বিষাদ নয়, 'বৃদ্ধাশ্রম'-এর পুজো জমজমাট বয়স্কদের জীবনের উদযাপনে

Durgapuja 2022: নিউটাউনের বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা লজ্জায় ফেলবেন তরুণদের। কেমন হলো 'স্নেহদিয়া'-র পুজো?

Prasanta Maji
৩ মিনিট
বিষাদ নয়, 'বৃদ্ধাশ্রম'-এর পুজো জমজমাট বয়স্কদের জীবনের উদযাপনে

ওঁরা আড্ডায় সুর করে এবারের পুজোর থিম গান ধরেছেন: 'কে বলে গো প্রবীণ মোরা, নবীন কম কীসে/ এমনি করে ছন্দে-গানে থাকি মিলেমিশে।' সঙ্গে নাচ।

নতুন এবং স্মার্ট শহর নিউটাউনে একটি রাস্তার এপারে 'স্নেহদিয়া', আর ঠিক ওপারে 'স্বপ্নভোর'। হিডকো-র অন্যান্যগুলির মতোই দু'টি অতীব যত্নে লালিত প্রকল্প। একটি ক্লাব, অন্যটি তাঁদের বসবাসের। আমরা বলি, বয়স্ক মানুষের সুখের ঠিকানা। প্রতিটি মুহূর্তে একরাশ খুশি নিয়ে চনমনে থাকার ঠিকানা। কিন্তু ওঁরা যে নিজেদের এক মুহূর্তও বয়স্ক ভাবেন না, ভাবেন না বয়স হয়েছে বা বয়স বেড়ে চলেছে। আর সেটাই ওদের জীবনীশক্তি ধরে রাখার মূলধন‌। সারাটা বছর ধরে কীভাবে ছন্দে-সুরে-গানে মিলেমিশে থাকেন, একবার এসে না দেখলে বিশ্বাস হবে না।

এই নিয়ে চার-চারবার তাঁরা দুর্গাপুজোর মতো এক দক্ষযজ্ঞকে হাসিমুখে নির্বিঘ্নে, নিখুঁতভাবে সেরে ফেললেন। সঙ্গে অবশ্যই ছিল হিডকো-র সর্বাত্মক সহায়তা। শুধু ওই চারদিন নয়, কয়েক মাস ধরে চলল তার প্রস্তূতিপর্ব। অনেকের নাওয়া-খাওয়ার সময়ই চলে গিয়েছিল। কুমোরটুলিতে গিয়ে প্রতিমার বায়না দিয়ে যে কর্মযজ্ঞর শুরু, তা শেষ হলো দশমীতে নিউটাউনেরই স্নিগ্ধ বিসর্জন ঘাটে গিয়ে গিয়ে ধুনুচি নাচে বিসর্জনে। হ‍্যাঁ, তালে তাল মিলিয়ে শরীর রীতিমতো দুলিয়ে হাতে হাত ধরে তাঁরা যখন বিসর্জন ঘাটে নৃত্যরত, পাশের অতি তরুণ-তরুণীরা বিস্মিত হচ্ছিলেন ওদের মতো বনস্পতিদের দিকে তাকিয়ে। যেন 'আয় সবে বেঁধে বেঁধে থাকি'।

'স্নেহদিয়া'-র সকলে, সঙ্গে লেখক (বাঁদিকে)

এবারের পুজোতে কী করেননি ওঁরা ? কাজের ফাঁকে ফাঁকে আড্ডায় ভরিয়ে দিয়েছেন মণ্ডপ। সঞ্জয় ঢাকি এসেছিল সুদূর মুর্শিদাবাদের গ্রাম থেকে, তার পালক দোলানো ঢাক নিয়ে আর মাথায় ঝাঁকড়া লম্বা ঢেউখেলানো চুল নিয়ে। চুল নাচিয়ে তাঁর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিত্য নাচলেন ওঁরা আরতির সময়। সন্ধিপুজোর দীর্ঘ ফর্দ আর নিত্যদিনের ফলমূল, ফুল-মিষ্টি সাজিয়ে নৈবেদ্য সাজানো থেকে সকলকে প্রসাদ বা মহাপ্রসাদ বিতরণ করলেনও নিজেরাই। পুষ্পাঞ্জলিতে ছিল মন আর ভক্তিভরে প্রণাম। পূজারী এসেছিলেন শেওড়াফুলি থেকে। যেমন‌ তাঁর পবিত্র সংস্কৃতে মন্ত্র উচ্চারণ, তেমনই তার মাধ্যমে প্রত্যেকের মধ্যে ভক্তি সঞ্চারিত করা- সবাই যেন তাতে উজ্জীবিত হয়ে উঠছিলেন প্রতিদিন অঞ্জলি দানে।

প্রতি সন্ধ্যায় তাঁরাই যখন আবার সামনের সংস্কৃতি মঞ্চে আগমনী গান ধরছিলেন বা আবৃত্তি করছিলেন 'মধু-বিধু দুই ভাই', শ্রুতিনাটকে তুলে ধরছিলেন প্রবীণদের সমস্যা ও সমাধান, গিটারে সুর বাজাচ্ছিলেন 'ওগো তুমি যে আমার...', বা নজরুল ইসলামের লেখা ভক্তিগীতি গাইছিলেন- অবাক হওয়া ছাড়া আর কী হতে পারে। না, একদিনও কোনও নামী অতিথি শিল্পী ধারেকাছেও ছিল না। এ যে প্রবীণদের দ্বারা ,প্রবীণদের জন্য, প্রবীণদের পুজো।

নবমীর মধ্যাহ্নে ছিল একেবারে পাত পেড়ে নিরামিষ-আমিষ উভয় ভোজনের সুব্যবস্থা। এও তো ওঁদেরই পরিকল্পনায় সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হলো। সাড়ে ছশো সদস্য গল্পে-গুজবে ভরিয়ে তুললেন কমিউনিটি লাঞ্চের বিশাল শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘর। ঢেকুরও তুললেন এই বলে, 'জয় জয় দুর্গা মায় কি জয়...। আসছে বছর, আবার হবে।'

মাইকে মাঝে মাঝেই ঘোষণা, 'যাঁরা এখনও আসেননি, চলে আসুন তাড়াতাড়ি খেতে' বা 'সুস্মিতা, তুমি যেখানেই থাকো, তবলাবাদককে খবর দাও, আজ তাড়াতাড়ি অনুষ্ঠান শুরু হবে', '২৫টা নারকেলের নাড়ু তৈরি হচ্ছে ভিয়েনে, কেউ গিয়ে একটা ছবি তুলে রাখো', 'মায়ের ভোগ রান্না হয়ে গেছে, কিচেন থেকে শাঁখ আর ঢাক বাজিয়ে মায়ের সামনে নিয়ে এসো।' বড় একটা ছাতা যেন সঙ্গে থাকে, 'যান প্লিজ, সুদীপ্ত, মহান্তিবাবু এব‌ং আরও ক'জন' বা 'স্যুভেনিরে যারা এখনও লেখা দেননি, অমুক তারিখের মধ্যে উমাদি বা উজ্জ্বলবাবুর হাতে দিয়ে দিন', 'এবার শীতল ভোগ বিতরণ শুরু হবে, সবাই নিজের জায়গায় বসুন...'- প্রতিদিনের এমন সব অজস্র ঘোষণা আর ঢাক আর কাঁসির বাদ্যি মিলেমিশে যখন একাকার হয়ে যাচ্ছিল স্নেহদিয়া অ্যাক্টিভিটি সেন্টার, তখন তপন, পাইন বা দেবনাথবাবু, তরুণবাবু, ভাস্করবাবু, সাহাবাবু‌, মজুমদার বা পালিতবাবু, চ্যাটার্জিবাবু, মহেশবাবু বা পূরবীদি, তুলিরেখাদি, তপতীদি, মিঠুদিরা মণ্ডপের সামনে চেয়ারে বসে চায়ে চুমুক দিয়েছেন আয়েশ করে, কাজের শেষে। বরুণবাবু ঢুকছেন তড়িৎগতিতে, হাতে তাঁর আগামী দিনের ভোগের মিষ্টি।

প্রবীণদের (পড়বেন নবীনদের) শারদোৎসবের দিনগুলো যেভাবে রঙিন হয়ে উঠল, তাতে তাঁরা কেবলই ফিরে ফিরে যাচ্ছিলেন স্মৃতির লম্বা দড়ি বেয়ে একেবারে শৈশবে। ফিরে পাচ্ছিলেনও তা। তাঁদের দিনগুলো যেন চারপাশের শুভ্র শরতের সাদা মেঘের ভেলায় এলোমেলো হয়ে‌ উড়ে উড়ে যাওয়া। আর একটি একটি করে রঙিন পাথর কুড়িয়ে নেওয়া টুপটাপ শব্দে।

থিম গানের শেষ কলিদুটো ওই সুরেই যে লেখা। তাদের সে গান গাওয়া শেষ হয়, তাই:

জীবনজুড়ে স্বপ্নসুখের রঙিন সেসব দিন

মায়ের কাছে প্রার্থনা এই, তাই ফিরিয়ে দিন

লিখেছেন
Prasanta Maji
Prasanta Maji
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।