বিজেপির বঙ্গ বিজয়: ‘পুশ-ইন’ বিতর্কে বাংলাদেশকে কড়া বার্তা ভারতের
India Bangladesh relations: ‘পুশ-ইন’ বিতর্কে বাংলাদেশকে কেন কড়া বার্তা দিল ভারত? অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের ফেরত পাঠানো নিয়ে ঠিক কী বলল নয়াদিল্লি?
ভারতে থাকা অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের ফেরত পাঠানো নিয়ে ফের কূটনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের পর বাংলাদেশে 'পুশ-ইন' বা জোর করে সীমান্ত পার করিয়ে পাঠানোর আশঙ্কার কথা উঠতেই এবার কড়া প্রতিক্রিয়া দিল নয়াদিল্লি। ভারতের বক্তব্য, এই পুরো বিষয়টিকে শুধুমাত্র সীমান্ত রাজনীতির চোখে দেখলে হবে না, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহুদিন ধরে ঝুলে থাকা নাগরিকত্ব যাচাই এবং প্রত্যর্পণের প্রশ্ন।
বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, ভারতে থাকা অবৈধ বিদেশিদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো ভারতের নীতি। তবে সেই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে বাংলাদেশের সহযোগিতা প্রয়োজন। ভারতের দাবি, বর্তমানে প্রায় ২,৮৬০টি নাগরিকত্ব যাচাইয়ের মামলা বাংলাদেশের কাছে পড়ে রয়েছে, যার অনেকগুলিই পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে ঝুলে আছে। এই দীর্ঘসূত্রতার কারণেই প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া আটকে যাচ্ছে।
ঘটনার সূত্রপাত বাংলাদেশের বিদেশমন্ত্রী খলিলুর রহমানের মন্তব্য ঘিরে। রণধীর বলেন,
গত কয়েক দিন ধরে এমন একাধিক মন্তব্য আমাদের চোখে পড়েছে। অবৈধ বাংলাদেশিদের ভারত থেকে প্রত্যর্পণের মূল বিষয়টির প্রেক্ষাপটে মন্তব্যগুলিকে আমাদের বিচার করতে হবে। এতে অবশ্যই বাংলাদেশের সহযোগিতা প্রয়োজন।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের পরে বাংলাদেশে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে সীমান্তে 'পুশ-ইন' বা জোর করে লোক ঢুকিয়ে দেওয়ার ঘটনা বাড়তে পারে। বাংলাদেশের তরফে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল, এমন ঘটনা ঘটলে ঢাকা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। তারই জবাবে ভারত জানায়, বিষয়টিকে আবেগ বা রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে বাস্তব পরিস্থিতি বুঝতে হবে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Bangladesh push-in warning: বাংলায় নতুন সরকার গঠনের পর কি সীমান্তে শুরু হবে ‘পুশ-ইন’ রাজনীতি? বাংলাদেশ কেন আগেভাগেই কড়া হুঁশিয়ারি দিল?
রণধীরের কথায়,
বাংলাদেশ তাদের নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করবে বলে আমরা আশা করছি, যাতে ভারত থেকে অবৈধ অভিবাসীদের প্রত্যর্পণ নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করা যায়।
ভারতের বক্তব্য অনুযায়ী, যাঁরা অবৈধভাবে দেশে রয়েছেন এবং যাঁদের বাংলাদেশি নাগরিক বলে সন্দেহ করা হচ্ছে, তাঁদের পরিচয় নিশ্চিত করা বাংলাদেশের দায়িত্ব। সেই প্রক্রিয়া দ্রুত না হলে প্রত্যর্পণও সম্ভব নয়। নয়াদিল্লির মতে, ভারত আইনি ও দ্বিপাক্ষিক কাঠামোর মধ্যেই কাজ করছে এবং ভবিষ্যতেও করবে।
গত কয়েক বছর ধরেই অসম, পশ্চিমবঙ্গ এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশের প্রশ্নে রাজনৈতিক উত্তাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে এই ইস্যু আরও বেশি করে সামনে এসেছে। অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা একাধিকবার কড়া অবস্থান নিয়েছেন এবং সীমান্ত দিয়ে 'পুশ-ব্যাক' বা 'পুশ-ইন' নিয়ে মন্তব্য করেছেন। বাংলাদেশের তরফে সেই মন্তব্যেরও প্রতিবাদ জানানো হয়েছিল।
এদিকে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে অবৈধ বাংলাদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে অভিযানও জোরদার হয়েছে। সম্প্রতি পুণে পুলিশ জানিয়েছে, গত পাঁচ বছরে তাঁরা ১৩০ জন বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠিয়েছে। শুধু ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসেই ৫৩ জনকে শনাক্ত করে ফেরত পাঠানো হয়েছে। পুলিশের দাবি, তাঁদের অনেকের কাছেই ভুয়ো আধার কার্ড এবং জাল ভারতীয় নথি পাওয়া গিয়েছিল।
এই পরিস্থিতিতে দু'দেশের সম্পর্ক কোন দিকে যাবে, তা নিয়েও কূটনৈতিক মহলে জল্পনা শুরু হয়েছে। কারণ, গত এক বছরে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নানা কারণে টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে। শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশে রাজনৈতিক পালাবদল হয়েছে। নতুন সরকার ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহ দেখালেও বিভিন্ন ইস্যুতে মতপার্থক্য স্পষ্ট হচ্ছে। বিশেষ করে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যু, সীমান্তে অনুপ্রবেশ, জলবণ্টন এবং সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে দুই দেশের অবস্থানে ফারাক বাড়ছে।
ভারত অবশ্য প্রকাশ্যে জানাচ্ছে, তারা বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রকের বক্তব্য, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের দ্বিপাক্ষিক কাঠামো রয়েছে, যার মাধ্যমে সীমান্ত, জলবণ্টন এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু একইসঙ্গে ভারত এটাও বুঝিয়ে দিয়েছে যে অবৈধ অনুপ্রবেশের প্রশ্নে তারা আপস করতে রাজি নয়।
অন্যদিকে মানবাধিকার সংগঠনগুলির একাংশ এই ধরনের পুশ-ব্যাক নীতির সমালোচনা করছে। তাদের দাবি, অনেক ক্ষেত্রেই পর্যাপ্ত আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই লোকজনকে সীমান্তের ওপারে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কিছু সংগঠন অভিযোগ করেছে, শুধু বাংলা ভাষায় কথা বলা বা মুসলিম পরিচয়ের ভিত্তিতেও সন্দেহ করা হচ্ছে। যদিও ভারত সরকার এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সমস্যা শুধুমাত্র আইন-শৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অর্থনীতি, সীমান্ত রাজনীতি এবং দুই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিও। সীমান্তবর্তী অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই কাজের খোঁজে বা বিভিন্ন কারণে অনুপ্রবেশের অভিযোগ রয়েছে। আবার বহু ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব প্রমাণ করাও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ফলে বিষয়টি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থানের পরে এই ইস্যু আরও রাজনৈতিক গুরুত্ব পেয়েছে। বিজেপি বরাবরই অবৈধ অনুপ্রবেশকে বড় রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে তুলে ধরেছে। তাদের দাবি, অনুপ্রবেশ শুধু নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়, এর প্রভাব পড়ছে রাজ্যের জনসংখ্যার ভারসাম্য, ভোটব্যাঙ্ক রাজনীতি এবং প্রশাসনিক কাঠামোর ওপরও। অন্যদিকে বিরোধীরা অভিযোগ করছে, এই ইস্যুকে রাজনৈতিক মেরুকরণের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে।








