একটি জনকল্যাণকামী রাষ্ট্রের মর্মকথা

Anasuya Sen
৩ মিনিট
একটি জনকল্যাণকামী রাষ্ট্রের মর্মকথা

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় 'জনকল্যাণকামী রাষ্ট্র' বলতে বোঝায় এমন একটি রাষ্ট্র ব্যবস্থা, যার প্রধান উদ্দেশ্য হল রাষ্ট্রের নাগরিকদের জীবনের সর্বাঙ্গীন কল্যাণ সাধন করা। অর্থাৎ প্রত্যেক নাগরিকদের জীবন যাতে সামগ্রিকভাবে বিকশিত হয় তা সুনিশ্চিত করা। 'ভারত' সেই রকমই একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্র | আমাদের দেশের তথা রাষ্ট্রের সংবিধানের মুখবন্ধেও তেমন কথাই বলা হয়েছে|

সেইরকম জনকল্যাণকামী প্রচেষ্টার একটি উজ্জ্বল সুসংহত এবং কার্যকরী দৃষ্টান্ত হল পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উদ্যোগে গঠিত "স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প"।এর মাধ্যমে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে দু'কোটিরও বেশি পরিবারকে আনা হয়েছে 'স্বাস্থ্যসাথী' প্রকল্পের আওতায়||

যে কোনও জনকল্যাণকামী প্রকল্প সফল হতে পারে যদি সেই প্রকল্পকে রূপদানের কাজে নিযুক্ত ব্যক্তিগণ একদিকে এবং অন্যদিকে সেই প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের (Target Beneficiary ) সততার পরিচয় দেন।মানুষ সততার পরিচয় দেবে......এইরকম আশা বুকে নিয়েই দেশের কেন্দ্রীয় সরকার ও রাজ্য সরকার যে কোনও জনকল্যাণকামী প্রকল্পের রূপরেখা গঠন করেন।

কিন্তু বিগত ১৫ই জুলাই,২০২১, প্রকাশিত একটি সংবাদ সেই সযত্ন-লালিত আশাকে চুরমার করে দিয়েছে, ভরসার ভিত্তিভূমিতে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছে।জানা গিয়েছে, বাঁকুড়া জেলার সোনামুখী অঞ্চলের দুটি নার্সিংহোম এবং ওন্দা রামসাগর এলাকার একটি নার্সিংহোম সম্পূর্ণ জুয়াচুরি করে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার গোয়ালতোড় গ্রামের অনেক সুস্থ মানুষকে প্রলোভনের কিছু টাকা ধরিয়ে রোগী সাজিয়ে তাদের নার্সিংহোমে ভর্তি করিয়েছে। সামান্য গায়ে ব্যথা বা জ্বরে ৮-১০দিন করে তাদের নার্সিংহোমে রেখে রোগীপিছু ৭০-৭৫ হাজার টাকার বিল করেছে।এইরকম Non-Specific শারীরিক সমস্যা নিয়ে ভর্তি রোগীদের সামনে রেখে নার্সিংহোম গুলি সরকারের কাছ থেকে সেইসব বিলের টাকা আদায় করেছে।

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের স্বাস্থ্য-দফতরের তরফে গঠিত একটি তদন্ত কমিটির সদস্যদের সামনে এই সব হতাশাজনক তথ্য উঠে এসেছে। এ কি শুধু হিমশৈলের চূড়া? ব্যাপকভাবে তদন্ত হলে কি গোটা হিমবাহের সন্ধান পাওয়া যাবে?

আরও প্রশ্ন জেগেছে, তাহলে কে-ই বা কল্যাণ করবেন? কাদের জন্যই বা কল্যাণ কামনা? তাহলে রাষ্ট্রব্যবস্থা বলতে কি শুধুমাত্র সরকারী কর্মী-অফিসার, আদালতের বিচারপতি, সৈন্যবাহিনী, পুলিশবাহিনী,মন্ত্রীবর্গ এদেরই বোঝায়? এঁরাই কেবলমাত্র রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিচালনার জন্য দায়ী? সাধারণ মানুষ কি রাষ্ট্রব্যবস্থার অংশ নন? রাষ্ট্রব্যবস্থাকে উন্নত করে গড়ে তোলার জন্য প্রতিটি নাগরিকের কি কোনও দায়িত্ব নেই?

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সরকার জনসাধারণের। তা, জনসাধারণের দ্বারা এবং জনসাধারণের জন্য গঠিত। তাই আমাদের দেশের প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব আছে সেই রাষ্ট্রব্যবস্থাকে পোষণ করবার | সেই পুষ্টিবিধানের অপরিহার্য ভিত্তি হল, প্রতিটি নাগরিকের নৈতিকতাপূর্ণ এবং সততাপূর্ণ জীবনচর্চা। এরকম চলতে থাকলে সরকারের পক্ষে জনকল্যাণকামী প্রকল্প গ্রহণ এবং রূপদান করা আর সম্ভব হবে না। তাতে কার লাভ হবে?

বলাই বাহুল্য সততাই একমাত্র বল, সততাই মূলধন। আর কেবলমাত্র ঈশ্বরে অনুরাগ ধর্মশিক্ষা ও ধর্মভাবই মানুষের মধ্যে সততার ফুল ফোটাতে পারে। যুগাবতার শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের শিক্ষা....'যে আছে, সে ঈশ্বরের কোলে শুয়ে আছে' আমাদের দেশের আবহমান কালের শিক্ষা...... 'তুমি সত্যকে রক্ষা করলে, সত্যও তোমাকে রক্ষা করবেন"|

কিন্তু বর্তমানে আমাদের দেশে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের বাহ্যিক আড়ম্বর এবং ধর্মীয় উন্মাদনার এত বাড়বাড়ন্ত হয়েছে, যে তার দমকা হাওয়ায় নাগরিক জীবনে সত্যানুরাগের শান্ত দীপশিখাটির প্রায় নিভন্ত অবস্থা।

অনেক বছর আগে একটি বাংলা আধুনিক গানের গীতিকার তাঁর মনের বেদনা ব্যক্ত করেছিলেন এই বলে...."এ কোন্ সকাল রাতের চেয়েও অন্ধকার?

এ কি সূর্য নাকি স্বপনের চিতা?

এ কি পাখির কূজন না কি হাহাকার?"

গানটির বাণীর এত বিষাদঘন রূপ অনেক শ্রোতাকেই ব্যথিত ও বিস্মিত করেছিল।

এ হাহাকার ছড়িয়ে পড়ুক, তা কাম্য নয়| কিন্তু, এই হাহাকার যে তীব্রতম রূপ ধরে আমাদের এই সিস্টেমের ভিতরটির সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে তাকে কুরেকুরে খেয়ে নিচ্ছে, তা বাস্তব এবং সেটাই দুঃখের।

তথ্য সূত্র : লেখক-এর নিজস্ব সংগ্রহ

লিখেছেন
Anasuya Sen
Anasuya Sen
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

সরবোন থেকে যন্তরমন্তর: যে আগুন বারবার বদলে দেয় পৃথিবীকে

May 1968 France student protests: এই যে ছেলেমেয়েরা যন্তরমন্তরের রাস্তায় স্লোগান দিচ্ছে, ধারাশ্রাবণের ভয় পিছনে ফেলে পার্লামেন্ট স্ট্রিটের দিকে এগিয়ে গেল, দক্ষিণী এক বৃদ্ধ তার ধুতি সামলাতে সামলাতে ছুটছেন তাদের সঙ্গে—কী মনোরম এই বারিপাত! কেমন যেন একটা দুর্দান্ত ফ্ল্যাশব্যাকে ঘুরে গেল সময়।

অঙ্কিতা ভাণ্ডারী মামলা: তিন অভিযুক্তের সাজা হয়েও মেটেনি ‘ভিআইপি’ রহস্য

Ankita Bhandari case highlights :অঙ্কিতার বাবা-মা অভিযোগ করেছেন, গৌতমই সেই ভিআইপি, যিনি তাঁদের মেয়েকে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন। তাঁরা রাষ্ট্রপতির কাছে গৌতমের রাজ্যপাল নিয়োগকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে গিয়েছেন, এই যুক্তিতে যে এই ‘ভিআইপি’কে কোনো পদে বহাল থাকার অনুমতি দেওয়ার আগে সিবিআই তদন্ত শেষ হওয়া উচিত।

জিডিপির বাইরে উন্নয়নের হিসাব, ভারতের অর্থনীতিকে অন্য চোখে দেখতে শিখিয়েছেন জঁ দ্রেজ

Economist Jean Drèze: দিল্লিতে সিজেপি বিক্ষোভের সময় পুলিশ আটক করল অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজকে। অমর্ত্য সেনের সহযোগী এই অর্থনীতিবিদ MGNREGA ও জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ২০২৬- এ পেয়েছেন গ্লোবাল ইনইকুয়ালিটি রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড।

জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন: তারুণ্য যা শেখালো ইন্ডিয়া জোটকে

Youth Protests and Opposition Unity: সংসদীয় রাজনীতিতে যেখানে প্রবীণ নেতারা ঐক্যের পথ খুঁজতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছিলেন, সেখানেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা ও বিভিন্ন অনিয়ম সংক্রান্ত ক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজপথে নামা তরুণ প্রজন্ম বিরোধীদের নতুন করে এক ছাতার তলায় আসার পথ তৈরি করছে।

কেন তুলে দিতে হচ্ছে মাদ্রাসা কমিশন? প্রশ্ন শিক্ষামহলের

West Bengal decides to merge Madrasah Service Commission: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৫ অক্টোবরের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের সঙ্গে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার।

আমার উৎসব, ওঁদের আরও একটা দীর্ঘ কাজের দিন

Durga Puja for Gig Workers: গিগ কর্মীদের দুর্গাপুজোর চার দিন কীভাবে কাটে? বাড়তি উপার্জনের আশায় ব্যক্তিগত আনন্দ, উৎসবের আমেজ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানোর সময় থেকে কতটা বিসর্জন দিতে হয় তাঁদের?

বাংলাদেশে রবীন্দ্র-বিরোধিতা নিয়ে কী বলছেন বুদ্ধিজীবীরা?

Tagore graffiti vandalism Bangladesh: বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? বুদ্ধিজীবীরা কী বলছেন?

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।