ক্ষণজন্মা এক বহুমুখী প্রতিভা ছিলেন রাহুল
রাহুল অরুণোদয়ের কর্মজীবন ছিল সংগ্রাম ও সাফল্যের মিশেল। থিয়েটারের মঞ্চ থেকে শুরু করে টলিউডের আলোয় উঠে এসেছিলেন।
মাত্র ৪২ বছর বয়সে অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রয়াণে টলিপাড়া জুড়ে শোকের ছায়া। সূত্রের খবর, তালসারির সমুদ্রে শুটিংয়ের ফাঁকেই ডুবে মৃত্যু হয়েছে তাঁর। রাহুলের এই অকালপ্রয়াণ মেনে নিতে পারছে না তাঁর বন্ধু-সহকর্মীরা। থিয়েটার, সিনেমা, লেখালেখি-রাহুলের ছায়া বাংলা সংস্কৃতি জগতে দীর্ঘ।
বাবা বিশ্বনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন বিজয়গড় আত্মপ্রকাশ নাট্যদলের পরিচালক। তিন বছর বয়সে বাবার সঙ্গে ‘রাজদর্শন’ নাটকে প্রথম মঞ্চে পা রাখেন রাহুল। তারপর প্রায় ৪৫০টি নাটকে অভিনয় করেছেন। নাকতলা হাই স্কুলে পড়াশোনা, আশুতোষ কলেজ থেকে স্নাতক। অভিনয় ছিল তাঁর রক্তে।
ছোট পর্দায় প্রথম সাফল্য আসে জি বাংলার ধারাবাহিক ‘খেলা’-য় আদিত্য চরিত্রে। তার আগে ‘তুমি আসবে বলে’-তে কাজ করেছিলেন। কিন্তু বড় পর্দায় সত্যিকারের পরিচিতি পান ২০০৮ সালে। রাজ চক্রবর্তীর ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’-এ প্রিয়াঙ্কা সরকারের বিপরীতে অভিনয়। ছবিটি সুপারহিট। অন্দরলোক পুরস্কার পান সেরা অভিনেতার। এরপর আর পিছনে ফিরতে হয়নি।
একের পর এক ছবিতে দেখা গিয়েছে তাঁকে। ‘জ্যাকপট’, ‘পরাণ যায় জ্বলিয়া রে’, ‘জাতিস্মর’, ‘চতুষ্কোণ’, ‘জুলফিকার’-এ স্মরণীয় অভিনয়। ব্যোমকেশ সিরিজে অজিতের চরিত্রও তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়িয়েছে। ‘মেঘে ঢাকা তারা’-য় অনিল চট্টোপাধ্যায়ের ভূমিকায় তাঁর অভিনয় দর্শকদের মনে দাগ কেটেছিল। অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস ছবিতে রাহুলের অভিনয় দাগ কেটে গিয়েছে সকলের মনে।
টেলিভিশনেও সমান তালে কাজ করেছেন। ‘মোহনা’, ‘দেশের মাটি’, ‘লালকুঠি’, ‘হরগৌরী পাইস হোটেল’, ‘আয়ে খুকু আয়ে’-তে অটিস্টিক চরিত্র—প্রতিটিতে নিজেকে নতুন করে প্রমাণ করেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে স্টার জলসার ‘ভোলে বাবা পার করেগা’-য় নতুন অধ্যায় শুরু করেছিলেন। ওয়েব সিরিজেও সক্রিয় ছিলেন।
অভিনয়ের পাশাপাশি রাহুল অরুণোদয় একজন সক্রিয় পডকাস্টার ছিলেন। ‘সহজ কথা’ নামে তাঁর পডকাস্ট চ্যানেলটি বাংলায় বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। সিনেমা, থিয়েটার ও সাহিত্য নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা করতেন তিনি। ব্রাত্য বসু, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়, শ্রীজিত মুখোপাধ্যায়, প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়-সহ একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বকে নিয়ে তিনি আড্ডায় বসেছেন। সহজ-সরল ভাষায় গভীর বিষয় তুলে ধরার ক্ষমতা তাঁকে এই মাধ্যমে আলাদা করে দিয়েছিল।
শুধু অভিনয় নয়, লেখক হিসেবেও পরিচিত ছিলেন রাহুল। সোশ্যাল মিডিয়ায়ও সক্রিয়। সমাজের নানা প্রসঙ্গে মতামত দিতে দ্বিধা করতেন না। নিজে বামমনস্ক ছিলেন রাহুল।
রাহুল অরুণোদয়ের কর্মজীবন ছিল সংগ্রাম ও সাফল্যের মিশেল। থিয়েটারের মঞ্চ থেকে শুরু করে টলিউডের আলোয় উঠে এসেছিলেন। সিনেমায় দীর্ঘদিন ভালো কাজ পাননি, কিন্তু যে সুযোগ এসেছে তাতেই সোনা ফলিয়েছেন রাহুল। প্রতিটি চরিত্রে নিজেকে মিশিয়ে দিতেন। তাঁর চলে যাওয়ায় এক গভীর ক্ষত।







