একদা দলিত পরিত্রাতা মায়াবতী বিজেপির হয়েই লড়লেন উত্তরপ্রদেশে?

Aritra Dasgupta
৪ মিনিট
একদা দলিত পরিত্রাতা মায়াবতী বিজেপির হয়েই লড়লেন উত্তরপ্রদেশে?

পরপর দু'বার ফের উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। হাথরস থেকে লখিমপুর যাবতীয় বিতর্ক কে পিছনে ফেলে যোগীর বিজয়রথ অপ্রতিরোধ্য। কিন্তু উত্তরপ্রদেশ যেমন উচ্চবর্ণের হিন্দুত্বের শক্ত ঘাঁটি তেমনিই দলিত, কুরমি, জাঠ , ঠাকুর সম্প্রদায়ের ভূমিকা ও উত্তরপ্রদেশের ভোট রাজনীতিতে সমান ভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

প্রায় সব কটি বুথ ফেরত সমীক্ষা থেকেই ইঙ্গিত মিলেছিল উত্তরপ্রদেশে ফের ক্ষমতায় ফিরছে বিজেপি। অবিশ্বাস্যভাবে ইন্ডিয়া টুডে- মাই এক্সিস ইন্ডিয়া এক্সিট পোলের সমীক্ষায় উঠে এসেছিল চূড়ান্তভাবে ভোটে মুখ থুবড়ে পড়েছে ইউপির বাকি দুটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক দল সমাজবাদী পার্টি এবং বহুজন সমাজবাদী পার্টি।

কিন্তু এই নির্বাচনে বারবার প্রশ্ন উঠেছে বিএসপি নেত্রী মায়াবতী ও তাঁর দল বহুজন সমাজবাদী পার্টিকে নিয়ে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বড় অংশের মতে গোটা নির্বাচনে যেভাবে লড়াই করেছে বিএসপি তা যেন উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবে বিজেপিকেই সুবিধে করে দেওয়া। গোটা উত্তরপ্রদেশ নির্বাচনের বিএসপির প্রার্থী তালিকায় বহু ক্ষেত্রেই দেখা গিয়েছে মায়াবতী বিজেপির বিরুদ্ধে অধিকাংশ আসনেই প্রার্থী দেননি। গোটা নির্বাচনেই বিজেপির বি টিম হিসেবে ভোট ভাঙানোর কাজ করেছে মায়াবতীর দল। উত্তরপ্রদেশের শেষ দু'দফার ভোটে প্রায় ১১১ আসনে মায়াবতী এমন সব লোকজনকেই প্রার্থী করেছেন যারা সমাজবাদী পার্টিকে দুর্বল করে বিজেপিকে সুবিধে পাইয়ে দেবে।

আশ্চর্যজনক ভাবে এইবারের নির্বাচনে মায়াবতী নিজের দলের প্রার্থীদের হয়ে সেভাবে প্রচারই করেননি। যে মায়াবতী তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক কেরিয়ারে ভোটারদের সঙ্গে জনসংযোগের ক্ষেত্রে প্রচারকেই সবথেকে বেশি গুরুত্ব দিতেন সেই তিনিই এবার গোটা উত্তরপ্রদেশ নির্বাচন জুড়ে মাত্র ২০ টি জনসভা করেছেন। নিজের রাজনৈতিক কেরিয়ারে একাধিক দুর্নীতি এবং অবৈধ সম্পত্তির মামলা ঝুলছে বিএসপি সুপ্রিমোর মাথায়। সেসবের হাত থেকে বাঁচতেই কি বিজেপির সঙ্গে নীরব সমঝোতার পথে হাঁটলেন তিন দশকের ও বেশি সময় ধরে উত্তরপ্রদেশ রাজনীতির অন্যতম প্রাসঙ্গিক মুখ মায়াবতী?

আবার সাত দফা উত্তরপ্রদেশ নির্বাচনের চতুর্থ দফার আগে নিউজ ১৮ কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মায়াবতীকে প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ। মায়াবতী ও কৃতজ্ঞ চিত্তে শাহের এই অভিবাদন গ্রহণ করেছেন। তারপরে উত্তরপ্রদেশ নির্বাচনে বি এস পি র এই শোচনীয় পরাজয় প্রশ্ন তোলে স্বেচ্ছায় কী আসন হারিয়ে বিজেপিকে সাহায্য করলেন মায়াবতী?

এই নির্বাচনে আসন এবং শতাংশ দুইয়ের বিচারেই প্রায় প্রান্তিক অবস্থায় পৌঁছেছে বহুজন সমাজবাদী পার্টি। ২০২২ বিধানসভা নির্বাচনে বিএসপির প্রাপ্ত আসন ১ টি। যেখানে ২০১৭ এর বিধানসভা নির্বাচনে মায়াবতীর ভোট ছিল ২২.০৪ শতাংশ সেখান থেকে প্রায় ১২ শতাংশ ভোট কমেছে বিএসপির।

উত্তরপ্রদেশের জাতপাতের রাজনীতিতে মায়াবতীর ভোট ব্যাঙ্ক ছিল দলিত ভোট। উত্তরপ্রদেশের প্রায় ২১ শতাংশ জুড়ে রয়েছে দলিত এবং অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি। ২০২২ এর বিধানসভা নির্বাচনের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে মায়াবতীর নিজের গোষ্ঠী জাতভ যা শতাংশের হিসেবে প্রায় ৫৫ শতাংশ এবং যা ছিল বহুজন সমাজবাদী পার্টির মূল ভোটব্যাঙ্ক তাদের মধ্যেকার একটা বড় অংশের ভোট গিয়েছে বিজেপিতে। বিজেপির উচ্চ-নীচ সমস্ত বর্গকেই হিন্দুত্বের ক্যানোপিতে আনার যে প্রয়াস তা উত্তরপ্রদেশের ক্ষেত্রে সফল। এবং এক্ষেত্রে নিজের ভোটব্যাঙ্ক ধসিয়ে পরোক্ষে বিজেপিকেই ভোটে সাহায্য করেছে বিএসপি। কেবল বিজেপি নয়, বিএসপির এই ভোট ভাঙনের সুবিধে নিয়েছে সমাজবাদী পার্টি ও। আবার অন্যদিকে বাকি ৪৫ শতাংশ অন্যান্য দলিত শ্রেণি যারা এতদিন বিএসপির কমিটেড ভোটার হিসেবে থেকেছে তাঁরা ও এবার সচেতন ভাবেই ভোট দিয়েছে বিজেপিতে।

এই প্রসঙ্গে খুবই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে সেন্টার ফর দি স্টাডি অফ ডেভেলপিং সোসাইটির সমীক্ষায়। তাঁরা ২০০২ থেকে ২০১৭ য় উত্তরপ্রদেশ নির্বাচনের ক্ষেত্রে দলিত ভোটের প্যাটার্ন নিয়ে কাজ করেছে। সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে ২০০২ সালে বিএসপি ৭৯ শতাংশ জাতভ ভোট পেয়েছিল। আবার ২০০৭ সালে এই পরিমাণই বেড়ে হয় ৮৬ শতাংশ। যে বছর মায়াবতীর ঐতিহাসিক উত্তরপ্রদেশ বিজয় এবং মুখ্যমন্ত্রীর পদে আসীন হওয়া। আবার ২০১২ এর বিধানসভা নির্বাচনে উত্তরপ্রদেশে গদিচ্যুত হন মায়াবতী। মুখ্যমন্ত্রী হন অখিলেশ যাদব। সেই বিধানসভা নির্বাচনে বিএসপি পেয়েছিল ৬২ শতাংশ জাতভ ভোট। ভোট কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ ছিল দলিতদের যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন মায়াবতী তাঁর অধিকাংশ পূরণেই ব্যর্থ হন তিনি। আবার ২০১৭ সালে মায়াবতীর জাতভ ভোটের শতাংশ বেড়ে হয় ৮৬ শতাংশ। অন্যদিকে অন্যান্য দলিত শ্রেণির ক্ষেত্রে ২০০২ তে বিএসপি পায় ৫৩ শতাংশ ভোট, ২০০৭ এ পায় ৫৫ শতাংশ ভোট, ২০১২ তে পায় ৪৫ শতাংশ ভোট এবং ২০১৭-য় ৪৩ শতাংশ ভোট।

২০২২ নির্বাচনে মায়াবতীর দলের এই শোচনীয় ভোটব্যাঙ্ক ভাঙনের ফলে সবথেকে বেশি উপকৃত হয়েছে বিজেপিই। কারণ যে ১২ শতাংশ ভোট মায়াবতীর হাত থেকে বেরিয়ে গিয়েছে তার প্রায় সিংহভাগ পেয়েছে বিজেপি। এই যে তলায় তলায় ভোটের আদানপ্রদান এবং আসন হারিয়ে প্রায় তলানিতে ঠেকে মায়াবতীর সেই অর্থে কোনও আক্ষেপ নেই। কারণ তিনি সচেতন ভাবেই চেয়েছিলেন তাঁদের ভোটব্যাঙ্ক বিজেপির খাতাতেই যাক। যদিও সংবাদ মাধ্যমে বারবার হেরে যাওয়ার পর তিনি নিজেদের বিজেপির বি টিম হিসেবে অস্বীকার করেছেন। কিন্তু কেন এই জবাবদিহি? হিসেবের অঙ্ক কিন্তু পরিষ্কার বলছে মায়াবতীর দলের সাহায্য ছাড়া বিজেপির এই বিপুল ভোট প্রাপ্তি সম্ভব ছিল না। মায়াবতী প্রথম থেকেই ক্ষমতায় আসতেই চাননি। কেবল চেয়েছিলেন ভোট ভাগাভাগি যাতে পরোক্ষে উপকৃত হবে বিজেপিই। তাই নিজের দলের এই ভোট- বিপর্যয়ের বিনিময়ে তিনি লখনউয়ের মসনদে যোগীকেই কয়েক কদম এগিয়ে দিলেন।

লিখেছেন
Aritra Dasgupta
Aritra Dasgupta
1 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ইন্ডিয়া জোটের মিছিলে বাধা, সুপ্রিম কোর্টে দায়ের হলো রিট

INDIA bloc's march towards supreme court: সোমবার কনট প্লেস থেকে সুপ্রিম কোর্ট অভিমুখে ইন্ডিয়া ব্লকের ‘চলো দিল্লি’ মিছিল অনুষ্ঠিত হলো। রাহুল গান্ধীর দুই পাশে ছিলেন, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ও নেহা বোরা। মিছিলে অংশ নেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অখিলেশ যাদব, তেজস্বী যাদব, ডি রাজা, সুপ্রিয়া সুলে। ভগবান দাস রোডে মিছিল পুলিশি বাধার সম্মুখীন হয়। শেষমেশ সুপ্রিম কোর্টে ‘রাহুল গান্ধী বনাম নির্বাচন কমিশন অফ ইন্ডিয়া’ নামে একটি রিট পিটিশন দাখিল হয়।

ব্যারিকেড ঘেরা দিল্লি, নজরদারির চোখে নাগরিক: নিরাপত্তা নাকি নিয়ন্ত্রণ?

Delhi Under Siege: জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে সিজেপির বিক্ষোভ ঘিরে দিল্লি কার্যত দুর্গে পরিণত হয়েছে। ৩৫ হাজার পুলিশ, কাঁটাতারের ব্যারিকেড, ড্রোন নজরদারি, ৪৫টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ, ২৪ ঘণ্টার ইন্টারনেট শাটডাউন, ৭ হাজারের বেশি আটক। ওমর আব্দুল্লাহ ও মেহবুবা মুফতির অভিযোগ তুলেছেন, দিল্লিতে 'কাশ্মীর মডেল'-এর প্রয়োগ চলছে।

প্রতিবাদের মানচিত্র থেকে মুছে গেল যন্তর মন্তর

Jantar Mantar protest site: আঠারো শতকে নির্মিত যন্তর মন্তর মূলত একটি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণকেন্দ্র। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঐতিহাসিক এই স্থাপনার পাশের রাস্তা হয়ে ওঠে দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা প্রতিবাদীদের মিলনস্থল।

‘দুই নেহা’-র কাণ্ডে বিভ্রান্ত দিল্লি পুলিশ! AISA নেত্রী-কে আটকানো যাচ্ছে না কোনোভাবেই

AISA-র সর্বভারতীয় সভাপতি নেহা বোরাকে আটক করতে গিয়ে তাঁরই মতো দেখতে এক মেয়েকে আটক করল দিল্লি পুলিশ। অথচ সেই সময় আসল নেহা বোরা দিল্লির কনট প্লেসে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের ব্যারিকেড পেরিয়ে সামনের দিকে এগোচ্ছিলেন।

রাহুল, নেহা, অভিজিৎ, ঐশী: কাউকেই দেবতা বানানো উচিত নয়

Gyanesh Kumar resignation: আজকে আমরা নেহাকে যে জায়গায় বসাচ্ছি, কাল সকালে যদি নেহার কোনো ত্রুটি হয় তাহলে কিন্তু আমরা এক মুহূর্তে তাঁকে ছুঁড়ে ফেলে দেব। তাহলে আমরাই বা আজকে নেহাকে এই জায়গায় বসাচ্ছি কেন?

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরও দিল্লিতে সাংবাদিকদের আটক কেন?

সাংবাদিকদের আটকের ঘটনাটি সামনে এসেছে এমন এক দিনে, যখন সুপ্রিম কোর্টে দিল্লির বিক্ষোভ ঘিরে আটক, চলাচলে বিধিনিষেধ এবং নাগরিকদের অধিকার নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

ইন্ডিয়া ব্লকের সঙ্গে বৈঠকে নারাজ প্রধান বিচারপতি, কী কারণ দেখালেন তিনি?

CJI surya kant rejects INDIA bloc meeting: প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, মল্লিকার্জুন খাড়্গে ও রাহুল গান্ধীর বৈঠকের অনুরোধ কিছু 'কারণ দেখিয়ে' প্রত্যাখ্যান করলেন। তাঁর যুক্তি, বিষয়গুলি সাব জুডিস আর রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তাঁর বৈঠক সাংবিধানিক ক্ষমতা বিভাজনের নীতি লঙ্ঘন করবে।

বিক্ষোভে বাধা, নেতাদের আটক! কোন পথে CJP-র আন্দোলন?

রাজধানীতে আন্দোলন ঘিরে উত্তেজনার আবহে নিরাপত্তা বাহিনীর এই তৎপরতা নজর কেড়েছে। তবে রবিবারের পরবর্তী কর্মসূচি কোথায় এবং কীভাবে হবে, সে বিষয়ে সিজেপি-র ঘোষণার দিকে নজর রয়েছে।