দেবস্মিতা পাল হত্যা রহস্য: সম্পত্তির লোভে কীভাবে সাজানো হয়েছিল নিখুঁত খুনের ছক?
Debosmita Pal Delhi Professor: বুধবার বিকেল আনুমানিক ৩টে ২০ মিনিট নাগাদ একটি দূরপাল্লার প্রাইভেট ক্যাবে করে পূর্ব দিল্লির বসুন্ধরা এনক্লেভের ‘সত্যম অ্যাপার্টমেন্টস’-এ পৌঁছয় রামপ্রসাদ ও বনশ্রী। সঙ্গে ছিল তাদের নাবালক ছেলে। লিফটে উঠলে সিসিটিভি ক্যামেরায় স্পষ্ট ভাবে মুখ দেখা যেতে পারে, এই আশঙ্কায় তারা মুখে মাস্ক পরে সিঁড়ি ব্যবহার করে সোজা উঠে যায় দেবস্মিতার ষষ্ঠ তলার ফ্ল্যাটে।
একটি সাজানো-গোছানো অধ্যাপকজীবন, কোটি টাকার পারিবারিক সম্পত্তি এবং এক চরম লোভের নৃশংস পরিণতি— এই সব নিয়েই গত কয়েক দিনে তোলপাড় দেশ। দিল্লির নামী কলেজ ‘শিবাজী কলেজ’-এর ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপিকা ড. দেবস্মিতা পালের (৪২-৪৯) নৃশংস হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নেমে যে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিল্লি পুলিশের হাতে এসেছে, তা এক কথায় শিউরে ওঠার মতো। ঘটনার মাত্র তিন দিনের মাথায়, পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের সহযোগিতায় পূর্ব বর্ধমানের বাদামতলা এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে মূল অভিযুক্ত দম্পতিকে। ধৃতদের নাম রামপ্রসাদ দাস ও বনশ্রী দাস। সন্দেহ এড়াতে নিজেদের নাবালক সন্তানকেও সঙ্গে নিয়েছিল তারা।
১৪০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে, ঠান্ডা মাথায় ছক কষে এই খুন করা হয়।
পুলিশের প্রাথমিক অনুমান এবং সিসিটিভি (CCTV) ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ৪ জুন (বুধবার) দুপুরের খুনের ঘটনার বিবরণ পাওয়া গিয়েছে। বুধবার বিকেল আনুমানিক ৩টে ২০ মিনিট নাগাদ একটি দূরপাল্লার প্রাইভেট ক্যাবে করে পূর্ব দিল্লির বসুন্ধরা এনক্লেভের ‘সত্যম অ্যাপার্টমেন্টস’-এ পৌঁছয় রামপ্রসাদ ও বনশ্রী। সঙ্গে ছিল তাদের নাবালক ছেলে। লিফটে উঠলে সিসিটিভি ক্যামেরায় স্পষ্ট ভাবে মুখ দেখা যেতে পারে, এই আশঙ্কায় তারা মুখে মাস্ক পরে সিঁড়ি ব্যবহার করে সোজা উঠে যায় দেবস্মিতার ষষ্ঠ তলার ফ্ল্যাটে।
২০১৭ সালে বিয়ে হলেও, ২০২২ সাল থেকে স্বামীর থেকে আলাদা হয়ে এই ফ্ল্যাটে একাই থাকতেন দেবস্মিতা। তাঁর স্বামী থাকেন বেঙ্গালুরুতে। বর্ধমানের সম্পত্তি সূত্রে অভিযুক্ত দম্পতি দেবস্মিতার পূর্বপরিচিত ছিল। ফলে, তারা যখন ‘ভাড়া দেওয়া’ বা ‘দেখা করার’ অজুহাতে কড়া নাড়ে, দেবস্মিতা কোনো সন্দেহ না করেই দরজা খুলে দেন।
ফ্ল্যাটের ভিতরে ঢোকার পর সুযোগ বুঝে সঙ্গে আনা ভারী কোনো অস্ত্র দিয়ে দেবস্মিতার মাথায় সজোরে আঘাত করা হয়। রক্তক্ষরণ নিশ্চিত করতে এবং ঘটনাটিকে আত্মহত্যার রূপ দেওয়ার বিভ্রান্তি তৈরি করতে তাঁর কবজির শিরাও কেটে দেওয়া হয়।
খুনের পর রক্তমাখা পোশাক বদলে ফেলে দম্পতি। মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে কাজ শেষ করে ফ্ল্যাটের দরজা বাইরে থেকে তালাবন্ধ করে তারা নিচে নেমে আসে। নিচে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিল তাদের ভাড়া করা সেই ক্যাবটি। তড়িঘড়ি সেই গাড়িতে চড়েই তারা দিল্লির সীমানা পেরিয়ে বর্ধমানের উদ্দেশে রওনা দেয়।
বুধবার দুপুর ১টা নাগাদ দেবস্মিতা তাঁর মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছিলেন। বিকেল ৬টা নাগাদ যখন তাঁর গৃহকর্মী এসে দরজায় ধাক্কাধাক্কি করেন, তখন ভিতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ মেলেনি।
পরদিন অর্থাৎ বৃহস্পতিবার (৫ জুন) দুপুর পর্যন্ত দেবস্মিতাকে ফোনে না পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন তাঁর দিদি দেবারতি পাল। তিনি তড়িঘড়ি সত্যম অ্যাপার্টমেন্টসের ফ্ল্যাটে গিয়ে দেখেন দরজা বাইরে থেকে তালাবন্ধ। প্রতিবেশীদের উপস্থিতিতে তালা ভেঙে ভিতরে ঢুকতেই মেঝেতে দেবস্মিতার রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত দেহ পড়ে থাকতে দেখেন তিনি। বেলা ২টো ৩৫ মিনিট নাগাদ পুলিশে খবর দেওয়া হয়। ক্রাইম ব্রাঞ্চ এবং ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা এসে পরীক্ষা করে দেখেন, ঘরে কোনো জোরপূর্বক প্রবেশের চিহ্ন নেই। আলমারি বা ঘরের জিনিসপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করা হয়নি, সোনাদানা বা নগদ টাকাও অক্ষত ছিল। এর থেকেই পুলিশ নিশ্চিত হয় যে, এটি কোনো ডাকাতির ঘটনা নয়, বরং অতি পরিচিত কারও গভীর ব্যক্তিগত আক্রোশ বা পূর্বপরিকল্পিত খুনের মামলা।
তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পারে, দেবস্মিতা পালের দাদুর মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার সূত্রে বর্ধমানে একটি পৈতৃক বাড়ি ও জমি পান দেবস্মিতা ও তাঁর ভাইবোনেরা। বর্তমান বাজারে সেই সম্পত্তির মূল্য কয়েক কোটি। ধৃত রামপ্রসাদ দাস ও বনশ্রী দাস দীর্ঘদিন ধরে ওই বাড়িরই একটি অংশে ভাড়াটে হিসেবে বসবাস করছিল।
ভাড়াটে হলেও, কালক্রমে ওই কোটি টাকার সম্পত্তি সম্পূর্ণ হাতিয়ে নেওয়ার ছক কষতে শুরু করে এই দম্পতি। দেবস্মিতা ও তাঁর পরিবার যখন ওই সম্পত্তি বিক্রি করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং এই দম্পতিকে বাড়ি খালি করার জন্য লাগাতার চাপ দিতে থাকেন, তখনই বাধে মূল বিবাদ। দেবস্মিতা কিছুতেই তাদের আবদার মানছিলেন না। শেষমেশ নিজেদের পথের কাঁটা সরাতে এবং সম্পত্তি দখলের রাস্তা পরিষ্কার করতে দেবস্মিতাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার এই মাস্টারপ্ল্যান সাজায় তারা।
দিল্লি পুলিশ এই খুনের রহস্য উদঘাটনে কোনো খামতি রাখেনি। ডিসিপি পদমর্যাদার অফিসারদের তত্ত্বাবধানে দ্রুত ৭টি বিশেষ টিম গঠন করা হয়। দিল্লি, পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরপ্রদেশ ও হরিয়ানা— এই চার রাজ্যে একযোগে চিরুনি তল্লাশি শুরু হয়।
ঘটনার দিন আবাসনে যাতায়াত করা প্রায় ২০০ জনের সিসিটিভি ফুটেজ ও মুভমেন্ট রেকর্ড খতিয়ে দেখে ১৩ জন সন্দেহভাজনের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করে পুলিশ।
দম্পতি ৫ বছরের নাবালক সন্তানকে সঙ্গে করে যান পুলিশের সন্দেহ এড়াতে। কিন্তু বদল হওয়া পোশাক দেখেই পুলিশের সন্দেহ গিয়ে পড়ে তাদের উপর।
তদন্তে সবচেয়ে বড় মোড় আসে সেই প্রাইভেট ক্যাবটির সন্ধান মেলার পর। পুলিশ জিপিএস (GPS) ট্র্যাকিং ও বুকিং হিস্ট্রি খতিয়ে দেখে দ্রুত ক্যাব ড্রাইভারকে চিহ্নিত করে এবং তাকে হেফাজতে নেয়। জিজ্ঞাসাবাদে চালক জানান, তিনি অপরাধের বিষয়ে কিছুই জানতেন না। বর্ধমান থেকে এই দম্পতি মোটা ভাড়ায় তাঁর গাড়ি বুক করে দিল্লি নিয়ে এসেছিল। তিনি নিচে অপেক্ষা করছিলেন এবং তারা কাজ সেরে নামতেই আবার তাদের নিয়ে বর্ধমানের দিকে রওনা দেন।
ড্রাইভারের দেওয়া নিখুঁত তথ্য ও লোকেশনের উপর ভিত্তি করে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের সহায়তায় ৭ জুন (রবিবার) বর্ধমানের বাদামতলা এলাকায় হানা দেয় দিল্লি পুলিশের টিম। সেখান থেকেই রামপ্রসাদ ও বনশ্রীকে হাতেনাতে গ্রেফতার করা হয়।
পুলিশ ইতিমধ্যে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-র ১০৩(১) ধারা অনুযায়ী খুনের মামলা রুজু করেছে। ধৃত দম্পতিকে ট্রানজিট রিমান্ডের (Transit Remand) আবেদনে বর্ধমান আদালতে পেশ করার প্রক্রিয়া চলছে, যাতে তাদের দিল্লিতে নিয়ে এসে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ করা যায়। খুনে ব্যবহৃত মূল অস্ত্রটি কোথায় লুকোনো হয়েছে এবং এই ষড়যন্ত্রে পর্দার আড়াল থেকে অন্য কেউ সাহায্য করেছে কিনা, তা জানার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা।
মাত্র তিন দিনের মধ্যে প্রায় ১৪০০ কিলোমিটার দূরের এই রোমাঞ্চকর ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের জট খুলে দিল্লি পুলিশ অপরাধীদের খাঁচায় পুরলেও, এই ঘটনা আরও একবার প্রমাণ করে দিল— সম্পত্তির অন্ধ লোভ মানুষকে কতটা পৈশাচিক করে তুলতে পারে।









