বিনায়ক লোহানী

Anasuya Sen
৪ মিনিট
বিনায়ক লোহানী

মধ্যপ্রদেশের ভোপালে জন্ম হয় বিনায়ক লোহানীর।ভোপালেই নিজের স্কুলের গন্ডি পার করেন তিনি। তবে পূর্বে তার পরিবারের বসবাস ছিল উত্তরাখণ্ডের কুমায়ুন অঞ্চলের আলমোড়া জেলায়। তাঁর বাবা ইন্ডিয়ান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস (IAS) -এর এমপি ক্যাডারে কর্মরত ছিলেন। ভোপালে নিজের স্কুলের গন্ডি পার করে বিনায়ক লোহানী বি.টেক (B.Tech) -এর জন্য ভর্তি হন আইআইটি (IIT) খড়্গপুরে। সেখান থেকে বি.টেক পাশ করে একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে যোগদান করেন তিনি। সেখানে ১ বছর যুক্ত থাকার পর সেটি ছেড়ে ফের নিজের পড়াশুনা শুরু করেন বিনায়ক। ২০০১ সালে কলকাতার ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ম্যানেজমেন্ট (IIM)-এ ভর্তি হন এমবিএ (MBA) -এর জন্য। ২০০৩ সালে এমবিএ শেষ করে প্লেসমেন্টের জন্য অপেক্ষা না করে তিনি শুরু করেন তার নিজের সংস্থা 'পরিবার'।

একটি ছোট্ট ভাড়া বাড়িতে সামান্য কিছু অর্থ নিয়ে মাত্র ৩ জন শিশুকে নিয়ে বিনায়ক লোহানী শুরু করেছিলেন তাঁর সংস্থা 'পরিবার'। তাঁর এই সংস্থা গড়ে তোলার পিছনে ছিল তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম। দরিদ্র শিশুদের পাশে দাঁড়ানোর জন্যই তিনি শুরু করেছিলেন তার এই সংস্থা। ২০০৪ সালের শেষের দিকে নিজের সংস্থার জন্য জমি কেনেন বিনায়ক লোহানী। ঐ জমিতেই গড়ে তোলেন পরিবারের প্রথম ক্যাম্পাস ---- 'পরিবার আশ্রম'। এরপরেই আস্তে আস্তে শুরু হয় পরিবারের পথ চলা। ২০১১ সালে মেয়েদের জন্য এবং ছেলেদের জন্য তৈরী হয় আলাদা ক্যাম্পাস। মাত্র ৩ জনকে নিয়ে শুরু হয়েছিল বিনায়ক লোহানীর 'পরিবার', সেটি ২০১৮ সালে গিয়ে পৌঁছয় ২০০০ জনে। ছেলে-মেয়ে মিলিয়ে ২০০০-এর ও বেশি শিশু লোহানীর পরিবারের সদস্য হয়ে ওঠে ; এবং 'পরিবার' পশ্চিমবঙ্গের দরিদ্র স্তরের শিশুদের জন্য সবচেয়ে বড় এবং উচ্চমানের আবাসিক কর্মসূচিতে পরিণত হয়।

পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি ২০১৬-১৭ সালে মধ্যপ্রদেশেও কাজ শুরু করে পরিবার। শুরু হয় ২৪৮ দিনের বোর্ডিং ( বিনা পয়সায় খাওয়া এবং শিক্ষা) দরিদ্র উপজাতি শিশুদের জন্য ; এবং ঐ প্রতিষ্ঠানটির নামকরণ হয় 'শ্রীরামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ সেবা কুটির'। বিনায়ক লোহানী স্বামী বিবেকানন্দের আধ্যাত্মিক ও মানবতাবাদী আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন ; এবং সেই কারণেই তাঁর প্রতিষ্ঠানের নামকরণ হয় রামকৃষ্ণদেব ও স্বামীজীর নামে। দেওয়াস, সিহোর, মন্ডলা, শেওপুর, ছিন্দওয়ারা, খান্দওয়া, বিদিশা এবং দিন্দোরি জেলায় শুরু হয় লোহানীর এই প্রতিষ্ঠানের কাজ। তাঁর এই প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২৫ হাজার শিশু বিনা পয়সায় খাবার পাচ্ছে (সকালের জলখাবার এবং রাতের খাবার), পাশাপাশি শিক্ষাও পাচ্ছে ওই সমস্ত শিশুরা।

পশ্চিমবঙ্গের সন্দলপুরে আরও একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছেন বিনায়ক লোহানী। ঐ প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৫০০ জন শিশু থাকতে পারবে। এই মুহূর্তে কাজও শুরু হয়ে গেছে। আস্তে আস্তে বাড়ানো হবে সন্দলপুরের ঐ প্রতিষ্ঠানটি।

এই মুহূর্তে বাংলায়, 'পরিবারে'র দুটি আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে - ছেলেদের জন্য "পরিবার বিবেকানন্দ সেবাশ্রম" এবং মেয়েদের জন্য "পরিবার সারদা তীর্থ"। ২১০০-এর ও বেশি শিশু পরিবারের সদস্য।৫ বছর বয়স থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত ছেলে ও মেয়েদের জন্য প্রেমময় ও যত্নশীল পরিবেশে বিনায়ক লোহানীর 'পরিবার' শিক্ষা ও সার্বিক শিশু বিকাশের সকল সুযোগ প্রদান করে আসছে।

এছাড়াও মান্ডলাতে ১৫০ জন শিশুর জন্য গড়ে তোলা হয়েছে দুটি হোস্টেল।ছেলেদের হোস্টেলটির নাম 'পরিবার বিবেকানন্দ বিদ্যার্থী সদন' এবং মেয়েদের হোস্টেলটির নাম 'পরিবার ভাগিনী নিবেদিতা সদন'। পাশাপাশি দিওয়াদিয়া গ্রামে সিহোর জেলায়ও একটি হোস্টেল গড়ে তোলা হয়েছে ২০টি মেয়ের জন্য।

পরিবারকে আবাসিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে দেখাশোনা এবং দুর্বল শিশুদের সার্বিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি মডেল প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা হয়।২০১১ সালে রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে শিশু কল্যাণের জাতীয় পুরস্কার (National Award for Child Welfare) লাভ করে লোহানীর পরিবার।

একটি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিনায়ক লোহানী জানিয়ে ছিলেন, "আমি বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আর আজ দেখুন আমার কত বড় পরিবার আছে আমার পাশে"। এর পাশাপাশি তিনি বলেন, "আইআইএম কলকাতার ইতিহাসে আমিই একমাত্র ছিলাম, যে চাকরির জন্য প্লেসমেন্ট না নিয়ে বেরিয়ে এসেছি"! এরপর হেসে লোহানী আরও বলেন, "আমি বরাবরই সামাজিক জায়গায় কিছু করতে চেয়েছিলাম।আমি কর্পোরেট ক্যারিয়ারে আগ্রহী ছিলাম না। সেই কারণেই চাকরি না করে নিজের সংস্থা গড়ে তুলেছি।"

ঐ সাক্ষাৎকারেই লোহানী আরও বলেন, "মধ্যবিত্ত পরিবারের একজন ভালো ছাত্র হওয়া, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং এমবিএ করাটা একটি খেলাপ। এরপর তিনি স্মরণ করেন বলেন, মূলধারার চাকরি এবং কর্পোরেট পরিবেশের চাকরিতে আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলছিলাম। সেই জন্যই ঐ জায়গা থেকে সরে এসেছিলাম"।

তিনি বলেন, "বরাবরই আমি স্বামী বিবেকানন্দের কাজে অনুপ্রাণিত হয়েছি। আমি সবসময় সমাজের পরিবর্তনের প্রতিনিধি এবং ত্যাগ, সেবা এবং ভক্তির অনুভূতি দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছি, বিশেষ করে স্বামী বিবেকানন্দের। রামকৃষ্ণ মিশন থেকেই আমি দীক্ষা গ্রহণ করেছি। রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসীদের সঙ্গে অনেক সময়ও কাটিয়েছি আমি"। এরপর লোহানী বলেন, "আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের উত্তরাধিকার হিসেবে মাদার টেরেসা-র প্রভাব ছিল প্রবল। আমি নিজের শহরে ফিরে যাওয়ার কোন গতি খুঁজে পাইনি।আমার সমস্ত চিন্তাভাবনা কলকাতা-কেন্দ্রিক হয়ে উঠেছিল। সেই জন্যই কলকাতায় নিজের প্রতিষ্ঠান 'পরিবার'কে গড়ে তুলেছি সর্ব প্রথম"।

'পরিবার' আজ এমন একটি প্রতিষ্ঠান যেখানে হাজার হাজার ছেলে-মেয়ে রয়েছে যারা বিনা পয়সায় শিক্ষা পাচ্ছে, এ সমস্ত সম্ভব হয়েছে কেবলমাত্র বিনয়ক লোহানীর উৎসাহের কারণে পাশাপাশি বদলে গেছে ঐ সমস্ত দরিদ্র পরিবারের ছেলে-মেয়েদের জীবনও। অনেক ছেলে-মেয়ে রয়েছে যারা শিক্ষাগত যোগ্যতায় অনেকটা এগিয়ে গেছে, স্কুল-কলেজের জীবন পার করে তারা পৌঁছে গেছে ইউনিভার্সিটি-তে।

নিজের 'পরিবার' সম্বন্ধে বিনায়ক লোহানী জানান, আমার লক্ষ্য পরিবারকে দেশের সর্ববৃহৎ বিনামূল্যে আবাসিক বিদ্যালয়ে রূপান্তর করা |

তথ্য সূত্র : লেখক এর নিজস্ব সংগ্রহ

লিখেছেন
Anasuya Sen
Anasuya Sen
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।