নির্বাচনের আগে বাংলায় নতুন রাজ্যপাল! আরএন রবি কে?
RN Ravi Appointed West Bengal Governor: আরএন রবি ভারতের প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। তিনি প্রথমে একজন ভারতীয় পুলিশ পরিষেবা (আইপিএস) কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে তিনি কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
কেন্দ্রের সাম্প্রতিক রাজভবন রদবদলে বড় পরিবর্তন ঘটেছে দেশের রাজনীতিতে। রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর নির্দেশে একাধিক রাজ্যে গভর্নর ও লেফটেন্যান্ট গভর্নর পদে বড় ধরনের রদবদল করা হয়েছে। এই পরিবর্তনের অংশ হিসেবেই তামিলনাড়ুর গভর্নর আরএন রবিকে পশ্চিমবঙ্গের গভর্নর করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি ভবনের ঘোষণার পরেই এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়। এর আগে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল ছিলেন সিভি আনন্দ বোস, তিনি আচমকাই পদত্যাগ করেন। তাঁর পদত্যাগের পরই দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে কেন্দ্র আরএন রবিকে বাংলায় পাঠানোর ঘোষণা দেয়।
এই সিদ্ধান্ত দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে। কারণ, পশ্চিমবঙ্গ এমন এক রাজ্য যেখানে দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের মধ্যে নানা বিষয়ে রাজনৈতিক টানাপোড়েন দেখা যায়। তার উপর সামনে বিধানসভা নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে। ফলে এই সময়ে নতুন রাজ্যপাল নিয়োগ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সিভি আনন্দ বোস ২০২২ সালের নভেম্বর মাসে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন। এর আগে তিনি ভারতীয় প্রশাসনিক পরিষেবার (আইএএস) একজন অভিজ্ঞ কর্মকর্তা ছিলেন। রাজ্যপাল হিসেবে তাঁর মেয়াদে রাজ্য সরকারের সঙ্গে একাধিক ইস্যুতে মতভেদও দেখা গিয়েছিল। তবে তিনি হঠাৎ করে পদত্যাগ করবেন, এমনটা অনেকেই ভাবেননি। মার্চ ২০২৬-এ তিনি পদত্যাগপত্র জমা দেন এবং রাষ্ট্রপতি তা গ্রহণ করেন। এর পরেই নতুন রাজ্যপাল হিসেবে আরএন রবির নাম ঘোষণা করা হয়।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও এই পরিবর্তনের বিষয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করেন। তিনি জানান, কেন্দ্রের তরফে তাঁকে ফোন করে নতুন নিয়োগের কথা জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনৈতিক প্রশ্নও তোলেন। তাঁর মতে, রাজ্যের সঙ্গে আলোচনা না করেই এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Pratikur Rahman CPM resignation: বারবার যখন চেয়ারের কথা প্রতীক উর বলছেন, তাহলে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে চিঠি কেন? রাজ্য সম্পাদককে কেন ইস্তফাপত্র দিলেন না? দলের নীতি নিয়ম অনুযায়ী কি হোয়াটসঅ্যাপে চিঠি দেওয়ার কথা?
আরএন রবি ভারতের প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। তিনি প্রথমে একজন ভারতীয় পুলিশ পরিষেবা (আইপিএস) কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে তিনি কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৪ সালে তাঁকে জয়েন্ট ইন্টেলিজেন্স কমিটির প্রধান করা হয় এবং পরে তিনি ভারতের উপ-জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করেন। এছাড়া নাগা শান্তি আলোচনায় কেন্দ্রের প্রতিনিধি হিসেবেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
রাজনীতির সঙ্গে তাঁর সরাসরি সংযোগ শুরু হয় রাজ্যপাল হিসেবে নিয়োগের মাধ্যমে। ২০১৯ সালে তাঁকে নাগাল্যান্ডের রাজ্যপাল করা হয়। সেই সময়ে নাগা বিদ্রোহীদের সঙ্গে শান্তি আলোচনার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল। পরে ২০২১ সালে তাঁকে তামিলনাড়ুর রাজ্যপাল হিসেবে পাঠানো হয়। সেখানে তাঁর মেয়াদ ছিল বেশ বিতর্কিত। কারণ, তামিলনাড়ুর ডিএমকে সরকার ও রাজভবনের মধ্যে প্রায়ই সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।
তামিলনাড়ুতে তাঁর কাজের সময় একাধিক ঘটনায় রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়। রাজ্য বিধানসভায় পাশ হওয়া অনেক বিল তিনি দীর্ঘদিন ধরে অনুমোদন না দিয়ে আটকে রেখেছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। রাজ্য সরকার দাবি করেছিল, এতে প্রশাসনিক কাজ ব্যাহত হচ্ছে। এই নিয়ে বিষয়টি সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায় এবং গভর্নরের ভূমিকা নিয়ে সাংবিধানিক বিতর্কও সামনে আসে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
West Bengal Politics: ২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে তাই ভোটের অঙ্ক বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। SIR-এ কে লাভের গুড় ঘরে তুলবে, সেই অঙ্কই কষছে তৃণমূল-বিজেপি যুযুধান দুই পক্ষ।
একবার তিনি বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রীর ভাষণের মাঝপথে উঠে চলে যাওয়ায় বড় রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। আবার একাধিকবার রাজ্য সরকারের দেওয়া ভাষণ পুরো পড়তে অস্বীকার করায়ও সমালোচনার মুখে পড়েন। ডিএমকে নেতৃত্ব বারবার অভিযোগ করেছে, রাজ্যপাল সাংবিধানিক সীমার বাইরে গিয়ে রাজনৈতিক অবস্থান নিচ্ছেন। অন্যদিকে, রাজভবনের তরফে বলা হয়েছিল, তিনি সংবিধান রক্ষার দায়িত্ব থেকেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
এই পটভূমিতেই তাঁর পশ্চিমবঙ্গে আগমন নতুন রাজনৈতিক প্রশ্ন তৈরি করছে। পশ্চিমবঙ্গেও গত কয়েক বছরে রাজ্যপাল ও রাজ্য সরকারের মধ্যে সংঘাত নতুন কিছু নয়। এর আগে জগদীপ ধনখড় রাজ্যপাল থাকার সময়েও রাজ্য সরকারের সঙ্গে বহুবার মতবিরোধ দেখা গিয়েছিল। পরে সি. ভি. আনন্দ বোস দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই সংঘাত কিছুটা কমলেও পুরোপুরি শেষ হয়নি।
এখন নতুন রাজ্যপাল হিসেবে আরএন রবির আগমন সেই সম্পর্ককে কোন দিকে নিয়ে যাবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে আলোচনা চলছে। বিশেষ করে সামনে বিধানসভা নির্বাচন থাকায় রাজভবনের ভূমিকা নিয়ে বাড়তি নজর থাকবে বলেই মনে করা হচ্ছে।
এই পরিবর্তনটি আসলে বৃহত্তর একটি প্রশাসনিক রদবদলের অংশ। রাষ্ট্রপতি ভবনের ঘোষণায় জানানো হয়েছে, একসঙ্গে কয়েকটি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে গভর্নর এবং লেফটেন্যান্ট গভর্নরের পদে বদল আনা হয়েছে। এই তালিকায় পশ্চিমবঙ্গ, দিল্লি, বিহার, মহারাষ্ট্র, তেলেঙ্গানা, নাগাল্যান্ড-সহ আরও কয়েকটি রাজ্যের নাম রয়েছে।
তামিলনাড়ুতেও এই বদলের প্রভাব পড়েছে। আরএন রবির স্থানান্তরের পর আপাতত কেরলের রাজ্যপাল রাজেন্দ্র আর্লেকারকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে তামিলনাড়ুর রাজ্যপালের কাজ চালানো হবে বলে জানানো হয়েছে।
রাজ্যপাল পদটি প্রায়ই রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে। বিশেষ করে যখন কেন্দ্র ও রাজ্যে ভিন্ন রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকে, তখন রাজ্যপালের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক বাড়ে। পশ্চিমবঙ্গও সেই ধরনের একটি রাজ্য, যেখানে এই প্রশ্ন নতুন নয়। এই পরিস্থিতিতে আরএন রবির আগমন বাংলার রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে কি না, তা সময়ই বলবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, সামনে নির্বাচন এবং তীব্র রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার আবহে রাজভবনের প্রতিটি পদক্ষেপই এখন রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।





