অনুপ্রবেশকারী সন্দেহে ১১ মাস বাংলাদেশে, স্বদেশে স্বভূমে ফিরছেন সুইটি বিবিরা

Danish Sheikh, Sweety Bibi: বাংলাদেশে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ সন্দেহে পাঠিয়ে দেওয়া বাংলাভাষী চার জনকে ভারতে ফিরিয়ে আনা হবে সুপ্রিম কোর্টে কী জানাল কেন্দ্র সরকার? নাগরিকত্ব যাচাইয়ের আগে ‘পুশব্যাক’ নিয়ে কেন উঠছে নতুন বিতর্ক? সোনালি খাতুন, দানিশ শেখদের মামলায় প্রশাসনের ভূমিকাই বা কতটা প্রশ্নের মুখে?

inscript
৩ মিনিট
অনুপ্রবেশকারী সন্দেহে ১১ মাস বাংলাদেশে, স্বদেশে স্বভূমে ফিরছেন সুইটি বিবিরা

কেন্দ্র জানিয়েছে, সুইটি বিবি, দানিশ শেখ-সহ চার জনকে ফের ভারতে ফিরিয়ে আনা হবে। বাংলাভাষী ছয়জনকে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ সন্দেহে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পরে সেই ঘটনাই পৌঁছয় আদালতে। দীর্ঘ আইনি টানাপোড়েনের পর সুপ্রিম কোর্টে কেন্দ্র জানায়, তাঁদের ভারতে ফিরিয়ে এনে নাগরিকত্বের দাবির সত্যতা খতিয়ে দেখা হবে। এই ঘটনাকে ঘিরে ফের চর্চায় ‘পুশব্যাক’ নীতি ও প্রশাসনিক ভূমিকা।

২৩ মে সুপ্রিম কোর্টে এই মামলার শুনানিতে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা কেন্দ্রের হয়ে জানান, মামলার বিশেষ পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি আদালতকে বলেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভারতে ফিরিয়ে আনা হবে এবং তারপর তাঁদের নাগরিকত্বের দাবির সত্যতা যাচাই করা হবে। তবে কেন্দ্র একইসঙ্গে স্পষ্ট করে দেয়, এই সিদ্ধান্তকে ভবিষ্যতের অন্য মামলায় নজির হিসেবে ধরা যাবে না।

প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি বিপুল পাঞ্চোলির বেঞ্চ এই মামলার শুনানি করে। আদালত কেন্দ্রের বক্তব্য নথিভুক্ত করে জানায়, যাঁদের ফিরিয়ে আনা হবে তাঁদের ভারতে থাকা নির্ভর করবে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের ফলাফলের উপর। কেন্দ্র জানিয়েছে, পুরো প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে আট থেকে দশ দিন সময় লাগতে পারে।

সুইটি বিবি এবং তাঁর ছেলে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
‘ওরা জানত আমি অন্তঃসত্ত্বা ছিলাম… তবু একটুও দয়া দেখায়নি’: সোনালি খাতুন

Sunali Khatun Interview: কীভাবে একটি বাঙালি পরিবারকে 'বাংলাদেশি' তকমা দিয়ে দেশছাড়া করা হলো, কীভাবে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ফাঁকে হারিয়ে গেল মানবিকতা— সেই অভিজ্ঞতারই নির্মম বিবরণ উঠে এসেছে এই সাক্ষাৎকারে।

ঘটনার সূত্রপাত গত বছর। অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গের বীরভূমের বাসিন্দা কয়েকজন মানুষ দিল্লিতে কাজ করতে গিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন সোনালি খাতুন, তাঁর স্বামী দানিশ শেখ, তাঁদের ছোট ছেলে এবং সুইটি বিবির পরিবার, তাঁর স্বামী কুরবান শেখ এবং তাঁদের ছেলে ইমাম দেওয়ান। দিল্লির রোহিণী এলাকায় তাঁরা দিনমজুরির কাজ করতেন। হঠাৎই তাঁদের বাংলাদেশি সন্দেহে আটক করা হয়। পরে বিদেশি আঞ্চলিক নিবন্ধন দফতর (FRRO) তাঁদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয় এবং সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

পরিবারগুলির দাবি ছিল, তাঁরা ভারতীয় নাগরিক এবং বহু বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গেই বসবাস করছেন। তাঁদের আত্মীয়রা কলকাতা হাইকোর্টে হেবিয়াস করপাস মামলা দায়ের করেন। সেই মামলায় কলকাতা হাইকোর্ট কেন্দ্রের পদক্ষেপকে বেআইনি বলে মন্তব্য করে। আদালত জানায়, যথাযথ প্রক্রিয়া না মেনেই তড়িঘড়ি এই মানুষগুলিকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। আদালত আরও পর্যবেক্ষণ করেছিল, অতিরিক্ত তৎপরতা বিচারব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

হাইকোর্ট নির্দেশ দেয়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের এক মাসের মধ্যে ভারতে ফিরিয়ে আনতে হবে। কিন্তু সেই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে কেন্দ্র সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়। কেন্দ্রের যুক্তি ছিল, এই মামলার বিচার করার এক্তিয়ার কলকাতা হাইকোর্টের ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। পাশাপাশি, দিল্লি হাইকোর্টে একই ধরনের মামলা চলছিল বলেও জানানো হয়।

এই মামলায় সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে সোনালি খাতুনের নাম। কারণ, যখন তাঁকে বাংলাদেশে পাঠানো হয় তখন তিনি অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। পরে বাংলাদেশে প্রবেশের অভিযোগে তাঁকে আটকও করা হয়। বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টে পৌঁছলে আদালত মানবিক কারণে তাঁকে এবং তাঁর আট বছরের সন্তানকে ভারতে ফিরিয়ে আনার পরামর্শ দেয়। শেষ পর্যন্ত গত ডিসেম্বর মাসে কেন্দ্র সরকার আদালতকে জানায়, মানবিক কারণে তাঁদের ফেরত আনা হবে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
আটমাসের অন্তঃসত্ত্বা, বীরভূমের সোনালি খাতুনকে যেভাবে বাংলাদেশে ঘাড়ধাক্কা

সোনালির পরিবারের অভিযোগ, রাতের অন্ধকারে সীমান্ত পার করানোর সময় তাঁদের চোখ কাপড় দিয়ে বাঁধা ছিল। বন্দুক তাক করে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছিল, ফিরলেই গুলি করা হবে।

সেই সময়ও সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল, নাগরিকত্ব নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পরে হবে। আগে মানুষগুলিকে ফিরিয়ে এনে সঠিক তদন্ত করা প্রয়োজন। এবার কেন্দ্রের সাম্প্রতিক অবস্থান কার্যত সেই পথেই এগোল।

এই মামলাকে ঘিরে নাগরিকত্ব, অনুপ্রবেশ এবং ‘পুশব্যাক’ নীতি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলির একাংশের অভিযোগ, পর্যাপ্ত নথি যাচাই না করেই অনেক ক্ষেত্রে মানুষকে বাংলাদেশি বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। আবার প্রশাসনের দাবি, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং অবৈধ অনুপ্রবেশ রুখতে কড়া পদক্ষেপ জরুরি।

বিশেষ করে অসম এবং সীমান্তবর্তী এলাকাগুলিতে গত কয়েক বছরে ‘পুশব্যাক’ শব্দটি বারবার উঠে এসেছে। অভিযোগ, অনেককে আনুষ্ঠানিক আইনি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ না করেই সীমান্তের ওপারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। যদিও প্রশাসনের তরফে বলা হয়েছে, বিদেশি ট্রাইব্যুনাল বা অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়ার ভিত্তিতেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

তবে এই মামলায় সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করছেন আইনজীবীদের একাংশ। কারণ, আদালত সরাসরি বলেছে, নাগরিকত্ব যাচাইয়ের আগে কাউকে জোর করে দেশছাড়া করা হলে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। একইসঙ্গে আদালত এটাও স্পষ্ট করেছে যে, বেআইনি অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার অধিকার সরকারের রয়েছে। কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় আইনি ও মানবিক দিক দুটোই মেনে চলতে হবে।

“বাংলাদেশি সন্দেহে ওঁদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। দীর্ঘ কষ্টের মধ্যে জেলে, রাস্তাঘাটে, জঙ্গলে দিন কাটাতে হয়েছে। ১১ মাস পর বাংলাদেশ থেকে ফিরছে তাঁরা। ১০০ দিন জেলও খেটেছেন। ১৯৫২ সালের নথি থাকার পরও তাঁদের বাংলাদেশি সন্দেহ করা হয়েছে। উপযুক্ত নথি যাচাই করেই কাউকে বাংলাদেশে পুশব্যাক করা উচিত,” ইনস্ক্রিপ্টকে বলেন স্থানীয় যুবক মফিজুল ইসলাম, যিনি দীর্ঘদিন বাংলাদেশে ছিলেন।

এখন নজর থাকবে কেন্দ্র সরকার কী ভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভারতে ফিরিয়ে আনে এবং তাঁদের নাগরিকত্ব যাচাইয়ের প্রক্রিয়া কী ভাবে এগোয় তার উপর। কারণ, এই মামলার ফল ভবিষ্যতে নাগরিকত্ব সংক্রান্ত বিতর্ক এবং প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিয়ে বড় প্রশ্নের মুখোমুখি করতে পারে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার, এমনটাই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিক বিক্ষোভ, ১৫০-র বেশি কারখানা বন্ধ, কী বলছে বাংলাদেশ সরকার?

Bangladesh garment workers protest: মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিক বিক্ষোভ, ১৫০-র বেশি কারখানা বন্ধ, শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবি নিয়ে কী বলছে বাংলাদেশ সরকার?

কেন পঞ্জাবে ক্ষমতা ধরে রাখা কঠিন হচ্ছে আপের?

Major Setback for AAP in Punjab: ২০২২ সালে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে পঞ্জাবে ক্ষমতায় এসেছিল আম আদমি পার্টি। কিন্তু পাঁচ বছরের মধ্যেই দলের অন্দরে বিদ্রোহ, বিধায়কদের দলত্যাগ, মাদক সমস্যা, দুর্নীতি ও ঋণের বোঝা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ২০২৭-এর নির্বাচনে ক্ষমতা ধরে রাখা কি কঠিন হয়ে উঠছে আপের?

বাদ গেলেন না মহিলারাও, যাজক-উপাসকদের মারধর-হুমকি, গির্জায় হামলা ঘিরে চাঞ্চল্য বাসন্তীতে

প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, গির্জায় ঢুকেই হামলাকারীরা উপাসক ও অতিথিদের মারধর শুরু করে। বাদ যাননি মহিলারাও। তাঁদের শাঁখা খুলে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং গির্জা থেকে বের করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। বিশপের সঙ্গে উপস্থিত যাজকদেরও শারীরিকভাবে হেনস্থা ও মারধর করা হয় বলে দাবি।

রামলীলা ময়দানে বিরোধীদের বক্তৃতা: কে কত নম্বর পেলেন?

INDIA Bloc Rally at Ramlila Maidan: মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আয়োজিত এই সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন ২১টি বিরোধী দলের নেতা ও কর্মীরা। কে, কী বললেন?

সুর চড়ল অভিষেকের, কোন রক্ষাকবচে ভরসা?

Abhishek Banerjee: সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর বক্তব্য ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে আগের তুলনায় অনেক বেশি আক্রমণাত্মক অবস্থান দেখা যাচ্ছে। ইডি-সিবিআই থেকে দিল্লি সফর—অভিষেকের এই আত্মবিশ্বাসের নেপথ্যে নিছক প্রতিরোধ নাকি কোনো গোপন রাজনৈতিক সমীকরণ?

সংসদের বাইরে ‘পিপলস ইমপিচমেন্ট’: জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে বিরোধীদের নতুন লড়াই

Peoples Impeachment of Gyanesh Kumar: খাড়্গের সরকারি বাসভবনের লনে ‘মক পার্লামেন্ট’ থেকে উঠল জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ছয় দফা অভিযোগ। জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ১৩.২ কোটি ভোটারের নাম মুছে ফেলা সহ, ছয়টি অভিযোগ রয়েছে। মল্লিকার্জুন খাড়্গে জ্ঞানেশ কুমারকে ‘দেশদ্রোহী’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

টুইন টাওয়ার ধসের ২৫ বছর: বিশ্ব অর্থনীতিতে যা যা বদলে দিল ৯/১১

9/11 25th anniversary: ৯/১১-এর অর্থনৈতিক অভিঘাত ছিল বহুমাত্রিক। নিউইয়র্কের আর্থিক বাজার কয়েক দিন বন্ধ ছিল। পুনরায় চালুর পর শেয়ারবাজারে বড় পতন দেখা দেয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক আর্থিক ব্যবস্থায় তারল্য সরবরাহ করে সম্ভাব্য বৃহত্তর সংকট ঠেকানোর চেষ্টা করে।

রামলীলা ময়দানে বিরোধীদের মেগা সমাবেশ: ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের বার্তা ‘ইন্ডিয়া’র

INDIA bloc rally Delhi: ভোটার তালিকা সংশোধনে কোটি কোটি নাম বাদ পড়ার অভিযোগে দিল্লির রামলীলা ময়দানে বিশাল সমাবেশ করল ‘ইন্ডিয়া’ জোট। রাহুল, মমতা ও অখিলেশ মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণ দাবি করে ‘ভোট বাঁচাও’ স্লোগান তোলেন।