বেঞ্জেমা থেকে দি মারিয়া, কাতার যাঁদের শেষ বিশ্বকাপের মঞ্চ হয়ে রইল
FIFA World Cup 2022 : হয়তো পরের বিশ্বকাপে এঁদের অনেককেই আর দেখা যাবে না। কারা তাঁরা, এক নজরে দেখে নেওয়া যাক…

বিশ্বকাপের মরসুম শেষ হয়ে গিয়েছে। একটু একটু করে ফুটবল বিশ্ব এবার নজর দেবে ক্লাব ফুটবলের দিকে। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের দিকে নজর সবার। সেইসঙ্গে আর্জেন্টিনার বিশ্বজয়ের সোনালি মুহূর্ত যেন এখনও শেষ হচ্ছে না। ১৮ ডিসেম্বরের ফাইনালকে ইতিমধ্যেই সর্বকালের অন্যতম সেরা লড়াই বলে ঘোষণা করেছেন ফুটবল বোদ্ধাদের একটা বড়ো অংশ। সর্বকালের সেরা ফুটবলার কে, তা নিয়ে অবশ্য দ্বন্দ্ব অব্যাহত। তবে তকিছুর মধ্যেও, করোনার ভয়াবহতা কাটিয়ে মানুষ যে আবার এই আনন্দের স্রোতে গা ভাসিয়েছেন, সেটাই স্বস্তির। সাময়িক হলেও, এই রাত জাগা অনেকেরই সার্থক।
তবে অনেকের কাছে মন খারাপের কারণও। কাতারের এই বিশ্বকাপ অনেক অঘটন উপহার দিয়েছে। দেখিয়েছে ছোট দলগুলির উত্থান, দেখিয়েছে সুপারস্টারদের কান্না। চোখের জল ফেলে বিদায় নিয়েছে জার্মানি, স্পেন, পর্তুগাল। ভবিষ্যতের সেরা তারকাদের মঞ্চও তৈরি করে দিল এই বিশ্বকাপ। সেইসঙ্গে দেখল বেশ কয়েকজন কিংবদন্তির বিদায়। তার সঙ্গে জুড়ে রয়েছে আসন্ন বিদায়ের সম্ভাবনা। হয়তো পরের বিশ্বকাপে এঁদের অনেককেই আর দেখা যাবে না। কারা তাঁরা, এক নজরে দেখে নেওয়া যাক…
ম্যানুয়েল ন্যুয়ের
জার্মানির এই গোলরক্ষক ইতিমধ্যেই কিংবদন্তিদের তালিকায় জায়গা নিয়ে নিয়েছেন। অলিভার কানের দেশের এই খেলোয়াড়ের অবিশ্বাস্য সব সেভ আজও ফুটবল ইতিহাসের অঙ্গ। কেবল জার্মানির নয়, বিশ্ব ফুটবলের সর্বকালের সেরা গোলরক্ষকদের তালিকায় ন্যুয়ের অবশ্যই থাকবেন। ‘সুইপার কিপার’ ন্যুয়ের গত দশকের সেরা গোলকিপার নির্বাচিত হয়েছিলেন। অবশ্য ২০১৪-র বিশ্বজয়ী টিমের এই সদস্যের গত দু’টি বিশ্বকাপ একেবারেই ভালো গেল না। আগেভাগেই ছিটকে গেল জার্মানি। এবারও গ্রুপ পর্যায় থেকেই বিদায় নিয়েছিলেন ন্যুয়ের। এখনও অবসরের কথা ঘোষণা করেননি তিনি। ৩৬ বছর বয়সী এই গোলরক্ষক জানিয়েছেন, ২০২৪-র ইউরো কাপেও তিনি খেলতে চান। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের সময় তাঁর বয়স হবে ৪০। হয়তো তাঁকে আর ফুটবল মাঠে দেখা যাবে না।
থিয়াগো সিলভা
বিখ্যাত হলুদ জার্সির বিশ্বস্ত নেতা – তাঁকে এই তকমা দিলে কোনও অত্যুক্তি হয় না। চেলসি এবং ব্রাজিলের সেন্টার ব্যাক পজিশনে খেলা এই ফুটবলারকে এই সময়ের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার বলে মানা হয়। সেইসঙ্গে আছে নেতৃত্বদানের অবিশ্বাস্য ক্ষমতা। দীর্ঘ কয়েক বছর ব্রাজিল ফুটবল দলের নেতা হিসেবে তিনি ছাড়া আর কাউকেই মনে করা যায় না। কোয়ার্টার ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার কাছে হারের পর ব্রাজিল বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয়। এখন থিয়াগো সিলভার বয়স ৩৮। পরবর্তী বিশ্বকাপে তাঁকে আর দেখা যাবে না, এটা প্রায় নিশ্চিত।
দানি আলভেজ
ব্রাজিলে থিয়াগো সিলভারই অন্যতম সঙ্গী। বিশ্বের সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুল ব্যাক। ট্রফি ক্যাবিনেটে প্রায় সবরকম পুরস্কারই ঢুকেছে। বিশ্বকাপ, অলিম্পিকে সোনা, কোপা আমেরিকা তো বটেই, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, লা লিগাও তাঁর দখলে। দানি আলভেজ ব্রাজিলের অন্যতম ভরসার নাম। বার্সেলোনায় লিওনেল মেসির সতীর্থ এই ফুটবলার কাতার বিশ্বকাপে সেভাবে জায়গা পাননি দলে। একটি ম্যাচেই মাঠে নেমেছিলেন। ৩৯ বছর বয়সী দানি আলভেজও পরবর্তী বিশ্বকাপের আগেই আলভিদা জানাবেন, সে নিয়ে অনেকেই নিশ্চিত। তাই রয়েছে মন খারাপও।
সার্জিও বুসকেতস
স্পেনের দীর্ঘদিনের ভরসার মুখ। বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার তিনি। বার্সেলোনা, স্পেনের অধিনায়ক। কিন্তু মরক্কোর কাছে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেওয়ার পর ভেঙে পড়েছিলেন সার্জিও বুসকেতস। শেষমেশ ৩৪ বছরের এই খেলোয়াড় সোশ্যাল মিডিয়ায় আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের কথা ঘোষণা করেন। ২০১০-এর বিশ্বকাপ, ২০১২ সালের ইউরো কাপ জয়ের অন্যতম কাণ্ডারি এই ফুটবলারকে স্প্যানিশ ব্রিগেড নিশ্চিত মিস করবে।
করিম বেঞ্জেমা
২০২২-এর ব্যালন ডি অর এই ভদ্রলোককে না দিলে বোধহয় অন্যায় হতো। পেয়েওছেন। এই বিশ্বকাপের আগে দুরন্ত ফর্মেও ছিলেন। কিন্তু বিধি বাম! থাইয়ে একটি চোট পুরো ছবিটাই পাল্টে দিল। ফ্রান্সের টিমে খেলতে পারলেন না। ফাইনালে হয়তো ফিরে আসতেন; কিন্তু না! রিয়াল মাদ্রিদ ও ফ্রান্সের অন্যতম ভরসার মুখ করিম বেঞ্জেমা। জিরৌ, এমবাপের দৌরাত্ম্যের মাঝে তাঁকে নিশ্চয়ই মিস করেছে ফুটবল বিশ্ব। কাতারের মহারণ শেষ হওয়ার পর এই বেঞ্জেমাই সোশ্যাল মিডিয়ায় অবসরের কথা ঘোষণা করে। আন্তর্জাতিক ফুটবল বিশ্বকে আলভিদা জানিয়েছেন তিনি।
লুকা মদরিচ
তাঁর নামটিই তাঁর পরিচয়। ক্রোয়েশিয়াকে ফুটবল মানচিত্রে শক্তিশালী জায়গা দেওয়ার কারিগর তিনি। দেশের সর্বকালের সেরা ফুটবলার। কারও কারও মতে, পৃথিবীর ইতিহাসেরও সর্বকালের সেরা মিডফিল্ডার। গোল করা, করানো, আক্রমণ তৈরি করা, ডিফেন্সে লোড বাড়ানো – লুকা মদরিচ একাই একশো। মাঠের মাঝে ম্যাজিক তৈরি করতে জানেন তিনি। সেমি ফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে হারের পরও সবাই উঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে সাধুবাদ জানান। ২০১৮ বিশ্বকাপের রানার্স আপ, এই বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থানাধিকারী দলটির আশার প্রতীক। ক্রোয়েশিয়ার ‘এলএম ১০’-র বয়স ৩৭ বছর। এটাই যে তাঁর শেষ বিশ্বকাপ হয়ে গেল, তা হয়তো বলা যায়।
পেপে
রগচটা, মাঠে হামেশাই মাথা গরম করে ফেলেন। কিন্তু পর্তুগালের ডিফেন্সের অন্যতম স্তম্ভ ছিলেন তিনি। ২০১৬-র ইউরোজয়ী দলের অন্যতম সদস্য পেপের এখন বয়স ৩৯। নিশ্চিতভাবেই পরের বিশ্বকাপে তাঁকে আর দেখা যাবে না।
ইডেন হ্যাজার্ড
দেখতে গেলে, এই তালিকার সবচেয়ে কম বয়স্ক খেলোয়াড়। মাত্র ৩১ বছরেই আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানিয়েছেন হ্যাজার্ড। বেলজিয়ামের আক্রমণভাগের অন্যতম ভরসা এই খেলোয়াড় বহু সময় দলকে অক্সিজেন দিয়েছেন। ক্লাব ফুটবলে চেলসি হোক বা রিয়াল মাদ্রিদ, তাঁর পা মাঠে কথা বলেছে। সেই হ্যাজার্ড আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানানোয় বেলজিয়ামের মুখ ভার। এবারের বিশ্বকাপে তাদের শোচনীয় পারফরমেন্সের জন্যই কি এই সিদ্ধান্ত?
অ্যাঞ্জেল দি মারিয়া
বিশ্বজয়ী দলের অন্যতম আলো তিনি। কোপা আমেরিকায় তাঁর গোলের সুবাদেই চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল আর্জেন্টিনা। এই বিশ্বকাপের ফাইনালেও তাঁর গোলটি মুগ্ধ করেছিল। লিওনেল মেসির পাশে দি মারিয়া যেন আগ্নেয়গিরির মতো খেলেছেন বরাবর। মেসির ছায়ায় বারবার ঢাকা পড়ে গিএয়ছেন। কিন্তু বিশ্বের সর্বকালের অন্যতম সেরার তকমা কেউ কেড়ে নিতে পারেনি। এখন দি মারিয়ার বয়স ৩৪ বছর। পরবর্তী বিশ্বকাপে হয়তো তাঁকে দেখা যাবে না। এখনও অবসর নিয়ে কিছু বলেননি। বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হিসেবে এখনও কিছু ম্যাচে তাঁকে দেখা যাবে বলেই আশাবাদী ভক্তরা।
লুই সুয়ারেজ, এডিশন কাভানি
একই দলের দুই সতীর্থ। উরুগুয়ের আক্রমণ ভাগের মূল দুই স্তম্ভ। বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকে ছিটকে যাওয়ার পর সুয়ারেজের কান্না ভোলেনি ফুটবল দুনিয়া। নিজের সময় বিশ্বের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার সুয়ারেজকেও যে পরের বিশ্বকাপে দেখা যাবে না, সেটা বলা যায়। একই অবস্থা কাভানিরও। তবে এখনও দুজনে কিছু ঘোষণা করেননি।
তালিকা এখানেই শেষ হতে পারত। নাম আরও বাকি রয়ে গিয়েছে নিশ্চয়ই। কিন্তু শেষ করা যাক চারজনের কথা বলে। লিওনেল মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো, টমাস মুলার এবং নেইমার। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপই যে তাঁর শেষ, সেই কথা আগেই জানিয়েছিলেন মেসি। এমনও বলেছিলেন, ১৮ ডিসেম্বরের ফাইনাল তাঁর শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ। কিন্তু বিশ্বকাপ জেতার স্বপ্ন ছোঁয়ার পর সমস্ত কিছু বদলে গিয়েছে। মেসি বলেছেন, তিনি এখনও খেলতে চান।
একই বক্তব্য রোনাল্ডোর ক্ষেত্রেও। বিশ্বকাপ থেকে চোখের জল নিয়ে ছিটকে গিয়েছেন। কিন্তু ৩৭ বছরের ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো যে এখনই অবসর নিচ্ছেন না, সেটা জানিয়ে দিয়েছেন। ইউরো কাপে হয়তো তাঁকে ফের দেখা যাবে। কিন্তু চার বছর পর বিশ্বকাপে দেখা যাবে কিনা, সেটা বলা যাচ্ছে না। দেখা না যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
অন্যদিকে, মুলার আর নেইমার দু’জনেই অবসরের ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছেন। এখনই কিছু জানাননি, সামান্য সময় নিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু বিশ্বকাপের পর তাঁদের সাক্ষাৎকার জানান দিচ্ছে, হয়তো অবসরের ঘোষণা আসতেও পারে। তাই সামনের বিশ্বকাপে নেইমার ম্যাজিক বা মুলারের বিস্ফোরণ দেখা যাবে কিনা, তা নিয়ে রয়েছে সংশয়।







