সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় আরও পিছোল ভারত, মিডিয়ায় বাড়ছে ইসলামবিদ্বেষী ন্যারেটিভ

India World Press Freedom Index 2026: বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র বলে পরিচিত ভারত সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় আরও পিছিয়ে গেল। বিশ্ব প্রেস ফ্রিডম সূচকে ১৫৭ নম্বরে নেমে যাওয়ার পাশাপাশি কেন রিপোর্টে উঠে এল বাড়তে থাকা ইসলামবিদ্বেষী মিডিয়া বয়ানের অভিযোগ? তবে কি স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিসর সত্যিই কমছে দেশে?

inscript
৩ মিনিট
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় আরও পিছোল ভারত, মিডিয়ায় বাড়ছে ইসলামবিদ্বেষী ন্যারেটিভ

ভারতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করল রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স-এর ২০২৬ সালের বিশ্ব প্রেস ফ্রিডম সূচক। এই তালিকায় ১৮০টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান নেমে এসেছে ১৫৭-এ। গত বছর ভারত ছিল ১৫১ নম্বরে। এক বছরের ব্যবধানে আরও ছ’ধাপ পিছিয়েছে গেল বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র। শুধু তাই নয়, ভারতকে এমন এক শ্রেণিতে রাখা হয়েছে, যাকে ‘ভেরি সিরিয়াস’ বা অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলা হচ্ছে।

এই রিপোর্টে বলা হয়েছে, ভারতে সংবাদমাধ্যমের সংখ্যা অনেক, ভাষার বৈচিত্র্যও বিপুল, কিন্তু সেই বহুত্ব এখন আর স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিচ্ছে না। বরং ধীরে ধীরে সংবাদমাধ্যমের উপর রাজনৈতিক, আইনি, আর্থিক ও সামাজিক চাপ এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। আরএসএফ মনে করছে, গণতান্ত্রিক কাঠামো বজায় থাকলেও বাস্তবে সংবাদমাধ্যমের উপর এক ধরনের অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ তৈরি হয়েছে।

রিপোর্টে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার পর সংবাদমাধ্যমের চরিত্রে বড় পরিবর্তন দেখা গিয়েছে। কেন্দ্রীয় শাসকের সঙ্গে বড় কর্পোরেট গোষ্ঠীর সম্পর্ক, বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে আর্থিক চাপ, এবং বিরোধী বা সমালোচনামূলক কণ্ঠকে কোণঠাসা করার প্রবণতায় স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিসর ক্রমশ ছোট হয়েছে। অনেক বড় টেলিভিশন ও সংবাদসংস্থা প্রকাশ্যে সরকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে বলেও রিপোর্টে ইঙ্গিত করা হয়েছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মোদির দেশে কতটা স্বাধীন সংবাদমাধ্যম? দিল্লি ছেড়ে ভিয়েতনামে গিয়ে কী বললেন বাইডেন?

Joe Biden On Modi's Press freedom: ২০২৩ সালের ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে ভারতের র‌্যাঙ্কিং ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৬১-এ নেমে এসেছে।

সংবাদমাধ্যমের মালিকানার প্রশ্নটিও এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের বহু প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম এখন কয়েকটি বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত। এই শিল্পপতিরা আবার সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বলেই পরিচিত। ফলে সম্পাদকীয় স্বাধীনতা থাকলেও বাস্তবে কতটা সরকারবিরোধী বা প্রশ্নমুখর সাংবাদিকতা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। কারণ সংবাদমাধ্যম ব্যবসা হিসেবে টিকে থাকতে গেলে সরকারি বিজ্ঞাপন, কর্পোরেট বিজ্ঞাপন এবং রাজনৈতিক সম্পর্ক—তিনটিই গুরুত্বপূর্ণ। আর এই জায়গাতেই স্বাধীনতা সংকুচিত হয়।

রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, শুধু মালিকানার নিয়ন্ত্রণ নয়, আইনের ব্যবহারও এখন সাংবাদিকদের জন্য বড় উদ্বেগ। রাষ্ট্রদ্রোহ, মানহানি, বেআইনি কার্যকলাপ রোধ আইন, সন্ত্রাস দমন আইন—এই ধরনের কঠোর আইনি কাঠামো বহু ক্ষেত্রে সাংবাদিক, স্বাধীন পোর্টাল বা অনুসন্ধানী প্রতিবেদকদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে। মামলা হলেই বছরের পর বছর আদালতে দৌড়তে হয়, আর তাতেই অনেক সংবাদমাধ্যম আত্মনিয়ন্ত্রণে চলে যায়। সরাসরি সেন্সরশিপ না থাকলেও আইনি ভয় কাজ করে।

শুধু সরকার নয়, সামাজিক স্তরেও সাংবাদিকদের উপর চাপ বাড়ছে। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় সংগঠিত ট্রোল বাহিনী, অনলাইন হুমকি, ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক আক্রমণ, মহিলা সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থামূলক ভাষা— এগুলি এখন প্রায়ই দেখা যায়। কোনো সাংবাদিক সরকারের সমালোচনা করলে বা সংখ্যালঘুদের নিয়ে মানবাধিকারভিত্তিক রিপোর্ট করলে তাঁকে ‘দেশদ্রোহী’, ‘অ্যান্টি-ন্যাশনাল’ বা ‘প্রোপাগান্ডিস্ট’ বলে চিহ্নিত করা হয়। এর ফলে অনেকেই নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ধরে ধরে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এফআইআর, কী লুকোতে চাইছে মণিপুর প্রশাসন

Manipur: এডিটরস গিল্ডকে যেভাবে কোণঠাসা করা হয়েছে মণিপুরে, তা আদতে গণতন্ত্রের ব্যর্থতা

এই রিপোর্টের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ হলো, ভারতের টেলিভিশন ও ডিজিটাল মিডিয়ার একাংশে ক্রমবর্ধমান ইসলামবিদ্বেষী বয়ানের প্রসঙ্গ। আরএসএফ বলছে, বিশেষত হিন্দি টিভি চ্যানেলের বহু প্রাইম টাইম অনুষ্ঠান ধর্মীয় মেরুকরণকে উসকে দেয়। সেখানে মুসলিম সম্প্রদায়কে জাতীয় নিরাপত্তা, জনসংখ্যা, সন্ত্রাস বা সামাজিক সমস্যা—প্রায় সব কিছুর সঙ্গে যুক্ত করে দেখানোর প্রবণতা বেড়েছে। সংবাদ বিশ্লেষণের জায়গা দখল করেছে চিৎকার, অভিযুক্তকরণ এবং জনমত প্রভাবিত করার কৌশল।

স্বাধীন অনলাইন পোর্টালগুলির পরিস্থিতিও খুব স্বস্তিদায়ক নয়। অনেক ছোট বা বিকল্প সংবাদমাধ্যম প্রশাসনিক চাপ, অ্যাকাউন্ট ব্লক, আইনি নোটিস, বিজ্ঞাপন না পাওয়া কিংবা ডিজিটাল নজরদারির মুখে পড়ছে। ফলে মূলধারার বাইরে যে ক’টি ভিন্ন স্বর শোনা যায়, তাদের টিকে থাকাই কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

এখানে একটা বড় বৈপরীত্য চোখে পড়ে। ভারত নিজেকে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র বলে দাবি করে, নিয়মিত নির্বাচন হয়, রাজনৈতিক বিতর্কও কম নয়। কিন্তু গণতন্ত্রের মূল স্তম্ভগুলির একটি হলো স্বাধীন সংবাদমাধ্যম—যে সরকারকে প্রশ্ন করবে, তথ্য যাচাই করবে, জনস্বার্থে সত্য তুলে ধরবে। সেই জায়গাতেই যদি ভয়, চাপ, পক্ষপাত আর মেরুকরণ ঢুকে পড়ে, তাহলে গণতন্ত্রের বাহ্যিক কাঠামো থাকলেও ভিত দুর্বল হয়ে যায়। আরএসএফ-এর রিপোর্ট মূলত সেই সতর্কবার্তাই দিয়েছে।

শুধু ভারতেরই নয়, গোটা বিশ্বের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাও এ বছর ২৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ জায়গায় পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে রিপোর্টটি। কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে উদ্বেগটা আরও বেশি, কারণ এখানে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলি এখনও সক্রিয়, অথচ স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিসর ক্রমশ সঙ্কুচিত।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই আপত্তি, ১০ মাসে দুই কমিশনারের ১৪ বার প্রশ্ন

Election Commission SIR: এসআইআর ঘিরে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই তৈরি হয়েছে মতপার্থক্য। গত ১০ মাসে দুই নির্বাচন কমিশনার ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছেন বলে দাবি দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। ফর্ম ৬ বদল, ভোটার তথ্যভান্ডারের কেন্দ্রীয়করণ, পশ্চিমবঙ্গের আপিল এবং প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা নিয়েও উঠেছে একাধিক প্রশ্ন। ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও আইন মেনে চলার বিষয়টি ফের আলোচনায়।

হুথিরা যেভাবে স্থানীয় বিদ্রোহী থেকে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিতে পরিণত হলো

Houthi Expansion in Yemen: ইয়েমেনে ফের কেন যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে? হুথিরা কীভাবে স্থানীয় জায়দি আন্দোলন থেকে শক্তিশালী সামরিক-রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হল? ইরানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কতটা গভীর? মোখা ও হানিশ দ্বীপপুঞ্জ দখলের পর কেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বাব আল-মান্দাব? এই সংঘাতের প্রভাব কি শেষ পর্যন্ত বিশ্ব বাণিজ্য, জ্বালানি পরিবহণ ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে পড়বে?