একজন ডেলিভারি রাইডারের কলম যেভাবে জিতে নিল চিনের সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মান
Wang Jibing Lu Xun Literature Award 2026: ওয়াং জিবিং (Wang Jibing)। প্রায় ৫৭ বছর বয়সি এই ফুড ডেলিভারি রাইডার চিনের সাহিত্য জগতে সৃষ্টি করেছেন এক অভূতপূর্ব ইতিহাস। ২০২৬ সালের জুলাই মাসে তিনি চিনের অন্যতম সর্বোচ্চ ও মর্যাদাপূর্ণ সাহিত্য সম্মান ‘লু শুন সাহিত্য পুরস্কার’ (Lu Xun Literature Prize) জয় করে বিশ্বকে চমকে দিয়েছেন।
দিনভর শহরের অলিগলিতে বাইক ছুটিয়ে খাবার পৌঁছে দেন মানুষের দরজায়। মাথায় হেলমেট, পিঠে ডেলিভারি ব্যাগ, আর চোখেমুখে ক্লান্তি। দিনের বেলা আর দশটা সাধারণ গিগ-শ্রমিকের মতোই তাঁর জীবন। কিন্তু রাত হলেই তাঁর হাতে খাবারের পার্সেলের বদলে থাকে খাতা-কলম। মাথায় পরের ডেলিভারির কথা নয়, ঘোরে পরের বাক্যে কী লেখা হবে তার চিন্তা।
তিনি ওয়াং জিবিং (Wang Jibing)। প্রায় ৫৭ বছর বয়সি এই ফুড ডেলিভারি রাইডার চিনের সাহিত্য জগতে সৃষ্টি করেছেন এক অভূতপূর্ব ইতিহাস। ২০২৬ সালের জুলাই মাসে তিনি চিনের অন্যতম সর্বোচ্চ ও মর্যাদাপূর্ণ সাহিত্য সম্মান ‘লু শুন সাহিত্য পুরস্কার’ (Lu Xun Literature Prize) জয় করে বিশ্বকে চমকে দিয়েছেন।
তাঁর এই জয় শুধু একজন ব্যক্তির সাফল্য নয়; এটি লাখ লাখ সাধারণ মেহনতি মানুষের কাজের স্বীকৃতি এবং নিজেদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার এক অমর গল্প।
১৯৬৯ সালের নভেম্বরে চিনের জিয়াংসু প্রদেশের একটি অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেন ওয়াং জিবিং। দারিদ্র্যের কারণে মাত্র ১৪ বছর বয়সে, মাধ্যমিক স্কুলে পড়ার সময়ই তাঁর লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। বাবা তাঁকে একটি মার্শাল আর্ট স্কুলে পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু শিক্ষার অভাব আর ভাগ্যের নির্মম পরিহাস তাঁকে অল্প বয়সেই নামিয়ে দেয় বেঁচে থাকার কঠিন লড়াইয়ে।
পরবর্তী কয়েক দশক ধরে তিনি যা পেয়েছেন, তা-ই করেছেন। শেনিয়াং-এ একজন নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে দৈনিক মাত্র ৩.৫ ইউয়ান মজুরিতে কাজ করতেন। সারাদিনের ভাঙা শরীরের ক্লান্তি ভুলে থাকতে রাতে পুরনো বইয়ের দোকান ঝাড়ু দিয়ে বিনামূল্যে বই পড়ার সুযোগ পেতেন।
বালি উত্তোলন ও ইটভাটার কাজও করেছেন তিনি। কনকনে ঠান্ডা জলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ডুবে বালি তুলতেন। হাত-পায়ের চামড়া উঠে রক্ত পড়ত। রাতে ঘুমানোর সময় ক্ষত বাঁচানোর জন্য পায়ের নিচে বালিশ রাখতে হতো।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Pirated Books in India: প্রকাশকদের মাথায় হাত পড়লেও লেখকদের জন্য কিন্তু এটা এক অদ্ভুত আনন্দের বিষয়। ভারতের রাস্তায় যদি কোনো লেখকের বইয়ের নকল বা সস্তা কপি দেদার বিক্রি হতে দেখা যায়, তবে বুঝতে হবে তিনি সাধারণ মানুষের ড্রয়িংরুম পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছেন।
এছাড়াও ফল বিক্রি, বর্জ্য কুড়ানো, মাটির ইট গাঁথা এবং ফুটপাতে ছোটখাটো ব্যবসাও করেছেন ওয়াং জিবিং।
একসময় স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে মাত্র ৫০০ ইউয়ান সম্বল করে তিনি কুনশান শহরে আসেন। সেখানে পরিত্যক্ত খালের উপর কাঠ দিয়ে কুঁড়েঘর বানিয়ে থাকতেন, যেখানে আলো বা জলের কোনো সুবিধা ছিল না। ঝড় উঠলেই ঘর ভেঙে পড়ার ভয় থাকত।

ছোটবেলা থেকেই সাহিত্যের প্রতি ওয়াং-এর ছিল গভীর অনুরাগ। ১৯৯২ সালে তিনি একটি ছোট উপন্যাস লিখে স্থানীয় সাময়িকীতে প্রকাশ করেন। এরপর প্রায় দুই লাখ শব্দের একটি বিশাল উপন্যাস লেখার কাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু তাঁর বাবা মনে করতেন এসব লিখে কোনো লাভ নেই, এগুলি ‘অকর্মণ্যতা’।
একদিন রাগের মাথায় তাঁর বাবা হাতের লেখা পুরো পাণ্ডুলিপিটি আগুনে পুড়িয়ে দেন। এই ঘটনায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে তিনি দুই মাস বাবার সঙ্গে কথা বলেননি এবং বাড়ি ছেড়ে চলে যান।
সংসারের চালাতে ২০১৯ সালে, ৫০ বছর বয়সে তিনি কুনশানে ফুড ডেলিভারি রাইডার হিসেবে যোগ দেন। তিনিই ছিলেন রাইডারদের মধ্যে সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ। কাজের কোনো নির্দিষ্ট সময় ছিল না—অ্যালগরিদমের তাড়া, ভুল ঠিকানার ঝামেলা, কাস্টমারের গালিগালাজ আর ট্রাফিকের ভয় ছিল নিত্যসঙ্গী। কিন্তু এই সব কষ্টের মধ্যেই তিনি লেখাকে বানিয়ে নেন জীবনের আনন্দ। তিনি বলতেন—“জীবন যদি তিক্ত হয়, কবিতা হলো সেই তিক্ততার পর খাওয়া চিনি।”
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Made in India A Titan Story: আমাজন এমএক্স প্লেয়ারে (Amazon MX Player) রিলিজ হওয়া ৬ এপিসোডের এই সিরিজটি মাত্র তিন সপ্তাহেই বাজিমাত করেছে। ওরম্যাক্স মিডিয়ার রিপোর্ট অনুযায়ী, ১ কোটি ৩৭ লক্ষেরও বেশি ভিউ নিয়ে এটি এই বছরের অন্যতম সফল এবং সবচেয়ে বেশি দেখা ভারতীয় ওয়েব সিরিজ হয়ে উঠেছে।
২০১৯ সালের এক ঘটনা তাঁর জীবন বদলে দেয়। এক গ্রাহক ভুল ঠিকানা দেওয়ায় তিন-তিনটি বিল্ডিং ঘুরে, ১৮ তলা সিঁড়ি বেয়ে উঠে খাবার পৌঁছে দিয়েছিলেন ওয়াং। কিন্তু ধন্যবাদ পাওয়ার বদলে দেরির জন্য কাস্টমার তাঁকে তীব্র গালিগালাজ করেন।
বাড়ি ফেরার পথে সেই অপমান, রাগ আর হতাশা থেকে তিনি লেখেন তাঁর বিখ্যাত কবিতা—“Man in a Hurry” (কবিতার চিনা শিরোনামের ইংরেজি অনুবাদ)।
২০২২ সালে এক প্রখ্যাত চিনা কবি কবিতাটি ইন্টারনেটে শেয়ার করলে রাতারাতি তা ভাইরাল হয়ে যায়। লাখ লাখ মানুষ তাঁর এই লেখার মধ্যে নিজেদের জীবনের নিঃশব্দ হাহাকার আর লড়াইকে খুঁজে পান।

২০২৪ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর অন্যতম কাব্যগ্রন্থ ‘Low Flight’ (চিনা শিরোনামের ইংরেজি অনুবাদ)। এটি লিখতে গিয়ে তিনি তাঁর ২০০ জন সহকর্মী ডেলিভারি রাইডারের সঙ্গে কথা বলেন, তাঁদের জীবনের গল্প ও কষ্টগুলিকে একসুতোয় গাঁথেন।
২০২৬ সালের ১৫ জুলাই, চিনা লেখক সমিতি যখন নবম লু শুন সাহিত্য পুরস্কার বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করে, তখন কবিতা বিভাগে সবচেয়ে বড় চমক ছিল ওয়াং জিবিং-এর এই বই—‘Low Flight’। প্রায় প্রতি চার বছর পর পর দেওয়া এই সম্মান চিনের সাহিত্য জগতে নোবেল পুরস্কারের সমতুল্য।
এই বইটির মূল বার্তা হলো—উঁচু আকাশে ডানা মেলাতেই শুধু সাফল্য লুকিয়ে থাকে না; জীবনের সব চাপ সহ্য করে মাটি ঘেঁষে উড়ে যাওয়াও এক ধরনের বীরত্ব।
এখন পর্যন্ত ৬,০০০-এর বেশি কবিতা লিখেছেন ওয়াং। তাঁর বইগুলির লাখ লাখ কপি বিক্রি হয়েছে বাজারে। লু শুন সাহিত্য পুরস্কার ছাড়াও তিনি একাধিক জাতীয় ও আঞ্চলিক সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। ২০১৩ সালে তিনি প্রদেশের অন্যতম শীর্ষ সাহিত্য সম্মান
জিয়াংসু জিজিনশান সাহিত্য পুরস্কার পান। ২০২৬ সালে শ্রমিকদের মধ্যে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি জিয়াংসু প্রদেশের মে দিবস শ্রম পদক ও মডেল ওয়ার্কার পান। এই বছরই সামাজিক সেবামূলক কাজের বিশেষ সম্মাননা জাতীয় ‘শিউ লেইফেং’ মডেলও পান। ২০২৫ সালে চিনের সবচেয়ে বড় জাতীয় বিনোদন অনুষ্ঠান সিসিটিভি (CCTV) স্প্রিং ফেস্টিভ্যাল গালাতে অতিথি হিসেবে অংশ নেন।
এত আন্তর্জাতিক পরিচিতি, কোটি কোটি মানুষের ভালবাসা আর মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার জেতার পরেও একটুও বদলাননি ওয়াং জিবিং। নিজের পরিচিতি দিতে গিয়ে তিনি এখনো হাসিমুখে বলেন—“আমি দিনে ডেলিভারি ম্যান, আর রাতে কবি।”
পুরস্কার জেতার পর সাংবাদিকরা যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, এবার তিনি চাকরি ছেড়ে দেবেন কি না? তিনি খুব শান্তভাবে উত্তর দেন:
“আমি গতকালও ডেলিভারি করেছি। যতদিন এই কুনশান শহরে থাকব, খাবার পৌঁছে দেওয়ার কাজটা আমি করে যাব। এই পুরস্কার আমার জীবনকে বদলে দেবে না। আমি একটা শান্ত নদীর মতো বইতে চাই।”







