আছে বল দুর্বলেরও, দেখাচ্ছে সামশেরগঞ্জ
Samsherganj voting: সামশেরগঞ্জে এত বেশি ভোট পড়ল কেন, যখন বহু নাম এসআইআর-এ বাদ যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে? যারা ভোট দিতে পারেননি, তাঁদের জন্যই কি অন্যরা ভোট দিচ্ছেন?
আছে বল দুর্বলেরও—এই কথাটিই যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল সামশেরগঞ্জে। রাজ্যে প্রথম দফা ভোটের দিন সকাল থেকেই এই কেন্দ্রের চিত্র ছিল আলাদা। সকাল ১১টা পর্যন্ত রাজ্যের মধ্যে সর্বাধিক ভোট পড়েছে সামশেরগঞ্জে। অথচ এই সামশেরগঞ্জই এমন একটি এলাকা, যেখানে এসআইআর প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। সেই প্রেক্ষিতেই এত বেশি ভোট পড়া অনেককেই ভাবাচ্ছে।
শুধু সামশেরগঞ্জ নয়, গোটা মুর্শিদাবাদ জেলাতেই ভোটের হার ছিল চোখে পড়ার মতো। দুপুর ১টার হিসাব অনুযায়ী, জেলায় মোট ভোট পড়েছে প্রায় ৭১.৭ শতাংশ। ভোটের এই উচ্চ হারকে ঘিরে রাজনৈতিক মহল ও বিশ্লেষকদের মধ্যে শুরু হয়েছে নানা ব্যাখ্যা। তাঁদের মতে, এই ভোট শুধুই উপস্থিত ভোটারদের অংশগ্রহণ নয়, এর মধ্যে রয়েছে এক ধরনের প্রতিবাদের সুরও।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ADR report West Bengal election: প্রথম দফার ১৫২টি আসনের মধ্যে ৬৬টিই ‘রেড অ্যালার্ট’ কেন্দ্র, তিন বা তারও বেশি প্রার্থীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রয়েছে। ভোটাররা কি এবার প্রার্থীর ভাবমূর্তির বদলে তাঁর বিরুদ্ধে থাকা মামলার দিকেও নজর দেবেন?
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, যাঁদের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, তাঁদের ক্ষোভও প্রতিফলিত হচ্ছে এই ভোটে। যাঁরা ভোট দিতে পারছেন, তাঁদের অনেকেই যেন ভোট দিচ্ছেন শুধু নিজের জন্য নয়, তাঁদের জন্যও, যাঁরা এই অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। অর্থাৎ, ভোট এখানে কেবল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়, অধিকার হরণের বিরুদ্ধে এক প্রতীকী প্রতিরোধ হয়ে উঠেছে।
এই প্রেক্ষাপটে আগের নির্বাচনের সঙ্গে তুলনাও সামনে আসছে। গত লোকসভা নির্বাচনে এসআইআর প্রক্রিয়া ছিল না। সেই সময় দুপুর একটা পর্যন্ত যে পরিমাণ ভোট পড়েছিল, তার তুলনায় এবার অনেক বেশি ভোট পড়েছে একই সময়সীমার মধ্যে। শুধু তাই নয়, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সারাদিনে ৭৯.৯২ শতাংশ ভোট পড়েছিল।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Bengali Migrant Workers: মালদহ-র সুজাপুর, হরিশচন্দ্রপুর, রতুয়া এবং মুর্শিদাবাদের ভগবানগোলা, লালগোলা, সামশেরগঞ্জ, সুতির মতো পরিযায়ী অধ্যুষিত বিধানসভাগুলিতে বিচারাধীন তালিকায় সংখ্যালঘু পরিযায়ী শ্রমিকদের নাম সর্বাধিক। ভগবানগোলা বিধানসভায় মোট ভোটারের সংখ্যা ২ লক্ষ ৬৪ হাজার, যার মধ্যে পরিযায়ী শ্রমিক প্রায় ১ লক্ষ ১০ হাজার। বিচারাধীন তালিকায় ১ লক্ষ ৯ হাজার ৪৩৫ জন, এর বড় অংশই পরিযায়ী শ্রমিক।
ফলে স্পষ্ট, এবারের ভোটে অংশগ্রহণের আগ্রহ এবং তাগিদ দুই-ই বেড়েছে।
প্রসঙ্গত, বাদ পড়া মানুষের সংখ্যর দিকে তাকালে একটি স্পষ্ট প্যাটার্ন চোখে পড়বে। সবচেয়ে বেশি নাম বাদ পড়েছে মুর্শিদাবাদে—৪ লক্ষ ৫৫ হাজার। তারপর উত্তর ২৪ পরগনা (৩ লক্ষ ২৫ হাজার), মালদহ (২ লক্ষ ৩৯ হাজার), দক্ষিণ ২৪ পরগনা (২ লক্ষ ২২ হাজার) এবং পূর্ব বর্ধমান (২ লক্ষ ৯ হাজার)। এই পাঁচ জেলায় বাদ পড়া নামের সংখ্যা মোট বাদ পড়া নামের অর্ধেকেরও বেশি। মনে রাখতে হবে এই এলাকাগুলি সীমান্তসংলগ্ন, ঘনবসতিপূর্ণ এবং সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। মুর্শিদাবাদ ও মালদায় সংখ্যালঘু জনসংখ্যার অনুপাত অন্যান্য জেলাগুলির থেকে অনেকটাই বেশি। ফলে সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন, জনতার ভোটাধিকার বাতিল করেই কি ক্ষমতাদখলের ঘুঁটি সাজানো হচ্ছে?
নির্বাচন কমিশন প্রথম থেকে বলে আসছে মৃত, স্থানান্তরিত, ডুপ্লিকেট ও অযোগ্য ভোটারদের তালিকা পরিষ্কার করার প্রক্রিয়াকেই বাস্তবায়ন করছে তারা। এই পর্বে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে বিচারকরা প্রতিটি মামলা খতিয়ে দেখেছেন। কিন্তু বিরোধীদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায় ও রাজনৈতিক শিবিরকে লক্ষ্য করা হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস বলছে, সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় বাদের হার অস্বাভাবিকভাবে বেশি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের বক্তব্য, এতে তাদের ভোটে কোপ পড়ছে। এই প্রক্রিয়া উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবেই করা। বিজেপির পাল্টা জাল ও অবৈধ ভোটার সরিয়ে স্বচ্ছ নির্বাচনের পথ প্রশস্ত হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সামশেরগঞ্জের চিত্র তাই আলাদা করে গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ, যেখানে নাম বাদ যাওয়ার অভিযোগ ছিল সবচেয়ে বেশি, সেখানেই ভোটের হার সবচেয়ে বেশি—এই বৈপরীত্যই যেন এই নির্বাচনের এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হয়ে উঠছে। অনেকের মতে, এটাই প্রমাণ করে যে ভোটাধিকার নিয়ে মানুষের সচেতনতা ও আবেগ কতটা গভীর। বাধা বা বঞ্চনা সত্ত্বেও সেই অধিকারকে আঁকড়ে ধরার চেষ্টা যে থেমে থাকে না, সামশেরগঞ্জে তারই এক স্পষ্ট উদাহরণ।






