"শিগগির চল একটা শট দিবি"— ঋত্বিক, সুপ্রিয়া এবং এক অবিস্মরণীয় 'কোমল গান্ধার'

Supriya Devi: উত্তম কুমার ও সুপ্রিয়া দেবীর সম্পর্ক নিয়ে চর্চা, আলোচনা বা জল- ঘোলা যা-ই বলা হোক না কেন, তার অভাব নেই। কিন্তু এই চর্চার কারণে মহানায়কের ছায়ায় যে প্রতিভাটি অনেকাংশে ঢেকে যায় তা হলো সুপ্রিয়া দেবী।

inscript
৪ মিনিট
"শিগগির চল একটা শট দিবি"— ঋত্বিক, সুপ্রিয়া এবং এক অবিস্মরণীয় 'কোমল গান্ধার'

সময়টা ষাটের দশকের গোড়ার দিক। বাংলা সিনেমার আকাশে তখন রোমান্টিসিজমের গোলাপি আভা। একদিকে উত্তম-সুচিত্রার প্রেমের রসায়ন, অন্যদিকে সত্যজিৎ রায়ের ধ্রুপদী ঘরানা। ঠিক এই সময়ের সন্ধিক্ষণে এক অদ্ভুত, খ্যাপাটে পরিচালক খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন তাঁর মানসপ্রতিমাকে। তিনি ঋত্বিক কুমার ঘটক। আর তাঁর জহুরির চোখ গিয়ে পড়ল সুপ্রিয়া দেবীর উপর— আমাদের সবার প্রিয় বেণুদি।

উত্তম কুমার ও সুপ্রিয়া দেবীর সম্পর্ক নিয়ে চর্চা, আলোচনা বা জল- ঘোলা যা-ই বলা হোক না কেন, তার অভাব নেই।কিন্তু এই অত্যধিক চর্চার আড়ালে মহানায়কের ছায়ায় যে প্রতিভাটি অনেকাংশে ঢেকে যায়, তা হলো সুপ্রিয়া দেবী।

উত্তম কুমার ও সুপ্রিয়া দেবীর আভিনেতা-অভিনেত্রীর জুটি বহুল চর্চিত। কিন্তু যে জুটি নিয়ে খুব কম চর্চা হয়, তা হল ঋত্বিক ঘটক ও সুপ্রিয়া দেবীর পরিচালক-অভিনেত্রীর জুটি। এক অভিনেত্রীর তাঁর পরিচালকের সঙ্গে পেশাদারি সম্পর্কের গণ্ডির বাইরে বেরিয়ে এক ব্যক্তিগত সম্পর্কের প্রতিফলন। এই প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই যখনই আমরা সুপ্রিয়া দেবীকে দেখতাম ঋত্বিক ঘটক সম্পর্কে কথা বলতে। ঋত্বিক ঘটককে নিয়ে কথা বললেই, তাঁর কথায়, চোখে এক অদ্ভুত শ্রদ্ধা-ভালোবাসা-অভিমান মিশ্রিত আভিব্যক্তি দেখতে পাওয়া গেছে। একজন কিংবিদন্তির প্রতি শ্রদ্ধা, একজন দাদার প্রতি ভালবাসা, আর সেই দাদার বোনের কথা না শুনে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাওয়ায় আভিমান।

বাংলা সিনেমার ইতিহাসের অন্যতম আইকনিক সংলাপ— “দাদা আমি বাঁচতে চাই”— সেলুলয়েডে এই আর্তনাদকে অমরত্ব দিয়েছিলেন তাঁরাই। বাংলা সিনেমার গ্ল্যামারাস অভিনেত্রীকে 'মেঘে ঢাকা তারা'র ট্র্যাজিক নীতার রূপ দিয়েছিলেন ঋত্বিক ঘটক। এই ছবি তৈরির অভিজ্ঞতাও ছিল অসাধারণ। এই ছবির অভিজ্ঞতার স্মৃতিচারণায় সুপ্রিয়া দেবীর কথায় শুধুমাত্র ঋত্বিক ঘটকের নাম আসে না। আসে জর্জদার (দেবব্রত বিশ্বাস) কথা, আসে বিজনদার (ভট্টাচার্য) কথা, আসে ইউনিটের আরও সকলের কথা। কারণ এই ছবিতে যেন একটি ইউনিট নয়, একটি পরিবার একসঙ্গে কাজ করছিল। আর তাই, ছবির কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার পর সকলে হাউ হাউ করে কাঁদে, ঠিক একটি সংসার ভেঙে যাওয়ার কান্নার মতো।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
পরাঙ্মুখ, হৃদয়ে দূরগামী; বেলা তার

Bela Tarr: তিনি চলচ্চিত্রকে কোনো মাধ্যম হিসেবে গুরুত্ব দিতে চাননি। তাঁর মনে হয়েছিল তাঁর অন্তর্গত বেদনার কথা— আমরা যারা বেদনার সন্তান, তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া উচিত এক গূঢ় ভাষায়।

এরপর শুরু হয় আরেক অধ্যায়— 'কোমল গান্ধার'। ​‘কোমল গান্ধার’-এর শুটিংয়ের দিনগুলো ছিল এক একটা যুদ্ধের মতো। সুপ্রিয়া দেবীর কথায় আমরা বারবার শুনতে পাই সেই অভিজ্ঞতার কথা। পরিচালক মশাই তাঁকে বারবার তুলে নিয়ে যেতেন অন্য ছবির শুটিং থেকে। কারণ- প্রযোজক পাওয়া যায়নি। আর তাই, যখনই একটু টাকা জোগাড় হয়, তখনই ক্যামেরা সহযোগে শুরু হয় ছবির শুটিংয়ের কাজ।

সুপ্রিয়া দেবী এই ছবির শুটিংয়ের আভিজ্ঞতা তুলে ধরার সময় একবার বলেছিলেন, "তখন খোকাদা অর্থাৎ অগ্রদূতের ছবি করছি। সেখানে হঠাৎ, লিকলিকে লম্বা চেহারার একজনকে দূর থেকে দেখে ঋত্বিকদাই মনে হল। আমি তাঁকে দেখে অনুমতি নিয়ে বেরিয়েছি। ঋত্বিকদা বলেন, "তুই শিগগির চল, একটা শট দিবি।" প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছিল। ফ্লোরের দরজার কাছে আমি ভিজছিলাম তখন, আমি বললাম কীভাবে যাব? ঋত্বিকদা বলছেন, "শট দিতেই হবে তুই চল।" আমি মিথ্যে কথা বলে ২ ঘণ্টার ছুটি নিলাম। শট হয়ে যাওয়ার পর ঋত্বিকদা বলেন, "তুই যদি পারিস সাতটার পর এসে আবার আরেকটা শট দিস লক্ষ্মীটি।" পাঁচটায় প্যাক আপের পর আবার এসে ঋত্বিকদার বাড়িতে আরেকটা শট দিলাম। এরপর আমি অজয় করের একটা সিনেমার শুটিং করছিলাম। ঋত্বিকদা এসে হাজির। বললেন, "তোকে তিনদিন ম্যানেজ করতে হবে।" আমি বললাম, কী করে ম্যানেজ করব? তুমি এরকম হুট হাট করে আমায় নিয়ে যাবে? তুমি আমার ডেট নিচ্ছ না কেন? বলে, "টাইম নেই। ডেটের টাইম নেই। প্রোডিউসার পাচ্ছি না। টাকা যখনই পাচ্ছি, তখনই শুটিং করছি।" আমি কিছুতেই ঋত্বিকদাকে না করতে পারতাম না। মানুষটাকে ভালোও বাসতাম ভীষণ। আমি নোট পাঠালাম। ভীষণ অসুস্থ, তাই বাপের বাড়ি থেকে বাবা এসে নিয়ে গেছে। এরকম করে তিন-চার বার পালিয়েছিলাম। এরকম পালিয়ে পালিয়ে কাজের শুটিং হয়। একবার তো প্রায় ধরা পড়েছিলাম অসিত সেনের কাছে। দার্জিলিং-এ শুটিং ছিল। তার আগে আমি শুনেছি ঋত্বিকদা কার্শিয়াং-এ এসেছে। আমি তখনই ভয়ে ভয়ে ছিলাম এখান থেকেও আমায় পালাতে হবে। পরের দিন ভোরে আসিতদা আসার আগে ঋত্বিকদা এসে হাজির। তারপর চলে এলাম কার্শিয়াং-এ। আমি বলেছিলাম, আর আমায় কেউ পাঠ দেবে না। আমায় এবার ছাড়ো। তখন ঋত্বিকদা বলেন, " পারবি না আসতে? ঠিক আছে। আমিও ম্যানেজ করে নেব।" ফিরে এসে আমি যখন সিনটা দেখলাম। দেখি উনি পুনুকে (রমেশ সেন) শাড়ি পরিয়ে শটটা নিয়েছেন। লং-এ শট নিয়েছেন। এটা শুধু ঋত্বিক ঘটকই পারে।"

সুপ্রিয়া দেবী জানতেন, এই কাজের জন্য তিনি কোনো পারিশ্রমিক পাবেন না। ঋত্বিক ঘটক ডেটও নেননি তাঁর। এমনকি, তখন তিনি অন্যান্য জায়গায়, অন্যান্য ছবির কাজে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি এও জানতেন, এসবের ফলে তাঁর রেপুটেশন খারাপ হতে পারে কাজের জায়গায়। তিনি আর কাজ নাও পেতে পারেন। কিন্তু বেণুদির তাঁর জিনিয়াস ঋত্বিকদার উপর ভরসা ছিল অগাধ। তিনি জানতেন, এই লুকিয়ে বেরিয়ে, পালিয়ে বেড়িয়ে বানানো ছবিটি বেশ ভালোই হবে।

আর তাই, যখন তাঁর প্রিয় ঋত্বিকদার মাদকাসক্তির কথা শুনলেন, তখন অনেক বোঝালেন তাঁকে। কিন্তু তিনি কথা শোনেননি। ঋত্বিকদা কেন কথা শুনলেন না? এই অভিমান সুপ্রিয়া দেবীর কোনোদিন যায়নি। তিনি দিনের পর দিন এই মেধাবী মানুষটিকে নিজেকে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে দেখলেন। তাঁর এই অভিযোগও ছিল যে, কেউ চেষ্টা করেননি ঋত্বিকদার পাশে দাঁড়ানোর। সবাই শেষ হতে দিয়েছেন ওঁকে।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।