২৩ বছরের সম্পর্ক ছিন্ন এক ধাক্কায়! কোন অভিমানে তৃণমূল ছাড়লেন তাপস রায়?
Tapas Roy Resignation: সোমবার বিধানসভার স্পিকারের কাছে ইস্তফাপত্র জমা দেওয়ার পর বেরিয়ে তাপস রায় বলেন, ”তৃণমূলে আমার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। দলের একাধিক বিষয়ে আমি আহত হয়েছি, কষ্ট পেয়েছি।"

ভোট আসতে না আসতে পরিযায়ী পাখির মতোই এ-দল থেকে ও-দল, ও দল থেকে এ দলে যাত্রা শুরু হয়ে যায় নেতানেত্রীদের। ২০২৪ ভোটও তার ব্যতিক্রম কিছু নয়। চিরাচরিত সেই ধারা মেনেই শুরু হয়ে গিয়েছে দল বদলের জোয়ার। যাওয়ার জায়গা অবশ্য মোটামুটি বাঁধাই। হয় তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে, নয় বিজেপি ছেড়ে তৃণমূলে। দিন কয়েক আগেই তৃণমূলের সমস্ত পদ ছেড়েছেন কুণাল ঘোষ। না, পদ ছাড়লেও তিনি দলেই রয়েছে। তবে তার থেকে এক ধাপ এগিয়ে এবার দলই ছাড়লেন তৃণমূল নেতা তাপস রায়। এবার কি তবে বিজেপিতে? সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
জল্পনা চলছিলই। আর সেটাই সত্যি হল শেষপর্যন্ত। তৃণমূলের সঙ্গে যাবতীয় সম্পর্কে ইতি টানলেন বরাহনগরের তৃণমূল নেতা তাপস রায়। শিয়রে লোকসভা ভোট। আর ঠিক তার আগেই বিরাট বড় ভাঙনের মুখে পড়ল তৃণমূল। জানা গিয়েছে, গত ১ তারিখই দলের সব পদ ছেড়ে দেওয়ার কথা জানান তাপসবাবু। সে কথা জানান দলনেত্রী মমতা বন্দ্যেপাধ্যায় ও সুব্রত বক্সিকেও। সোমবারই বিধানসভায় স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘরে গিয়ে ইস্তফাপত্র জমা দিয়ে এসেছেন তিনি। স্পিকার জানিয়েছেন, মঙ্গলবার তাপসের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন তিনি।
প্রায় দু'দশকেরও বেশি সময় ধরে তৃণমূলের সঙ্গে যুক্ত তাপস রায়। ২৩ বছর ধরে দলের একনিষ্ঠ সদস্য, তৃণমূলের হয়ে লড়ে হয়েছেন বেশ কয়েকবারের বিধায়কপদ। কিন্তু সেই তাপসই নাকি সম্প্রতি দলের একাধিক কাজে অসন্তুষ্ট হয়েছেন। দলের ভূমিকা নিয়ে অভিমান জমেছে তাঁর মনে। সেই অভিমানের বহিঃপ্রকাশই কি হল ভোটের ঠিক আগে আগে। কেন বিধায়ক এবং দলের সমস্ত পদ থেকে ইস্তফা দিলেন তিনি?
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Justice Abhijit Ganguly Tamluk: কাঁথি উত্তর, কাঁথি দক্ষিণ, ভগবানপুর আর খেজুরি বিধানসভা ইতিমধ্যেই বিজেপির দখলে।
সোমবার বিধানসভার স্পিকারের কাছে ইস্তফাপত্র জমা দেওয়ার পর বেরিয়ে তাপস রায় বলেন, ”তৃণমূলে আমার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। দলের একাধিক বিষয়ে আমি আহত হয়েছি, কষ্ট পেয়েছি। সন্দেশখালি থেকে দুর্নীতি – নানা বিষয়ে আমার খারাপ লেগেছে। বুঝেছি, আর যাই হোক, এই দলে থাকা যায় না আর। অপমানিত হয়েছি। তাই আমি ইস্তফা দিলাম বিধায়ক পদ এবং দলের সব পদ থেকে। ১ তারিখই আমি ইস্তফা পাঠিয়েছিলাম। নেত্রীকেও সব জানিয়েছিলাম।” এতদিন ধরে রাজনীতি করছেন, কোনও দিন পুলিশ বাড়িতে আসেনি। অথচ এবার ইডি এল। তা নিয়ে তাপস রায়ের দাবি, ”অন্যান্য দল আমার প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে কিন্তু আমার দল পাশে দাঁড়ায়নি। শাহজাহান ইডির টার্গেট বলে নেত্রী বলছেন, অথচ আমার কথা একটিবারের জন্যও বলেননি।” শুধু বিধায়ক পদই নয়, সিটি কলেজের পরিচালন সমিতির সদস্যপদ ও সাগর দত্ত মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের একটি পদ থেকেও ইস্তফা দিয়েছেন তাপস রায়।
কার্যতই বোঝা যাচ্ছে, বাড়িতে ইডি-হানা এবং তা নিয়ে তৃণমূলের চুপ করে থাকা নিয়ে মনে মনে ক্ষোভ পুষে রেখেছিলেন বরাহনগরের বিধায়ক তাপস রায়। সোমবার অবশ্য দলের তরফে তাপসবাবুর সমস্ত অভিযোগই উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের দাবি, ‘বাধ্যবাধকতা’র কারণেই তাপস দলের পদ এবং বিধায়ক পদ ছেড়েছেন। সেই ‘বাধ্যবাধকতা’ হল ইডি। দলের একটি অংশ থেকে এটাই বলা হচ্ছে যে, তাপসের বাড়িতে হানা দিয়ে ইডি নির্ঘাত কিছু তথ্যপ্রমাণ পেয়েছিল। সেই কারণেই তাঁকে বিজেপিতে যেতে হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরেই ওয়াশিং মেশিন তত্ত্ব কিন্তু রাজনৈতিক মহলে বেশ চালু। আর সেই সম্ভাবনার কথাই ফের উস্কে উঠেছে তৃণমূলের একাংশের বক্তব্যে। তৃণমূলের অন্দরে তাপসের ‘ঘোষিত শত্রু’ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগামীরাও একই কথা বলছেন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Kunal Ghosh - Abhijit Ganguly: বিচারপতির উদ্দেশে কুণাল বলেছিলেন, ‘‘অবসরের বেশি দিন বাকি নেই। তার আগেই আপনি স্বেচ্ছাবসর নিয়ে আসুন না রাজনৈতিক ময়দানে।"

সোমবারই পূর্ব মেদিনীপুরের তমলুকের সরকারি সভায় ভাষণ দেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখানে কারওর নাম না করেই বলেছেন, বিজেপি সিবিআই-ইডির ভয় দেখিয়ে তৃণমূলকে ভাঙাতে চাইছে। তৃণমূলের তরফে অবশ্য বলা হয়েছে, হয় তিনি অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী, নয়তো বাংলার মানুষকে বোকা ভাবছেন।' শাসকদলের তরফে আরও বলা হয়েছে, তাপস যে দাবি করেছেন, ইডি হানার পর তাঁর পাশে দলীয় নেতৃত্ব দাঁড়াননি, তাঁর সঙ্গে কোনও কথাও বলেননি, সে দাবি অসত্য। তৃণমূলের বক্তব্য, ইডি তাপসের ফোন বাজেয়াপ্ত করে নিয়ে গিয়েছিল। দু’দিন পর তাঁর নম্বর সক্রিয় হয়। সেই সময়েই দলীয় নেতৃত্ব তাঁর সঙ্গে একাধিক বার কথা বলেছিলেন। শাসকদলের আরও বক্তব্য, তাপস দলের মুখপাত্র ছিলেন। কিন্তু সোমবার তিনি যা যা দাবি করেছেন, তা ‘হাস্যকর’।
সকালেই তাপসের বৌবাজারের বাড়িতে গিয়েছিলেন রাজ্যের মন্ত্রী ব্রাত্য বসু এবং তৃণমূলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক কুণাল ঘোষ। তাঁরা বেরিয়ে যাওয়ার পরেই সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন তাপস। জানান, তিনি দলে অবহেলিত, উপেক্ষিত এবং অসম্মানিত। অর্থাৎ, ব্রাত্য, কুণালের ‘দৌত্য’ যে কাজে লাগেনি, তাঁরা যে তাপস-বরফ গলাতে পারেননি, তা স্পষ্ট। এদিন বিধানসভায় ইস্তফাপর্ব মেটানোর পর তাপস অবশ্য অভিযোগ করেছেন, তাঁর বাড়িতে ইডির হানার পর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বা দলের কেউ তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। কথা বলেননি। তিনি বিধানসভা অধিবেশনে যোগ দিয়েছিলেন। তা-ও তাঁর সঙ্গে কথা বলা হয়নি। পাশাপাশি, নানাবিধ দুর্নীতির অভিযোগ, সন্দেশখালির ঘটনা নিয়েও তিনি ‘যারপরনাই অস্বস্তি’তে ছিলেন বলে দাবি করেছেন তাপস।
এখনও সরকারি ভাবে কোনও ঘোষণা করা না হলেও, কান পাতলে শোনা যাচ্ছে এর পরে তাপসের গন্তব্য বিজেপি। এমনকী আসন্ন লোকসভা ভোটে উত্তর কলকাতা থেকে প্রার্থীও হতে চলেছেন তিনি। শোনা যাচ্ছে, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিপরীতে লড়তে চলেছেন তিনি। উত্তর কলকাতার তৃণমূল নেতৃত্ব কয়েকদিন ধরেই আলোচনার কেন্দ্রে। নেতাদের মধ্যে বিরোধ সামান্য হলেও প্রকাশ্যে এসেছে। সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়েছিলেন তাপস রায়। শনিবারই তিনি অভিযোগ করেন, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ই নাকি তাঁর বাড়িতে ইডি আধিকারিকদের পাঠিয়েছিলেন। যাতে আসন্ন লোকসভা ভোটে উত্তর কলকাতার প্রার্থী না হতে পারেন তাপসবাবু, সেই কারণেই সুদীপের এই ‘ষড়যন্ত্র’ বলে অভিযোগ। সুদীপ নিয়ে ক্ষোভ জানিয়ে ইতিমধ্যেই দলের সমস্ত পদ ছেড়েছেন কুণাল ঘোষ। এবার আরও এক ধাপ এগিয়ে দলই ছাড়লেন তাপস রায়ের মতো তৃণমূলের বিশ্বস্ত নেতা। ২০২৪ লোকসভা ভোটের আগে আর ঠিক কোন কোন রদবদলের মুখোমুখি হতে হবে তৃণমূলকে, সেটাই এখন দেখার।






