জন্মদিনে ফিরে দেখা || যে সৌরভ সুরভিত করেছিল ভারতীয় ক্রিকেটকে

তাঁর গুরুত্ব বোঝানোর জন্য প্রয়োজন হয় না আইসিসি ট্রফির তালিকার কিংবা পুরনো রেকর্ডের পাতার। পরিসংখ্যানের পাতা বারবার আপামর ভারতবাসীর মনে উকি দিতে চায় কপিল দেবের ভারত কিংবা হালের মহেন্দ্র সিংহ ধোনি কিংবা বিরাটের ভারত হয়ে। সৌরভ আর কী করেছেন ভারতের জন্য? আর তখনই ক্রিকেট জার্নালিজমের গুরু নেভিল কার্ডাসের একটা উক্তি ভীষণভাবে নাড়া দিয়ে ওঠে - ' The Scoreboard is an Ass' (পরিসংখ্যান তো আস্ত একটা গাধা)

Sourish Das
৯ মিনিট
জন্মদিনে ফিরে দেখা || যে সৌরভ সুরভিত করেছিল ভারতীয় ক্রিকেটকে

একসময় তিনি মাঠ ময়দানে পরিচিত ছিলেন প্রত্যাবর্তনের রাজা নামে। ৫০ বছর বয়স হয়ে গেল, এখনও একটুও নিজেকে বদলালেন না তিনি। ক্রিকেট মাঠকে বেশ কয়েক বছর আগেই বিদায় জানালেও, এখনো পর্যন্ত তিনিই ভারতের 'কিং অফ কামব্যাক'। ২০১৯ সালে যখন সকলকে চমকে দিয়ে তিনি হয়ে উঠলেন BCCI চেয়ারপারসন, সেই সময় অনেকে বলেছিলেন, একেবারে বেন স্টোকসের মত খেললেন। অনেকে আবার বললেন, শেষ বলে ছক্কা হাঁকালেন তিনি। কিন্তু আপামর বাঙালির মননে তখন একটাই কথা, দাদা কামব্যাক করলেন দাদার মতই।

পাকিস্তান হোক বা অস্ট্রেলিয়া, 'আই এম ফ্রম দা ল্যান্ড অফ সৌরভ গাঙ্গুলী' বললেই যে কোনো অপরিচিত বাঙালিও হয়ে ওঠেন মুহূর্তের মধ্যেই পরিচিত। বেহালার বীরেন রয় রোডের ওই বাড়িটাই যেন বাঙালির পরিচয়ের একটা পাসপোর্ট। সৌরভ গাঙ্গুলি ভারতের ক্রিকেটের ঠিক কোন জায়গায় আছেন? সচিন ভারতের ঈশ্বর, দ্রাবিড় ভারতীয় ক্রিকেটের কর্ণ। বডিলাইনের আক্রমণ হোক কিংবা ক্রিকেটের রাজনীতিতে গড়াপেটা চক্র, এসব কিছুর থেকে সব সময় প্রায় দূরেই ছিলেন তাঁরা। কিন্তু, কলকাতা থেকে উঠে আসা এই বদমেজাজি ছেলেটা এসে পড়েছিলেন এই আঁচের মধ্যে। ২০০০ সালের দিকে যখন ভারতীয় ক্রিকেটের একেবারে হতদরিদ্র অবস্থা, সেই সময়েই ভারতের হল ধরলেন সৌরভ।

তাঁর না ছিল দাদা স্নেহাশিসের মতো ক্লাসিক ব্যাটিং স্টাইল, আর না ছিল সচিন হবার সাধ্য, না ছিল দ্রাবিড়ের সেই স্কিল। সেই সময়ে ভারতের প্রয়োজন ছিল একজন সৌরভ গাঙ্গুলীকেই। সেই সময় লাক্সারি, গ্ল্যামার, ফ্যানবেস কোনো কিছু প্রয়োজন হতো না। ভারতীয় ক্রিকেটে সেই সময়ে 'বাইশে শ্রাবণ'-এর ডাল ভাতের মতই একটা নেসেসিটি হয়ে উঠেছিলেন সৌরভ। পাহাড়ের নদী যেমন পলিমাটি বুকে নিয়ে এসে তৈরি করে সমতল, সৌরভও সেদিন যথার্থ দাদার মতোই নিজের দু'হাতে তৈরি করেছিলেন ভারতীয় ক্রিকেটের রূপরেখা। ভারতীয় ক্রিকেটের শুকনো জমিতে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন প্রাণের বীজ। জীবনের ২২ গজে অর্ধশতক পূর্ণ হলেও ভারতীয় ক্রিকেটের জন্য এখনো তিনি একজন দাদার মতোই। তাঁর গুরুত্ব বোঝানোর জন্য প্রয়োজন হয় না আইসিসি ট্রফির তালিকার কিংবা পুরনো রেকর্ডের পাতার। পরিসংখ্যানের পাতা বারবার আপামর ভারতবাসীর মনে উকি দিতে চায় কপিল দেবের ভারত কিংবা হালের মহেন্দ্র সিংহ ধোনি কিংবা বিরাটের ভারত হয়ে। সৌরভ আর কী করেছেন ভারতের জন্য? আর তখনই ক্রিকেট জার্নালিজমের গুরু নেভিল কার্ডাসের একটা উক্তি ভীষণভাবে নাড়া দিয়ে ওঠে - ' The Scoreboard is an Ass' (পরিসংখ্যান তো আস্ত একটা গাধা)

সৌরভের জীবনে গিয়েছে একাধিক উত্থানপতন। ভারতীয় দলে চান্স পাওয়া থেকে শুরু করে অধিনায়ক হওয়া, ১৬ বছরের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ক্যারিয়ারে অসংখ্যবার দল থেকে ছিটকে গেছেন, আবার ফিরেও এসেছেন রাজকীয় কায়দায়। যখন তিনি প্রথমবার ভারতীয় দলে চান্স পেলেন, সেই সময় ক্যাপ্টেন তাকে করতে চেয়েছিলেন ওয়াটার বয়। একটা ম্যাচেই পেলেন চান্স, কিন্তু ৩ রানেই আউট। ব্যাস বাদ! চার বছর পরে আবার তিনি যখন লর্ডসে নামছেন, আশপাশ থেকে কথা উঠছে, ও নাকি সম্বরনের কোটা! সেই লর্ডস টেস্টেই জন্ম হলো প্রিন্স অফ ক্যালকাটার।

একের পরে কভার ড্রাইভ যখন বাউন্ডারি ক্রস করে গ্যালারিতে আছরে পড়তে শুরু করল, তখন বড় বড় ক্রিকেট ক্রিটিকরাও চুপ। শতরানের এই ইনিংসটা ছিল বাঙালির বিশ্বজয়ের স্রেফ সূত্রপাত। তারপর এলো সেই অভিশপ্ত ১৯৯৯। ভারতীয় ক্রিকেট প্রায় ভেঙে পড়েছে। অধিনায়কত্ব ছেড়ে দিয়েছেন সচিন তেন্ডুলকর। ফিক্সিং কাণ্ডে চূর্ণবিচূর্ণ আজহারের ক্যারিয়ার। আবারও চ্যালেঞ্জ এল সৌরভের সামনে। গ্রহণ করলেন সদর্পে। তারপরে ৪৯টি টেস্টের মধ্যে ২১ টায় জয় লাভ যার মধ্যে ১৩ টা টেস্ট দেশের বাইরে। পাকিস্তানকে পাকিস্তানে গিয়ে হারানো থেকে শুরু করে অস্ট্রেলিয়ার পিক টাইমে অধিনায়ক স্টিভ ওয়র চোখে চোখ রেখে ফলো ওয়ান টেস্ট ছিনিয়ে নেওয়া। অ্যান্ড্রু ফ্লিনটফের খালি গায়ে জামা উড়িয়ে সেলিব্রেশনের যোগ্য জবাব দিতে ন্যাটওয়েস্ট ফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারিয়েই লর্ডসের ব্যালকনিতে জামা ওড়ানো, সৌরভ গাঙ্গুলি মানেই অ্যাগ্রেশনের ওপর নাম।

তারপরে এল চ্যাপেল যুগ। বিদেশে সিরিজ জিতেও হাত থেকে ছিটকে গেল অধিনায়কত্ব। বাদ পড়তে হলো ভারতীয় দল থেকেও। আবার দেওয়া হলো চ্যালেঞ্জ। রঞ্জি খেলে দারুণ পারফরম্যান্স করে আবারও কামব্যাক সৌরভের। এরকম পরিস্থিতি হতে থাকলে অনেকেই সরে দাঁড়ায়, কিন্তু সৌরভের কেমিস্ট্রিটা যেন একেবারে অন্যরকম। ফিরে এসেই প্রত্যাবর্তন ইনিংসে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে অপরাজিত অর্ধশতরান। এরপর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ডবল সেঞ্চুরি, ভারত জিতল দুই ম্যাচেই। কিন্তু আবারো বাদ পড়তে হলো খারাপ পারফরমেন্সের অছিলায়। তবে এবারে আর ব্যাপারটা ভালো লাগলো না। অস্ট্রেলিয়া সিরিজ খেলেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ক্যারিয়ারে ইতি টানতে চাইলেন মহারাজ। নাগপুরের শেষ টেস্টেও উজ্জ্বল ৮৫। প্রশ্ন উঠলো, সত্যিই কি ফর্মে ছিলেন না দাদা? কিন্তু ততদিনে সব শেষ!

১৯৯৬ সালে যখন সৌরভ ভারতীয় দলে প্রবেশ করেছিলেন সেই সময়ে মুম্বাই এবং দক্ষিণ লবির সাংবাদিকরা যেন গেলো গেলো রব তুলেছিলেন, ভি ভি এস লাক্সমানের মতো প্রতিভাবান খেলোয়াড় থাকতে কেন সৌরভকে চান্স দেওয়া হচ্ছে? আর যদি বাঁহাতি ব্যাটসম্যান নিতে হতো তাহলে ডব্লিউ ভি রমনকে আবার নেওয়া যেত। কিন্তু সেই সময় ভারতীয় বোর্ডের কর্মকর্তাঁরা বলেছিলেন, বহুদিন তো বেঙ্গল থেকে কোন প্লেয়ার নেওয়া হয় না, তাই একজনকে নেওয়া হয়েছে, আর নেওয়া হয়েছে মানে খেলাতে হবে নাকি?

মহম্মদ আজহারউদ্দিন পর্যন্ত নির্বাচনী সভায় সৌরভের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে রীতিমতো তুলকালাম করে দিয়েছিলেন। কিন্তু সৌরভ গাঙ্গুলীর জন্য প্লাস পয়েন্টের কাজ করেছিলেন সম্বরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর ওপর মেরুদণ্ড শক্ত করে দাঁড়িয়ে থাকা, ১৯৯৬ বিশ্বকাপে ভারতীয় দলের হতাশা জনক পারফরম্যান্স, ইডেনের বিতর্ক, মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন এবং সঙ্গীতা বিজলানি নিয়ে কেচ্ছা কাহিনি, সবকিছুই অনুঘটকের কাজ করেছিল সৌরভের জন্য। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে দলে চান্স পাওয়ার পর সৌরভকে 'কলকাতাঁর রসগুল্লা' বলে বিদ্রুপ করেছিলেন খোদ সুনীল গাভাস্কার। রবি শাস্ত্রী সরাসরি বলেছিলেন, 'ও তো সম্বরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোটা।' তবে তাঁরা হয়তো সকলেই ওয়াসাল ছিলেন সৌরভের ক্ষমতাঁর ব্যাপারে। তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন, সৌরভ যদি টিমে আসেন তাহলে ভারতীয় দলের ভরকেন্দ্রটা অনেকটাই পূর্বদিকে ঘুরে যেতে পারে।

অভিযোগ উঠেছিল, ১৯৯৬ এর ইংল্যান্ড সফরের সময় সৌরভের ক্যারিয়ার শেষ করার সম্পূর্ণ ব্লু প্রিন্ট ফ্লাইটে বসেই বানিয়ে ফেলেছিলেন মহম্মদ আজহারউদ্দিন এবং সন্দীপ পাতিল। হোটেলে চেকিং করার পর আজহারউদ্দিন সৌরভকে বলেছিলেন, 'ভালো করে ইংল্যান্ড ঘোরো, বাজার করো, সবার সাথে দেখা সাক্ষাৎ করো।' অর্থাৎ ক্রিকেট খেলার বা দলে জায়গা পাওয়ার কথা ভুলেও ভেবো না। অন্যদিকে প্লেয়ার ফিডব্যাক রিপোর্টে সৌরভ সম্পর্কে ভয়ংকর অভিযোগ জানিয়েছিলেন পাতিল। ১৯৯২ সালে সৌরভ যখন ভারতীয় দলে প্রথম নির্বাচিত হয়েছিলেন তখন তাঁর নামে কৃষ্ণমাচারি শ্রীকান্ত এবং রবি শাস্ত্রী সহ একাধিক খেলোয়াড় অভিযোগ করেছিলেন। সৌরভ নাকি উদ্ধত, সিনিয়র ক্রিকেটার হিসেবে কাউকে সম্মান করেন না। সৌরভ পরে সবকিছুকে মিথ্যা বলে অভিযোগ করলেও সেটাকেই কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছিলেন সন্দীপ। রিপোর্ট করেছিলেন, "সৌরভ টিম ম্যান নয়, ম্যাচের আগে কারো সাথে কথা বলে না একা একা ঘুরতে থাকে।" তবে শোনা যায়, বিনোদ কামলীর রাস্তা পরিষ্কার রাখার জন্য নাকি এই সমস্ত করেছিলেন সন্দীপ পাতিল। তবে, সৌরভকে কোনভাবেই খেলায় চান্স দেওয়া হতো না যদি না সুনীল যোশীর আঙুল ভেঙে যেত। অগত্যা কোনরকম উপায় না দেখে সৌরভকে খেলাতে বাধ্য হয়েছিল ভারতীয় টিম ম্যানেজমেন্ট। লন্ডনের বৃষ্টি ভেজা পিচে ডমিনিক কর্ক এবং এলান মুলালির ভয়ংকর ইনসুইং এবং আউটসুইং এর ঠেলায় যখন ভারতীয় দলের কোন ব্যাটসম্যান ব্যাটে বল পর্যন্ত লাগাতে পারছেন না, সেই জায়গায় তিন নম্বর ব্যাটসম্যান হিসেবে আনকোরা সৌরভকে ঠেলে দিয়েছিলেন সন্দীপ পাতিল এবং মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন। কিন্তু, তাঁরা যেটা ভেবেছিলেন সেটা হলো না। প্ল্যান করেছিলেন, বিষাক্ত সুইংয়ের সামনে যখনই সৌরভ সমস্যায় পড়বেন, তখনই সোজা ফোন চলে যাবে মুম্বাই এবং দক্ষিণী কিছু স্পোর্টস মিডিয়ার কাছে। আর তাঁরা শেষ করে দেবে সৌরভের সম্পূর্ণ ক্যারিয়ার। কিন্তু হলো ঠিক উল্টো। একটার পর একটা কভার ড্রাইভ যেন সন্দীপ পাতিলের সমস্ত পরিকল্পনাকে ভুল বলে প্রমাণ করতে শুরু করল।

বাঙালি বলেই বোধহয় সৌরভের ক্রিকেট ক্যারিয়ারে এত সমস্যা। যেখানে দিলীপ বেংসরকার ১৬টি টেস্ট খেলার পরে জীবনের প্রথম হাফ সেঞ্চুরি করেছিলেন, যে সুনীল গাভাস্কার ১০০০ রান পূরণ করতে বারোটা টেস্ট খেলে ফেলেছিলেন, যে রোহিত শর্মা পর পর ৯টা ম্যাচে দুই অঙ্কের স্কোর পর্যন্ত করতে পারেননি, সৌরভ কি এতটা সুযোগ পেতেন? সমসাময়িক সচিন, লক্ষণ এবং দ্রাবিড়ের মতো খেলোয়াররা যেখানে নিজের ইচ্ছামত ২০১২, ২০১৩, এমনকি ২০১৪ সালেও অবসর ঘোষণা করতে পারেন, সেখানে সৌরভকে বাধ্য করা হয়েছিল ২০০৮ সালেই অবসর নিতে। চ্যাপের কাণ্ডে যেখানে ভারতীয় বোর্ডের উচিত ছিল সৌরভের পক্ষে থাকা, সেখানে তাঁরাই বরং চলে গিয়েছিল গ্রেগ চ্যাপেলের পক্ষে। লর্ডসের প্রথম টেস্টের আগে সৌরভ কে বলা হতো ও নাকি ক্রিকেট খেলতেই পারেনা। যখন সেটা ভুল প্রমাণিত হল, তখন আবার বলা হল টেস্টে মোটামুটি চললেও ওয়ানডে এর দ্বারা হবে না।

টোরন্টর একটি ম্যাচে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ৮ নম্বরে ব্যাট করতে পাঠানো হয়েছিল সৌরভকে যেখানে প্রথম চারজনের মধ্যেই ব্যাট করতে নামতেন সৌরভ। মাত্র ৮ বল খেলেও ওয়াসিম আকরামের একটি বলে একটি দুর্ধর্ষ স্ট্রেট ড্রাইভ খেলে যেন বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, শেষে ব্যাট করতে নামলেও তিনি কিন্তু বেঙ্গল টাইগার। তাঁর পরের ম্যাচেই বাদ। নিজের দশ হাজার রান পূর্ণ করার পরে একটু দুর্দান্ত স্টেটমেন্ট দিয়েছিলেন সৌরভ। বলেছিলেন, "জীবনের প্রথম ওয়ানডে রানটা করার পরে জানতাম না পরের ম্যাচে দলে থাকবো কিনা। আজ দশ হাজার ওয়ানডে রান পূরণ করার পরেও জানিনা পরের ম্যাচে থাকবো কিনা।" চ্যাপেল এর ষড়যন্ত্রে তখন ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গিয়েছেন সৌরভ গাঙ্গুলী। অন্যপ্রান্তে অধিনায়কত্ব পাওয়ার লোভে যেন পুরোপুরি লালায়িত জেন্টলম্যান রাহুল দ্রাবিড়।

সিঙ্গেল জাজ করার ক্ষমতা ছিল প্রবল। তাই বিনা কারণে রান আউট হতেন না সৌরভ। এটাকে নিয়েও আবার এক শ্রেণীর ক্রিকেট মিডিয়া বিতর্ক তৈরি করতে শুরু করে। তাঁরা বলে নাকি সৌরভ গাঙ্গুলী স্ট্রাইক রোটেট করতে জানেন না। একটা ক্যাচ যদি সৌরভ মিস করেন, তখন পুরো মিডিয়া একেবারে রে রে করে ছুটে আসছে, কিন্তু সৌরভের মতো দুর্দান্ত ক্যাচ ধরার ক্ষমতা খুব কম লোকেরই ছিল। ক্লোজ ইন ও পয়েন্ট ফিল্ডার হিসেবেও দুর্দান্ত ছিলেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। একটা সময় বলা হত সৌরভ নাকি জোরে বল খেলতে পারেন না। কিন্তু ওয়াসিম আকরাম থেকে শুরু করে ডারেন গফ, ব্রেট লি, শন পোলক, সকলেই কার্যত রাম ঠেঙ্গানি খেয়েছেন দাদার হাতে। ১৮ হাজার রান তো আর শুধু স্পিনের বিরুদ্ধে আসেনা। ১৯৯৭ সালে করাচির ওয়ানডে ম্যাচে ওয়াকার ইউনিসকে একের পর এক বাউন্ডারি ওভার বাউন্ডারি মেরে রীতিমতো ছাতু করে দিয়েছিলেন গাঙ্গুলি। অফসাইডের মহারাজ নাকি কোন সাইডে খেলতে পারেন না বলেও উঠেছিল বিতর্ক। কিন্তু সেটাকেও বারবার ভুল বলে প্রমাণ করেছেন গাঙ্গুলী।

২০০৬ সালে শেষ দিকে সৌরভের কাম ব্যাক যখন পুরোপুরি নিশ্চিত, সেই সময় লোকেরা বলেছিল এত তাড়াহুড়ো করার দরকার নেই, এই সিরিজটার উপরে সারা জীবনের ক্রিকেট ক্যারিয়ার দাঁড়িয়ে আছে। দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে সিরিজ খেলতে গিয়ে ডেল স্টেইন, মরনি মরকেলদের বলে খাবি খেতে হবে। তাঁর থেকে বরং দুর্বল ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজের কামব্যাক করো। কিন্তু সৌরভের জবাব ছিল, "এইভাবে কাপুরুষের মতো ক্রিকেট খেলা যায় না। যা সত্যিকারের খেলার ক্ষমতা রয়েছে তাঁর প্রতিপক্ষ বিচার করার দরকার পড়ে না। যদি ক্ষমতা থাকে তো ওখানে কিছু করে দেখাবো। তাহলে আর কি, বাদ পড়বো ক্রিকেট থেকে।"

২০০৩ বিশ্বকাপে নাসির হোসেনের ইংল্যান্ড, শন পোলোকের দক্ষিণ আফ্রিকা, ওয়াকার ইউনিসের পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলার পরেও ভারতকে বিশ্বকাপ ফাইনাল অবধি নিয়ে যেতে পেরেছিলেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। রিকি পন্টিং এর নেতৃত্বাধীন ভয়ংকর অস্ট্রেলিয়ার সামনে ভারতীয় দল তাসের ঘরের মতো ভেঙে গেলেও, সৌরভের চেষ্টাকে কুর্নিশ জানাতে হয়। সৌরভ সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে চির প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের লম্বা একটা সময়ের অধিনায়ক শাহিদ আফ্রিদি বলেছেন, 'ও বন্দা হি থোরা আলগ থা।' খেলোয়ার জীবনে অসংখ্য সমস্যার সমাধান করেছেন নিজে দাঁড়িয়ে থেকে। শচীন যখন নিজের ব্যাটিং এর কথা চিন্তা করে সরে দাঁড়িয়েছেন সেই সময় গাঙ্গুলির উপরে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল ভারতীয় দলের দায়িত্ব। ২০০০ থেকে বেশ কয়েকটা বছর সৌরভের নেতৃত্বে দারুন ক্রিকেট খেলেছিল ভারত। ভারতীয় ক্রিকেটের ওপেনিং জুটিও তৈরি করেছিলেন সৌরভ নিজেই। সৌরভ এবং শচীনের ওপেনিং পার্টনারশিপকে খন্ডাতে পারবে এমন ক্ষমতা হয়তো আর কোন ভারতীয় ওপেনিং পার্টনারশিপের ছিল না। ওয়ানডে ম্যাচে দ্রাবিড়ের জঘন্য ব্যাটিংকে সামলাতে এবং তাঁর ক্যারিয়ারটাকে বাঁচিয়ে দিতে সৌরভ দ্রাবিড়কে করে দিয়েছিলেন উইকেট কিপার। সুযোগ দিয়েছিলেন বীরেন্দ্র শেহবাগের মত লোকাল বয়দের। হরভজন সিং আর অনিল কুম্বলেকে নিজের ক্যারিয়ারের বাজি রেখেই বিদেশের মাটিতে বোর্ডের ঘোষণা উপেক্ষা করে নিয়ে গিয়েছিলেন সৌরভ। সেদিন এরা দুজন যদি সফল না হতেন হয়তো এদের দুজনের ক্যারিয়ারের পাশাপাশি সৌরভের ক্যারিয়ারও শেষ হয়ে যেত। কিন্তু একটা বড় রিস্ক নিয়ে ছিলেন তিনি। আর তাতে সফল হন ভালোভাবেই। সুযোগ দিয়েছিলেন মহেন্দ্র সিং ধোনিকেও। তবে কখনোই নিজের জন্য কোন নিরাপত্তা বা সাহায্যের চেষ্টা করেননি।

২০০৮ সালে যখন সৌরভ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ছেড়ে দিচ্ছেন সেই সময় ধোনীর কাঁধে দায়িত্ব দিয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে সৌরভ বলেছিলেন, "আজকের রাতটা নিশ্চিন্তে ঘুমাবো।" পরবর্তীতে আইপিএলেও তাকে হতে হয়েছে বঞ্চনার শিকার। শ্রীনিবাসনের চক্রান্তে বারংবার সমস্যার মধ্যে পড়তে হয়েছে তাকে। শেষ পর্যন্ত পুণে ওয়ারিয়ার্স ইন্ডিয়ার হয়ে খেলেও সাফল্য পাননি সৌরভ। তবে আইপিএলে কামব্যাক ম্যাচে পুনের জার্সিতে ৩২ নট আউট ইনিংস খেলে প্রমাণ করেছিলেন, টি-টোয়েন্টিতে খেলার দক্ষতাও রয়েছে। হয়তো সেই সময় ফর্ম খুব একটা ভালো ছিল না, তবে চেষ্টাটা ছিল সেই প্রথম দিনের মতোই। তারপর যখন ২০১৬ সালে সিএবি প্রেসিডেন্ট হিসেবে অভিষেক সেই সময়েই সৌরভ আবারো বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত। ২০১৯ এর ১৪ অক্টোবর, বিসিসিআই প্রেসিডেন্ট হিসেবে অভিষেক ঘটল মহারাজের। অস্ট্রেলিয়া টেস্টের বিরুদ্ধে আপামর বাঙালিকে যে বিষণ্ণতায় মুড়ে ফেলেছিলেন সৌরভ, তাঁর ক্ষতে মলম দেওয়ার সময় আসন্ন। সেইদিন কি এমন হয়েছিলো তাঁর মনে, যে অস্ট্রেলিয়া সিরিজের আগেই শিরস্ত্রান খুলে রেখেছিলেন মহারাজ, সেই উত্তর এখনো খুঁজছে ক্রিকেট বিশ্ব।

বেহালার ছোট্ট একটি গলি থেকে ক্রিকেটের ২২ গজে দাদা হয়ে ওঠার দাদাগিরি লেখা থাকবে ক্রিকেটের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে। বাঙালির বিশ্ব শাসনের আরেক নাম সৌরভ গাঙ্গুলী। লর্ডসের মাটিতে ব্রিটিশ তাড়ানোর ঔদ্ধত্য মনে থাকবে সারা জীবন। একদল শত্রুর হাত থেকে বাঁচার জন্য পালটা মারের যে ব্যাকরণ তিনি তৈরি করেছিলেন, তা বেঁচে থাকবে চিরকাল। তিনি বিরিয়ানি প্রেমিক, তিনি যেমন অফসাইডের ফিল্ডিং ভেঙে পরপর মারতে পারেন চার, তেমনি ফুটবল মাঠে ভাঙতে পারেন ডিফেন্স, দুর্গা পূজার মণ্ডপে পাঞ্জাবি পায়জামা পড়ে ঢাক বাজানো থেকে শুরু করে, ওয়েস্টার্ন ফর্ম্যাল পরে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া, সবকিছুতেই তিনি সাবলীল। ক্রিকেট কমেন্টেটর থেকে বিসিসিআই প্রেসিডেন্ট, সৌরভ মানে বিশ্ব দরবারে বাঙালিয়ানার একটা ঐতিহ্য। বাংলা টেলিভিশন দুনিয়ার সব থেকে জনপ্রিয় রিয়ালিটি শো এর হোস্ট হোস্ট হিসেবেও তিনি যথেষ্ট সাবলীল। তাই তো টেলি অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডের মঞ্চেও পুরস্কার হাতে দেখা মেলে সৌরভ গাঙ্গুলীর। তবে আক্ষেপ শুধু একটাই, ন্যাটওয়েস্ট সিরিজ জিতে যতই জামা ঘোরানো হোক না কেনো ২০০৩ বিশ্বকাপে যদি অস্ট্রেলিয়াকে হারাতে পারত ভারত তাহলে আর হয়ত 'আইসিসি ট্রফি' নিয়ে কটাক্ষের শিকার হতে হতোনা প্রিন্স অফ ক্যালকাটাকে। শুভ ৫০ মহারাজ!

লিখেছেন
Sourish Das
Sourish Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

নারী টেস্টে এত অনীহা কেন, লর্ডসের ইতিহাসও বদলাবে না সেই ছবি?

Women’s Test Cricket: লর্ডসে ভারতের নারী ক্রিকেট দলের ঐতিহাসিক জয় নারী টেস্ট ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ বদলানোর সুযোগ এনে দিয়েছে? এত সাফল্য ও জনপ্রিয়তার পরও কেন এই ফরম্যাটে নিয়মিত ম্যাচ নেই?

শিব-পরশুরামের যুদ্ধবিদ্যা কালারিপায়াট্টু থেকেই জন্ম কুংফুর!

Kalaripayattu Indian Martial Art: ভারতীয় পৌরাণিক ঐতিহ্যে কালারিপায়াট্টুকে স্রেফ যুদ্ধের কৌশল হিসেবে দেখা হয়নি, বরং এটিকে মানব শরীরের অভ্যন্তরীণ প্রাণশক্তিকে জাগিয়ে তোলার এক মহান সাধনা বলে মনে করা হয়।

দু'হাজার বছর পুরনো ‘আত্য পাত্যা’: এই খেলাই শিখিয়েছিল যুদ্ধের কৌশল!

Atya Patya Traditional Indian Game: আনুমানিক ১০০ থেকে ৩০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রচিত প্রাচীন তামিল সাঙ্গম সাহিত্য ‘নাটতৃণৈ’-তে এই খেলার প্রথম লিখিত প্রমাণ পাওয়া যায়। অতএব, এই খেলার বয়স প্রায় দুই হাজার বছরেরও বেশি। সেখানে বলা আছে, প্রাচীন চোল রাজবংশের সেনারা যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার আগে নিজেদের ক্ষিপ্রতা, দ্রুত দৌড়ানোর ক্ষমতা আর শরীরকে এক নিমেষে বাঁকানোর চপলতা বাড়াতে এই খেলায় মেতে উঠত।

১৬ বছর পর ফের ভারতের পথে ললিত মোদী

Lalit Modi return to India: দীর্ঘ সময় পর দিল্লির আপিল ট্রাইব্যুনাল তাঁর বিরুদ্ধে থাকা আর্থিক অনিয়মের বড় অভিযোগ ও জরিমানা বাতিল করে দেওয়ার পরেই এই আলোচনার সূত্রপাত। সোশ্যাল মিডিয়ায় ললিত মোদী নিজেই স্পষ্ট করেছেন, সমস্ত বড়সড় আইনি জটিলতা কাটার পর ২০২৬ সালের শেষ দিকে অথবা ২০২৭-এর শুরুতেই ফের তিনি ভারতে পা রাখতে চলেছেন।

গোলের আড়ালে ঘৃণার খেলা: ২০২৬ বিশ্বকাপে ট্রাম্প, ফিফা আর ফুটবলের পরাজয়

Trump FIFA World Cup: এই বিশ্বকাপ শুধুই একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; মাঠের লড়াই ছাপিয়ে তা হয়ে উঠেছে ভূ-রাজনীতি, বর্ণবিদ্বেষ এবং বাণিজ্যিক আধিপত্যের এক জটিল ময়দান।

একটা রাজপুত্তুর যার মুকুট হারিয়ে গিয়েছে

Lionel Messi Retirement: তিনটে ফাইনালের বোঝা। একে একে ছেড়ে যায় সহযোদ্ধারা। রক্তাক্ত মাসচেরানো চলে যান, কুন আগুয়েরোর অসুখ... তবু লিও পড়ে থাকে, আমরা পড়ে থাকি আর কিছুদিন। বৃত্ত সম্পূর্ণ করতে প্রয়োজন ছিল একজন স্ক্যালোনির, তিনি সেটুকু সেতু নির্মাণের দায়িত্ব নিলেন। আমরা অপেক্ষা করলাম লুসাইলে। আমরা তো কবেই হেরে গিয়েছিলাম, সৌদি আরব শুধু চিনিয়ে দিয়েছিল আশপাশটা।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬: যেভাবে ১৫ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসায় পরিণত হল ফুটবল

FIFA Revenue 2026: 'কুইন্টেট প্রাইভেট ব্যাংক'-এর সাম্প্রতিক একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, শেয়ারবাজারের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের অনুঘটক হওয়ার চেয়ে বিশ্বকাপ আসলে একটি শক্তিশালী স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্যিক উদ্দীপক হিসেবেই বেশি কাজ করে। ফিফা, সম্প্রচারকারী সংস্থা, স্পোর্টসওয়্যার ব্র্যান্ড এবং আতিথেয়তা (হসপিটালিটি) ক্ষেত্রগুলি বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করলেও, কোম্পানির শেয়ারের দামে সেই ইতিবাচক প্রভাব দীর্ঘ সময় ধরে রাখা বেশ কঠিন।

যখন ইউরোপে নারীরা গৃহবন্দি, তখন অসমে মেয়েরা খেলছিলেন ধোপখেল

Dhop Khel Assam: আহোম রাজাদের রাজপ্রাসাদ থেকে বিহুর মেঠো মাঠ—অসমের মাটিতে একসময় গমগম করত ধোপখেলের আওয়াজ। ফুটবল, কাবাডি আর দূরন্ত নিশানার এই অদ্ভুত রোমাঞ্চকর খেলাটি শুধু পুরুষদের বীরত্ব প্রমাণের লড়াই ছিল না; যখন ইউরোপে নারীদের জীবন ছিল চার দেওয়ালে বন্দি, তখন অসমে মেয়েরাও মাঠে নেমে মেতে উঠতেন ধোপখেলে।