লিখেছিলেন বাংলা এনসাইক্লোপিডিয়া, বিস্মৃতির অতলে এই কৃতী বাঙালি

Debabrata Mondal
২ মিনিট
লিখেছিলেন বাংলা এনসাইক্লোপিডিয়া, বিস্মৃতির অতলে এই কৃতী বাঙালি

উত্তর কলকাতার বাগবাজার। সময় যেন হঠাৎ করেই থমকে দাঁড়িয়েছে এখানে। বাগবাজারের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে এখনও টের পাওয়া যায় বনেদি কলকাতার গন্ধ, বাগবাজারের প্রতিটি অলিগলি ঐতিহ্যের কথাই বলে সর্বক্ষণ। তবে বাগবাজারের আদি বাসিন্দারাও হয়তো মনে রাখেননি নগেন্দ্রনাথ বসুর নাম, যিনি সবার অন্তরালেই একপ্রকার বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলেছিলেন বাংলা সাহিত্যের জগতে। তাঁর বাসস্থানও অবহেলায় পড়ে থাকে এখন।

১৮৬৬ সালের ৬ জুলাই। সেদিন সকাল থেকে আকাশের মুখ ভার। একনাগাড়ে কেঁদে কেঁদেও ক্লান্ত হয় না সে। গঙ্গার পাড়ের গাছগুলো বারংবার মাথা ঝুঁকিয়ে প্রকৃতিকে কুর্নিশ করেও রেহাই পাচ্ছে না। এমনই এক বর্ষণমুখর দিনে বাগবাজারের কাঁটাপুকুর বাই লেন নামক এক গলিতে জন্ম নগেন্দ্রনাথ বসুর, যে গলির নাম এখন বিশ্বকোষ লেন, নগেন্দ্রনাথ বসুর কীর্তির নামানুসারে। নগেন্দ্রনাথ বসু ছিলেন এশিয়াটিক সোসাইটির সদস্য, একই সঙ্গে ঐতিহাসিকও। ১৯১৯ সাল নাগাদ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত হল নগেন্দ্রনাথ বসুর নাম। তাঁর আবিষ্কৃত বেশ কিছু তথ্যের ওপর ভিত্তি করে শুরু হলো কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ।

নগেন্দ্রনাথ বসুর হাতে খড়ি হয় 'ভারত' এবং 'তপস্বিনী' পত্রিকা সম্পাদনার মধ্য দিয়ে। এমনকী, পরবর্তীকালে 'শব্দকল্পদ্রুম' নামক একটি পত্রিকার সম্পাদনাও করেছিলেন তিনি। সময় থেমে থাকে না, সালটা ১৮৮৮। বাগবাজারের গলির সেই ছোট্ট ছেলেটা ততদিনে করে ফেলেছে অসাধ্যসাধন। তার হাত ধরেই আত্মপ্রকাশ করে 'বাংলা এনসাইক্লোপিডিয়া' বা বিশ্বকোষ।

১৮৮৭ সাল নাগাদ রঙ্গলাল মুখোপাধ্যায় এবং ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের প্রচেষ্টায় প্রকাশিত হয় ‘বিশ্বকোষ’। ১৮৮৮ সালে এর দায়িত্ব গ্রহণ করেন নগেন্দ্রনাথ বসু। দীর্ঘ বাইশ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমে সংকলিত বাইশটি খণ্ড প্রকাশিত হল ১৯১১ সালে।মোহনবাগান শিল্ড জিতে যখন আওয়াজ তুলেছে, 'ইংরেজ ভারত ছাড়ো', প্রায় একই সময়ে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে নিঃশব্দে বিপ্লব ঘটালেন উত্তর কলকাতার বাগবাজারের নগেন্দ্রনাথ বসু।

১৯৩৩ সালে নগেন্দ্রনাথ বসু আবার শুরু করলেন বিশ্বকোষের পরবর্তী সংস্করণের কাজ। যদিও ১৯৩৮ সাল নাগাদ তাঁর মৃত্যু ঘটলে সেই কাজ অসমাপ্তই থেকে যায়।

না এই কাজের স্বীকৃতি সেভাবে কোনওদিন জোটেনি নগেন্দ্রনাথ বসুর। আত্মবিস্মৃতি রোগে আক্রান্ত বাঙালি নগেন্দ্রনাথ বসুকে ভুলেছে অনেককাল আগেই। নগেন্দ্রনাথ বসুর কল্যাণেই কাঁটাপুকুর বাই লেনের নাম হয় 'বিশ্বকোষ লেন' এবং একই সঙ্গে ইতিহাসের সরণিতে পা রাখেন নগেন্দ্রনাথ বসু, সম্ভবত কোনও বইয়ের নাম অনুযায়ী এই প্রথম কোনও রাস্তার নামকরণ হল। অথচ, ‘প্রাচ্য মহাবিদ্যার্ণব ' এখন বিস্মৃতির অন্তরালে। নগেন্দ্রনাথ বসুর নামফলক এখনও রয়েছে তাঁর বাড়িতে। কিন্তু পথচলতি মানুষের হয়তো চোখেও পড়ে না তা। সেই বাড়ির এখন জীর্ণদশা, সংরক্ষণের কোনও প্রয়াসও নেই এই বাড়িকে ঘিরে। এক স্থানীয় বাসিন্দার কথায়, বিশ্বকোষ লেন নামটা অনেকে জানলেও, এই নামের উৎস সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নয় প্রায় কেউই। এভাবেই নিজ এলাকাতেই বিস্মৃত হয়ে রয়েছেন নগেন্দ্রনাথ।

তথ্যসূত্র: কলকাতার সাতকাহন, আনন্দবাজার পত্রিকা

লিখেছেন
Debabrata Mondal
Debabrata Mondal
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।