আটমাসের অন্তঃসত্ত্বা, বীরভূমের সোনালি খাতুনকে যেভাবে বাংলাদেশে ঘাড়ধাক্কা

সোনালির পরিবারের অভিযোগ, রাতের অন্ধকারে সীমান্ত পার করানোর সময় তাঁদের চোখ কাপড় দিয়ে বাঁধা ছিল। বন্দুক তাক করে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছিল, ফিরলেই গুলি করা হবে।

inscript
৩ মিনিট
আটমাসের অন্তঃসত্ত্বা, বীরভূমের সোনালি খাতুনকে যেভাবে বাংলাদেশে ঘাড়ধাক্কা

আট মাসের অন্তঃসত্ত্বাকে বাংলাদেশি সন্দেহে প্রথমে আটক তারপর ঘাড়ধাক্কা। চোখে কাপড় বেঁধে রাতের অন্ধকারে সোজা বাংলাদেশ। বীরভূমের পাইকর গ্রামের মেয়ে সোনালি খাতুন কি সুস্থভাবে দেশে ফিরতে পারবেন? মিসক্যারেজ হবে না তো? জীবনপ্রান্তে উপনীত সোনালির হতদরিদ্র বাবা ভাদু শেখ পাইকরের ভাঙাঘরের দাওয়ায় বসে এই প্র‍শ্নগুলির সঙ্গেই লড়াই করছেন।

৩০ বছর দিল্লিতে রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেছেন ভাদু শেখ। বয়সজনিত কারণে এখন আর কাজ করতে পারেন না। তাই ফিরে এসেছেন গ্রামের বাড়িতে, বীরভূমের পাইকরে। তবে দিল্লিতেই বসবাস করছিলেন তাঁর মেয়ে সোনালি খাতুন। দিল্লিরই বাসিন্দা দানিশ শেখের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। স্বামী স্ত্রী থাকতেন দিল্লির রোহিনী এলাকার ২৬ সেক্টরে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মুম্বই থেকে খেদিয়ে বাংলাদেশ! কী ভাবে ঘরে ফিরলেন নাজিমুদ্দিন?

Migrant workers from Bengal : তারপর জোর করে বাংলাদেশে পুশব্যাক করা হয়। অভিযোগ বিএসএফ তাঁর থেকে ১৮ হাজার টাকা কেড়ে নিয়ে হাতে ধরিয়ে দেয় ৩০০ বাংলাদেশি রূপি।

সোনালি খাতুনের বাবা-মা

গত ১৮ জুন দিল্লির কে.এন কাটজু মার্গ থানার পুলিশ তাঁদের আটক করে। ভারতীয় নাগরিকের পরিচয়পত্র দেখালেও পুলিশ তাঁদের বাংলাদেশি সন্দেহে বিএসএফের হাতে তুলে দেয়। তারপর মেহেদি সীমান্ত দিয়ে ‘ঘাড়ধাক্কা’ দেওয়া হয় বাংলাদেশে। সোনালির পরিবারের অভিযোগ, রাতের অন্ধকারে সীমান্ত পার করানোর সময় তাঁদের চোখ কাপড় দিয়ে বাঁধা ছিল। বন্দুক তাক করে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছিল, ফিরলেই গুলি করা হবে। এক কাপড়েই বাংলাদেশ পাঠিয়ে দেওয়া হয় সোনালি খাতুন, দানিশ শেখ (২৯ বছর বয়স) এবং তাঁদের আট বছরের ছেলে সাবির শেখকে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কালিয়াচকের পরিযায়ী শ্রমিক আমির শেখকে যেভাবে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হল

Amir Sheikh: 'বাঙালি' পরিচয় দেওয়ার পরেই তাঁকে 'বাংলাদেশি' তকমা দেওয়া শুরু হয়। আধার কার্ড, জন্মের শংসাপত্র দাখিল করেও লাভ হয়নি।

শুধু সোনালির পরিবারই নয়, একই সঙ্গে খেদানো হয়েছে পাইকরেরই বাসিন্দা, সোনালির বান্ধবী সুইটি বিবিকে (৩৩ বছর বয়স)। সুইটির স্বামী অকালপ্রয়াত। তাঁর সঙ্গে রয়েছে দুই সন্তান ১৬ বছর বয়সি কুরবান শেখ ও ৫ বছর বয়সি ইমান। বীরভূমের পাইকরে সুইটির মা একা মেয়ের অপেক্ষায় পল অনুপল জেগে আছেন।

বাংলাদেশের রাজশাহি অঞ্চলে স্থানীয়দের মাধ্যমে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন সোনালিরা। এরপর মেয়েকে দেশে ফেরাতে সোনালির পরিবার যোগাযোগ করে পরিযায়ী শ্রমিক ঐক্য মঞ্চের সঙ্গে। বাংলাদেশে স্থানীয়দের দ্বারা দুবেলা খাবারের ব্যবস্থা হয়েছে সোনালিদের। তাঁর পরিবারের আশঙ্কা, আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা এইভাবে দিনের পর দিন দুশ্চিন্তায়, অপুষ্টিতে ভুগে সুস্থ থাকতে পারবে তো? এইভাবে চলতে থাকলে সোনালির মিসক্যারেজ হওয়ার ভয় পাচ্ছে তাঁর পরিবার। সোনালির মা জ্যোৎস্না বিবি বলেন, “মেয়েটা ঈদে এল না। বোধহয় নাতি-নাতনির মুখ দেখতে পাব না আর।”

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
রোহিঙ্গা সমস্যার মধ্যেই উপ্ত ছিল বাঙালি নিপীড়নের বীজ

Bangladeshis : এর আগেও বাঙালিকে তাড়ানোর রব উঠেছে অসমে। ১৯৬০ সালে তা চরমে পৌঁছয়। অসমে 'বংগাল খেদা' নামে বাঙালি তাড়াও হয়েছিল।

ইনস্ক্রিপ্টকে সোনালির বাবা জানিয়েছেন, “দিল্লিতে ৩০ বছর আছি। কোনওদিন এমন ঘটনা ঘটবে ভাবতে পারিনি।” ঈদের সময় সোনালির পরিবার গ্রামের বাড়িতে ফিরেছিল। তাঁর এক সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিল তাঁরা। একদিকে অন্তঃসত্ত্বা সোনালির দেশে ফেরার লড়াই, অন্যদিকে মায়ের অপেক্ষায় সীমান্তের এপারে প্রহর গোনা তাঁর একরত্তি সন্তান ও পরিবারের।

পরিযায়ী শ্রমিক ঐক্য মঞ্চের আরিফ শেখ ইনস্ক্রিপ্টকে জানিয়েছেন, সোনালিদের পরিবার তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাঁরা প্রথমে আইনি কাগজ সংগ্রহ করেন। ১৯৫২ সালের দলিল আছে সোনালির পরিবারের। স্থানীয়রা বলছেন, কয়েক প্রজন্ম ধরে বীরভূমের পাইকরে বাস করছেন ভদু শেখরা। পরিযায়ী শ্রমিক ঐক্যমঞ্চের সাহায্যে হাইকোর্টে মামলা করেছেন ভদু শেখ। চেষ্টা চলছে সোনালিদের বাংলাদেশে থেকে দেশে ফিরিয়ে আনার।

কেন সোনালিরা বীরভূম ছেড়ে এত দূরদূরান্তে কাজে যান? স্থানীয়রা বলছেন, গ্রামে তেমন জমি নেই। অন্যের জমিতে ভাগচাষী হিসেবে কাজ করে যে অর্থ পাওয়া যায়, তাতে সংসার চলে না। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিন একশো দিনের কাজ বন্ধ। ফলে গ্রামের পর গ্রাম খালি হয়ে যাচ্ছে। মেয়েদের জন্যে গ্রামে বিঁড়ি বাঁধার কাজ আছে। এক হাজার বিঁড়ি বাঁধলে ২০০-২৫০ টাকা পাওয়া যায়। আর এক হাজার বিঁড়ি বাঁধতে সময় লাগে পাঁচ দিন। অর্থাৎ দিনে ৪০ টাকা আয়। ফলে ভদ্রস্থ ভাবে বাঁচার আশায় বিপদ মাথায় পাড়ি দিতে হয় ভিনরাজ্যে।

গত কয়েক মাসে ভিন রাজ্যে বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিক নিগ্রহের ঘটনা শোরগোল ফেলেছে। সেই তালিকায় উঠে এসেছে সোনালি খাতুনের পরিবারও। এখনও তাঁরা বাংলাদেশেই রয়েছেন। পর্যায়ক্রমিক এই ঘটনার আঁচ পড়েছে বঙ্গ-রাজনীতিতেও। তবে, সমস্ত রাজনৈতিক আকচাআকচির বাইরে গিয়ে দেখলে ধরা পড়বে প্রান্তিক মানুষের অর্থনৈতিক বেহাল দশা আর নিজের দেশে বেনগরিক আখ্যার অপমান। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, সোনালির মতো মায়েদের হেনস্থার ভয়চিত্র দেখিয়ে ভোটবাক্স ভরিয়ে আখের গোছানোর রাজনীতিকেরা কি আদৌ তাঁদের নিরাপদ বাসস্থান ও কর্মসংস্থান দিতে অঙ্গীকারবদ্ধ হবেন?

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ডানাছাঁটা ট্রাম্প-নেতানিয়াহু, বিশ্ব রাজনীতি কোন দিকে যাবে?

Trump midterm defeat: আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির পরাজয় এবং ইজরায়েলের নির্বাচনে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানো—দুটি ঘটনাই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই পরাজয়ের পর ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ কী হবে? আমেরিকা-ইজরায়েল সম্পর্কের সমীকরণ কি বদলাবে? আর বিশ্ব রাজনীতিতে তার প্রভাবই বা কতটা পড়বে?

ট্রাম্পের হারের ৫ কারণ: কেন মুখ ফিরিয়ে নিলেন মার্কিন ভোটাররা?

US Midterm Elections: আমেরিকার মিডটার্ম নির্বাচনে বড় ধাক্কা খেল ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি।জীবনযাত্রার খরচ বৃদ্ধি থেকে শুরু করে ট্রাম্পের নীতি—রিপাবলিকানদের ভরাডুবির পাঁচটি মূল কারণ কী কী?

পিস বন্ড কী, কেন দিতে হয়? নেহা বোরার আপত্তিতে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ঔপনিবেশিক আমলের আইন

Peace Bond: শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করলেই কি দিতে হবে পিস বন্ড? AISA-র জাতীয় সভাপতি নেহা বোরার আপত্তিতে নতুন করে বিতর্কে ঔপনিবেশিক আমলের প্রতিরোধমূলক আইন। ব্রিটিশ আমল থেকে স্বাধীন ভারত, CrPC থেকে BNSS—কীভাবে বদলেছে এই আইনি ব্যবস্থা? কেন কাউকে ১০ হাজার টাকার মুচলেকা দিতে বলা হয়? কী বলছে আইন?

রামলীলা ময়দানের সভায় ভিড় দেখাতে এআই ছবি? কতটা সত্যি?

Ramlila Maidan AI image controversy: দিল্লির রামলীলা ময়দানে ১ নভেম্বরের ‘ইন্ডিয়া’ জোটের সমাবেশে ভিড় ও এআই ছবি ব্যবহার নিয়ে বিজেপি ও কংগ্রেসের মধ্যে বিতর্ক তুঙ্গে। ভাইরাল ছবিগুলোর সত্যতা কী?

আবের কাওয়াস: প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান মুসলিম মহিলা নিউ ইয়র্কের সিনেটে

Aber Kawas: নিউ ইয়র্কের ১২ নম্বর সিনেট ডিস্ট্রিক্ট থেকে জয়ী হয়ে ইতিহাস গড়লেন আবের কাওয়াস। নিউ ইয়র্ক স্টেট আইনসভায় তিনি প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান এবং প্রথম হিজাব পরিহিত মুসলিম মহিলা প্রতিনিধি।

প্রতিবেশীর ধর্ম দেখব না! গির্জায় হামলায় যা বলছে বাসন্তী

Basanti church: গির্জার সদস্য প্রদীপ মণ্ডল ইনস্ক্রিপ্টকে জানিয়েছেন, শনিবার সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ চার্চ অফ নর্থ ইন্ডিয়ার (CNI) বিশপ সুব্রত চক্রবর্তী পার্শ্ববর্তী এলাকার কয়েকটি গির্জার যাজকদের নিয়ে শান্তিপূর্ণ শোভাযাত্রা করে নারায়ণতলার নবনির্মিত গির্জায় পৌঁছন। তাঁদের স্বাগত জানাতে গির্জার ভিতরে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। প্রার্থনা শুরুর ঠিক আগে ৩০-৩৫ জনের একটি দল জোর করে গির্জায় ঢুকে পড়ে বলে দাবি তাঁর।

পাঁচ খুনের 'বদলা'? এবার গুয়াহাটিতে এনকাউন্টার পুলিশের

Guwahati Encounter: গুয়াহাটিতে হোটেলে ঢুকে পাঁচ জনকে খুনের অভিযোগে ধৃত ঘনকান্ত গগৈ পুলিশের গুলিতে নিহত। পুলিশের দাবি, হেফাজত থেকে পালিয়ে সার্ভিস রিভলভার ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল সে। একই সময়ে মধ্যপ্রদেশের দেওয়াস ও ভোপালে পৃথক এনকাউন্টারে তিন অভিযুক্ত গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। কয়েক দিন আগেই বাংলায় গাইঘাটা ও সামশেরগঞ্জে দুই অভিযুক্তের মৃত্যু হয়েছিল।

আমেরিকার প্রথম মুসলিম সেনেটর, ট্রাম্পের ইসলামবিদ্বেষী প্রচারকে হারিয়ে ইতিহাস গড়লেন আবদুল এল-সায়েদ

Abdul El-Sayed: নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর দলের একাধিক নেতা এল-সায়েদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ইসলামবিদ্বেষী প্রচার চালিয়েছিলেন। তাঁর ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে এনে তাঁকে আমেরিকার নিরাপত্তার পক্ষে বিপজ্জনক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছিল।