‘ধর্মনিরপেক্ষ’ ও ‘সমাজতান্ত্রিক’ শব্দে অ্যালার্জি! কাদের, কেন?

Constitution of India: সঙ্ঘের তরফে দত্তাত্রেয় হোসাবলে বলেছেন, সংবিধানের প্রস্তাবনায় ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ এবং ‘সমাজতান্ত্রিক’ শব্দ দু'টি জরুরি অবস্থার সময় যোগ করা হয়েছিল। তিনি দাবি করেন, বিআর অম্বেদকরের তৈরি মূল সংবিধানে এই শব্দ ছিল না।

inscript
৩ মিনিট
‘ধর্মনিরপেক্ষ’ ও ‘সমাজতান্ত্রিক’ শব্দে অ্যালার্জি! কাদের, কেন?

ভারতের সংবিধানের প্রস্তাবনায় ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ এবং ‘সমাজতান্ত্রিক’ শব্দ দু'টির থাকা না থাকা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে দেশজুড়ে। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) সাধারণ সম্পাদক দত্তাত্রেয় হোসাবল এই শব্দ দু'টি নিয়ে পুনর্বিবেচনার প্রস্তাব দেওয়ার পর উপ-রাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনখড়ও একই মত প্রকাশ করেছেন। বাংলার প্রাক্তন রাজ্যপাল একধাপ এগিয়ে এই শব্দ দু'টিকে ‘ঘা’ বলে অভিহিত করেছেন।

উপ-রাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনখড় বলছেন, কোনও দেশের সংবিধানের প্রস্তাবনা পরিবর্তন করা যায় না। তিনি দাবি করেছেন, ভারত ছাড়া আর কোনও দেশের সংবিধানের প্রস্তাবনা বদলানো হয়নি। তিনি বলেন, প্রস্তাবনা সংবিধানের আত্মা। এটি পরিবর্তন করা যায় না। এটি সংবিধানের বীজ। কিন্তু ১৯৭৬ সালে ৪২তম সংশোধনীর মাধ্যমে ভারতের প্রস্তাবনায় ‘ধর্মনিরপেক্ষ’, ‘সমাজতান্ত্রিক’ এবং ‘অখণ্ডতা’ শব্দগুলি যোগ করা হয়। এটি সংবিধানের প্রতিষ্ঠিত মূল্যবোধের প্রতি অবিচার। তিনি বলেন, এই শব্দগুলো জরুরি অবস্থার সময় যোগ করা হয়েছিল, যখন নাগরিকদের মৌলিক অধিকারটুকুও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। ধনখড়ের মতে, এই শব্দগুলো ভারতের 'সনাতন সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়'। তিনি বলেন, "এই শব্দ যোগ করা আমাদের হাজার বছরের সভ্যতার ঐতিহ্যকে অবমাননা করার মতো।" কর্ণাটকের প্রাক্তন বিধায়ক ডি.এস. বীরাইয়ার সংকলিত ‘অম্বেদকরের বার্তা’ বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে এই মন্তব্য করেন ধনখড়।

সঙ্ঘের তরফে দত্তাত্রেয় হোসাবলে দিনকয়েক আগেই বলেছিলেন, সংবিধানের প্রস্তাবনায় ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ এবং ‘সমাজতান্ত্রিক’ শব্দ দু'টি জরুরি অবস্থার সময় যোগ করা হয়েছিল। তিনি দাবি করেন, বিআর অম্বেদকরের তৈরি মূল সংবিধানে এই শব্দ ছিল না। তিনি বলেন, জরুরি অবস্থার সময় সংসদ কাজ করেনি, বিচারব্যবস্থা অচল ছিল, মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। তখনই এই শব্দ দু'টি যোগ করা হয়। এগুলো থাকা উচিত কি না, তা নিয়ে আলোচনা হওয়া দরকার। হোসাবলে বলেন, জরুরি অবস্থার সময় কংগ্রেস সরকারের অধীনে বহু মানুষকে কারারুদ্ধ করা হয়েছিল। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব করা হয়েছিল। তিনি কংগ্রেসের কাছে এই সময়ের জন্য ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানান।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কত সিবগাতুল্লার মৃত্যু হলে বাঙালির রামনবমী পালন পূর্ণতা পাবে?

Ram Navami 2025: কেন মমতা বললেন, তাঁদের দলের পক্ষ থেকেও রামনবমী পালন করা হবে এবং ওইদিন সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হবে? কে বা কারা এই নরম হিন্দুত্বের মন্ত্র তাঁর কানে ঢেলেছিল?

কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে এই মন্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। তিনি বলেন, আরএসএস সবসময় দরিদ্র, পিছিয়ে পড়া এবং তপশিলি জাতি-উপজাতির মানুষের বিরুদ্ধে। তারা সংবিধানের মূল মূল্যবোধের বিরোধী। তিনি বেঙ্গালুরুতে সাংবাদিকদের বলেন, হোসাবলে মনুস্মৃতির আদর্শে বিশ্বাসী। মনু চান না দরিদ্র মানুষ উন্নতি করুক। তিনি সমতা, স্বাধীনতা, ভ্রাতৃত্ব এবং ধর্মনিরপেক্ষতার বিরোধী। খাড়গে বলেন, "যদি ওরা সংবিধানের একটি শব্দও স্পর্শ করে, আমরা শেষ পর্যন্ত লড়াই করব।" তিনি আরএসএস-এর উদ্দেশে বলেন, ওরা যদি সত্যিই হিন্দুধর্মের পক্ষে কাজ করতে চায়, তাহলে প্রথমে অস্পৃশ্যতা দূর করুক। তিনি আরএসএস-এর মতাদর্শকে পশ্চাদপসরণমূলক বলেও সমালোচনা করেন।

কংগ্রেস ছাড়াও অন্যান্য বিরোধী দল এই প্রস্তাবের নিন্দা করেছে। সিপিআই(এম) বলেছে, এই শব্দ দু'টি সংবিধানের মূল মূল্যবোধের অংশ। এগুলো স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আত্মত্যাগের প্রতীক। বামেরা বলেছে, আরএসএস-এর এই প্রস্তাব ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র করার পরিকল্পনার অংশ। রাহুল গান্ধীও এই আবহে মুখ খুলেছেন। তাঁর কথায়, আরএসএস-এর মুখোশ খুলে গেছে। তারা মনুস্মৃতি চায়, সংবিধান নয়। তারা দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার কেড়ে নিতে চায়। কেরলের মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন এই প্রস্তাবকে গণতন্ত্রের মূল আদর্শের ওপর আক্রমণ বলে অভিহিত করেছেন। আরজেডি নেতা লালুপ্রসাদ যাদব বলেন, আরএসএস-এর সংবিধানের দিকে কুনজর দেওয়ার সাহস নেই।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
'আমিত্ব' ভারতীয় সংবিধানের মূল নয়, মনমোহনের জয় ও পরাজয় সেই মূলেই লুকিয়ে

Manmohan Singh Death: ১০ বছরের শাসনকালে মনমোহন সিংহ জননেতা বা তথাকথিত রাজনৈতিক নেতা বা একনায়ক হয়ে উঠতে পারেননি ঠিকই, কিন্তু নিজের ও সংবিধানের মর্যাদা রক্ষা করেছেন একজন শিক্ষিত ও রুচিশীল ব্যক্তি হিসেবে।

প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের নভেম্বরে সুপ্রিম কোর্ট এই শব্দ দু'টির বৈধতা নিয়ে একটি মামলার রায় দিয়েছে। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সঞ্জীব খান্না এবং বিচারপতি পি.ভি. সঞ্জয় কুমারের বেঞ্চ বলে, এই শব্দগুলো জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য। এগুলো সংবিধানের মূল কাঠামোর বিরোধী নয়। আদালত বলেছে, ৪৪ বছর পর এই সংশোধনী নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনও যুক্তি নেই।

১৯৭৬ সালে জরুরি অবস্থার সময় ৪২তম সংশোধনীর মাধ্যমে প্রস্তাবনায় এই শব্দগুলো যোগ করা হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন সরকার এই পদক্ষেপ করে। পরবর্তী জনতা সরকার অনেক সংশোধনী বাতিল করলেও এই শব্দগুলো বহাল রাখে। এমনকী বিজেপি-নেতৃত্বাধীন বাজপেয়ী সরকারও এই শব্দগুলি স্পর্শ করেনি।

বিজেপি নেতা শিবরাজ সিং চৌহান বলেছেন, ভারতীয় সংস্কৃতির মূল হল সর্বধর্ম সম্ভাব। তাঁর মতে, ধর্মনিরপেক্ষতা শব্দের প্রয়োজন নেই। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং বলেছেন, "কে না চায় এই শব্দগুলো সরাতে? প্রত্যেক চিন্তাশীল নাগরিক এটি সমর্থন করবে।" বিরোধীরা বলছে, এই মনোভাব সংবিধানকে দুর্বল করার ষড়যন্ত্র।

একদিকে আরএসএস এবং বিজেপি নেতারা বলছেন, এই শব্দগুলো অম্বেদকরের সংবিধানের অংশ ছিল না। অন্যদিকে, বিরোধীরা বলছে, এই তৎপরতা সংবিধানের আত্মায় ধ্বংস করার চেষ্টা। সুপ্রিম কোর্টের রায় সত্ত্বেও এই আলোচনা ভবিষ্যতে আরও চড়া সুরে হতে পারে, তার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে এখন থেকেই।

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ডানাছাঁটা ট্রাম্প-নেতানিয়াহু, বিশ্ব রাজনীতি কোন দিকে যাবে?

Trump midterm defeat: আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির পরাজয় এবং ইজরায়েলের নির্বাচনে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানো—দুটি ঘটনাই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই পরাজয়ের পর ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ কী হবে? আমেরিকা-ইজরায়েল সম্পর্কের সমীকরণ কি বদলাবে? আর বিশ্ব রাজনীতিতে তার প্রভাবই বা কতটা পড়বে?

ট্রাম্পের হারের ৫ কারণ: কেন মুখ ফিরিয়ে নিলেন মার্কিন ভোটাররা?

US Midterm Elections: আমেরিকার মিডটার্ম নির্বাচনে বড় ধাক্কা খেল ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি।জীবনযাত্রার খরচ বৃদ্ধি থেকে শুরু করে ট্রাম্পের নীতি—রিপাবলিকানদের ভরাডুবির পাঁচটি মূল কারণ কী কী?

পিস বন্ড কী, কেন দিতে হয়? নেহা বোরার আপত্তিতে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ঔপনিবেশিক আমলের আইন

Peace Bond: শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করলেই কি দিতে হবে পিস বন্ড? AISA-র জাতীয় সভাপতি নেহা বোরার আপত্তিতে নতুন করে বিতর্কে ঔপনিবেশিক আমলের প্রতিরোধমূলক আইন। ব্রিটিশ আমল থেকে স্বাধীন ভারত, CrPC থেকে BNSS—কীভাবে বদলেছে এই আইনি ব্যবস্থা? কেন কাউকে ১০ হাজার টাকার মুচলেকা দিতে বলা হয়? কী বলছে আইন?

রামলীলা ময়দানের সভায় ভিড় দেখাতে এআই ছবি? কতটা সত্যি?

Ramlila Maidan AI image controversy: দিল্লির রামলীলা ময়দানে ১ নভেম্বরের ‘ইন্ডিয়া’ জোটের সমাবেশে ভিড় ও এআই ছবি ব্যবহার নিয়ে বিজেপি ও কংগ্রেসের মধ্যে বিতর্ক তুঙ্গে। ভাইরাল ছবিগুলোর সত্যতা কী?

আবের কাওয়াস: প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান মুসলিম মহিলা নিউ ইয়র্কের সিনেটে

Aber Kawas: নিউ ইয়র্কের ১২ নম্বর সিনেট ডিস্ট্রিক্ট থেকে জয়ী হয়ে ইতিহাস গড়লেন আবের কাওয়াস। নিউ ইয়র্ক স্টেট আইনসভায় তিনি প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান এবং প্রথম হিজাব পরিহিত মুসলিম মহিলা প্রতিনিধি।

প্রতিবেশীর ধর্ম দেখব না! গির্জায় হামলায় যা বলছে বাসন্তী

Basanti church: গির্জার সদস্য প্রদীপ মণ্ডল ইনস্ক্রিপ্টকে জানিয়েছেন, শনিবার সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ চার্চ অফ নর্থ ইন্ডিয়ার (CNI) বিশপ সুব্রত চক্রবর্তী পার্শ্ববর্তী এলাকার কয়েকটি গির্জার যাজকদের নিয়ে শান্তিপূর্ণ শোভাযাত্রা করে নারায়ণতলার নবনির্মিত গির্জায় পৌঁছন। তাঁদের স্বাগত জানাতে গির্জার ভিতরে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। প্রার্থনা শুরুর ঠিক আগে ৩০-৩৫ জনের একটি দল জোর করে গির্জায় ঢুকে পড়ে বলে দাবি তাঁর।

পাঁচ খুনের 'বদলা'? এবার গুয়াহাটিতে এনকাউন্টার পুলিশের

Guwahati Encounter: গুয়াহাটিতে হোটেলে ঢুকে পাঁচ জনকে খুনের অভিযোগে ধৃত ঘনকান্ত গগৈ পুলিশের গুলিতে নিহত। পুলিশের দাবি, হেফাজত থেকে পালিয়ে সার্ভিস রিভলভার ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল সে। একই সময়ে মধ্যপ্রদেশের দেওয়াস ও ভোপালে পৃথক এনকাউন্টারে তিন অভিযুক্ত গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। কয়েক দিন আগেই বাংলায় গাইঘাটা ও সামশেরগঞ্জে দুই অভিযুক্তের মৃত্যু হয়েছিল।

আমেরিকার প্রথম মুসলিম সেনেটর, ট্রাম্পের ইসলামবিদ্বেষী প্রচারকে হারিয়ে ইতিহাস গড়লেন আবদুল এল-সায়েদ

Abdul El-Sayed: নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর দলের একাধিক নেতা এল-সায়েদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ইসলামবিদ্বেষী প্রচার চালিয়েছিলেন। তাঁর ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে এনে তাঁকে আমেরিকার নিরাপত্তার পক্ষে বিপজ্জনক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছিল।