রাশিয়ার টানা হুমকি সত্ত্বেও ইউক্রেনকে সাহায্য আমেরিকার, কোন অজানা পরিণতি অপেক্ষায়?

ইউক্রেনকে আরও অস্ত্রসাহায্য করার কথা ঘোষণা করেছেন জো বাইডেন। দিন যত গড়াচ্ছে, ক্রমশ ভয়ংকর চেহারা নিচ্ছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। উঠে এসেছে একের পর এক মারণাস্ত্রর নাম। কখনও ড্রোন, কখনও শক্তিশালী মিসাইল দিয়ে রুশ আগ্রাসন ঠেকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে ইউক্রেন। তাই যুদ্ধজয়ে মরিয়া রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন এবার ‘নেক্সট-জেনারেশন’ সমরাস্ত্র ব্যবহারে তৎপর হয়েছেন।

জানা গিয়েছে, ব্রিটেনের সরবরাহ করা অত্যাধুনিক ‘ব্রিমস্টোন’ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে একের পর এক টি-৯০এম ট্যাঙ্ক গুঁড়িয়ে দিতে পেরেছে ইউক্রেনীয় সেনা। তাই এবার অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক প্রযুক্তি, গ্রেনেড লঞ্চার, ছোট আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে সাজানো ‘বিএমপিটি টার্মিনেটর’ নামিয়ে সেই ব্রিমস্টোনেরই পাল্টা জবাব দিতে চাইছে ক্রেমলিন। আর ইউক্রেনের ড্রোনের ‘ওষুধ’ হিসেবে রুশ অস্ত্রাগারে রয়েছে লেজার অস্ত্র। রাশিয়া জানিয়েছে, এই শক্তিশালী লেজার শুধু ড্রোনই ধ্বংস করে না, ভূপৃষ্ঠ থেকে ১৫০০ কিলোমিটার ওপরে থাকা নজরদারি স্যাটেলাইটকেও অকেজো করে দিতে পারে।

ইউক্রেনের ন্যাটোতে যোগদানের ইচ্ছা, ও তার রুশ প্রতিক্রিয়ার অংশ হিসেবে ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি দুই দেশের মধ্যে ভয়াবহ লড়াই শুরু হয়। সামরিক শক্তির বিরাট পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও পশ্চিমি মিত্রদের বিপুল সামরিক সাহায্য পেয়ে যুদ্ধে এখনও টিকে আছে ইউক্রেন। অন্যদিকে, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও একটু একটু করে নিজেদের দখলকৃত ভূমির পরিমাণ বাড়াচ্ছে রাশিয়া। যুদ্ধের ফলাফল শেষ পর্যন্ত কী হবে, তা সময়ই বলে দেবে। অবধারিতভাবেই চলমান যুদ্ধে বেশ কিছু কৌশলগত ভারী অস্ত্র ব্যবহার হচ্ছে। কী সেগুলো?

আরও পড়ুন: ভয়াবহ মিসাইল রাশিয়ার হাতে! ইউক্রেনের পর পুতিনের টার্গেট কে?

ত্রাসের নাম ট্যাঙ্ক-বিধ্বংসী রকেট ও মিসাইল
চলমান যুদ্ধে ইউক্রেন তার মিত্রদের কাছ থেকে বিভিন্ন মডেলের বিপুল-সংখ্যক অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক রকেট ও মিসাইল পেয়েছে। মূলত এগুলোর কারণেই রাশিয়ার ট্যাঙ্ক-সহ অন্যান্য সাঁজোয়া গাড়ি সহজেই ধ্বংস হচ্ছে।

ইউক্রেনের হাতে রয়েছে ব্রিটিশ NLAW। Next generation Light Anti-tank Weapon, যা জ্যাভলিনের মতোই হামলা করে। ইউক্রেন এই পর্যন্ত সাত হাজার জ্যাভলিন, সাড়ে চার হাজার NLAW মিসাইল পেয়েছে। তবে রাশিয়ার হাতেও একই ধরনের অস্ত্র রয়েছে।

মেইন ব্যাটল ট্যাঙ্ক (MBT)
ট্যাঙ্ক ছাড়া আধুনিক যুগের যুদ্ধ যেন কল্পনাও করা যায় না। চলমান রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধে দুই পক্ষই প্রচুর ট্যাঙ্ক ও অন্যান্য সাঁজোয়া যান ব্যবহার করছে। এসব ট্যাঙ্কের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো T-72 ট্যাঙ্ক। এটি রাশিয়া-ইউক্রেন, উভয়ই ব্যবহার করে।

সাঁজোয়া যান (Armoured Vehicles)
ট্যাঙ্ক ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের সাঁজোয়া যান এই যুদ্ধে ব্যবহৃত হচ্ছে। Infantry Fighting Vehicles (IFV) নামে পরিচিত এসব 'আর্মার্ড ভেহিকল' সেনাদের নিরাপদে যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করা ছাড়াও হেভি মেশিনগান ও অন্যান্য অস্ত্র দিয়ে ট্যাঙ্কের বিকল্প হিসেবে কাজ করে। এই ধরনের সাঁজোয়া যানের মধ্যে BMP সিরিজের তিনটি মডেল রুশ-ইউক্রেন সেনাবাহিনীতে কয়েক হাজার ইউনিট সক্রিয় রয়েছে। এগুলো সাতের বেশি সেনা পরিবহণের পাশাপাশি বিভিন্ন কাঠামো অনুযায়ী ৩০ মিলিমিটার হেভি মেশিনগান, ১০০ মিলিমিটার কামান, অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক মিসাইল, অটোমেটিক গ্রেনেড লঞ্চার-সহ বিভিন্ন ক্যালিবারের মেশিনগান দিয়ে পদাতিক সেনাদের আগ্নেয়াস্ত্রর জোগান দিতে সক্ষম।

আর্টিলারি
কামান ছাড়া আধুনিক যুদ্ধ যেন কল্পনাও করা যায় না। চলমান যুদ্ধে দুই পক্ষের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত কৌশলগত অস্ত্র হচ্ছে আর্টিলারি। ফিল্ড হাউটজার, রকেট আর্টিলারি এবং সেল্প প্রপেল্ড আর্টিলারি– কামান সাধারণত এই তিন ধরনের হয়ে থাকে। চলমান ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে ইউক্রেন জরুরি ভিত্তিতে ন্যাটো-র দেশগুলোর কাছে সাহায্য চেয়ে M777 লং রেঞ্জ হাউটজার কামান পায়।

পরিস্থিতি যে মোটেই অনুকূলে নেই, তা ভালোই আঁচ করতে পারছে রাশিয়া। একই দিনে তাদের দুই শীর্ষ সেনাকর্তা যুদ্ধের বলি হয়েছেন বলে বৃহস্পতিবার বিবৃতি দিয়ে স্বীকার করে নিয়েছে রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রক। এর শেষ কোথায়, জানে না কেউ। তবে আন্তর্জাতিক মহলে একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, আমেরিকা কি এই যুদ্ধের নেপথ্যে? কারণ প্রথম থেকে ইউক্রেনকে সামরিক সাহায্য দিয়ে আসছেন বাইডেন।

যুক্তরাষ্ট্র একাই গত দুই মাসে ইউক্রেনকে ৩৫০ কোটি ডলারের অস্ত্র সাহায্য দিয়েছে। আরও সাতশো কোটি ডলারের অস্ত্রসাহায্য সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট বাইডেন অনুমোদন করেছেন, যা দিয়ে হাউটজার দূরপাল্লার কামান, মাল্টিপল রকেট লঞ্চার এবং সাঁজোয়া ড্রোনের মতো অত্যাধুনিক অস্ত্র দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

বাইডেন বলেন, "আমি ইউক্রেনের জন্য আরও একটা নিরাপত্তা-সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করছি, যা ইউক্রেনকে গোলাবারুদ, র‍্যাডার ও অন্যান্য সরঞ্জাম জোগাড়ে সাহায্য করবে।" তবে এই সহায়তার কথা ঘোষণার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট সতর্ক করে বলেন, সহায়তা-তহবিল কিন্তু শেষের দিকে। আরও অর্থসহায়তার অনুমোদন দিতে কংগ্রেসের প্রতি আহ্বানও জানিয়ে রাখেন তিনি। জানা গিয়েছে, বাইডেন কংগ্রেসকে আরও ৩৩ বিলিয়ন ডলার সহায়তা-প্যাকেজ অনুমোদনের জন্য চাপ দিচ্ছেন।

এই ধরনের 'স্পর্শকাতর' অস্ত্র যেন ইউক্রেনকে না দেওয়া হয়, তা নিয়ে রাশিয়া লিখিতভাবে আমেরিকা এবং বেশ কয়েকটি ন্যাটো-র দেশকে সাবধান করে। ওই চিঠিতে সতর্ক করা হয় 'অত্যন্ত স্পর্শকাতর' এসব অস্ত্র ইউক্রেনে পাঠালে 'অজানা পরিণতি' ভোগ করতে হতে পারে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, রাশিয়ার পরাজয় নিশ্চিত করতে আমেরিকা এবং তার ন্যাটো মিত্ররা যদি ইউক্রেনকে ভারী অস্ত্র-সরঞ্জাম, রসদ জুগিয়ে চলে এবং বাড়িয়ে যেতে থাকে- যে ইঙ্গিত তারা স্পষ্টভাবেই দিচ্ছে, তাহলে প্রেসিডেন্ট পুতিনের সামনে রাস্তা কী?

২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে সামরিক হামলা শুরুর নির্দেশ দেওয়ার সময় পুতিন হুমকি দিয়েছিলেন- "কোনও পশ্চিমি শক্তি যদি এই যুদ্ধে সরাসরি মাথা গলায়, তাহলে তাদের এমন পরিণতি ভোগ করতে হবে, যা ইতিহাসে আগে দেখা যায়নি।"

হুমকির তোয়াক্কা করছে না ন্যাটো। বলাই বাহুল্য, বাইডেন ইউক্রেনের পাশে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে যেভাবে দাঁড়িয়েছেন, তাতে আগামী দিনে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক কোন তিমিরে যাবে, তার উত্তর খুঁজে পাচ্ছেন না তাবড় কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরাও।

More Articles

;