সুপারহিরোরা কল্পনাতেই থাকে, মায়েরা থাকেন বাস্তবে
Mother's sacrifice and love: যখন রোগ থেকে সেরে উঠি, সবাই ডাক্তারের প্রশংসা করে। কেউ মনে রাখে না সেই মানুষটাকে, যিনি তিন রাত ঘুমোননি; কপালে হাত রেখে বারবার দেখেছেন আমার জ্বর কমলো কি না।
নারী দিবসে সাধারণত আমরা তাঁদের নাম নিই— যাঁরা ইতিহাস গড়েছেন, পৃথিবীটাকে বদলে দিয়েছেন। তাই মনের মধ্যে একটা ধারণা অনেকদিন ধরে ছিল যে, অসাধারণ নারীরা যেন একটু দূরেই থাকেন— মঞ্চে, মাইক্রোফোনে অথবা বইয়ের পাতায়।
কিন্তু আমরা তাঁদের নাম নিতে ভুলে যাই, যারা সকলের কাছে সাধারণ, সামান্যা হলেও আদপে অসামান্যা। যাদের ছাড়া বিশ্ব সংসার অচল না হলেও আমাদের পরিবার অচল। যখন কথা হচ্ছে 'সাধারণ' নারীদের নিয়ে, তখন লেখা শুরু করা যাক একটি সাধারণ সকাল দিয়ে। রান্নাঘরে ভাতের হাঁড়ি নামানো হয়েছে একটু আগে, গরম ভাতের ধোঁয়া উঠছে। সিঙ্কে বাসনের স্তূপ। জানালা দিয়ে রোদ ঢুকছে। আর সেই রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন একজন নারী— চুলটা তাড়াহুড়ো করে খোঁপা করা, শাড়ির আঁচলটা কোমরে গোঁজা, ঘেমে যাওয়া মুখ। কেউ তাঁকে ডাকলেই তিনি একটু থেমে হাতের পিঠ দিয়ে কপালটা মুছে নেন।
আমি বলছিলাম আমার বাড়ির একটি সাধারণ সকালের কথা। এবং সেই সাধারণ সকালের ঘটনাবলীর কেন্দ্রীয় চরিত্র আমার মা। আমার মায়ের কোনো জীবনী নেই। তাঁর নামে কোনো পুরস্কার নেই, কোনো সাক্ষাৎকার নেই, এমনকী কোনো ইতিহাসের অধ্যায়ও নেই। তবু আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ইতিহাসটা তিনিই লিখেছেন।
আমার মা খুব সাধারণ একজন মানুষ, এতটাই স্বাভাবিক যে তাঁকে আলাদা করে দেখার প্রয়োজনই পড়েনি। তিনি ভোরে ওঠেন, রান্নাঘরে যান, চা বানান, বাজারের লিস্ট করেন, ঘর গুছিয়ে রাখেন। আমি কখনও খুঁজে দেখিনি আমার মায়ের বিশেষত্ব কী কী। যেন তিনি এই পৃথিবীর আর পাঁচটা নিয়মেরই একটা— সূর্য উঠবে, বৃষ্টি হবে, আর মা সব ঠিক করে দেবে।
ছোটবেলায় আমার মনে হতো, মা যেন এক অদ্ভুত যন্ত্র। 'যন্ত্র' বলছি কারণ তিনি কখনও ক্লান্ত হন না। আমরা সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পরও তিনি রান্নাঘরে বাসন ধুচ্ছেন। আবার সকালে ঘুম থেকে উঠলে দেখি তিনি সব গুছিয়ে তৈরি। প্রতিটা ছোটখাটো খুঁটিনাটি নিয়ে নিরন্তর ব্যস্ত আমার মা।
স্কুলের বেঞ্চে বসে যখন টিফিন বক্স খুলতাম, ভিতরে থাকত গরম পরোটা বা লুচি। তরকারিতে সামান্য নুন কম-বেশি হলেই আমার নাক কুঁচকে যেত। একবারও বুঝিনি সেই খাবারটুকু তৈরি করতে মা কখন উঠেছেন, কখন ময়দা মেখেছেন কিংবা কখন ভাজা শেষ করেছেন— এই পুরো ঘটনাটা কোনোদিনও আমার চোখে পড়েনি। আমি শুধু টিফিন বক্সটি খুলেছি, খেয়েছি এবং শেষ করেছি। ব্যস, এটুকুই ছিল আমার পৃথিবী!
আমার মা নিজের সম্পর্কে খুব কম কথা বলেন। তাঁর অতীতটা ঠিক একটি বন্ধ আলমারির মতো; ভিতরে অনেক কিছু আছে, কিন্তু দরজাটা খুব একটা খোলা হয় না। আমাদের মনে হতো, মায়েরা তো মা-ই হন— তাঁদের আলাদা করে কী-ই বা শখ-আহ্লাদ থাকতে পারে!
তবু মাঝে মাঝে সংসারের জাঁতাকলের ফাঁকফোকর দিয়ে কিছু দৃশ্য বেরিয়ে আসে। একদিন আলমারি ঘাঁটতে ঘাঁটতে পেয়েছিলাম একটি পুরনো খাতা। ভিতরে সুন্দর করে লেখা কিছু গান, কয়েকটা কবিতার লাইন, আর শেষে নিজের হাতে সযত্নে লেখা একটি নাম। মায়ের নিজের নাম।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
International Womens Day: একটু নড়াচড়া করতেও প্রাণান্তকর কষ্ট। তার উপর ছেলের বিষাক্ত কথার খোঁচা রমলা দেবীকে মানসিকভাবে আরও ভেঙে দেয়। অথচ এই অর্ঘ্যর জন্য তিনি কী না করেছেন!
আমি খুব অবাক হয়েছিলাম। আমি কোনোদিন জানতামই না, মা গান লিখে রাখতেন। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম,
মা তুমি গান লিখতে?
মা একটু হেসে বলেছিলেন,
আরে না রে, এমনি লিখে রাখতাম।
এই ‘এমনি’ শব্দটা মায়েদের খুব প্রিয়। এর ভিতরে অনেক গল্প লুকিয়ে থাকে। আমার মা যখন হাসেন, তখন চোখের কোণে কয়েকটা সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়ে। আমার ছোটবেলায় এই ভাঁজগুলো ছিল না। কখন তৈরি হলো, কীভাবে তৈরি হলো, আমি ঠিক মনে করতে পারি না।
হয়তো মা আরও পড়াশোনা করতে চেয়েছিলেন, হয়তো নিজের মতো একটি জীবন গড়তে চেয়েছিলেন। কিন্তু জীবনের এক সময় তিনি হাসিমুখে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন— নিজের গল্পটা একটু ছোট করে লিখবেন, যাতে আমাদের গল্পটা বড় হতে পারে।
আমি যখন পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাই, সবাই বলে,
বাহ, কী মেধাবী ছেলে!
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
International Women’s Day story: ব্যবসার খাতিরে অনেক সময় তাঁকে কড়া কথা বা বিরক্তিও সহ্য করতে হয়। কেউ হয়তো দাম বেশি হওয়ার অনুযোগ করেন, কেউ বা অপছন্দ করেন। কিন্তু চৈইতালদি সবকিছুই সামলে নেন অসীম ধৈর্যের সঙ্গে।
যখন রোগ থেকে সেরে উঠি, সবাই ডাক্তারের প্রশংসা করে। কেউ মনে রাখে না সেই মানুষটাকে, যিনি তিন রাত ঘুমোননি; কপালে হাত রেখে বারবার দেখেছেন আমার জ্বর কমলো কি না। এদিকে মা নিজে যদি অসুস্থ হন, তিনি বলবেন,
ধুৎ! কিচ্ছু হয়নি আমার।
মা যদি নিজের জন্য একটি শাড়ি কিনতে যান, তিনি দশবার ভাববেন। কিন্তু সন্তানের জন্য কিছু কিনতে গেলে একবারও ভাববেন না। এই অদ্ভুত অঙ্কটা আমি কিছুতেই বুঝতে পারিনি। একটি মানুষ নিজের প্রয়োজনগুলোকে এত সহজে সরিয়ে রাখতে পারে কীভাবে?
আমার মনে আছে, একবার আমি অঙ্কে খুব খারাপ রেজাল্ট করেছিলাম পরীক্ষায়। বাড়ি ফিরতে খুব ভয় পাচ্ছিলাম। মনে হচ্ছিল মা খুব রাগ করবেন। বাড়ি ফিরে মাকে মার্কশিটটা দিলাম। মা চুপচাপ সেটা দেখলেন। তারপর আমার মাথায় হাত রেখে বললেন,
খুব মনখারাপ করছে?
তিনি বলেছিলেন,
তাহলে ঠিক আছে। আবার চেষ্টা করবি। মনে রাখবি, তোর লড়াইটা তোর নিজের সঙ্গে।
এই কথাটা তখন খুব সাধারণ লেগেছিল। আজ বুঝি, এই কথাটির মধ্যে কত বিরাট একটি বিশ্বাস লুকিয়ে ছিল— আমার উপর, আমার ভবিষ্যতের উপর।
কিন্তু মায়ের দু-একটা সাধারণ বাক্য, যা আমার জীবনের সবচেয়ে বড়ো শিক্ষা হয়ে রয়ে গেছে—
কাউকে দোষ দেওয়ার আগে তার দিকটাও ভেবে দেখো।
বা
নিজে ভালো থাকাটা খুব বড় কিছু না, কিন্তু কাউকে কষ্ট না দেওয়াটাও একটা অনেক বড় কাজ।
আমরা যখন প্রকৃতির নিয়মে বেড়ে উঠি, তখন একটি অদ্ভুত সত্য সামনে আসে। আমরা বুঝতে শুরু করি, আমাদের মায়েরা আসলে কোনো ‘সুপারহিরো’ নন। তাঁরাও ক্লান্ত হন। তাঁরাও ভয় পান। তাঁরা কখনও কখনও ভুলও করেন।
কিন্তু ঠিক তখনই আমরা আরও একটি বিষয় অনুধাবন করি— সুপারহিরোরা কেবল কল্পনাতেই থাকে, আর মায়েরা থাকেন বাস্তবে। একেবারে আমাদের চোখের সামনে। তিনি প্রতিদিন নিজেকে একটু একটু করে ভেঙে আমাদের বিলিয়ে দিয়ে গেছেন।
আর আমরা সেই বিসর্জনের টুকরোগুলো দিয়েই তিল তিল করে নিজেদের জীবন সাজিয়েছি।







