স্ক্রিন ছাড়াই কোডিং শিখবে দৃষ্টিহীনরা, ভারতীয় ছাত্রদের আবিষ্কার তাক লাগাল বিশ্বকে
Project TACTO: কোনো স্ক্রিন ছাড়াই, স্রেফ হাতের স্পর্শ, বোতাম, সেন্সর আর অডিও বার্তার সাহায্যে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের কোডিং শেখাতে গালগোটিয়াস ইউনিভার্সিটির চার শিক্ষার্থী তৈরি করেছে এক অভিনব ডিভাইস—'TACTO'। প্রচলিত স্ক্রিন-নির্ভর শিক্ষার নিয়মকে বদলে দিয়ে কোডিংয়ের মতো জটিল বিষয়কে এই যন্ত্রটি অনায়াসে তাদের হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে।
কোডিং শেখা মানেই স্ক্রিনের সামনে বসে নজর রাখা। একটা ল্যাপটপ বা কম্পিউটারের মনিটর, সেখানে টিমটিম করে জ্বলতে থাকা একটা কার্সার, নানা রঙের কোডের ব্লক আর মাউসের এক ক্লিকেই চোখের সামনে ভেসে ওঠা ফলাফল।
খুব চেনা এক সাধারণ সাজানো ব্যবস্থা, তাই না? কিন্তু একবার ভেবে দেখেছেন কি, যাদের চোখে আলো নেই, সেই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ছাত্রছাত্রীদের জন্য এই একটাই চেনা নিয়ম কতটা বড় বাধা? "কোডিং করতে গেলে স্ক্রিন লাগবেই"—এই একটা অলিখিত নিয়ম একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই দক্ষতাকে তাদের নাগালের বাইরে রেখে দিয়েছিল। নিঃশব্দে, বছরের পর বছর ধরে।
এই চেনা নিয়মটাকেই বদলে দেওয়ার জেদ চেপেছিল গ্রেটার নয়ডার গালগোটিয়াস ইউনিভার্সিটির (Galgotias University) চারজন তরুণ-তরুণীর মাথায়। তারা ঠিক করলেন, স্ক্রিনের উপর থেকে নির্ভরতা পুরোপুরি সরিয়ে দিতে হবে। আর সেই জেদ থেকেই জন্ম নিল এক চমৎকার আবিষ্কার—'TACTO' (Project Tacto)।
এটি এমন এক ডিভাইস বা যন্ত্র, যা কোডিংয়ের মতো জটিল বিষয়কে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের হাতের মুঠোয় এনে দেয়। কোনো স্ক্রিন বা পর্দা ছাড়াই, স্রেফ হাতের স্পর্শ, বোতাম, সেন্সর আর কানে শোনার অডিও বার্তার সাহায্যে কোডিংয়ের অ আ ক খ শেখা যায় এই যন্ত্রে। আর এই দুর্দান্ত দেশীয় আবিষ্কারই সম্প্রতি বিশ্বমঞ্চে ভারতের নাম উজ্জ্বল করে ছিনিয়ে এনেছে সেরা শিরোপা।
হংকংয়ের মঞ্চে ভারতের জয়জয়কার
সম্প্রতি হংকংয়ের 'দ্য এডুকেশন ইউনিভার্সিটি'-তে বসেছিল একটি আন্তর্জাতিক ছাত্র উদ্ভাবন প্রতিযোগিতার আসর—'EDVentures 2026'। সেখানে বিশ্বের ১০টি দেশের ১৯টি বাঘা বাঘা বিশ্ববিদ্যালয় অংশ নিয়েছিল। সিঙ্গাপুরের নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটি থেকে শুরু করে সৌদি আরবের কিং সৌদ ইউনিভার্সিটি কিংবা থাইল্যান্ডের মাহিদোল ইউনিভার্সিটি—সবাই হাজির হয়েছিল তাদের অভিনব সব আইডিয়া নিয়ে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ভারতেই জন্ম প্রাঞ্জলির। তবে ছোটবেলাতেই, মাত্র ১১ বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে তিনি আমেরিকার ফ্লোরিডায় চলে যান। প্রাঞ্জলির বাবা ছিলেন একজন ইঞ্জিনিয়ার। বাবার কাজ দেখতে দেখতেই ছোট্ট প্রাঞ্জলির কম্পিউটারের প্রতি ভালবাসা তৈরি হয়।
কিন্তু সবাইকে পিছনে ফেলে বিচারকদের মন জয় করে নিল ভারতের এই চার শিক্ষার্থীর তৈরি 'TACTO'। প্রতিযোগিতা থেকে তারা শুধু শীর্ষ পুরস্কারই (Top Prize) ছিনিয়ে আনেনি, সেই সঙ্গে জিতে নিয়েছে 'এডাব্লিউএস চ্যাম্পিয়নশিপ প্রাইজ' (AWS Championship Prize)-ও। পুরস্কার হিসেবে মিলেছে প্রায় ৭,০০০ মার্কিন ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় যা প্রায় ৬.৭ লাখ টাকা) অর্থসাহায্য এবং তাদের এই প্রজেক্টকে আরও বড় করার নানা সুযোগ-সুবিধা।
আসলে, রাষ্ট্রপুঞ্জের বা জাতিসংঘের একটি বড় লক্ষ্য হলো 'সবার জন্য সমান এবং মানসম্মত শিক্ষা' (UN SDG 4)। 'TACTO' সরাসরি সেই লক্ষ্য পূরণেই কাজ করছে।
"ব্রেইল যখন লেগো ব্লকের মুখোমুখি"
নিশ্চয়ই জানতে ইচ্ছে করছে, স্ক্রিন ছাড়া এই যন্ত্রটি আসলে কীভাবে কাজ করে? এর কাজ করার পদ্ধতিটি ভারি মজার। যারা এই প্রজেক্টটি দেখেছেন, তারা সহজ ভাষায় একে বলেন—"Braille meets Lego"। অর্থাৎ, ব্রেইল আর লেগো ব্লকের এক চমৎকার জুটি!
হাতের ছোঁয়ায় কোডের ব্লক: কোডিংয়ের বিভিন্ন ধারণা (যেমন কোনো কাজ বারবার করা বা লুপ, শর্তসাপেক্ষ কোডিং বা কন্ডিশনালস ইত্যাদি) ছোট ছোট প্লাস্টিকের ব্লকের আকারে তৈরি করা হয়েছে। এই প্রত্যেকটি ব্লকের গায়ে ব্রেইল লিপিতে চমৎকার মার্কিং করা থাকে, যা দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থীরা আঙুল বুলিয়ে অনায়াসে পড়তে পারে।
ম্যাজিক ম্যাট: এরপর শিক্ষার্থীরা তাদের ইচ্ছেমতো সেই ব্লকগুলি তুলে নিয়ে একটি সেন্ট্রালাইজড রিডার ম্যাট বা বেসের (এক ধরনের বিশেষ ম্যাট) উপর একের পর এক সাজিয়ে কোডের একটি ধাপ বা সিকোয়েন্স তৈরি করে। ঠিক যেমন ছোটবেলায় লেগো ব্লক দিয়ে ঘরবাড়ি বানানো হতো!
চোখের বদলে কান: এই রিডার ম্যাটের নিচে থাকে বিশেষ সেন্সর। ব্লকগুলি সাজানো হওয়া মাত্রই সেন্সর সেই বিন্যাসটি বুঝে নেয় এবং সঙ্গে সঙ্গে লাউডস্পিকারে রিয়েল-টাইম অডিও ফিডব্যাক বা ভয়েস মেসেজ দিতে শুরু করে। কী কোড তৈরি হলো, কোডিংয়ে কোনো ভুল আছে কি না, কিংবা এর চূড়ান্ত ফলাফল কী এল—সবকিছুই শিক্ষার্থীরা স্পষ্ট শুনতে পায়।
চিত্রঋণ: PCCE
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
AI data center cooling: এআই-এর দ্রুত বিস্তারের ফলে ডেটা সেন্টারের বাড়তে থাকা বিদ্যুৎ চাহিদার সমাধান কি পারমাণবিক চুল্লির শীতলীকরণ প্রযুক্তিতে লুকিয়ে আছে? এমআইটির গবেষকদের তৈরি ‘অ্যাডাপ্টিভ ফেজ কুলিং’ কি এআই চিপকে আরও দক্ষভাবে ঠান্ডা রেখে বিদ্যুৎ সাশ্রয় ও কর্মক্ষমতা বাড়াতে পারবে?
ফলে, কোনো কিছু না দেখেই, স্রেফ ছুঁয়ে এবং শুনে প্রোগ্রামিংয়ের পিছনের আসল লজিক বা যুক্তিটা চোখের নিমেষে জলের মতো সহজ হয়ে যায়।
এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছে গালগোটিয়াস ইউনিভার্সিটির চার শিক্ষার্থীর একটি চমৎকার টিম।
গৌরাঙ্গ পান্ত: বিটেক কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। এই স্টার্টআপের ফাউন্ডার এবং সিইও।
আয়ুষ রাজ: এই প্রজেক্টের কো-ফাউন্ডার এবং সিটিও (চিফ টেকনোলজি অফিসার), যিনি ডিভাইসটির কারিগরি দিক সামলান।
সৃষ্টি মান্ডোলিয়া: বিটেক সিএসই উইথ ডাটা সায়েন্সের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। তিনি এই ডিভাইসের 'চিফ কারিকুলাম ডিজাইনার'। অর্থাৎ, কীভাবে ধাপে ধাপে সহজ করে সিলেবাস সাজালে একজন দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থী সবচেয়ে ভালো শিখবে, সেই দায়িত্ব সৃষ্টি সামলান।
কাব্যা সিং: বিবিএ ফিনান্সিয়াল ইনভেস্টমেন্ট অ্যানালিসিসের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। এই পুরো প্রজেক্টের বিজনেস লিড বা ব্যবসার দিকটি দেখছেন তিনি।
এই চার তরুণ তুর্কির পিছনে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়েছিলেন তাদের মেন্টর বা পরামর্শদাতা, পেশায় উদ্যোক্তা রচিথ মাথুর। ইনভেস্টরদের সামনে কীভাবে নিজেদের তুলে ধরতে হবে, কীভাবে এই পণ্য বাজারে আসবে—সবকিছু নিয়ে দিনের পর দিন তর্ক-বিতর্ক আর কাটাছেঁড়ার মধ্য দিয়েই তৈরি হয়েছে এই বিজয়ী টিম।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও এই প্রতিভাকে চিনতে ভুল করেনি। গালগোটিয়াস ইউনিভার্সিটি পুরো টিমের হংকং যাওয়ার সমস্ত খরচ এবং বিমান টিকিট স্পনসর করেছে। শুধু তাই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের '১০ কোটি টাকার ইনোভেশন ফান্ড' থেকেও এই প্রজেক্টকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ফান্ডের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
কেন এই যন্ত্র ভারতের জন্য ভীষণ জরুরি?
পরিসংখ্যান বলছে, এই মুহূর্তে ভারতে প্রায় ৪৯.৫ লাখ মানুষ সম্পূর্ণ অন্ধ এবং প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষ আংশিক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। অর্থাৎ, গোটা বিশ্বের মোট দৃষ্টিহীন জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষ আমাদের দেশেই থাকেন।
অথচ আমাদের সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থা এখনও তাদের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। অনেক সময়ই দেখা যায়, স্কুলের শুরুর দিনগুলিতেই কোনো দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিশুকে বিজ্ঞান বা প্রযুক্তির বিষয়গুলি থেকে একটু দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়। কখনো শিক্ষকের ছোট একটা মন্তব্য—"এই সাবজেক্টটা তোমার জন্য বড্ড কঠিন হবে", আবার কখনো স্কুলের পরিকাঠামোর অভাব। শুনতে শুনতে এই শিশুদের মনেও কোথাও একটা ধারণা তৈরি হয়ে যায় যে, বিজ্ঞান বা প্রযুক্তির দুনিয়াটা বোধহয় তাদের জন্য নয়।
কোডিং শেখার বয়স যখন আসে, ততদিনে তারা মানসিকভাবে অনেকটাই পিছিয়ে পড়ে। বাজারচলতি স্ক্রিন রিডার সফটওয়্যারগুলি বড়দের কিছুটা সাহায্য করলেও, একদম নতুন একজন শিক্ষার্থীর জন্য স্ক্রিনের লেখা শুনে কোডিং শেখাটা প্রচণ্ড বিভ্রান্তিকর এবং একাকিত্বের।
'TACTO' ঠিক এই অন্ধকারটাকেই দূর করতে চায়। এটি বেঙ্গালুরুর 'আইইটি সামিট'-এ 'ইঞ্জিনিয়ারিং রেজিলিয়েন্স অ্যাওয়ার্ড'-এও সম্মানিত হয়েছে। বর্তমানে এটি একটি রেজিস্টার্ড স্টার্টআপ হিসেবে কাজ শুরু করেছে। এদের মূল লক্ষ্য হলো—একটি ওপেন সোর্স ট্যাকটাইল ইকোসিস্টেম তৈরি করা। তারা বিভিন্ন এনজিও, স্কুল এবং সরকারি সংস্থাগুলির সঙ্গে হাত মিলিয়ে এই ডিভাইসটিকে ভারতের প্রতিটি কোণায় পৌঁছে দিতে চান।
আসলে, শিক্ষার হাতিয়ার বা শেখার টুলসগুলি যদি একটু বদলে দেওয়া যায়, তবে ক্লাসরুমের দরজাটা আরও অনেক বেশি মানুষের জন্য খুলে যায়—'TACTO' আজ বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে এই সহজ সত্যিটাই প্রমাণ করে দিল।






