সব অনুমানকে বুড়ো আঙুল! ক্রিকেট বিশ্বকাপ বারবার যে অঘটন দেখেছে

World Cup: দেখে নেওয়া যাক, বিশ্বকাপের কোন ম্যাচগুলি সেরা অঘটনের তালিকায় জায়গা করে নিল।

Sourish Das
১৪ মিনিট
সব অনুমানকে বুড়ো আঙুল! ক্রিকেট বিশ্বকাপ বারবার যে অঘটন দেখেছে

প্রকৃত অর্থে অঘটন বলতে আমরা কী বুঝি? সহজ ভাষায় বলতে গেলে যে ফলাফল আমাদের প্রচলিত সমীকরণ দিয়ে সব সময় মেলানো সম্ভব হয় না, তাকেই অঘটনের পর্যায়ে ফেলে থাকি আমরা। ক্রিকেটের বিশ্বকাপে এরকম বহু ঘটনা ঘটেছে, যেখানে ম্যাচের ফলাফল ক্রিকেট বিশ্লেষকদের সমস্ত অনুমানকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দিয়েছে, আর সারা বিশ্বকে দিয়েছে বিশাল চমক। এবছরের ক্রিকেট বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যর্থতা থেকে শুরু করে, সাউথ আফ্রিকার বিরুদ্ধে নেদারল্যান্ডের জয়, এ-বছরের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও অঘটনের ঘটনা নেহাত কম নয়। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এরকম অঘটনের ঘটনা প্রচুর। কিন্তু তার মধ্যেও দশটি এমন অঘটন রয়েছে, যা হয়তো ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরা কখনও কল্পনা পর্যন্ত করতে পারেননি। দেখে নেওয়া যাক, বিশ্বকাপের কোন ম্যাচগুলি সেরা অঘটনের তালিকায় জায়গা করে নিল।

জিম্বাবোয়ের কাছে পরাজিত অস্ট্রেলিয়া, ২০০৭ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ

২০০৭-এর ৫০ ওভারের বিশ্বকাপ জয়লাভ করে সেই সময় বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ দল হয়ে উঠেছে অস্ট্রেলিয়া। বেশ ফুরফুরে মেজাজেই ইতিহাসের প্রথম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছিল রিকি পন্টিংয়ের অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু ম্যাথিউ হেডেন, অ্যাডাম গিলক্রিস্ট, অ্যান্ড্রু সায়মন্স, মাইকেল হাসি, ব্রেট লিদের নিয়ে গড়া রিকি পন্টিংয়ের অস্ট্রেলিয়াকে পরাজিত করে বড় অঘটনের জন্ম দিয়েছিল জিম্বাবোয়ে। ৪৫ বলে অপরাজিত ৬০ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলে ৫ উইকেটে জিম্বাবোয়ের জয়ের নায়ক হয়েছিলেন ব্রেন্ডন টেলার।

দক্ষিণ আফ্রিকায় আয়োজিত ওই বিশ্বকাপে বি গ্রুপে ওই দু'টি দলের ছিল প্রথম ম্যাচ। কেপটাউনে শুরু থেকেই অবিশ্বাস্য ক্রিকেট খেলেছিল জিম্বাবোয়ে। টসে জিতে প্রথমে ব্যাটিং করেছিল অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু, আত্মবিশ্বাসী অস্ট্রেলিয়ার টপ অর্ডারকে একেবারে গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন জিম্বাবোয়ের বোলাররা। ইনিংসের চতুর্থ বলেই অ্যাডাম গিলক্রিস্টকে প্যাভিলিয়নের রাস্তা দেখিয়ে নিজেদের ক্ষমতা প্রদর্শন করেছিলেন এলটন চিগুম্বুরা। নিজের পরের ওভারে এসে ফিরিয়ে দেন এই পেস বোলিং অলরাউন্ডার। টপ অর্ডার করে যেতেই কার্যত তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং অর্ডার। চার ওভারের মধ্যে মাত্র ১৯ রানে তিন উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে যায় অস্ট্রেলিয়া।

ছবি: টম শ

ভুসি সিবান্দার দুর্দান্ত থ্রো করে আউট করে দেন মাইকেল হাসিকে। দশম ওভারের শেষে অস্ট্রেলিয়ার স্কোর তখন ৪ উইকেটে ৪৮। সেখান থেকে কুড়ি ওভারে ৯ উইকেটে হারিয়ে ১৩৮ রান করতে পারে অস্ট্রেলিয়া। শেষদিকে নেমে ২২ বলে দু'টি করে ৪ এবং ৬ মেরে ৩৫ রানের ইনিংস খেলে অস্ট্রেলিয়াকে কিছুটা ভালো স্থানে এনে দাঁড় করিয়েছিলেন ব্র্যাড হগ। অন্যদিকে, অ্যান্ড্রু সাইমনসের ব্যাট থেকে আসে ৩৩।

কিন্তু টি-টোয়েন্টির জগতে এই রান খুব একটা বেশি নয়। তবে অস্ট্রেলিয়ার বোলিং লাইন আপে তখন ব্রেট লি, মিচেল জনসন, স্টুয়ার্ট ক্লার্কের মতো বোলার রয়েছেন। তাই জিম্বাবোয়ের কাছে এই রান তাড়া করাটা খুব একটা সহজ ছিল না। রান তাড়া করতে নেমে টেইলার ৩১ রানের একটা দুর্দান্ত ওপেনিং ইনিংস খেলেন। তবে একটা পর্যায়ে ১৬ রানের মধ্যে তিন উইকেট হারিয়ে জিম্বাবোয়ের স্কোর হয়ে যায় ৪ উইকেটে ৭০। কিন্তু তারপরেই নামে বৃষ্টি। ডাকুয়ার্থ লুইস পদ্ধতিতে তখনও পাঁচ রানে এগিয়ে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া। তবে আধঘণ্টা পরে আবারও শুরু হলো খেলা।

৫৩ রানের জুটিতে টেইলার এবং হ্যামিলটন মাসাকাদজা মোটামুটি ম্যাচটাকে বের করে আনেন। তখনো ৯ বলে জিম্বাবোয়ের দরকার ১৬ রান। শেষবারে আসতে আসতে রান গিয়ে দাঁড়ায় ১২-তে। শেষ ওভারে রাখেনের প্রথম বলেই অফ স্টাম্পের বাইরে নিচু ফুলটস পেয়ে চার মারেন টেইলার। পরের দিন বলে আসে চার রান। শেষ দুই বলে চার রান প্রয়োজন। পঞ্চম বলটি লেগ স্ট্যাম্পে থাকায় লেগ বাই থেকে হয়ে যায় বাউন্ডারি। আর ইতিহাস তৈরি হয় দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে।

লর্ডসের মাঠে ডাচ রূপকথা, ২০০৯ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ

২০০৯ সালে প্রথমবার ইংল্যান্ডে বসেছিল টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আসর। আর ক্রিকেটতীর্থ লর্ডসে উদ্বোধনী ম্যাচে ইংল্যান্ডের প্রতিপক্ষ ছিল অপেক্ষাকৃত অনেক সহজ নেদারল্যান্ডস। সমস্ত ক্রিকেট-বিশেষজ্ঞ মনে করেছিলেন, ম্যাচটা হবে একেবারেই একপেশে। তবে রোমাঞ্চের নানা অলিগলি পেরিয়ে শেষ ওভারের নাটকীয়তায় ইংরেজদের হারিয়ে সবার অনুমান পাল্টে দিয়েছিল ডাচরা। চার উইকেটের একটা স্মরণীয় জয় তুলে নিয়ে সমস্ত ক্রিকেট-বোদ্ধাদের চমকে দিয়েছিলেন নেদারল্যান্ডের ক্রিকেটাররা। আর ৩০ বলে ৪৯ রানের একটা ঝোড়ো ইনিংস খেলে ম্যাচের নায়ক হন টম ডে গ্রুথ।

তবে ম্যাচ যে শুরু থেকেই এরকম অবিশ্বাস্য ছিল, তা কিন্তু নয়। প্রথম ১১ ওভার লড়াইটা একপেশেই ছিল। টসে হেরে ব্যাটিং করতে নেমে রবি বোপারা এবং লুক রাইট দারুণ ব্যাটিং করে বিনা উইকেটে ইংল্যান্ডের স্কোর নিয়ে গিয়েছিলেন ১০০ রানের গণ্ডিতে। কিন্তু তারপরেই ফাইট ব্যাক করতে শুরু করে নেদারল্যান্ডস। পরবর্তী ৯ ওভারে ৬ উইকেট হারিয়ে মাত্র ৬২ রান তুলতে পারে ইংল্যান্ড। ওয়েন মরগান থেকে শুরু করে অধিনায়ক পল কলিংউড, ইংল্যান্ডের কোনও ব্যাটার টিকতে পারেননি ডাচ বোলারদের সামনে। ৪৯ বলে ৭১ রান করে ইংল্যান্ডের সর্বোচ্চ রান স্কোরার হয়েছিলেন রাইট। অন্যদিকে ৩৪ বলে পাঁচটি ৪ মেরে ৪৬ রান করেছিলেন রবি বোপারা। অবাক করা হলেও এটা সত্যি, ইংল্যান্ডের পুরো ইনিংসে ছিল না কোনও ৬। অন্যদিকে, ৪ ওভারে ৩৫ রানে দুই ওপেনারের উইকেট নিয়ে নেদারল্যান্ডের সফলতম বোলার হয়েছিলেন রায়ান টেন ডাসকাটে।

রান তাড়া করতে নেমে ২৩ রানের মধ্যে দুই ওপেনারকে হারিয়ে ধাক্কা খায় নেদারল্যান্ডের দলটি। তারপরে, লড়াই শুরু করেন গ্রুথ। প্রথম বলে স্টুয়ার্ট ব্রডকে চার মেরে ইনিংস শুরু করেন তিনি। ব্রডের পরে দুই ওভারে দু'টি ৪-এর সঙ্গে মারেন একটি ছয়। তৃতীয় উইকেটে বাস জুইদেরান্তের সঙ্গে ২৮ বলে ৪৩ ও পঞ্চম উইকেটে পিটার বোরেনের সঙ্গে ২৯ বলে পঞ্চাশ রানের দারুণ জুটিতে দলকে এগিয়ে আনেন গ্রুথ। ত্রয়োদশ ওভারে শেষ হয় তাঁর লড়াই। ৩০ বলে ৪৯ রানের একটি ইনিংস খেলে দলকে তিনি এগিয়ে আনেন জয়ের দিকে।

শেষ ওভারে চার উইকেট হাতে রেখে নেদারল্যান্ডের দরকার ছিল ৭। তখন ফ্রিজে ছিলেন ১৪ বলে ১৯ রান করা ডাসকাটে। ব্রডের এই ওভারে প্রথম তিন বলে আউটের তিনটি সুযোগ হারায় ইংল্যান্ড। শেষ ৩ বলে চাই মাত্র ৪। চতুর্থ বল এজগার শিফারলি মিস করলে বাই থেকে আসে এক রান। পরের বলে ডাসকাটে নেন সিঙ্গেল। শেষ বলে দরকার ২ রান। ঠিকমতো খেলতে পারেননি শিফার্লি। শুয়ে পড়ে বল ধরে ফেলেন স্টুয়ার্ড ব্রড। তৎক্ষণাৎ রান আউট করতে পারলে এক রানে জিতে যাবে ইংল্যান্ড। কিন্তু থ্রো করে স্ট্রাইকের প্রান্তে বল লাগাতে পারলেন না, ব্রড। উল্টো ওভার থ্রো থেকে আরও এক রান নিয়ে ম্যাচটা জিতে যায় নেদারল্যান্ড। বিরক্তিকর এই হার কোনওদিনই মেনে নিতে পারেনি ইংল্যান্ড।

বাংলাদেশকে হারিয়ে ইতিহাস হংকং-এর, ২০১৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ

ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ, ফলে ২০১৪ বিশ্বকাপে প্রথম থেকেই এগিয়েছিল বাংলাদেশ। ঘরের ম্যাচে প্রাথমিক পর্বে নিজের প্রথম দু'টি ম্যাচে ৯ উইকেট এবং ৮ উইকেটে দু'টি বড় জয় নিয়ে উড়ছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। কিন্তু সেই পর্বের শেষ ম্যাচে সেই বাংলাদেশকে মাটিতে নামিয়ে দিয়েছিল হংকং। দুই উইকেটের একটি স্মরণীয় জয় দিয়ে পুরো ক্রিকেট-বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই ছোট্ট দলটি। টি-টোয়েন্টিতে সেটি ছিল এখনও পর্যন্ত দু'টি দলের একমাত্র সাক্ষাৎ। যে-কোনও সংস্করণে এর আগে একবারই দেখা হয়েছিল তাদের। ২০০৪ সালে কলম্বোতে এশিয়া কাপে ওয়ান ডে ম্যাচে হংকংকে সহজে হারিয়েছিল বাংলাদেশ। ফলে ২০১৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সেই ম্যাচেও হট ফেভারিট ছিলেন টাইগাররা।

চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে ছিল ম্যাচ। সেই ম্যাচে টস হেরে প্রথমে ব্যাটিং করতে নেমেছিল বাংলাদেশ। তামিম ইকবাল এবং সাব্বির রহমানকে প্রথম ওভারেই হারিয়ে বড় ধাক্কা খায় বাংলাদেশ। তারপর এনামুল হক এবং শাকিব আল হাসান ধাক্কা সামাল দেন। পাওয়ার প্লে-র শেষ ওভারে বাংলাদেশ স্পিনার নাদিম আহমেদকে টানা তিনটি বলে তিনটি চার মেরে এনামুল আউট হন ২৬ রান করে। শাকিব আল হাসান এবং অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম দারুণ ইনিংস খেলছিলেন বাংলাদেশের হয়ে। ১০ ওভারে তিন উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ৮০। কিন্তু এর পরেই নাটকীয়ভাবে পাল্টে যায় চিত্র। পরবর্তী ৫.৫ ওভারে মাত্র ২৩ রানে ৭ উইকেট হারিয়ে ১০৮ রানে গুটিয়ে যায় বাংলাদেশ। ২৭ বলে ৩৪ রান করেন শাকিব। অন্যদিকে, ৩.৩ ওভারে ২১ রান দিয়ে ৪টি উইকেট নিয়ে বাংলাদেশকে গুঁড়িয়ে দেন বাঁহাতি স্পিনার নাদিম আহমেদ। পাশাপাশি লেগ স্পিনার নিজাকত খানের দখলে আসে তিনটি উইকেট।

রান তাড়া করতে নেমে, প্রথমেই হংকং দলকে ধাক্কা দেন শাকিব। তবে ১২ রানে থাকার সময় ওপেনার ইরফান আহমেদের সহজ ক্যাচ ছেড়ে দেন ফিল্ডার রুবেল হোসেন। প্রায় যেন জীবন ফিরে পেয়ে পঞ্চম ওভারে বাংলাদেশের সেই সময় সর্বশ্রেষ্ঠ বোলার আব্দুর রাজ্জাককে একটি ছক্কা এবং দু'টি চার মারেন ইরফান আহমেদ। মাঝে সাকিব আল হাসানের একই ওভারে ইরফান এবং জেমি অ্যাটকিনসন বিদায় নিলে নতুন করে ম্যাচে ফিরে আসে বাংলাদেশ। দ্রুত আরও দু'টি উইকেট নিয়ে হংকংকে চাপে ফেলে দেয় বাংলাদেশ। ১০ ওভার শেষে সেই সময় হংকং ইনিংস দাঁড়িয়ে ৫ উইকেট হারিয়ে ৫১ রানে। সেখান থেকে একটা দারুণ ইনিংস খেলে হংকংকে জয়ের কাছাকাছি নিয়ে যান মুনির দার। তবে ডাবল নিতে গিয়ে কিপার মুশফিকের সঙ্গে সংঘর্ষে আঘাত পান তিনি। ২৪ বলে দরকার সে সময় ৩৬, ১৭ নম্বর ওভারে ফরহাদ রেজাকে দু'টি চার এবং একটি ছয় মেরে তুলে নেন ১৫ রান। আবারও জমে ওঠে লড়াই। তবে পরের ওভারে কোন রান না দিয়ে মুনিরের উইকেট তুলে নেন বা হাতি স্পিনার রাজ্জাক। শেষের আগের ওভারে তিন রান দিয়ে একটি উইকেট নেন সাব্বির। ম্যাচে তখন এগিয়ে বাংলাদেশ।

শেষ ওভারে দরকার ৬ রানের। আর বাংলাদেশের দরকার মাত্র দু'টি উইকেট। তবে, হংকং বোলাররা ব্যাট হাতেও বেশ দক্ষ। চাপের পরিস্থিতিতে প্রথম বলে ১ এবং পরের বলে দু'টি ডাবল নিয়ে স্কোর লেভেল করে ফেলে হংকং। আর চতুর্থ বলে রাজ্জাককে এক্সট্রা কাভার দিয়ে ছক্কায় উড়িয়ে ম্যাচ জিতে নেন হাসিব আমজাদ। চার উইকেট নিয়ে ম্যাচের সেরা হন নাদিম।

আবারও নেদারল্যান্ডের বিরুদ্ধে পরাজয় ইংল্যান্ডের, ২০১৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ

২০০৯ আসরের লর্ডসের ওই বিব্রতকর হারের ক্ষত তখনও পর্যন্ত দগদগে। ২০১৪ আসরে আবারও নেদারল্যান্ডসের কাছে হেরে বসে ইংল্যান্ড। আগেরবারে ইংল্যান্ড বেশ খানিকটা ম্যাচে ছিল। কিন্তু এবারে ইংলিশদের কার্যত গুঁড়িয়ে দেন ডাচরা। ১৩৩ রানের পুঁজি নিয়ে প্রতিপক্ষকে ৮৮ রানে কার্যত গুড়িয়ে দেন ডাচ বোলাররা। সেবারের বিশ্বকাপে প্রথম থেকে নেদারল্যান্ড ছিল পিছিয়ে। সুপার টেন পর্বে শ্রীলংকার বিপক্ষে মাত্র ৩৯ রানে অল আউট হয়েছিল নেদারল্যান্ডস। টুর্নামেন্টের শুরুর দিকে জিম্বাবোয়ের কাছে পরাজিত হয়েছিল দলটি। তাই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে নেদারল্যান্ডের সম্ভাবনা খুবই কম বলেই মনে করেছিলেন ক্রিকেট-বিশেষজ্ঞরা।

চট্টগ্রামের ময়দানে টস হেরে ব্যাটিং করতে নেমে স্টেফান মাইবার্গের ৩১ বলে ৩৯ এবং ওয়েসলি বারেসির ৪৫ বলে ৪৮ রানের ইনিংসের সহায়তায় ৫ উইকেটে ১৩৩ রান করে নেদারল্যান্ড। প্রথম ১১ ওভারে যেখানে নেদারল্যান্ডসের রান ছিল ৮৪, সেখানেই পরবর্তী ৯ ওভারে তারা তুলতে পারে মাত্র ৪৯ রান। প্রথমে মনে হয়েছিল, বাংলাদেশের পিচে এই রান যথেষ্ট কম। তবে সেটাই যে ছিল যথেষ্ট, তা প্রমাণ করে দেন ডাচ বোলাররা।

রান তাড়া করতে নেমে ইংল্যান্ড শুরুটা করে ভালোই। তবে ১৮ রানে প্রথম উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে যায় ইংলিশ ব্যাটিং অর্ডার। মাত্র ১৭.৪ ওভারে ৮৮ রানে থমকে যায় ইংরেজদের ইনিংস। ওয়েন মর্গ্যান, জস বাটলার, মঈন আলি-র মতো ভালো ব্যাটসম্যানরা টিকতেই পারেননি নেদারল্যান্ডের বোলারদের সামনে। দুই অঙ্কে যেতে পেরেছিলেন মাত্র তিনজন ব্যাটসম্যান, যাঁদের মধ্যে সর্বোচ্চ ১৮ রান করেছিলেন রবি বোপারা। ইংরেজের ইনিংসে বাউন্ডারি বলতে ছিল কেবল ৪টি চার। নিয়ন্ত্রিত বোলিং করে ৩.৪ ওভারে মাত্র ১২ রান দিয়ে তিনটি উইকেট নিয়ে ম্যাচের সেরা নির্বাচিত হন মুদাসার বুখারী।

আফগানিস্তানের কাছে পরাজিত ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ২০১৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ

২০১৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপটি এখনও পর্যন্ত বিশ্বে বিখ্যাত ফাইনাল ম্যাচের শেষ ওভারে কার্লোস ব্রেথওয়েটের টানা চারটি ছক্কার জন্য। কিন্তু, ওই আসরেই তারা বড় অঘটনের শিকার হয়েছিল অপেক্ষাকৃত অনেক সহজ দল আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে। আর মজার ব্যাপার হলো, সেই আসলে ওটাই ছিল তাদের একমাত্র হার। সুপার টুয়েলভের সেটি ছিল দুই দলের শেষ ম্যাচ। ওই ম্যাচের আগেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের সেমিফাইনালে যাওয়ার জায়গা ছিল নিশ্চিত। অন্যদিকে, টুর্নামেন্ট থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল আফগানিস্তান। তাই ম্যাচটি ছিল ডেড রাবার। তবে এই ম্যাচটি যে, এতটা আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে, তা হয়তো স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি দেশ-বিদেশের ক্রিকেট বোদ্ধারা। ওই ম্যাচটির আগে টি-টোয়েন্টিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে কখনও খেলেনি আফগানিস্তান।

নাগপুরের মাঠে টসে হেরে ব্যাটিং করতে নেমে আফগানরা ৭ উইকেট হারিয়ে তোলে ১২৩ রান। আফগানিস্তানের ইনিংসের শেষে মনে হয়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে এই রান যথেষ্ট কম। তবে সেটাই শেষমেষ যথেষ্ট করে তোলেন তাদের বোলাররা, বিশেষত তাদের দলের তিন জন স্পিনার, আমির হামজা, মোহাম্মদ নবি এবং রশিদ খান। আপনার অধিনায়ক আজগার আফগান নতুন বল তুলে দেন বাহাতি স্পিনার হামজা-র হাতে। প্রথম ওভার এই মাত্র ১ রান দিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে চাপে ফেলে দেন হামজা। পরের ওভারে আবারও ১ রান দিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিধ্বংসী ওপেনার এভিন লুইজের উইকেট তুলে নেন তিনি।

জনসন চার্লস, মারলোন স্যামুয়েলসরা তেমন কিছু করে দেখাতে পারেননি। দলকে একাই টেনে নিয়ে যাচ্ছিলেন ডোয়াইন ব্রাভো। কিন্তু শেষমেশ ২৯ বলে ১৮ সালের সেই ইনিংস থামিয়ে দেন মোহাম্মদ নবি। শেষ পাঁচ ওভারে ওয়েস্ট ইন্ডিজের দরকার ছিল মাত্র ৪০ রান। হাতে উইকেট ছিল ছয়টি। আন্দ্রে রাসেল তখনও ক্রিজে রয়েছেন। তবে তখনই ঘটে অঘটন। সপ্তদশ ওভারে রান নিতে গিয়ে রান আউট হয়ে আন্দ্রে রাসেল আউট হন ৭ রানে। ঊনবিংশ ওভারে আউট হয়ে যান ওয়েস্ট ইন্ডিজ অধিনায়ক ড্যারেন স্যামি। শেষ ওভারে চাই ১০ রান। দারুণ বোলিং করে শেষ ওভারে মোহাম্মদ নবি দেন মাত্র ৩। আর পেরে ওঠেনি ক্যারিবিয়ানরা। ৬ রানের জয়ে উৎসবে মাতেন আফগান ক্রিকেটাররা। শেষ হওয়ার দলের বিরুদ্ধে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে সেটি ছিল আফগানিস্তানের প্রথম জয়।

এবারে আসা যাক, ৫০ ওভারের বিশ্বকাপের অঘটনের তালিকায়।

কেনিয়ার কাছে পরাজিত ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ১৯৯৬ ক্রিকেট বিশ্বকাপ

আগের আসনগুলোতে বেশ কিছু ম্যাচ থেকে অপ্রত্যাশিত ফলাফল এলেও, সত্যিকারের অর্থে প্রথম অঘটন ঘটেছিল ১৯৯৬ বিশ্বকাপে। সেই আসলে গ্রুপের ম্যাচে পুনেতে দু'বারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজের মুখোমুখি হয়েছিল সেই আসরের নবাগত দল কেনিয়া। ক্যারিবিয়ানদের সামনাসামনি আসার আফ্রিকান ওই দলটির কোনও সম্ভাবনাই ছিল না। তাই সবাই প্রত্যাশা করেছিলেন, ম্যাচটা হবে একপেশে। ম্যাচটা শুরু হয়েছিল কিছুটা সেরকমভাবেই। কিন্তু শেষমেশ খেলা ঘুরিয়ে দেয় কেনিয়া।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিধ্বংসী বোলার কোর্টনি ওয়ালসের বোলিংয়ের তোপে প্রথম থেকেই পিছিয়ে পড়েছিল কেনিয়া। ৪৫ রানে ৩ উইকেট খুইয়ে কার্যত ধুঁকছিল আফ্রিকান এই দলটি। সেখান থেকে তারা আর সেভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। স্টিভ টিকোলোর ২৯ রান এবং হিতেশ মোদির ২৬ রানের ওপরে ভরসা করে মাত্র ১৬৬ রানে অলআউট হয়ে যায় কেনিয়া। এইটুকু একটা স্কোর নিয়ে ক্যারিবিয়ানদের হারানো তো দূরের কথা, হালকা লড়াই যে করতে পারবে কেনিয়া, সেটাও কেউ ভাবতে পারেননি। কিন্তু এই ছোট্ট টার্গেট তাড়া করতে নেমেও শেষমেষ পরাজিত হয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ।

শুরু থেকেই উইকেট হারাতে শুরু করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। কেনিয়ার বোলারদের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের বিপক্ষে কিছুতেই রানের চাকা সচল করতে পারছিলেন না ক্যারিবিয়ানরা। শিবনারায়ণ চন্দ্রপাল এবং রাজার হারপার বাদে আর কোনও ব্যাটসম্যান সেভাবে দাগ কাটতে পারেননি সেই ম্যাচে। বলতে গেলে আর কোনও ব্যাটসম্যান দুই অঙ্কের ঘর পর্যন্ত স্পর্শ করতে পারেননি। মাত্র ৯৩ রানে অলআউট হয়ে যায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। কেনিয়া ম্যাচটি জিতে নেয় ৭৩ রানে। ঐতিহাসিক এই ম্যাচে ১০ ওভারে মাত্র ১৫ রান দিয়ে ৩ উইকেট তুলে ম্যাচের সেরা হন কেনিয়ার অধিনায়ক মরিস ওদুম্বে।

পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়, ১৯৯৯ ক্রিকেট বিশ্বকাপ

১৯৯৭ সালে আইসিসি ট্রফি জয় করে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। তাই অভিষেক বিশ্বকাপে বাংলাদেশ থেকে খুব একটা বেশি প্রত্যাশা ছিল না। গ্রুপের আরেক সহযোগী সদস্য স্কটল্যান্ডের বিরুদ্ধে জয়লাভ করাটা ছিল বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য। মিনহাজুল আবেদীন নান্নুর নৈপুণ্যর জোরে বাংলাদেশ খুব সহজেই স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে দিয়েছিল। তাই জয়-পরাজয়ের কথা না ভেবে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একদম চাপহীনভাবেই খেলতে নেমেছিল বাংলাদেশ।

তবে সেই আসলে যেভাবে পাকিস্তান খেলছিল তাতে ম্যাচ শুরুর আগেই কার্যত হেরে বসেছিল বাংলাদেশ। নর্দাম্পটনে টস জিতে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ। শুরুটা বেশ ভালোভাবেই করে বাংলাদেশ। প্রথম ওপেনিং জুটি থেকে আসে ৬৯ রান। কিন্তু মাত্র এক রানের ব্যবধানে দুই ওপেনার বিদায় নিলে চাপে পড়ে যায় বাংলাদেশ। সেখান থেকে খেলার হাল ধরেন বাংলাদেশের কিংবদন্তি ব্যাটসম্যান আক্রম খান। তাঁর ৪২ এবং শেষ দিকে খালেদ মাহমুদ সুজনের ২৭ রানের ওপরে ভর করে নির্ধারিত ৫০ ওভারের শেষে ৯ উইকেটে ২২৩ রান সংগ্রহ করে বাংলাদেশ। তবে বাংলাদেশের এই সম্মানজনক সংগ্রহের পিছনে পাকিস্তানের বোলারদের অতিরিক্ত ৪০ রানের ভূমিকাও কম ছিল না।

জবাবে ব্যাট করতে নেমে খালিদ মেহেমুদের বোলিংয়ের চাপে পড়ে ৪২ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে বিপদে পড়ে যায় পাকিস্তান। তারপর পাকিস্তানের বিপদ সামলাতে মাঠে নামেন আজহার মেহেমুদ এবং ওয়াসিম আকরাম। দলের যখন ৯৭ রান, সেই সময়ে আজহার আউট হয়ে প্যাভিলিয়নে ফেরেন। আর সেই সঙ্গে ভেঙে যায় প্রতিরোধের সেই দেওয়াল। একের পর এক পাকিস্তানের উইকেটের পতন হতে থাকে, আর তার সঙ্গেই ইতিহাস গড়ার দিকে এগোতে থেকে বাংলাদেশ। ১৬১ রানের সাকলাইন মোস্তাকের রান আউটের মাধ্যমে জয় নিশ্চিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ইতিহাস গড়েন টাইগাররা। ৬১ রানের ঐতিহাসিক জয়তে অসাধারণ ভূমিকা রাখায় ম্যাচের সেরা হন খালেদ মেহমুদ সুজন।

কেনিয়ার কামাল, ২০০৩ ক্রিকেট বিশ্বকাপ

ক্রিকেট বিশ্বকাপের সবথেকে আশ্চর্য কয়েকটি ঘটনা সংকলন করা হলে ২০০৩ সালের বিশ্বকাপে কেনিয়ার সেমিফাইনাল খেলার ঘটনাটা থাকবে একদম প্রথমদিকেই। আর কেনিয়ার ওই সেমিফাইনাল খেলার পিছনে যে ম্যাচটি সবথেকে বড় অবদান রেখেছিল সেটি হল শ্রীলঙ্কা বনাম কেনিয়া ম্যাচ। ২০০৩ বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে সহ-আয়োজক ছিল জিম্বাবোয়ে এবং কেনিয়া। কিন্তু, নিরাপত্তার অজুহাত দিয়ে নিউজিল্যান্ড দল নাইরোবি যেতে অস্বীকার করায়, মাঠে না নেমেই চার পয়েন্ট পেয়ে যায় কেনিয়া। সমীকরণ এমন দাঁড়ায়, একটা বড় দলের বিপক্ষে জয় পেলেই কেনিয়া চলে যাবে সুপার সিক্সে। আর সেই বড় দল হয়ে ওঠে শ্রীলঙ্কা।

নাইরোবিতে টস হেরে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে কেনেডি ওয়েটিয়েনোর ৮৮ রান এবং বাকি ব্যাটসম্যানদের ছোট ছোট অবদানের মাধ্যমে ৫০ ওভার শেষে ৯ উইকেট হারিয়ে ২১০ রান সংগ্রহ করে কেনিয়া। ৫০ ওভারের বিশ্বকাপের নিরিখে ২১১ রান খুব একটা বড় টার্গেট নয়। আর যেহেতু উল্টোদিকে দলটি শ্রীলঙ্কা, তাই স্বভাবতই কিছুটা পিছিয়ে ছিল কেনিয়া। কিন্তু নাইরোবির স্লো পিচ, সঙ্গে আয়োজক দেশ হওয়ার সুবিধা, সবকিছু মিলিয়ে এই স্বল্প পুঁজি নিয়ে লড়াই করতে শুরু করে কেনিয়া।

জবাবে ব্যাটিং করতে নেমে ৩৯ রানের মধ্যেই ২ ওপেনারকে হারিয়ে চাপে পড়ে যায় শ্রীলঙ্কা। সেখান থেকে তাদের তুলে ওঠানোর চেষ্টা করেন তিলকরত্নে এবং অরবিন্দ দি সিলভা। কিন্তু তাদের সব প্রতিরোধ ভেঙে গুঁড়িয়ে দেন কেনিয়ার লেগ স্পিনার কলিন্স ওবুইয়া। ম্যাচের সেরা এই বোলার মাত্র ২৪ রানে ৫ উইকেট তুলে নিয়ে ১৫৭ রানে শেষ করে দেন লঙ্কানদের ইনিংস। ৫৩ রানে এই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ জিতে কেনিয়া চলে যায় সুপার সিক্সে। পরবর্তীতে সেমিফাইনালে উঠতেও এই জয় বড় ভূমিকা রেখেছিল কেনিয়ার কাছে।

বাংলাদেশের কাছে ভারতের পরাজয়, ২০০৭ ক্রিকেট বিশ্বকাপ

১৭ মার্চ, ২০০৭, এই দিনটিকে ক্রিকেট ইতিহাসের অঘটন দিবস হিসেবে ঘোষণা করা যেতেই পারে। কারণ সেই দিন একই সঙ্গে দু'টি অঘটন ঘটেছিল বিশ্বকাপে। সেদিন পোর্ট অফ স্পেনে ভারতের মুখোমুখি হয়েছিল অপেক্ষাকৃত অনেক দুর্বল দল বাংলাদেশ। সেই সময় ভারতীয় দলের ব্যাটিং লাইন আপ ছিল সর্বকালের অন্যতম সেরা একটি লাইন আপ। ব্যাটিংয়ের প্রধান চাষ স্তম্ভ ছিলেন সচিন তেন্ডুলকর, সৌরভ গঙ্গোপাধ‍্যায়, বীরেন্দ্র শেহবাগ এবং রাহুল দ্রাবিড়। সেই সময় এই চার জন তারকা তখন বিশ্ব ক্রিকেটের হাইলাইট। তাই এমন একটি হাইপ্রোফাইল ব্যাটিং লাইন আপের কারণে সেই ম্যাচে হট ফেভারিট ছিল ভারত। তাই বাংলাদেশের বিপক্ষে ওই ম্যাচে ভারতের সহজ জয়ের পক্ষে ক্রিকেট-বিশেষজ্ঞরা বাজি ধরেছিলেন। কিন্তু একটি ঘটনা পুরো বাংলাদেশি ক্যাম্পের মনোবলে এনে দিয়েছিল পরিবর্তন।

ওই ম্যাচের আগের দিন জাতীয় দলের খেলোয়াড় মনজারুল ইসলাম রানার মৃত্যু সংবাদ পুরো বাংলাদেশ দলে যেন এনে দিয়েছিল শোকের ছায়া। আর এই শোক যেন নতুন শক্তি দিয়েছিল বাংলাদেশের গোটা দলকে। চোখের জল মুছে সকলেই প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যেভাবেই হোক রানার জন্য এই ম্যাচে জিতবেন তাঁরা। আর সেই প্রতিজ্ঞা পূরণে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন রানার সবথেকে প্রিয় বন্ধু মাশরাফি বিন মুর্তজা।

প্রথমে ব্যাটিং করতে নেমে মাশরাফির বোলিংয়ের সামনে ২১ রানে দুই উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে যায় ভারত। সেই চাঁদকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের দুই বাঁহাতি স্পিনার রফিক এবং রাজ্জাক ভারতকে কোণঠাসা করতে শুরু করেন। মাঝে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় এবং যুবরাজ সিং কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করলেও এই জুটি ভেঙে যাওয়ার পরেই ১৯১ রানে অলআউট হয়ে যায় ভারত। ১৯২ রানের লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে আহামরি কিছু না হলেও ওই স্লো পিচে রান তাড়া করা খুব একটা সহজ কাজ ছিল না। তবে সেইদিন বাংলাদেশের হয়ে যেন জ্বলে উঠেছিলেন তিনজন টিনেজার, তামিম ইকবাল, সাকিব আল হাসান এবং মুশফিকুর রহিম। তিনজনের ৫০ রানের ইনিংসের উপর ভর করে ১৯২ রানের টার্গেট খুব সহজেই হাসিল করে নেন টাইগাররা। ৯ বল বাকি থাকতেই ৫ উইকেটে ম্যাচ পকেটে পুরে নেয় বাংলাদেশ। নিজেদের সতীর্থ রানার বিদেহী আত্মাকে এর থেকে বড় উপহার আর কি দিতে পারতো বাংলাদেশ? এই জয়ের কারণেই পরবর্তী সুপার এইটে কোয়ালিফাই করতে পেরেছিল বাংলাদেশ।

পাকিস্তানকে হারিয়ে আয়ারল্যান্ডের জয়, ২০০৭ ক্রিকেট বিশ্বকাপ

যেদিন ভারতকে হারিয়ে জয়লাভ করল বাংলাদেশে সেই একই দিনেই জামাইকার সেবাইনা পার্কে সেই আসরের নবাগত দল আয়ারল্যান্ডের মুখোমুখি হয়েছিল পাকিস্তান। সেই আসরে এটি ছিল দুই দলের দ্বিতীয় ম্যাচ। নিজেদের প্রথম ম্যাচটি জিম্বাবোয়ের সঙ্গে টাই করেছিল আয়ারল্যান্ড। অন্যদিকে, ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে প্রথম ম্যাচে হার দিয়ে শুরু করায় জয় ছাড়া আর কোনও রাস্তা ছিল না পাকিস্তানের হাতে। এরকম একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে টস হেরে প্রথমে ব্যাটিং করতে নামে পাকিস্তান।

শুরুতেই নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে শুরু করে পাকিস্তান ক্রিকেট দল। একপর্যায়ে মাত্র ৭২ রানে টপ অর্ডারের প্রথম ছ'জন ব্যাটার প্যাভিলিয়নে ফিরলে বেশ চাপে পড়ে যায় পাক দলটি। সেখান থেকে দলকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন কামরান আকমাল। কিন্তু বাকি ব্যাটাররা তাঁর সহায়তা করেননি। এই কারণে আয়ারল্যান্ডের মতো একটি নবীন দলের বিপক্ষে মাত্র ১৩২ রানে গুটিয়ে যায় পাকিস্তানের ইনিংস। বৃষ্টি বিঘ্নিত কারণে খেলা কিছুটা ব্যাহত হওয়ায় শেষমেশ ডাক ওয়ার্থ লুইস নিয়মে আয়ারল্যান্ডের কাছে লক্ষ্যমাত্রা দাঁড়ায় ৪৭ ওভারে ১২৮ রান। তাই প্রতিপক্ষ যতই ছোট হোক না কেন, এইটুকু রান নিয়ে ম্যাচ জেতা সবসময় অত্যন্ত কঠিন। তবে, নিজেদের বিখ্যাত বোলিং লাইন আপ দিয়ে লড়াই চালানোর চেষ্টা করেছিল পাকিস্তান।

কিন্তু তাদের সমস্ত চেষ্টায় জল ঢেলে দেন আয়ারল্যান্ডের কিংবদন্তি ব্যাটসম্যান নায়াল ও'ব্রায়েন। তার ৭২ রানের ওপর ভর করে তিন উইকেট হাতে অবিশ্বাস্য জয় পায় আয়ারল্যান্ড।

লিখেছেন
Sourish Das
Sourish Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

নারী টেস্টে এত অনীহা কেন, লর্ডসের ইতিহাসও বদলাবে না সেই ছবি?

Women’s Test Cricket: লর্ডসে ভারতের নারী ক্রিকেট দলের ঐতিহাসিক জয় নারী টেস্ট ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ বদলানোর সুযোগ এনে দিয়েছে? এত সাফল্য ও জনপ্রিয়তার পরও কেন এই ফরম্যাটে নিয়মিত ম্যাচ নেই?

শিব-পরশুরামের যুদ্ধবিদ্যা কালারিপায়াট্টু থেকেই জন্ম কুংফুর!

Kalaripayattu Indian Martial Art: ভারতীয় পৌরাণিক ঐতিহ্যে কালারিপায়াট্টুকে স্রেফ যুদ্ধের কৌশল হিসেবে দেখা হয়নি, বরং এটিকে মানব শরীরের অভ্যন্তরীণ প্রাণশক্তিকে জাগিয়ে তোলার এক মহান সাধনা বলে মনে করা হয়।

দু'হাজার বছর পুরনো ‘আত্য পাত্যা’: এই খেলাই শিখিয়েছিল যুদ্ধের কৌশল!

Atya Patya Traditional Indian Game: আনুমানিক ১০০ থেকে ৩০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রচিত প্রাচীন তামিল সাঙ্গম সাহিত্য ‘নাটতৃণৈ’-তে এই খেলার প্রথম লিখিত প্রমাণ পাওয়া যায়। অতএব, এই খেলার বয়স প্রায় দুই হাজার বছরেরও বেশি। সেখানে বলা আছে, প্রাচীন চোল রাজবংশের সেনারা যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার আগে নিজেদের ক্ষিপ্রতা, দ্রুত দৌড়ানোর ক্ষমতা আর শরীরকে এক নিমেষে বাঁকানোর চপলতা বাড়াতে এই খেলায় মেতে উঠত।

১৬ বছর পর ফের ভারতের পথে ললিত মোদী

Lalit Modi return to India: দীর্ঘ সময় পর দিল্লির আপিল ট্রাইব্যুনাল তাঁর বিরুদ্ধে থাকা আর্থিক অনিয়মের বড় অভিযোগ ও জরিমানা বাতিল করে দেওয়ার পরেই এই আলোচনার সূত্রপাত। সোশ্যাল মিডিয়ায় ললিত মোদী নিজেই স্পষ্ট করেছেন, সমস্ত বড়সড় আইনি জটিলতা কাটার পর ২০২৬ সালের শেষ দিকে অথবা ২০২৭-এর শুরুতেই ফের তিনি ভারতে পা রাখতে চলেছেন।

গোলের আড়ালে ঘৃণার খেলা: ২০২৬ বিশ্বকাপে ট্রাম্প, ফিফা আর ফুটবলের পরাজয়

Trump FIFA World Cup: এই বিশ্বকাপ শুধুই একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; মাঠের লড়াই ছাপিয়ে তা হয়ে উঠেছে ভূ-রাজনীতি, বর্ণবিদ্বেষ এবং বাণিজ্যিক আধিপত্যের এক জটিল ময়দান।

একটা রাজপুত্তুর যার মুকুট হারিয়ে গিয়েছে

Lionel Messi Retirement: তিনটে ফাইনালের বোঝা। একে একে ছেড়ে যায় সহযোদ্ধারা। রক্তাক্ত মাসচেরানো চলে যান, কুন আগুয়েরোর অসুখ... তবু লিও পড়ে থাকে, আমরা পড়ে থাকি আর কিছুদিন। বৃত্ত সম্পূর্ণ করতে প্রয়োজন ছিল একজন স্ক্যালোনির, তিনি সেটুকু সেতু নির্মাণের দায়িত্ব নিলেন। আমরা অপেক্ষা করলাম লুসাইলে। আমরা তো কবেই হেরে গিয়েছিলাম, সৌদি আরব শুধু চিনিয়ে দিয়েছিল আশপাশটা।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬: যেভাবে ১৫ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসায় পরিণত হল ফুটবল

FIFA Revenue 2026: 'কুইন্টেট প্রাইভেট ব্যাংক'-এর সাম্প্রতিক একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, শেয়ারবাজারের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের অনুঘটক হওয়ার চেয়ে বিশ্বকাপ আসলে একটি শক্তিশালী স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্যিক উদ্দীপক হিসেবেই বেশি কাজ করে। ফিফা, সম্প্রচারকারী সংস্থা, স্পোর্টসওয়্যার ব্র্যান্ড এবং আতিথেয়তা (হসপিটালিটি) ক্ষেত্রগুলি বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করলেও, কোম্পানির শেয়ারের দামে সেই ইতিবাচক প্রভাব দীর্ঘ সময় ধরে রাখা বেশ কঠিন।

যখন ইউরোপে নারীরা গৃহবন্দি, তখন অসমে মেয়েরা খেলছিলেন ধোপখেল

Dhop Khel Assam: আহোম রাজাদের রাজপ্রাসাদ থেকে বিহুর মেঠো মাঠ—অসমের মাটিতে একসময় গমগম করত ধোপখেলের আওয়াজ। ফুটবল, কাবাডি আর দূরন্ত নিশানার এই অদ্ভুত রোমাঞ্চকর খেলাটি শুধু পুরুষদের বীরত্ব প্রমাণের লড়াই ছিল না; যখন ইউরোপে নারীদের জীবন ছিল চার দেওয়ালে বন্দি, তখন অসমে মেয়েরাও মাঠে নেমে মেতে উঠতেন ধোপখেলে।