পুতুল নাচ

Anasuya Sen
৩ মিনিট
পুতুল নাচ

"এই রানী মুড়ি ভাজছে,মুড়ি ভাজছে,মুড়ি ভাজতে ভাজতে ......বেলা হল।এই রানী চান করছে.....এই রানী চুল মুছছে,এই রানী চুল ঝাড়ছে, চুল ঝাড়ছে, চুল ঝাড়ছে......। রানীর চুল গিয়ে লাগল তার সতীনের গায়.... দুই সতীনে ঝগড়াঝাটি, মারামারি, মারামারি, মারামারি.....শাশুড়ি এলো ঠ্যাঙ্গা নিয়ে, দিল দুই ঘা।দুই সতীনের ঝগড়া শেষ।এবার দুই সতীনে ভাব করছে, জড়িয়ে ধরছে।" এই রকম মজাদার পুতুল নাচ দেখেছি, তার সঙ্গে পুতুলের নাচিয়ের অনর্গল কথকতা শুনেছি ছোটবেলায় ঝুলনের মেলায়। দেখতে দেখতে, শুনতে শুনতে বন্ধুদের সঙ্গে খুব হাসাহাসি করতাম | নিজেদের মধ্যে পুতুলনাচের কাহিনীর অভিনয় করতাম।খুব রঙ্গ হতো।

গত ২১শে মার্চ (কলকাতার মধুসূদন মঞ্চে) 'বিশ্ব পুতুলনাচ দিবস' উপলক্ষে,একটি উৎসবে যোগদান করার সুযোগ পেয়েছিলাম। দুদিন-ব্যাপী উৎসবে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে পুতুল-নাচ শিল্পীরা যোগদান করেছিলেন।তাদের উপস্থাপিত বিভিন্ন স্বাদের ও আঙ্গিকের পুতুল নাচ দেখতে দেখতে, ছোটবেলার স্মৃতি জেগে উঠেছিল। আর খুব আনন্দ হচ্ছিল এই কথা ভেবে, যে এই গ্রামীণ শিল্প-ধারাটি আজও সজীব হয়ে আছে এবং মানুষকে নির্মল আনন্দ বিতরণ করছে।

সেই উৎসবের আঙিনায় এইরকম কয়েকজন পুতুল নাচ শিল্পীর সঙ্গে আলাপ আলোচনা করার সুযোগ হয়েছিল।পূর্ব মেদিনীপুর জেলার নন্দকুমার থেকে আসা এক শিল্পীর কাছ থেকে জানলাম যে আমাদের দেশে চার ধরণের পুতুল নাচ দেখানো হয়.......ডাং পুতুল (বা Rod Puppet ), তারের পুতুল (বা String Puppet ), কাপড়ের তৈরী পুতুল (Glove Puppet ) যেটিকে পেছন দিক থেকে গ্লাভসের মত পরে আঙুলের সাহায্য নাচানো হয় এবং বেণী পুতুল (Shadow Puppet )।এদের মধ্যে ডাং পুতুল, তারের পুতুল আর কাপড়ের পুতুলই বাংলায় সর্বাধিক প্রচলিত আর জনপ্রিয়।মেদিনীপুর বিখ্যাত বেণী পুতুলের জন্য। দক্ষিণবঙ্গের জয়নগর এলাকা বিখ্যাত ডাং পুতুলের জন্য।আর নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরে জনপ্রিয় তারের পুতুল। এদের মধ্যে কাপড়ের তৈরী পুতুলের উপযোগিতা খুব বেশী। কারণ এগুলি ব্যাগে করে যেখানে খুশী নিয়ে যাওয়া যায়, পথের ধারে যেকোনো সুবিধাজনক জায়গায় আসর বসিয়ে এগুলি বার করে খেলা দেখানো যায়। তাই দেখতে উৎসাহভরে চারপাশে লোকজন ভিড় করে। ঐ শিল্পী জানালেন যে বিগত ৪০ বছর ধরে তিনি এই পুতুল নাচ দেখিয়েই জীবিকা নির্বাহ করেছেন।তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহে ১২টি বেণী পুতুল (Shadow Puppet ) আছে। তাঁর বাবা একটি যাত্রাভিনয় দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বাল্যকালে তিনি ঐ যাত্রাদলে বাবাকে সঙ্গ দিতেন, কখনো কখনো অভিনয়ের প্রয়োজনে বালিকা সেজে নাচ করতেন। অভিনয় শিল্পের যে প্রভাব তাঁর ওপর পড়েছিল, তার ছায়া পড়েছে তাঁর উপস্থাপিত পুতুলনাচে।

জয়নগর থেকে আসা এক পুতুল-নাচ শিল্পীর কথায় ...... পুতুল নাচের পরম্পরায় ডাং পুতুলই সর্বাপেক্ষা প্রাচীন।গ্রামের বৃদ্ধদের কাছে শুনেছি যে ডাং পুতুলের ৫০০ থেকে ৬০০ বছরের প্রাচীন পরম্পরা আছে। খুব সম্ভবত এই ডাং পুতুলের ধারণাটা এসেছে 'কাক-তাড়ুয়া' থেকে। প্রাচীন কালে এই পুতুল-নাচ শিল্পীরাই সাধারণ মানুষের মনোরঞ্জন করতেন এবং তার মাধ্যমে অনেক প্রয়োজনীয় সামাজিক বার্তা ছড়িয়ে দিতেন। সমাজের মানুষের মধ্যে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের শিক্ষা ছড়িয়ে দেবার জন্য শিল্পীরা পৌরাণিক কাহিনীর উপস্থাপনা করতেন পুতুল-নাচের মাধ্যমে।সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পৌরাণিক কাহিনী ও উপাখ্যানের ওপর নির্ভরতা অনেক কমে গেছে |

জয়নগরের ঐ শিল্পী নিজে যখন এই শিল্প-মাধ্যমের চর্চায় আসেন, তখন শুরুতে তিনি 'আলিবাবা ও চল্লিশ চোর'-এর কাহিনী, মুগলির কাহিনী উপস্থাপনা করতেন। অত্যাধুনিক কালে তিনি পুতুলনাচের মাধ্যমে জন-স্বাস্থ্য সম্বন্ধে ও পরিবার-পরিকল্পনা সম্বন্ধে জনতার মধ্যে সচেতনতা ছড়িয়ে দিচ্ছেন। বালিকা -শিক্ষা ও নারী-শিক্ষা প্রসারের উদ্দেশ্যে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের 'কন্যাশ্রী' নাম যে প্রকল্পটি আছে, তার গুনাগুন প্রচারের উদ্দেশ্যে তিনি সম্প্রতি একটি 'শো' করেছেন।

কালের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পুতুল-নাচের কাহিনী যেমন পরিবর্তিত হয়েছে, তেমন পরিবর্তিত হয়েছে পুতুল তৈরীর রীতি, প্রকরণ ও উপকরণ। অনেক আগে মাটির পুতুল নিয়ে খেলা দেখানো হতো। পুতুল ভারী হওয়ার জন্য সাবলীল ভাবে খেলা দেখানো যেত না। তারপর এল কাঠের পুতুল, সঙ্গে রঙিন সাজ।

নদীয়া জেলার হাঁসখালি থেকে আগত এক শিল্পী বললেন যে তাঁর পুতুলগুলি শোলা দিয়ে তৈরী।সেগুলি পেছন দিক থেকে তার দিয়ে বেঁধে খেলা দেখতে বেশ স্বাচ্ছন্দ হয়।তিনি তাঁর পুতুল নাচের মধ্যে দিয়ে জনমানসে বাল্য-বিবাহের কুফল, অরণ্য সংরক্ষণের সুফল এবং সীমান্ত -ঘেঁষা এলাকায় মানব-পাচারের প্ররোচনা এবং বিপদের সম্বন্ধে সচেনতা প্রসারের কাজ যথাসাধ্য করেন।

পুতুল-নাচ উৎসবের যিনি প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন, তিনি বললেন যে ২০১৬ সালে 'শকুন্তলা' নামে একটি উপস্থাপনার মাধ্যমে 'পরিবেশ দূষণ' সম্মন্ধে মানুষের মধ্যে সচেতনতা প্রসারের চেষ্টা করেছিলেন।সেখানে দেখানো হয়েছিল যেন রাজা দুষ্মন্ত এসে শকুন্তলার হাতে লালিত-পালিত তরু-লতা-প্রকৃতিকে ধ্বংস করছেন।

তিনি আরও বললেন যে বিগত ২০০ বছর ধরে এই শিল্প-মাধ্যমটি অবলম্বন করে পুতুল-নাচ শিল্পীরা অনেক যুগোপযোগী বার্তা জনমানসে ছড়িয়ে দিয়েছেন, এখন সময় এসেছে আমাদের দেশের বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের মধ্যে সমন্বয় ও সৌভ্রাতৃত্বের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার, এই কাজ অবিলম্বে করা উচিত।।

তথ্য সূত্র : সংবাদপত্র, লেখক এর নিজস্ব সংগ্রহ

লিখেছেন
Anasuya Sen
Anasuya Sen
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

শ্রীরামকৃষ্ণের চিকিৎসক গঙ্গাপ্রসাদ সেনের বাড়ির দুর্গাপুজো: পূর্ববঙ্গের ঐতিহ্য যেভাবে এল কুমারটুলিতে

Gangaprasad Sen Bari Durga Puja: গঙ্গাপ্রসাদ সেন ছিলেন বিখ্যাত আয়ুর্বেদ চিকিৎসক। শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবও তাঁর কাছে চিকিৎসা করাতে আসতেন। তাঁর বাবা নীলাম্বর সেন অবিভক্ত বাংলার এক নামকরা কবিরাজ ছিলেন। কলকাতায় আসার পর সেন পরিবার কুমারটুলিতে বসতি গড়ে এবং সেখানেই ১৮৫৭ সালে শুরু হয় দুর্গার আরাধনা।

১৩ বছর বয়সে ফুটপাথে থাকা, কার্গিলে জওয়ানদের পাশে, ‘পরিন্দা’য় আগুনে পুড়ে যাওয়া: নানা পাটেকর আসলে কেমন মানুষ ছিলেন?

Nana Patekar unknown facts: প্রকাশ রাজের ভাষায়, নানা কেবল একজন প্রবীণ সহকর্মী ছিলেন না; তিনি ছিলেন এমন এক অভিভাবক-বন্ধু, যাঁর সঙ্গে তীব্র তর্কে জড়িয়ে পড়া যেত, আবার একই টেবিলে বসে তাঁর হাতের রান্না করা খাবার ভাগ করে নেওয়া যেত। মদ বা মুম্বইয়ের তথাকথিত হাই-প্রোফাইল পার্টি কালচারের প্রতি তাঁর চিরকালই ছিল তীব্র অনীহা।

নানা পাটেকর: ফিরে দেখা অনন্য জীবন

Nana Patekar: ১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি তৎকালীন বোম্বে রাজ্যের রায়গড় জেলার মুরুদ-জানজিরায় এক মারাঠি পরিবারে জন্মেছিলেন বিশ্বনাথ পাটেকর। পরে সিনেমার দুনিয়ায় তিনি হয়ে ওঠেন ‘নানা পাটেকর’।

মাছ-ভাত খেয়েই বোধন, দশমীতে মৎস্যমুখ! বাগবাজার হালদার বাড়ির সাড়ে চারশো বছরের পরম্পরা

Bagbazar Haldar Bari Durga Puja: পুজোর ইতিহাসের সূত্রপাত ওড়িশার বালেশ্বরের কাছে সাহেবপুর বা রহনপুরে। হালদার পরিবারের পূর্বপুরুষরা চন্দননগরের নোয়াপাড়ার জমিদার ছিলেন। তাঁদেরই এক পূর্বপুরুষ কৃষ্ণপ্রসাদ হালদার প্রমোদভ্রমণে ওড়িশার ওই এলাকায় গেলে স্বপ্নাদেশ পান। সেই স্বপ্নের বর্ণনা অনুযায়ী মাটি খুঁড়ে সত্যিই উদ্ধার হয় মহিষমর্দিনীর কষ্টিপাথরের মূর্তি।

মাছ-ভাত খেয়ে দেবী বরণ আর কী কী বিশেষ রীতি পালন করা হয় ২২০ বছরের রাজকৃষ্ণ মিত্র বাড়ির দুর্গাপুজোয়?

Rajkrishna Mitra House Durga Puja: দর্জিপাড়ার রাজকৃষ্ণ মিত্রের বাড়ির শতাব্দীপ্রাচীন দুর্গাপুজোতে ২২০ বছর ধরে একই রীতি মেনে পুজো হয়ে আসছে। তবে এই পুজোর বিশেষত্ব শুধু তার প্রাচীনত্বে নয়, দেবীর ভোগ, নৈবেদ্য, পারিবারিক খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে দশমীর বরণ; প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে নিজস্ব কিছু নিয়ম। যার মধ্যে অন্যতম, দশমীর দিন মাছ-ভাত খেয়ে দেবীকে বরণ করেন বাড়ির মহিলারা। আবার যে পুজোয় একসময় বলির রীতি ছিল, সেই পুজোতেই এখন বলির পরিবর্তে দেওয়া হয় চিনির নৈবেদ্য।

ইস্টবেঙ্গলের জয়ে কোমা ভেঙে চোখ মেলেছিলেন শচীনকর্তা

S D Burman's love for East Bengal: শচীনকর্তার একমাত্র পুত্র ‘পঞ্চম’ বাবার কানের কাছে চিৎকার করে উঠলেন— “বাবা… ইস্টবেঙ্গল জিতসে… পাঁচ-শূন্য!” আর তারপরই ... যে মানুষটি নির্জীব পড়েছিলেন, যাঁর স্নায়ু কোনো ডাকে সাড়া দিচ্ছিল না—তাঁর চোখের কোণ সামান্য কেঁপে উঠল। ধীরে ধীরে শচীনকর্তা তাঁর অক্ষিপট মেলে তাকালে। ব্যাস, ওইটুকুই। এর পর আর কোনোদিন তিনি চোখ খোলেননি।

যে দুর্গাপুজোয় সাধারণের প্রবেশ ছিল নিষেধ, সেখান থেকেই যেভাবে হলো সর্বজনীন পুজোর শুরু

history of Durga Puja in Kolkata: ব্রিটিশ কলকাতায় সেই পুজোর ধরন বদলাতে শুরু করল; বদলাল গেট-টুগেদারের ধরনও। আর কলকাতার দুর্গাপুজো আদতে হয়ে উঠল কোম্পানির পুজো। মানে কোম্পানির লোকেদের তোয়াজের জন্য করা পাঁচ দিনের অনুষ্ঠান। সেই পুজোর থেকে ইংরেজদের মনোরঞ্জন করা প্রধান উদ্দেশ্য ছিল।

প্রেমে, ঈর্ষায়, ভ্রমণে মারিয়া কোদামার চোখে কেমন ছিলেন বোর্হেস?

Jorge Luis Borges: ২০১৯ সালে প্রকাশিত এই সাক্ষাৎকারে লেখকের বিধবা স্ত্রী মারিয়া কোদামা তাঁদের অনন্য সম্পর্ক ও একান্ত যাপনের স্মৃতিচারণ করেছিলেন। মারিয়া কোদামা মৃত্যুবরণ করেন ২০২৩ সালের ২৬ মার্চ। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছিলেন পাবলো হিয়েনেরা। এটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ২০১৯ সালে, পরে লা নাসিয়ন (La Nacion) পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ২০২৩ সালের ২৫ মার্চ। সাক্ষাৎকারটি স্প্যানিশ থেকে অনুবাদ করেছেন স্প্যানিশ সাহিত্য ও বোর্হেসবিশেষজ্ঞ কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক রাজু আলাউদ্দিন।