এআইয়ের বাড়বাড়ন্তে বিপদে চিনের কমিউনিস্ট পার্টি?
AI Threat to China’s Communist Party: এআই শুধু প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ বদলাবে, নাকি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও রাজনীতিতেও তৈরি করবে নতুন সংকট? কেন চিনের শীর্ষ গোয়েন্দা কর্তা এআইকে কমিউনিস্ট পার্টির ক্ষমতার জন্য সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে দেখছেন? বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার হাতে এআই গেলে কী ধরনের বিপদ তৈরি হতে পারে? আর কেন শি জিনপিং এআইকে মানুষের নিয়ন্ত্রণে রাখার কথা বলছেন?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে গোটা বিশ্বেই এখন উদ্বেগ বাড়ছে। কিন্তু সেই উদ্বেগের চরিত্র সব দেশে এক রকম নয়। আমেরিকায় আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে এআই মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে কি না, কিংবা ভবিষ্যতে মানবজাতির জন্য বড় বিপদ তৈরি করতে পারে কি না। অন্যদিকে চিনের উদ্বেগের কেন্দ্রে উঠে এসেছে—এআই কি দেশের রাজনৈতিক ও আদর্শগত নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে? এমনকি তা কি চিনা কমিউনিস্ট পার্টির ক্ষমতার ভিতকেও নাড়িয়ে দিতে পারে?
চিন আমেরিকার প্রযুক্তি সংস্থা অ্যানথ্রপিকের প্রধান ডারিও অ্যামোডেইয়ের চিনের এআই উন্নয়ন রুখে দেওয়ার আহ্বানকে ‘ভয় দেখানোর রাজনীতি’ বলে খারিজ করেছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এর কিছুদিন আগেই চিনের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা আধিকারিক এআই নিয়ে নিজেই অত্যন্ত গুরুতর সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
অ্যানথ্রপিকের প্রধান ডারিও অ্যামোডেই সম্প্রতি একটি দীর্ঘ প্রবন্ধে এআই উন্নয়নের গতি নিয়ন্ত্রণের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, অত্যন্ত শক্তিশালী এআই দ্রুত তৈরি হতে থাকলে তা ভবিষ্যতে বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, চিন এআই-তে আমেরিকাকে ছাড়িয়ে গেলে তা শুধু আমেরিকার জন্য নয়, গণতান্ত্রিক দেশগুলির জন্যও গুরুতর বিপদ তৈরি করতে পারে।
এই কারণে আমেরিকার উচিত চিনের উন্নত এআই প্রযুক্তিতে প্রবেশের সুযোগ সীমিত রাখা এবং শক্তিশালী এআই চিপ ও প্রযুক্তি চিনে পৌঁছনোর পথে বাধা তৈরি করা—এমনই মত অ্যামোডেইয়ের। তাঁর যুক্তি, গণতান্ত্রিক দেশগুলির হাতে এআই প্রযুক্তিতে দীর্ঘমেয়াদি এগিয়ে থাকা প্রয়োজন। তাঁর এই বক্তব্যকে সমর্থন করেছেন ওপেনএআইয়ের প্রধান স্যাম অল্টম্যান, গুগল ডিপমাইন্ডের ডেমিস হাসাবিস এবং ইলন মাস্কের মতো প্রযুক্তি জগতের একাধিক পরিচিত ব্যক্তি। তবে তাঁরা সবাই চিনকে ঘিরে অ্যামোডেইয়ের নির্দিষ্ট প্রস্তাবগুলিকে সমর্থন করেছেন এমন নয়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
AI in Gaza War: ইজরায়েলি বাহিনীকে 'টার্গেট' নির্ধারণ করতে গাজা জুড়ে অজস্র ফিলিস্তিনিদের মুখ স্ক্যান করতে গুগল ফটো ফেসিয়াল রিকগনিশন পরিষেবা ব্যবহার করার অনুমতি দিয়েছে গুগল।
চিন অবশ্য এই যুক্তি মেনে নেয়নি। চিনের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বলেছেন, এ ধরনের ‘ভয় দেখানো’, সংঘাত এবং ক্ষতিকর প্রতিযোগিতা এআই নিয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পরিবেশকে আরও খারাপ করবে। চিনের বক্তব্য, এআই নিয়ে দেশগুলির মধ্যে সহযোগিতা প্রয়োজন, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে নতুন সংঘাত তৈরি করা নয়। চিনের সরকারি সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমসও অ্যামোডেইয়ের প্রস্তাবকে চিনকে নিয়ন্ত্রণ করার আমেরিকান প্রচেষ্টা হিসেবে দেখেছে। তাদের ভাষায়, এআই ক্ষেত্রেও যেন নতুন ধরনের ঠান্ডা যুদ্ধ তৈরি করার চেষ্টা চলছে।
আবার আন্তর্জাতিক মঞ্চে বেজিং যখন এআই নিয়ে ‘ভয় দেখানোর রাজনীতি’র সমালোচনা করছে, তখন চিনের নিজস্ব নিরাপত্তা সংস্থাই এআইয়ের রাজনৈতিক বিপদ নিয়ে সতর্ক করছে।
চিনের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা মন্ত্রকের প্রধান চেন ইশিন একটি সরকারি পত্রিকায় লিখেছেন, ‘শত্রুতাপূর্ণ শক্তি’ এবং বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী এআই ব্যবহার করে চিনের বিরুদ্ধে প্রচার ও ‘কগনিটিভ ওয়ার’ বা মানুষের চিন্তাভাবনা ও মতামতকে প্রভাবিত করার যুদ্ধ চালাতে পারে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এর ফলে চিনের রাজনৈতিক নিরাপত্তা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং আদর্শগত নিরাপত্তা সরাসরি হুমকির মুখে পড়তে পারে।
এখানে ‘কগনিটিভ ওয়ার’ কথাটির গুরুত্ব রয়েছে। এআই এখন কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে মানুষের মুখ ও কণ্ঠস্বর নকল করে ভিডিও তৈরি করতে পারে। এমন কোনো ভিডিও তৈরি করা সম্ভব, যেখানে কোনো রাজনৈতিক নেতা এমন কথা বলছেন যা তিনি আদৌ বলেননি। একইভাবে ভুয়ো ছবি, ভুয়ো অডিয়ো, স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি প্রচারমূলক লেখা কিংবা বিপুল সংখ্যক ভুয়ো সামাজিক মাধ্যমের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ানো সম্ভব।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Microsoft Israel Technology Deal: ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত ইজরায়েল প্রতিরক্ষা মন্ত্রক মাইক্রোসফটের কাছ থেকে প্রায় ১ কোটি ডলারের প্রযুক্তিগত সহায়তা ও পরামর্শ পরিষেবা নিয়েছে।
চিনের নিরাপত্তা আধিকারিকের আশঙ্কা, এই ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করার চেষ্টা হতে পারে। অর্থাৎ চিনের কাছে এআইয়ের বিপদ শুধু সাইবার আক্রমণ বা সামরিক প্রযুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের বিশ্বাস, তথ্য পাওয়ার পদ্ধতি এবং রাজনৈতিক ধারণাকেও এআই প্রভাবিত করতে পারে—এই আশঙ্কাই এখন চিনের নিরাপত্তা আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে।
চেন ইশিন বিশেষভাবে আমেরিকার কয়েকটি এআই মডেলের কথাও উল্লেখ করেছেন। তাঁর দাবি, এই ধরনের প্রযুক্তি সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলি এআই ব্যবহার করে চিনের গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো, সংবেদনশীল তথ্য এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আক্রমণ চালাতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেছেন।
তবে চেন ইশিন এআই উন্নয়নের গতি নিয়ন্ত্রণের কথা বলেননি। বরং তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয়, এআইয়ের উপর আরও বেশি রাজনৈতিক ও সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। অর্থাৎ চিনের কাছে সমস্যা এআই প্রযুক্তির উন্নয়ন নিজে নয়; সমস্যা, এই প্রযুক্তি কার হাতে থাকবে, কীভাবে ব্যবহার হবে এবং তার উপর রাষ্ট্রের কতটা নিয়ন্ত্রণ থাকবে।
চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংও এর আগে এআই নিয়ে সতর্ক করে বলেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে সবসময় মানুষের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকতে হবে। ফলে বেজিং একদিকে এআইকে ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও সামরিক শক্তির গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে দেখছে, অন্যদিকে তার সম্ভাব্য রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকিও অস্বীকার করছে না।
এখানেই আমেরিকা ও চিনের এআই বিতর্কের একটি বড় পার্থক্য স্পষ্ট হয়। আমেরিকায় আলোচনার একটি বড় অংশ হচ্ছে এআই ভবিষ্যতে মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে কি না এবং তা মানবজাতির জন্য অস্তিত্বের সংকট তৈরি করতে পারে কি না। চিনের সরকারি নিরাপত্তা আলোচনায় অবশ্য এই ধরনের মানবসভ্যতা ধ্বংসের আশঙ্কা এখন প্রধান বিষয় নয়। সেখানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, তথ্য নিয়ন্ত্রণ, সামরিক প্রতিযোগিতা এবং বিদেশি প্রভাবের আশঙ্কাই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠকে এআই নিয়েও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে এআইয়ের নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দু’দেশ কতটা কাছাকাছি আসতে পারে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
চিন একদিকে আমেরিকার ‘এআই আতঙ্ক’ ছড়ানোর অভিযোগ করছে, অন্যদিকে নিজের গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমেই জানাচ্ছে যে এআই রাজনৈতিক ক্ষমতার জন্য নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করছেন, বেজিং এআইকে থামাতে চাইছে না। বরং প্রযুক্তিটির নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রেখে তার সুবিধা নিতে চাইছে এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি থেকে রাষ্ট্র ও শাসনব্যবস্থাকে সুরক্ষিত রাখতে চাইছে।








