হাসপাতালে সোনম ওয়াংচুক, স্ত্রী তুললেন একাধিক প্রশ্ন
পুলিশের এই আকস্মিক হানায় যন্তর মন্তরে উপস্থিত ছাত্রনেতা ও আন্দোলনকারীদের উপরও শারীরিক নিগ্রহ চালানো হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
ভোরের আলো ফোটার আগেই দিল্লির যন্তর মন্তর চত্বর পরিণত হলো এক অভূতপূর্ব রণক্ষেত্রে। 'NEET' প্রশ্নফাঁস কেলেঙ্কারি এবং সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার চরম দুর্নীতির বিরুদ্ধে গত ২০ দিন ধরে আমরণ অনশনে বসেছিলেন লাদাখের প্রখ্যাত সমাজকর্মী, পরিবেশবিদ ও শিক্ষাবিদ সোনাম ওয়াংচুক। কিন্তু শনিবার ভোররাতে দিল্লি পুলিশ কার্যত বলপ্রয়োগ করে এবং একপ্রকার নাটকীয় কায়দায় তাঁকে প্রতিবাদস্থল থেকে তুলে নিয়ে যায়। অত্যন্ত দুর্বল ও অসুস্থ অবস্থায় ওয়াংচুককে দিল্লির সফদারজং হাসপাতালে ভরতি করা হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশের রাজধানীসহ দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের আগুন ছড়িয়ে পড়েছে।
গত ২০ জুন থেকে যন্তর মন্তরে পরীক্ষা দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান বিক্ষোভ শুরু করেছিল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP)। এরপর গত ২৮ জুন থেকে সেখানে এসে জলস্পর্শ না করে আমরণ অনশন শুরু করেন সোনাম ওয়াংচুক। শনিবার ভোর ৪টে নাগাদ আচমকাই এক বিশাল এবং ভারী পুলিশ বাহিনী যন্তর মন্তরে এসে পৌঁছয়। প্রত্যক্ষদর্শী ও আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, পুলিশের এই বিশেষ স্কোয়াডের বহু সদস্যের গায়ে কোনো সরকারি উর্দি বা ব্যাজ ছিল না, তারা এসেছিলেন সাদা পোশাকে।
ঘটনাস্থলে এসেই পুলিশ কোনো কথা না বলে প্রথমে পুরো প্রতিবাদ মঞ্চটি চাদর এবং বড় বড় সাদা কাপড় দিয়ে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে। আন্দোলনকারীদের দাবি, এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত 'লুকোছাপা'র কৌশল, যাতে পুলিশের আসল বর্বরতা বাইরে থেকে কেউ ক্যামেরাবন্দি করতে না পারে কিংবা সাধারণ মানুষের চোখে না পড়ে। এরপর ২০ দিন ধরে অভুক্ত, নিস্তেজ এবং শারীরিকভাবে অত্যন্ত জীর্ণ ওয়াংচুককে চ্যাংদোলা করে টানতে টানতে পুলিশের গাড়িতে তোলা হয়।
“সোনম স্যারকে গুন্ডা বলে গাল দেওয়া হয়েছে”: ক্ষোভে ফুঁসছেন সিজেপি প্রতিষ্ঠাতা
পুলিশের এই আকস্মিক হানায় যন্তর মন্তরে উপস্থিত ছাত্রনেতা ও আন্দোলনকারীদের উপরও শারীরিক নিগ্রহ চালানো হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী তথা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে পুলিশের এই পদক্ষেপকে ‘বর্বর, অগণতান্ত্রিক ও কাপুরুষোচিত’ বলে তীব্র নিন্দা করেছেন। নিজের ক্ষোভ উগরে দিয়ে অভিজিৎ বলেন:
ভোররাতে পুলিশ এসে আমাদের শ্রদ্ধেয় সোনাম স্যারকে ‘গুন্ডা’ বলে অকথ্য ভাষায় গালাগালি দেয় এবং পশুর মতো জোর করে তুলে নিয়ে যায়। বাধা দিতে গেলে আমি নিজেও পুলিশের হাতে মারাত্মকভাবে আক্রান্ত ও লাঞ্ছিত হয়েছি। পুলিশ আসলে আরএসএসের গুন্ডার মতো আচরণ করেছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Sonam Wangchuk: সোনম ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমে রাতারাতি জনপ্রিয় হওয়া 'ককরোচ জনতা পার্টি'র ধরণা মঞ্চে উপস্থিত হন। উল্লেখ্য, তিনি লাদাখের অধিকার ও পরিবেশ রক্ষা নিয়েও দীর্ঘ দিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন। গত ১৪ মার্চ, ২০২৬ তারিখে তাঁকে যোধপুর সেন্ট্রাল জেল থেকে মুক্তি দেওয়া হয়।
তিনি আরও যোগ করেন, “শাসকদল ভাবছে সোনম স্যারকে শারীরিকভাবে সরিয়ে দিলেই বোধহয় এই ঐতিহাসিক আন্দোলন শেষ হয়ে যাবে? তারা মস্ত বড় ভুল করছেন। আমরা একচুলও মাটি ছাড়ছি না।” এই ঘটনার পর আন্দোলনকারীরা শুধু কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানেরই নয়, সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিরও পদত্যাগের দাবি তুলে সরব হয়েছেন।
সোনম ওয়াংচুককে সফদারজং হাসপাতালে ভরতি করার পর সেখানে পৌঁছন তাঁর স্ত্রী গীতাঞ্জলি জে অ্যাংমো। কিন্তু সেখানেও প্রশাসনের তরফ থেকে চূড়ান্ত অসহযোগিতা করা হয় বলে অভিযোগ। হাসপাতাল চত্বরে দাঁড়িয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে গীতাঞ্জলি দেবী এক বিস্ফোরক দাবি করেন। তিনি বলেন, “গতকাল (১৭ জুলাই, ২০২৬) সন্ধ্যা পর্যন্তও কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে জানিয়েছিলেন যে ওঁর সমস্ত ভাইটাল প্যারামিটার স্বাভাবিক রয়েছে। কিন্তু আজ হঠাৎ করে পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দাবি করছে ওঁর শরীরে পটাশিয়ামের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গিয়েছে! অথচ আমাদের কোনো মেডিকেল রিপোর্ট বা প্রেসক্রিপশন দেখানো হচ্ছে না।”
সামাজিক মাধ্যম 'X'-এ (প্রাক্তন টুইটার) এক পোস্টে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের উদ্দেশ্যে অত্যন্ত কড়া ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে সোনাম ওয়াংচুকের স্ত্রী লিখেছেন:
আমার, তাঁর পরিবার এবং গত ২০ দিন ধরে ওঁর স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণকারী ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের লিখিত সম্মতি ছাড়া সোনাম ওয়াংচুককে মুখে বা ইঞ্জেকশনের (IV) মাধ্যমে কোনো ওষুধ বা তরল দেওয়া যাবে না। সোনামকে না জানিয়ে, আমাকে না জানিয়ে যেভাবে তুলে নিয়ে আসা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং জোর খাটানো।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Sonam Wangchuk hunger strike: যতীন দাস, ভগৎ সিং, কাজী নজরুল ইসলাম, মহাত্মা গান্ধী থেকে সোনম ওয়াংচুক—ভারতে অনশনের ইতিহাস এক শতাব্দীরও বেশি পুরোনো। সময়ের সঙ্গে বদলেছে আন্দোলনের দাবি। ভারতীয়দের অনশনের সুদীর্ঘ ইতিহাস মনে করাচ্ছেন সোনম ওয়াংচুক।
অভিযোগ উঠেছে, হাসপাতালে সোনম ওয়াংচুকের ঘরে তাঁর স্ত্রীকে মোবাইল ফোন নিয়ে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না এবং ওঁর ব্যক্তিগত ডাক্তার ও আইনজীবীদেরও ভিতরে যাওয়ার সমস্ত প্রবেশাধিকার কঠোরভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
হাসপাতাল ও দিল্লি পুলিশের সরকারি বয়ান
সফদারজং হাসপাতালের পক্ষ থেকে শনিবার (১৮ জুলাই, ২০২৬) দুপুরে সোনম ওয়াংচুকের বর্তমান স্বাস্থ্য নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত বুলেটিন জারি করা হয়েছে। হাসপাতাল সূত্রের খবর, দীর্ঘ ২০ দিনের অনশন এবং মারাত্মক ডিহাইড্রেশনের (শরীরে জলের ঘাটতি) কারণে ওয়াংচুকের ওজন প্রায় ৭ থেকে ৯ কেজি হ্রাস পেয়েছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তবে তিনি বর্তমানে সম্পূর্ণ সচেতন আছেন এবং তাঁর ভাইটাল প্যারামিটার স্থিতিশীল। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, শরীরের অভ্যন্তরীণ স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা ফিরিয়ে আনার জন্য তাঁকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ (Continuous Observation) এবং চিকিৎসার মধ্যে রাখা জরুরি।
অন্যদিকে সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে দিল্লি পুলিশ নিজেদের জানিয়েছে, এর পিছনে কোনো রাজনৈতিক অভিসন্ধি নেই। দিল্লি হাইকোর্টের পূর্ববর্তী একটি নির্দেশিকা এবং চিকিৎসকদের দেওয়া জরুরি স্বাস্থ্য সতর্কবার্তাকে সম্মান জানিয়েই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ২০ দিন ধরে অভুক্ত থাকার ফলে ওয়াংচুকের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল হওয়ার মতো চিকিৎসাজনিত জরুরি অবস্থা (Medical Emergency) তৈরি হচ্ছিল। পুলিশ স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, কোনো লাঠিচার্জ বা কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি, স্রেফ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যপরিষেবা নিশ্চিত করতেই তাঁকে স্থানান্তরিত করা হয়েছে।
ওয়াংচুককে সরালেও স্তিমিত নয় আন্দোলন
প্রশাসনের এই অতিসক্রিয়তা বা বলপ্রয়োগ আদতে হিতে বিপরীত হয়েছে। সোনাম ওয়াংচুককে যন্তর মন্তর থেকে সরিয়ে দেওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন সেখানে উপস্থিত অন্য ছাত্ররা। ওয়াংচুকের শূন্যস্থান পূরণ করতে যন্তর মন্তরের মাটিতেই নতুন করে আমরণ অনশনে বসে পড়েছেন ছাত্রনেতা অভিজিৎ দিপকে। তাঁদের সঙ্গে অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (AISA) সহ একাধিক বামপন্থী ও প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধিরা অনশন কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছেন।
আন্দোলনকারীদের মূল টার্গেট এখন আগামী ২০ জুলাইয়ের পূর্বঘোষিত 'সংসদ ভবন অভিযান'। তাঁদের দাবি, এই ঐতিহাসিক মার্চকে ভয় পেয়েই ঠিক দু-দিন আগে ওয়াংচুকের কণ্ঠরোধ করার এই মরিয়া চেষ্টা চালাল কেন্দ্র। তবে লড়াই যে থামছে না, তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন ওয়াংচুকের স্ত্রী গীতাঞ্জলি জে অ্যাংমো। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন,
সোনম যদি হাসপাতালে বন্দিও থাকেন, তবুও আমি নিজে তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে এই পদযাত্রার সামনে দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব দেব। ২০ জুলাইয়ের সংসদ ভবন অভিযান যথাসময়ে এবং দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে সফল হবেই।
দেশজুড়ে লাখ লাখ মেধাবী শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ এবং দেশের ভঙ্গুর শিক্ষা ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করার এই লড়াই এখন আর শুধু যন্তর মন্তরে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা দেশব্যাপী এক গণআন্দোলনের রূপ নিতে চলেছে।








