টালমাটাল যুদ্ধবিরতি, কেন ফের উত্তপ্ত আমেরিকা-ইরান সম্পর্ক?
US-Iran Tensions Escalate Again: হরমুজ প্রণালী ঘিরে নতুন করে মুখোমুখি আমেরিকা ও ইরান। যুদ্ধবিরতির পর পাল্টাপাল্টি হামলায় পশ্চিম এশিয়ায় ফের উত্তেজনা, বাড়ছে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর খুব বেশি সময় পেরোয়নি। কিন্তু সেই যুদ্ধবিরতি এখন নতুন করে বড় পরীক্ষার মুখে। পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে আবারও পাল্টাপাল্টি সামরিক হামলা হয়েছে। ফলে পশ্চিম এশিয়ায় শান্তি ফিরবে বলে যে আশা তৈরি হয়েছিল, তা এখন অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত একটি বাণিজ্যিক মালবাহী জাহাজে ড্রোন হামলাকে ঘিরে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী একটি কার্গো জাহাজের উপর ইরানের ড্রোন হামলা যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করেছে। জাহাজটি হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচল করছিল। হামলার পর মার্কিন সেনাবাহিনী দ্রুত পাল্টা অভিযান চালায়।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সংরক্ষণ কেন্দ্র, উপকূলীয় রাডার ব্যবস্থা এবং সামরিক পরিকাঠামো লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালানো হয়েছে। ওয়াশিংটনের দাবি, এই অভিযান ছিল সীমিত এবং শুধুমাত্র ভবিষ্যতের হামলা ঠেকানোর উদ্দেশ্যেই পরিচালিত হয়েছে।
অন্যদিকে ইরানও পাল্টা জবাব দিতে দেরি করেনি। ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলিকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছে, ভবিষ্যতে আবার হামলা হলে আরও কড়া জবাব দেওয়া হবে।
এই ঘটনায় সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে। বিশ্বের সমুদ্রপথে তেল পরিবহনের একটি বড় অংশ এই জলপথ দিয়েই হয়। ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক শিপিং সংস্থাগুলির মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে এবং কয়েকটি জাহাজ বিকল্প পথ বেছে নেওয়ার কথাও ভাবছে।
মাত্র কয়েক দিন আগেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা হয়েছিল। সেই চুক্তির অন্যতম শর্ত ছিল হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা এবং দুই দেশ সামরিক সংঘাত এড়াবে। একই সঙ্গে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনাও এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল।
কিন্তু সর্বশেষ ঘটনায় সেই সমঝোতার ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠে গিয়েছে। ওয়াশিংটনের বক্তব্য, ইরানের ড্রোন হামলাই যুদ্ধবিরতির প্রথম বড় লঙ্ঘন। অন্যদিকে তেহরানের দাবি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপই পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, উভয় পক্ষই আপাতত পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ এড়াতে চাইছে। তাই হামলার লক্ষ্যও সীমিত রাখা হয়েছে। তবে এই ধরনের পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপ ভুল বোঝাবুঝি বা অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে বড় সংঘর্ষের দিকে পরিস্থিতিকে ঠেলে দিতে পারে।
পশ্চিম এশিয়ার সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কূটনৈতিক উদ্যোগ। পাকিস্তান, কাতার-সহ একাধিক দেশ মধ্যস্থতার মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। লক্ষ্য, যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখা এবং পরমাণু ইস্যুতে স্থায়ী সমঝোতার পথ তৈরি করা।
তবে নতুন সামরিক সংঘর্ষ সেই প্রচেষ্টাকেও কঠিন করে তুলেছে। সাম্প্রতিক এই হামলা কি সাময়িক উত্তেজনা হিসেবেই থেমে যাবে, নাকি এটি আবারও বৃহত্তর সংঘাতের সূচনা করবে? তার উত্তরই নির্ধারণ করবে আগামী দিনে পশ্চিম এশিয়ার রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির ভবিষ্যৎ।








