এআই নিয়ে আমার আগ্রহ শূন্যের চেয়েও কম: সালমান রুশদি
Salman Rushdie AI: রুশদির মূল যুক্তিটা খুব সহজ ও অকাট্য। তিনি মনে করেন—গল্প বলা, সাহিত্য কিংবা সিনেমা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে 'মৌলিকতা' বা অরিজিনালিটির উপর। আর এই মৌলিক জিনিসটাই এআই-এর পক্ষে নকল করা অসম্ভব।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI কি সত্যিই মানুষের জায়গা নিতে পারবে? এই নিয়ে তর্ক-বিতর্ক-জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। আমাদের বন্ধুদের আড্ডা-ক্ষেত্র থেকে কর্মক্ষেত্র সর্বত্রই এই প্রশ্নের ছয়লাপ। আমাদের মন এই প্রশ্নও ঘোরে, শিল্প, সাহিত্য বা সিনেমার মতো সৃজনশীল জগতে এআই-এর কি সত্যিই মানুষের জায়গা নেওয়ার ক্ষমতা আছে? কিন্তু এই ধরনের আলোচনাকে একদমই প্রশ্রয় দেন না সালমান রুশদি। সম্প্রতি লন্ডনে 'Liberatum’s 14th Cultural Honor' গ্রহণের আগে 'ভ্যারাইটি' (Variety) ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এআই নিয়ে নিজের তীব্র ক্ষোভ ও অনীহা প্রকাশ করেছেন রুশদি।
সৃজনশীল কাজে এআই-এর ভূমিকা আসলে কতখানি? রুশদির ভাষায়:
একদম কিছুই না। শূন্য।
শুধু তাই নয়, খুব স্পষ্ট এবং কড়া ভাষায় লেখক জানিয়ে দিলেন এআই নিয়ে তাঁর আগ্রহ নাকি "শূন্যের চেয়েও কম!" (“I have less than zero interest in AI”)।
কিন্তু কেন এআই-এর উপর এত চটেছেন এই বরেণ্য সাহিত্যিক?
রুশদির মূল যুক্তিটা খুব সহজ ও অকাট্য। তিনি মনে করেন—গল্প বলা, সাহিত্য কিংবা সিনেমা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে 'মৌলিকতা' বা অরিজিনালিটির উপর। আর এই মৌলিক জিনিসটাই এআই-এর পক্ষে নকল করা অসম্ভব।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Nobel Prize in Chemistry 2024: কম্পিউটারকে ব্যবহার করে প্রকৃতিতে অনুপস্থিত এমন কিছু নতুন ধরনের প্রোটিন তৈরির প্রক্রিয়াকেই বলে কম্পিউটেশনাল প্রোটিন ডিজাইন।
রুশদি বলেন,
এআই-এর নতুন কিছু তৈরি করার কোনো ক্ষমতাই নেই। এটি যা করতে পারে তা হলো—ইন্টারনেট থেকে প্রচুর তথ্য গিলে ফেলা বা সংগ্রহ করা এবং তারপর সেটারই একটা অন্য রূপ বা সংস্করণ তৈরি করে দেওয়া। কিন্তু শিল্প তো সেটা নয়! শিল্প হলো এমন কিছু খুঁজে বের করা, যা আগে পৃথিবীর কেউ কখনো করেনি। এআই এই কাজটা কোনোদিনও পারবে না।
এআই নিয়ে সালমান রুশদির এই অবস্থান কিন্তু আজকের নয়, গত কয়েক বছর ধরেই তিনি এই বিষয়ে নিজের মতামত স্পষ্ট করে আসছেন। ২০২৪-২৫ সালের দিকে তিনি বলেছিলেন, এআই হয়তো থ্রিলার বা সায়েন্স ফিকশনের মতো চেনা ছকে বাঁধা (formulaic) লেখার ক্ষেত্রে কিছুটা হুমকি হতে পারে, কারণ সেখানে মৌলিকতার চেয়েও একটা নির্দিষ্ট প্যাটার্ন বেশি কাজ করে। কিন্তু সত্যিকারের সাহিত্যের জন্য এআই কোনো চ্যালেঞ্জই নয়।
নিজের স্টাইল পরীক্ষা করার জন্য রুশদি একবার চ্যাটজিপিটি (ChatGPT)-কে নিজের মতো করে কিছু লিখতে বলেছিলেন। ফলাফল দেখে তিনি স্রেফ হেসে উড়িয়ে দেন এবং সেটাকে 'আবোলতাবোল' বলে আখ্যা দেন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Artificial Intelligence: যদি প্রযুক্তির উপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যায়, AI যদি নিজের মতো করে চিন্তা করতে শুরু করে, তখন কী হবে? আমরা AI-কে ঠিক কতটা বিশ্বাস করতে পারি?
রুশদি মনে করেন, এআই-এর সবচেয়ে বড় খামতি হলো তার 'হিউমার' বা হাস্যরসের অভাব। ২০২৫ সালের একটি সাহিত্য উৎসবে তিনি মজা করে বলেছিলেন,
যতদিন না এআই মানুষকে হাসাতে পারছে, ততদিন লেখকরা সম্পূর্ণ নিরাপদ। চ্যাটজিপিটি-র মুখে কেউ কৌতুক শুনতে চায় না।
তাঁর মতে, সত্যিকারের সাহিত্য সৃষ্টি হয় মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, স্মৃতি, আবেগ, সাংস্কৃতিক গভীরতা এবং জীবনের নানা অপ্রত্যাশিত মোড় থেকে। এআই কেবল ডেটা বা তথ্য প্রসেস করতে পারে, কিন্তু মানুষের ভিতরের এই গভীর অনুভূতিগুলি তৈরি করতে পারে না।
শিল্পের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে রুশদি একটি চমৎকার কথা বলেছেন। তিনি মনে করেন, শিল্প বা সৃজনশীল কাজ মানে নিছক বিনোদন বা মানুষকে আনন্দ দেওয়া নয়। শিল্পের আসল কাজ হলো মানুষের চিন্তাভাবনাকে নাড়া দেওয়া, সমাজকে উস্কে দেওয়া।
তাঁর ভাষায়,
শিল্প যখন তার সেরা ফর্মে থাকে, তখন তা বিনোদনের চেয়েও অনেক বেশি কিছু। এটি মানুষকে চ্যালেঞ্জ করে। আর আপনি যখন মানুষকে চ্যালেঞ্জ করবেন, তখন অনেকেই হয়তো তা পছন্দ করবে না; কিন্তু সেটাই তো কাজটা করার সবচেয়ে বড় কারণ।
ব্যক্তিগত জীবনে ২০২২ সালে এক মারাত্মক প্রাণঘাতী হামলার মুখোমুখি হতে হয়েছিল রুশদিকে। কিন্তু সেই ধাক্কা সামলে তিনি আবার কলম ধরেছেন। হামলা-পরবর্তী জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা তাঁর আত্মজীবনীমূলক বই 'Knife: Meditations After an Attempted Murder'-এর উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে একটি প্রামাণ্যচিত্র (Documentary), যা আগামী সেপ্টেম্বর মাসে মুক্তি পেতে চলেছে। এছাড়া ২০২৫ সালে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর নতুন গল্প সংকলন 'দ্য ইলেভেন্থ আওয়ার' (The Ground Beneath Her Feet), যেখানে বয়স, মৃত্যু ও স্মৃতির এক অদ্ভুত কোলাজ রয়েছে। বর্তমানে তিনি সম্পূর্ণ নতুন একটি উপন্যাসের কাজও শুরু করেছেন।

পাশাপাশি, তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস 'মিডনাইটস চিলড্রেন' (Midnight's Children)-এর রুপোলি পর্দার রূপান্তর নিয়েও কথা বলেন রুশদি। ২০১২ সালে দীপা মেহতার সঙ্গে করা ছবিটির প্রশংসা করলেও, চলচ্চিত্র নির্মাতা বিশাল ভরদ্বাজের সঙ্গে নেটফ্লিক্সের যে টিভি সিরিজের কথা চলছিল, তা স্ক্রিপ্ট এবং বাজেটের সমস্যার কারণে বাতিল হয়ে গিয়েছে বলে তিনি জানান। তবে অন্যান্য কিছু বই নিয়ে পর্দায় রূপান্তরের নতুন কথাবার্তা এখনও চলছে।
ফতোয়া থেকে শুরু করে ছুরি ছুড়ে খুনের চেষ্টা—জীবনের নানা চড়াই-উতরাই পার করা সালমান রুশদি খুব ভালো করেই জানেন শব্দের শক্তি কতটা তীব্র হতে পারে। আর সেই কারণেই তিনি বিশ্বাস করেন, মানুষের রক্ত-মাংসের অভিজ্ঞতা এবং কল্পনাশক্তির কোনো বিকল্প হয় না। এআই যতই উন্নত হোক না কেন, তা কেবল মানুষের তৈরি করা সৃষ্টিরই একটা অনুকরণ মাত্র; মানুষের হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসা খাঁটি শিল্পের জায়গা নেওয়া কম্পিউটারের কোডিং-এর পক্ষে কোনোদিনই সম্ভব নয়।








