সীমান্তে একতরফা ক্লিন আপ নয়, দিল্লিকে বার্তা ঢাকার

Bangladesh push-in warning: বাংলায় নতুন সরকার গঠনের পর কি সীমান্তে শুরু হবে ‘পুশ-ইন’ রাজনীতি? বাংলাদেশ কেন আগেভাগেই কড়া হুঁশিয়ারি দিল?

inscript
৩ মিনিট
সীমান্তে একতরফা ক্লিন আপ নয়, দিল্লিকে বার্তা ঢাকার

বাংলার রাজনৈতিক পালাবদল শুধু নবান্ন বা দিল্লির সমীকরণ বদলায়নি, তার ঢেউ পৌঁছে গিয়েছে ঢাকা পর্যন্ত। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ঐতিহাসিক জয়ের পর বাংলাদেশের প্রথম প্রতিক্রিয়াই এসেছে সীমান্ত রাজনীতি নিয়ে। ঢাকার বিদেশমন্ত্রী খলিলুর রহমান জানিয়েছেন, ভাবি পশ্চিমবঙ্গ সরকার গঠনের পরে যদি ‘পুশ-ইন’ বা জোর করে মানুষ ঠেলে বাংলাদেশে পাঠানোর ঘটনা ঘটে, তাহলে বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।

‘পুশ-ইন’ শব্দবন্ধটি এখন ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত রাজনীতির নতুন আতঙ্ক। অভিযোগ, ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বা স্থানীয় প্রশাসন অনেক সময় যাঁদের ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ বলে সন্দেহ করে, তাঁদের আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই সীমান্ত পেরিয়ে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। বাংলাদেশ বহুবার এটিকে তাদের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন বলে প্রতিবাদ জানিয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির নির্বাচনী প্রচারের অন্যতম বড় ইস্যুই ছিল ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ’। বিজেপির শীর্ষ নেতারা বারবার দাবি করেছেন, রাজ্যে বিপুল সংখ্যক ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ রয়েছে এবং ক্ষমতায় এলে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিশেষ করে সম্ভাব্য মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে উঠে আসা শুভেন্দু অধিকারী নির্বাচনী মঞ্চে এই ইস্যুকে প্রায় কেন্দ্রীয় স্লোগানে পরিণত করেছিলেন। ফলে ঢাকার দুশ্চিন্তা অমূলক নয়। কারণ সীমান্তবর্তী রাজ্যে যখন একই সঙ্গে অসম ও পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায়, তখন সীমান্ত নীতিতে আরও সমন্বিত কড়াকড়ির সম্ভাবনা দেখছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের বিদেশমন্ত্রী প্রথমত বুঝিয়ে দিতে চাইছেন তাঁরা আর আগের মতো নীরব দর্শক হয়ে থাকবে না। দ্বিতীয়ত, ভাবি পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে আগাম সতর্কবার্তা, সীমান্তে এই ধরনের ঘটনা ঘটলে তার কূটনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে। তৃতীয়ত, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই বার্তার গুরুত্ব আছে। কারণ বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তারা নিজেদের জাতীয়তাবাদী অবস্থান জোরালোভাবে তুলে ধরতে চাইছে। ভারতের চাপের সামনে মাথা নোয়াবে না, এই বার্তা দেশের ভিতরেও দিতে চাইছে ঢাকা।

আসলে বাংলাদেশের ভয়টা কোথায়? ভয়টা হলো, পশ্চিমবঙ্গে ভোটের সময় যেভাবে ‘মুসলিম বিদেশি’ এবং ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ কথাগুলিকে রাজনৈতিক অস্ত্র করা হয়েছে, তার প্রশাসনিক রূপ কী হতে পারে। ভোটার তালিকা সংশোধন থেকে শুরু করে নাগরিকত্ব যাচাই—সবকিছুর সঙ্গে এই বিতর্ক জুড়ে দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও লিখেছে, পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে বিজেপির উত্থানের সঙ্গে সীমান্ত-নিরাপত্তা ও ‘অবৈধ ভোটার’ প্রসঙ্গকে কৌশলে ব্যবহার করা হয়েছে।

বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, এখন সেই রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বাস্তব ফল দেখানোর চাপ থাকবে বিজেপির উপর। আর সেই ফল দেখানোর সবচেয়ে সহজ দৃশ্যমান উপায় হতে পারে সীমান্তে ‘অভিযান’। অর্থাৎ সন্দেহভাজন বাংলাদেশি বা নথিহীন বাঙালি মুসলিমদের শনাক্ত করে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও ইতোমধ্যেই সতর্ক করেছেন, ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলিতে বিজেপির সাফল্য দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।

তবে এই পালাবদলের মধ্যে বাংলাদেশ সুযোগও দেখছে। বিশেষ করে তিস্তা জলবণ্টন চুক্তির ক্ষেত্রে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২০১১ সালে তিস্তা চুক্তিতে আপত্তি জানিয়েছিলেন। তার পর দেড় দশক ধরে বিষয়টি ঝুলে রয়েছে। এখন দিল্লি ও কলকাতায় একই রাজনৈতিক শিবির থাকলে চুক্তির রাস্তা কিছুটা মসৃণ হতে পারে, এমন জল্পনা শুরু হয়েছে।

ভারতের বিদেশসচিবও আজ বলেছেন, দিল্লি বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে পারস্পরিক সম্মান ও স্বার্থের ভিত্তিতে কাজ করতে প্রস্তুত। অথচ অন্যদিকে যদি পশ্চিমবঙ্গের ভাবি সরকার সীমান্তে আগ্রাসী মনোভাব নেয়, তাহলে সেই ইতিবাচক বার্তা মুহূর্তে নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

সীমান্তে ‘পুশ-ইন’ কোনো সাধারণ প্রশাসনিক বিষয় নয়। এটি মানবাধিকার, নাগরিকত্ব, আন্তর্জাতিক আইন এবং দু'দেশের জনমতের প্রশ্ন। সীমান্তের ওপারে যাকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, সে সত্যিই বাংলাদেশি কি না, তার প্রমাণ কী, তাকে গ্রহণ করতে বাংলাদেশ রাজি কি না, এই সব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া এমন পদক্ষেপ সরাসরি সংঘাত ডেকে আনতে পারে। আর সবচেয়ে বড় কথা, এতে সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে আতঙ্ক, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা এবং অনিশ্চয়তা বেড়ে যায়।

বাংলাদেশ তাই এখন আগেভাগেই অবস্থান পরিষ্কার করছে। তারা বলতে চাইছে, পশ্চিমবঙ্গে সরকার বদলালেই সীমান্তে একতরফা ‘ক্লিন-আপ অপারেশন’ চালানো যাবে না। দিল্লি ও কলকাতার রাজনৈতিক সম্পর্ক যতই ভালো হোক, ঢাকা তার জাতীয় স্বার্থে পাল্টা সুর তুলবে।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

অঙ্কিতা ভাণ্ডারী মামলা: তিন অভিযুক্তের সাজা হয়েও মেটেনি ‘ভিআইপি’ রহস্য

Ankita Bhandari case highlights :অঙ্কিতার বাবা-মা অভিযোগ করেছেন, গৌতমই সেই ভিআইপি, যিনি তাঁদের মেয়েকে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন। তাঁরা রাষ্ট্রপতির কাছে গৌতমের রাজ্যপাল নিয়োগকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে গিয়েছেন, এই যুক্তিতে যে এই ‘ভিআইপি’কে কোনো পদে বহাল থাকার অনুমতি দেওয়ার আগে সিবিআই তদন্ত শেষ হওয়া উচিত।

জিডিপির বাইরে উন্নয়নের হিসাব, ভারতের অর্থনীতিকে অন্য চোখে দেখতে শিখিয়েছেন জঁ দ্রেজ

Economist Jean Drèze: দিল্লিতে সিজেপি বিক্ষোভের সময় পুলিশ আটক করল অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজকে। অমর্ত্য সেনের সহযোগী এই অর্থনীতিবিদ MGNREGA ও জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ২০২৬- এ পেয়েছেন গ্লোবাল ইনইকুয়ালিটি রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড।

জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন: তারুণ্য যা শেখালো ইন্ডিয়া জোটকে

Youth Protests and Opposition Unity: সংসদীয় রাজনীতিতে যেখানে প্রবীণ নেতারা ঐক্যের পথ খুঁজতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছিলেন, সেখানেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা ও বিভিন্ন অনিয়ম সংক্রান্ত ক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজপথে নামা তরুণ প্রজন্ম বিরোধীদের নতুন করে এক ছাতার তলায় আসার পথ তৈরি করছে।

কেন তুলে দিতে হচ্ছে মাদ্রাসা কমিশন? প্রশ্ন শিক্ষামহলের

West Bengal decides to merge Madrasah Service Commission: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৫ অক্টোবরের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের সঙ্গে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার।

আমার উৎসব, ওঁদের আরও একটা দীর্ঘ কাজের দিন

Durga Puja for Gig Workers: গিগ কর্মীদের দুর্গাপুজোর চার দিন কীভাবে কাটে? বাড়তি উপার্জনের আশায় ব্যক্তিগত আনন্দ, উৎসবের আমেজ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানোর সময় থেকে কতটা বিসর্জন দিতে হয় তাঁদের?

বাংলাদেশে রবীন্দ্র-বিরোধিতা নিয়ে কী বলছেন বুদ্ধিজীবীরা?

Tagore graffiti vandalism Bangladesh: বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? বুদ্ধিজীবীরা কী বলছেন?

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? সরকার বদলায়, কেন বদলায় না মন?

Rabindranath Tagore Targeted in Bangladesh: বাংলাদেশে বারবার কেন নিশানা হচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর? হাসিনা থেকে ইউনূস, সরকার বদলালেও কেন থামছে না তাঁর সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার মুছে ফেলার চেষ্টা? জাতীয় সঙ্গীতের স্রষ্টাকেই কেন বারবার প্রত্যাখ্যানের মুখে পড়তে হচ্ছে?