কেন ডাকাতরা মা কালির পুজো করে?

Amit Pratihar
৩ মিনিট
কেন ডাকাতরা মা কালির পুজো করে?

কালিপুজোর সাথে ডাকাতদের ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকার গল্প আমরা প্রায় প্রত্যেকেই কমবেশি জানি। আগেকার দিনের হাড় হিম করা ডাকাতদের ডাকাতির গল্প আমরা শুনেছি প্রত্যেকেই অল্পবিস্তর। ইয়াপ বড় বড় পেটাই চেহারার ডাকাতরা যে কোনও ডাকাতির আগেই মা কালির পুজো করতেন, মা কে প্রসন্ন করতে দেওয়া হতো নরবলি পাঁঠাবলি। তারপর 'হা রে রে রে' শব্দে তারা বেরোতো ডাকাতি করতে। ডাকাতি সেরে এসে ডাকাতরা লুন্ঠন করা সামগ্রী মায়ের পায়ে সমর্পণ ও করতেন। কিন্তু কেন? ডাকাতদের সাথে মা কালির কী সম্পর্ক? সেটাই জেনে নেবো আজ।

প্রায় ১১০ বছরের বেশি সময় ধরে নদীয়ার মাজদিয়া ঘোষপাড়ায় ডাকাতে কালিতলায় ডাকাত কালির পুজো হয়ে আসছে। প্রতিবছর ধুমধাম করে পালন করা হয় এই পুজো। দূরদূরান্ত থেকে লোক আসেন মায়ের দর্শন করতে। মা নাকি খুবই জাগ্রত। একাগ্র চিত্তে মায়ের কাছে যা মানত করা হয়, সেই মনকামনা মা পুণ্য করে থাকেন। এই কালি পুজো নিয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন গায়ের লোম খাড়া করা গল্প। যে গল্পের মধ্যেই লুকিয়ে আছে মা কালির সাথে ডাকাতদের সম্পর্ক।

তখন ইংরেজ আমল। নদীয়ার এই অংশে গ্রামের মানুষদের চরম দুর্দশা। গ্রামের মানুষ খেতে পাচ্ছে না, চরম দুর্ভোগে কাটছে তাদের জীবন। রুগী মানুষদের চিকিৎসা হচ্ছে না। এমন সময় গ্রামের তরুণ সাহসী যুবকরা সিদ্ধান্ত নেন তারা এইভাবে গ্রামের মানুষদের মরতে দিতে পারেন না। অতঃপর? উপায় কী? ডাকাতি। তারা ঠিক করেন যাদের জন্য গ্রামের মানুষের এই হাল, তাদের ওপরই ডাকাতি করবেন। ইংরেজদের মাল বোঝাই ট্রেন লুন্ঠন করার সিদ্ধান্ত নিলেন তারা। ডাকাতি করার পর যা সম্পত্তি পাওয়া যাবে তা গ্রামের অসহায় মানুষদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া হবে।

যা ভাবা তাই কাজ, ঢাকার দিকে ব্রিটিশদের একটি মাল বোঝাই ট্রেন যাচ্ছিলো। ইংরেজদের তখন কড়া শাসন ভারতের বুকে। তাদেরই শাসনে তাদের ওপরেই ডাকাতি করা চারটিখানি কথা নয়। গ্রামের সাহসী তরুণেরা সে'সবের পরোয়া না করে, তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নেন ট্রেন ডাকাতি করার। মাজদিয়ার ইছামতি নদীর ব্রিজের ওপর দিয়ে ট্রেন যাচ্ছিলো। লণ্ঠনের আলো দেখিয়ে ট্রেনের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড় করানো হয় ট্রেন। একের পর এক ডিব্বা থেকে নামানো হয় ট্রেনের সমস্ত মাল। কাপড়, কাঁচা আনাজ, দামি সামগ্রী। কিছুই বাদ দেওয়া হয় না। খবর চলে যায় ইংরেজদের কানে। তৎক্ষণাৎ ইংরেজদের বিশাল বাহিনী হাজির হয় ইছামতির ব্রিজে।

ডাকাতরা গা ঢাকা দেয় পাশের ঘন জঙ্গলে। কারা ছিলেন সেই ডাকাতদলের প্রমুখ মুখ? হেমন্ত বিশ্বাস, দুলাল প্রামাণিক, কৃত্তিবাস মিত্র, ভরত সর্দার, গিরীন্দ্রনাথ ঘোষ এর মত বিখ্যাত স্বাধীনতা সংগ্রামের সাথে যুক্ত যুবকরাই এই ডাকাতি পরিচালনা করেন। জঙ্গলে ব্রিটিশ বাহিনী তন্ন তন্ন করে খোঁজ চালায় ডাকাত দলের। দিনের পর দিন, জঙ্গলে গা ঢাকা দিয়ে তখন হতাশ ডাকাত দল। ব্রিটিশ বাহিনী চারিদিক দিয়ে জঙ্গল ঘিরে রেখেছে। যে কোনও মুহূর্তে ডাকাত দল ধরা পড়বে। মৃত্যু নিশ্চিত, সাথে লুঠের সামগ্রীও পৌঁছাবে না গ্রামের অসহায় মানুষগুলোর কাছে। ডাকাতদল মনে মনে মা কালিকে স্মরণ করেন এই বিপদে। আশ্চর্যজনক ভাবেই ঠিক কালিপুজোর আগের দিন ব্রিটিশ বাহিনী জঙ্গল ছেড়ে চলে যায়। পরের দিন পূর্ণ অমাবস্যা, মা কালির পুজোর তিথি। ডাকাতরা গ্রামে ফিরলো। ফিরেই মায়ের বিগ্রহ প্রতিস্থাপন করে মায়ের আরাধনা শুরু করলো। সেই থেকেই মায়ের নাম ডাকাত কালি। এই খবর ছড়িয়ে যায় সারা দেশ জুড়ে। দিকে দিকে ডাকাতরা মা কালির আরাধনা করতে শুরু করে।

এখনও মাজদিয়ার প্রত্যেক ব্যক্তি এই ডাকাত দলকে অত্যন্ত সম্মানের চোখে দেখেন। ডাকাত দলের উত্তর পুরুষরা কেউ বা শিক্ষক, কেউ বা রয়েছেন সেনাবাহিনীতে আবার কেউ বা পুলিশে কর্মরত। এই কালী পুজো নিয়ে এখনও একটি গল্প প্রচলিত রয়েছে। প্রতিবছর নাকি কালীপুজোর আগের দিন রাত্রে ডাকাতি করা চাই। নইলে মায়ের আরাধনায় ব্যাঘাত হবে। এই কাজ আটকাতে পুলিশ তাই আগে থাকতেই কয়েকজনকে সন্দেহবশত থানায় আটকে রাখে। এই সমস্যার সমাধান পেতে গ্রামের কয়েকজন সদস্য পুলিশের চোখ এড়িয়ে সেই আটক ব্যক্তিদের স্থানে কম্বলের মধ্যে লুকিয়ে যান। সেই সুযোগে আটক ব্যক্তিরা পালিয়ে গিয়ে ডাকাতি করে এসে পরদিন সকালে যথাস্থানে আবার ফিরে যান। পুলিশ এই ঘটনার কোন টেরও পায় না। ডাকাতির সামগ্রী দিয়ে মায়ের পুজোর সামগ্রী কিনে বাদবাকি জিনিস বিলিয়ে দেওয়া হয় অসহায় মানুষের মধ্যে। এই ডাকাতদল সব সময় দাঁড়িয়েছে গরীব এবং দুঃস্থ মানুষদের পাশে। এমনকি এই ডাকাতদল কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির ট্রেজারিতেও ডাকাতি করেছে।

এই ডাকাতে কালির পুজোর আগে ডাকাতির ঘটনা বন্ধ হয়েছে ইদানিংকালে। কোনও এক রাজবাড়িতে ডাকাতি করতে গিয়ে ডাকাতদল মা কালির দর্শন পায়। মা কালি তাদের নির্দেশ দেয় ডাকাতি করা বন্ধ করতে। আসলে সে রাজবাড়ীর রাণী নিজেই মায়ের সাজে সেজে ডাকাতদলকে এই নির্দেশ দেন।

লিখেছেন
Amit Pratihar
Amit Pratihar
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ঋত্বিক: ফিরে দেখা

Ritwik Ghatak: আমরা যখন ছোট ছিলাম, মানে ষাটের দশকের সেই শেষ দিকে বা সত্তরের দশকে, তিনি কত না অদ্ভুতভাবে আমাদের প্রভাবিত করতেন। যেমন একদিন আমাদের রবীন্দ্রসদনের সামনে দেখতে পেয়ে তিনি হঠাৎ বললেন, আমাকে একটা ট্যাক্সি ধরে দেবে?

কলকাতায় চালু হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস

West Bengal School of Magic: মুখ্যমন্ত্রী ‘পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক, ইল্যুশন অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস’ স্থাপনের প্রস্তাবে অনুমোদন করেছেন। পুজোর পর উপদেষ্টা কমিটির সদস্যরা বৈঠক করবেন।

বিভূতিভূষণের উপন্যাস কেবল দৃশ্যের নয়, শব্দেরও এক জগৎ তৈরি করে

Bibhutibhushan Bandyopadhyay: বাংলা সাহিত্যে বিভূতিভূষণকে আমরা সাধারণত প্রকৃতির কবি বলেই চিনি। তাঁর বর্ণনায় নদী, মাঠ, বন, আকাশ, ঋতু আর গ্রামীণ জীবনের যে ছবি ফুটে ওঠে, তা নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তাঁর সাহিত্যকে যদি একটু অন্য দিক থেকে দেখা যায়? যদি আমরা শুধু দৃশ্যের দিকে না তাকিয়ে শোনার চেষ্টা করি?

স্ট্যাচু অব লিবার্টি ও আমেরিকার অভিবাসন: আমেরিকার ইতিহাসে আশ্রয়প্রার্থীদের জায়গা কোথায়?

Statue of Liberty: স্ট্যাচু অব লিবার্টির ধারণার সূত্রপাত ১৮৬৫ সালে। ফরাসি রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এদুয়ার্দ দ্য লাবুলে আমেরিকার স্বাধীনতার শতবর্ষ এবং ফ্রান্স-আমেরিকার বন্ধুত্বকে স্মরণ করে স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ধারণা দেন।

এশিয়ার সেরা মিউজিয়ামের স্বীকৃতি পাটনার, কীভাবে বিশ্বসেরাদের টেক্কা দিল বিহার মিউজিয়াম?

Patna Outranks paris: বিশ্বের সেরা ১০০টি মিউজিয়ামের তালিকায় নবম স্থান অর্জন করে কীভাবে ল্যুভর ও মেটের মতো বিখ্যাত জাদুঘরকে পিছনে ফেলে এশিয়ার সেরা মিউজিয়াম হয়ে উঠল পাটনার বিহার মিউজিয়াম?

দেশভাগের ইতিহাসকে নারীর চোখে দেখা: অংশুমান করের ‘হিরণবালা’

Hiranbala Novel Review: বাংলা উদ্বাস্তু-আখ্যানের বড় অংশে দেশভাগের অভিজ্ঞতা এসেছে পুরুষের জীবন, তার মনস্তত্ত্ব ও তার গতিবিধির ভিতর দিয়ে। ‘হিরণবালা’ প্রথমেই এই কাঠামো ভেঙে দেয়। উদ্বাস্তু পরিবারের গল্পে একজন নারীকে নিষ্ক্রিয় বা পরোক্ষ ভূমিকায় না দেখিয়ে, উদ্বাস্তু হওয়ার অভিজ্ঞতাটিকে প্রত্যক্ষভাবে বুনে দেয় নারীটির জীবন। দেশভাগকে প্রায় অদৃশ্য করে হিরণকে উদ্বাস্তু করা শুরু হয় ১৯৪৬ সালে, বিয়ের মধ্য দিয়ে।

সুকুমার রায়ের সঙ্গে চার্লি চ্যাপলিনের ভীষণ মিল পাই: স্বাগতালক্ষ্মী দাশগুপ্ত

Sukumar Ray Literature: কেউ যদি অনেক বড় বয়সেও ছোট থাকতে চায়— যেমন আমি বলি যে আমার বয়স বাড়েনি— আর যদি নিজের বয়সটাকে একই জায়গায় ধরে রাখতে ইচ্ছে করে, তবে মনে হয় সুকুমার রায়ের সমগ্র তাঁর সারাজীবন বিছানার পাশে গীতবিতানের মতোই চিরসঙ্গী হয়ে থাকতে পারে।

বাংলার দেশি খাসির মাংস থেকে চিংড়ি শুঁটকি, জিআই তকমার অপেক্ষায় কোন কোন খাবার?

GI Tag Registration: বাংলার দেশি খাসির মাংস, ইলিশের বিভিন্ন পণ্য ও চিংড়ি শুঁটকি জিআই স্বীকৃতি পেতে চলেছে। আবেদন প্রক্রিয়া এগিয়েছে, আগামী এক বছরের মধ্যে স্বীকৃতি পাওয়ার আশা। কিন্তু জিআই তকমা কী এবং এই স্বীকৃতি পেলে বাংলার উৎপাদকদের কী লাভ হবে?