্গের মৃত্যু কি কেবলই এক মর্মান্তিক জলডুবি বা 'অ্যাক্সিডেন্ট'? নাকি এর নেপথ্যে রয়েছে কোনো গভীর ষড়যন্ত্র, বা ঠান্ডা মাথার খুন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আজ মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দুটি দেশের পুলিশ প্রশাসন—সিঙ্গাপুর পুলিশ ফোর্স এবং আসাম পুলিশ। দুই মেরুর দুই তদন্ত রিপোর্ট এই মৃত্যরহস্যকে এক জটিল গোলকধাঁধায় পরিণত করেছে।
সিঙ্গাপুরের করোনার আদালতে (Coroner’s Court) গত ১৪ জানুয়ারি যে রিপোর্ট পেশ করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণভাবে ফরেনসিক এবং পারিপার্শ্বিক প্রমাণের উপর ভিত্তি করে তৈরি। সিঙ্গাপুর পুলিশের ভাষ্যমতে, এটি একটি 'দুর্ঘটনা'। তাদের প্রধান যুক্তিগুলো হলো—
• টক্সিকোলজি রিপোর্টে দেখা গেছে, মৃত্যুর সময় জুবিনের রক্তে অ্যালকোহলের মাত্রা ছিল ৩৩৩ মিলিগ্রাম (প্রতি ১০০ মিলিলিটারে)। সিঙ্গাপুরের আইনে গাড়ি চালানোর জন্য অনুমোদিত মাত্রা যেখানে ৮০ মিলিগ্রাম, সেখানে জুবিনের শরীরে এর উপস্থিতি ছিল চার গুণেরও বেশি। চিকিৎসাবিজ্ঞান বলে, এই পরিমাণ অ্যালকোহল একজন মানুষের স্নায়ুতন্ত্রকে অকেজো করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। এই অবস্থায় সাঁতার কাটা তো দূরস্ত, নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে থাকাই অসম্ভব।
• তদন্তকারী অফিসারের বয়ান অনুযায়ী, জুবিন প্রথমে লাইফ জ্যাকেট পরেই জলে নেমেছিলেন। কিন্তু বন্ধুদের সঙ্গে সাঁতার কাটার সময় তিনি নিজেই সেটি খুলে ফেলেন। এমনকি তাঁকে দ্বিতীয়বার জ্যাকেট অফার করা হলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং একা ল্যাজারাস দ্বীপের দিকে এগিয়ে যান।
• ইয়টে উপস্থিত প্রায় ২০ জন সাক্ষীর বয়ান অনুযায়ী, জুবিনকে কেউ জোর করে জলে ঠেলে দেয়নি। তিনি স্বেচ্ছায় সাঁতার কাটছিলেন এবং হঠাৎই তাঁর শরীর জলে ভেসে ওঠে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
MGNREGA: মনরেগার পরিবর্তে যে নতুন আইন আনা হয়েছে তা আদতে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার উপরেও আক্রমণ নামিয়ে এনেছে। রাজ্যগুলির সঙ্গে পরামর্শ না করেই এবং রাজ্য সরকারগুলির রাজকোষের উপর সীমাবদ্ধতা আছে, এই বিষয়টি পুরোপুরি জানার পরেও, কেন্দ্র একতরফা ভাবে এবং একেবারে বিনামেঘে বজ্রপাতের মতো কর্মসংস্থান প্রকল্পে রাজ্যগুলির প্রদেয় অংশের অনুপাত এখনকার ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪০ শতাংশ করেছে।
সিঙ্গাপুর পুলিশের এই তত্ত্ব অনুযায়ী, জুবিন নিজের হঠকারিতা এবং অতিরিক্ত মদ্যপানের শিকার। এখানে কোনো অপরাধমূলক অভিসন্ধি বা 'ফাউল প্লে' নেই।
ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব ও খুনের অভিযোগ সিঙ্গাপুরের এই সরলরৈখিক সমীকরণের ঠিক বিপরীতে দাঁড়িয়েছে অসম পুলিশ। গুয়াহাটির কামরূপ মেট্রোপলিটন আদালতে পেশ করা তাদের ৩৫০০ পৃষ্ঠার চার্জশিট বলছে অন্য কথা। অসম পুলিশ এই ঘটনাকে দেখছে 'হত্যাকাণ্ড' হিসেবে। ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-এর ১০৩(১) ধারায় চারজনের বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগ আনা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছেন জুবিনের দীর্ঘদিনের ম্যানেজার সিদ্ধার্থ শর্মা এবং নর্থ ইস্ট ফেস্টিভ্যালের আয়োজক শ্যামকানু মহন্ত।
অসম পুলিশের স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম (SIT)-এর তদন্তে উঠে আসা প্রশ্নগুলো অত্যন্ত অস্বস্তিকর এবং যুক্তিযুক্ত—
• অসুস্থ শরীরে মদ্যপান কেন? জুবিন গর্গ দীর্ঘদিন ধরে এপিলেপসি (মৃগী রোগ) এবং উচ্চ রক্তচাপজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন। তাঁর ঘনিষ্ঠ মহল এবং অভিযুক্তরা—সবাই এই বিষয়ে অবগত ছিলেন। অসম পুলিশের প্রশ্ন, জেনেবুঝে একজন অসুস্থ ব্যক্তিকে কেন এত বিপুল পরিমাণ মদ্যপান করতে দেওয়া হলো? এটা কি কেবলই অবহেলা, নাকি এর পেছনে ছিল তাঁকে শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল করে দেওয়ার ছক?
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Iran protests: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভকারীদের 'মুক্তির' আহ্বান জানিয়েছেন এবং প্রয়োজনে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। অন্যদিকে ইরানের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইজরায়েল এই বিক্ষোভকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বিক্ষোভকারীদের বীরত্বকে কুর্নিশ জানিয়েছেন
• ৩৩৩ মিলিগ্রাম অ্যালকোহল নিয়ে একজন মানুষ যখন লাইফ জ্যাকেট খুলে গভীর সমুদ্রে সাঁতার কাটতে যান, তখন তাঁর সঙ্গীরা কী করছিলেন? তাঁরা কি তাঁকে থামানোর চেষ্টা করেছিলেন? নাকি তাঁকে সেই মৃত্যুকূপের দিকে ঠেলে দিয়েছিলেন? চার্জশিটে দাবি করা হয়েছে, জুবিনকে 'উৎসাহিত' করা হয়েছিল এবং পরিস্থিতি এমন তৈরি করা হয়েছিল যাতে তিনি জলে নামতে বাধ্য হন।
• জুবিনের নিজের কাজিন, সন্দীপন গর্গ—যিনি নিজে একজন পুলিশ অফিসার—ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে দায়িত্বজ্ঞানহীনতার (Culpable Homicide) অভিযোগ আনা হয়েছে। পরিবারের একজন সদস্য এবং আইনের রক্ষক হয়েও তিনি কেন জুবিনকে আটকালেন না?
দুই তদন্তের সন্ধিক্ষণে কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন একজন সাংবাদিক বা গবেষক হিসেবে এই দুই তদন্ত রিপোর্ট পাশাপাশি রাখলে কিছু গভীর প্রশ্ন আপনাআপনি উঠে আসে। এই প্রশ্নগুলোই হতে পারে এই রহস্যভেদের চাবিকাঠি—
• সিঙ্গাপুর পুলিশের দাবি অনুযায়ী জুবিন লাইফ জ্যাকেট 'প্রত্যাখ্যান' করেছিলেন। কিন্তু ৩৩৩ মিলিগ্রাম অ্যালকোহল যার রক্তে বইছে, তাঁর কি কোনো বিচারবুদ্ধি বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকে? সেই অবস্থায় তাঁর 'না' বলাটাকে কি সম্মতি হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত ছিল? নাকি জোর করে তাঁকে নিরাপত্তা বলয়ে রাখাটা সঙ্গীদের কর্তব্য ছিল? এখানে 'ব্যক্তিগত স্বাধীনতা'র যুক্তি কি খাটে?
• পুলিশ কোস্ট গার্ডের রিপোর্ট বলছে, খবর পাওয়ার ৯ মিনিটের মধ্যে তারা পৌঁছেছিল। কিন্তু জুবিন জলে ডোবার ঠিক কতক্ষণ পর কোস্ট গার্ডকে খবর দেওয়া হয়েছিল? সেই মাঝের সময়টুকুতে ইয়টে কী ঘটেছিল? সেখানে কি কোনো তর্কাতর্কি বা ধস্তাধস্তি হয়েছিল, যা সিসিটিভি বা বাইরের সাক্ষীর অভাবে চাপা পড়ে গেছে?
• অসম পুলিশ খুনের মামলা রুজু করেছে, কিন্তু খুনের মোটিভ কী? আর্থিক লেনদেন? ব্যক্তিগত শত্রুতা? নাকি পেশাগত রেষারেষি? জুবিনের মতো একজন মহাতারকাকে সরিয়ে দেওয়ার পেছনে কার স্বার্থ থাকতে পারে, সেই বিষয়টি এখনও জনসমক্ষে পরিষ্কার নয়। চার্জশিটে এই 'মোটিভ' কতটা জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠিত, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
জুবিন গর্গ ছিলেন আবেগের জাদুকর। তাঁর সুর ব্রহ্মপুত্রের মতোই চঞ্চল আবার গভীর। আজ সেই সুর স্তব্ধ। কিন্তু তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে যে আইনি ও কূটনৈতিক জটিলতা তৈরি হয়েছে, তা সহজে মেটার নয়। সিঙ্গাপুরের আদালত যেখানে বিজ্ঞান এবং ফরেনসিক প্রমাণের ওপর দাঁড়িয়ে রায় দিচ্ছে, সেখানে অসম পুলিশ জোর দিচ্ছে পারিপার্শ্বিক ষড়যন্ত্র এবং 'মেনস রিয়া' (অপরাধমূলক মানসিকতা)-র ওপর।
মৃতের পরিবার, বিশেষ করে তাঁর স্ত্রী গরিমা সাইকিয়া গর্গ চাইছেন ঘটনার প্রতিটি মুহূর্তের পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত। জুবিনের কাকা আদালতে দাঁড়িয়ে যে প্রশ্ন করেছেন—"জুবিন স্বেচ্ছায় জলে নেমেছিল, নাকি তাঁকে নামতে বাধ্য করা হয়েছিল?"—এটাই এখন এই মামলার মূল প্রতিপাদ্য।
শেষ পর্যন্ত এই লড়াইটা হয়তো দাঁড়াবে 'বিজ্ঞান বনাম বিবেক'-এর লড়াইয়ে। টক্সিকোলজি রিপোর্ট হয়তো বলবে জুবিন মাতাল ছিলেন, কিন্তু মানবিকতার আদালত প্রশ্ন তুলবে—মাতাল জুবিনকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিল কারা? যতক্ষণ না এই প্রশ্নের উত্তর মিলছে, ততক্ষণ ল্যাজারাস দ্বীপের জল জুবিন-ভক্তদের কাছে কেবল লোনা জল নয়, একরাশ দীর্ঘশ্বাস হয়েই থাকবে।







