১ কোটি ২০ লক্ষ কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি, কতটা পূরণ করতে পারবেন মমতা?

কেন্দ্রীয় সরকারের বাজেট পেশ করেছেন ভারতের প্রথম মহিলা অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন। কার্যত সেই পথেই হেঁটে এ বছর বাংলায় রেকর্ড গড়ে স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত অর্থমন্ত্রী হিসেবে বাজেট পেশ করলেন চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। কোভিড পরবর্তী সময়ে রাজ্যের অর্থনীতির জন্য সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বাজেট ছিল এই বছরের বাজেট। আর এই বাজেটকে জয়বাংলা বাজেট বলে অভিহিত করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিধানসভা ভবনে আংশিক বাজেট পেশ করলেও, রাজ্যের প্রধান অর্থ উপদেষ্টা অমিত মিত্রকে নিয়ে বাজেট ব্যাখ্যা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিভাবে করোনাভাইরাস পরিস্থিতি মোকাবিলা করে রাজ্যের অর্থনীতি এগিয়ে চলেছে, সেটার ব্যাখ্যাই তিনি করলেন। আগের বছরের থেকেও এ বছরে পশ্চিমবঙ্গের রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ বেড়েছে অনেকাংশে। ৩.৭৬ গুণ বেশি রাজস্ব আদায় করতে পেরেছে পশ্চিমবঙ্গ। অন্যদিকে, শিল্পপার্ক থেকে শুরু করে টেক্সটটাইল পার্ক, সবকিছুই গড়ে তোলা হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। ডেউচা-পাঁচামি কোল ব্লককে আরো সুপ্রতিষ্ঠিত করার পরিকল্পনা নিয়েছে রাজ্য সরকার। তার সাথেই নজর দেওয়া হয়েছে তাজপুর বন্দরের দিকে। আগামি অর্থবছরে বাজেটে বরাদ্দের পরিমাণ রাখা হয়েছে ৩ লক্ষ ২১ হাজার ৩০ কোটি টাকা। এই টাকার পরিমাণ আগের থেকেও অনেকটাই বেশি। 

স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে, কৃষি ক্ষেত্রে, খাদ্য ক্ষেত্রে, শিক্ষাক্ষেত্রে, শিল্প, বাণিজ্য এবং শিল্পোন্নয়নে, তথ্য সংস্কৃতি এবং তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে, উত্তরবঙ্গ এবং পশ্চিম অঞ্চলের উন্নয়নে, সর্বোপরি পর্যটন এবং পরিবহন বিভাগে লক্ষাধিক টাকা খয়রাতি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্য সরকার। চলতি করোনাকালে এই মুহূর্তে রাজ্যের আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত সঙ্গীন। রাজ্য সরকার আয় বেড়ে যাওয়ার কথা ঘোষণা করলেও সেই আগের হিসাব নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। টানা দুই বছর ধরে করোনা এবং লাগাতার লকডাউন এর কারণে সবথেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাজ্যের পর্যটন ক্ষেত্রটি। এই কারণেই মূলত পর্যটন বিভাগের দিকে নজর দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। পাশাপাশি তথ্য সংস্কৃতি এবং তথ্যপ্রযুক্তি দপ্তরে বরাদ্দ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্য সরকার।

তবে তার থেকেও বেশি উল্লেখযোগ্য হলো পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রকল্প খাতে খরচের পরিমাণ বৃদ্ধি। লক্ষীর ভান্ডার, ঐক্যশ্রী, স্বাস্থ্য সাথী, সহ একাধিক প্রকল্পে বৃদ্ধি করা হয়েছে ব্যয়। আর এই একগুচ্ছ কল্যাণ প্রকল্পে রাজ্য সরকারের ব্যয়ের পরিমাণ কার্যত আকাশ ছোঁয়া। কিন্তু রাজ্যের অর্থনীতিতে নড়বড়ে অবস্থা, সেখানে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ যদি না বাড়ে তাহলে কিন্তু এই প্রকল্প চালানো অসুবিধা হয়ে যাবে। কেন্দ্রের বিরুদ্ধেও অভিযোগ রয়েছে বকেয়া টাকা আটকে রাখার। তাই এই পরিস্থিতিতে নতুন কোনো প্রকল্প ঘোষণা করার পথে হাঁটলেনই না মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বরং একাধিক পুরনো প্রকল্পের টাকা বাড়িয়ে দিয়ে কিছুটা যেন  নিরাপদ পদক্ষেপ নিলেন তিনি। 

কিন্তু এই সমস্ত পুরনো প্রকল্পে টাকা বাড়িয়ে দিয়ে কি কোনো লাভ হবে? যত সময় যাবে এই সমস্ত প্রকল্প গুলি আরো বেশি করে টাকা শুষে নিতে শুরু করবে রাজ্য সরকারের কোষাগার থেকে। এই বিষয়টা খুব ভাল করেই জানেন মমতা, তাই সামাজিক প্রকল্প ঘোষণা করার আবাসন শিল্পের ওপর জোর দিলেন তিনি। আবাসন শিল্প চাঙ্গা করতে জমি-বাড়ি রেজিস্ট্রেশন স্ট্যাম্প ডিউটি এবং সার্কেল রেটের সুবিধার মেয়াদ বৃদ্ধি করা হলো। বৈদ্যুতিক এবং সিএনজি গাড়ি ক্রেতাদের জন্যও রাখা হলো সুবিধা। মমতা দাবি করলেন, এ বছরের বাজেট মা-মাটি-মানুষের বাজেট। ১ কোটি ২০ লক্ষ কাজের সুযোগ তৈরি হবে আগামী বছরের মধ্যে।

তবে, বিরোধীদের প্রশ্ন এখানেই, এত যে প্রকল্পের জন্য টাকা বৃদ্ধি করা হলো সে টাকা আসবে কোথা থেকে? আগে দুই দফায় ঘোষিত সামাজিক প্রকল্পগুলির পাশাপাশি ভোট প্রতিশ্রুতি রেখে তৃতীয় বার ক্ষমতায় আসার পরে ইতিমধ্যেই 'লক্ষীর ভান্ডার', 'দুয়ারে রেশন', 'স্টুডেন্ট ক্রেডিট কার্ডে'র মতো একাধিক জনপ্রিয় প্রকল্প চালু করেছেন মমতা। ভোট বাক্সে সাড়া মিলেছে এই সমস্ত ঘোষণার ফলে। সরাসরি গরিবদের হাতে নগদ তুলে দেওয়ার জন্য এই সমস্ত প্রকল্প প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু প্রশ্নটা উঠছে, কয়েকদিন না হলে দেওয়া গেল, কিন্তু এতদিন ধরে এতগুলি প্রকল্পে দেবার মত টাকা আসবে কোথা থেকে?

রাজ্য সরকারের কিন্তু ব্যয় খুব একটা কম নয়। এদিন যে বাজেট পেশ করা হল তাতে যে সমস্ত প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ ঘোষণা করা হয়েছে, তারপরে রাজ্যের ব্যয়ের পরিমাণ আরো বাড়বে। এমনিতেই রাজ্যের রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ কম। পশ্চিমবঙ্গে বিশাল মাপের কোন শিল্প এই মুহূর্তে নেই। তার উপরে রয়েছে বিপুল ঋণের বোঝা। প্রত্যেক বছর এই ঋণ শোধ করতে মমতার কোষাগার থেকে ৭০ হাজার কোটি টাকা করে দিতে হচ্ছে। তাই বাস্তবটাকে বুঝে নিয়ে কার্যত খুব একটা ঝুঁকি নিতে চাননি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একটা সহজ বাজেট পেশ করল তার সরকার। চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য সরাসরি জানিয়ে দিলেন, "সব ধরনের কল্যাণ প্রকল্প ইতিমধ্যেই চালু করা হয়েছে। এই সমস্ত প্রকল্প এখন জোরদারভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। মুখ্যমন্ত্রী নিজে এক্ষেত্রে নজর রাখবেন।" মুখ্যমন্ত্রী বলছেন, "যে সামাজিক সুরক্ষা আমরা দিয়ে থাকি, তা আর কোথাও নেই। রাজ্য সরকারের তরফ থেকে পেনশন দেওয়া হয়। দেশের অর্থনীতির অবস্থা সম্পূর্ণ বেহাল। বেকারত্ব এবং গরিবের সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে। মানুষের হাতে কোনো টাকা পয়সা নেই। এখানেই যদি আমরা মানুষের হাতে টাকা তুলে দিতে পারি তাহলে অর্থনীতি সচল হয়। আমরা তাই সেটাই করছি।"

তবে সরকারের আর্থিক সমীক্ষা এবং বাজেট বিবৃতি অনুযায়ী, বাজেট ঘাটতির পরিমাণ কিন্তু মাত্র ২ কোটি টাকা। তবে হিসাব মিলিয়ে দেখতে গেলে, রাজ্যের নিজস্ব কর আদায় ৮০ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। করের বাবদ কেন্দ্র থেকে পাওয়া যায় ৬২ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। সঙ্গে কেন্দ্রের অনুদান ৫০ হাজার কোটি টাকা। যদিও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখন বলছেন বকেয়া টাকা কেন্দ্র দিচ্ছে না, কিন্তু তবুও সবকিছু মিলিয়েও রাজ্যের ব্যয়ের পরিমাণ অনেকটাই বেশি। তেল এবং আবগারি দপ্তর থেকে একটা মোটা অঙ্কের কর পাচ্ছেন মমতা। কিন্তু তার পরেও লাভের লাভ তেমন একটা হচ্ছে না।

পশ্চিমবঙ্গের এই 'ভাঁড়ে মা ভবানী' অবস্থায় রাজ্য সরকারের কাছে আছে মাত্র দুটি রাস্তা। প্রথমটি হলো পরিকাঠামো উন্নয়ন করে শিল্প নিয়ে আসা এবং পশ্চিমবঙ্গের রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ বৃদ্ধি করা। দ্বিতীয়টি হল বাজার থেকে ধার করা। এমনিতেই প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা ধারের বোঝা নিয়ে চলছে রাজ্য। কিন্তু তবুও মুখ্যমন্ত্রীর কাছে দ্বিতীয় রাস্তাটি বেশি সহজ মনে হতে পারে। শোনা যাচ্ছে নাকি আগামী বছরে রাজ্য বাজার থেকে বেশ কিছু টাকা ধার নিতেও পারে। অবশ্যই, ধার নিলে তার সুদও দিতে হবে। তার উপরে জিএসটি ক্ষতিপূরণের মেয়াদ প্রায় শেষের পথে।

অন্য দিকে, আবার রাজ্য সরকারি কর্মীদের একাংশের মধ্যে ডিএ বৃদ্ধি নিয়ে কপালে চিন্তার ভাঁজ রয়েছে। বেতন খাতে গত বছরের তুলনায় এবারে বরাদ্দ বেড়েছে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। কিন্তু, তাতে কি আদৌ নিয়োগ হবে? পশ্চিমবঙ্গে যে শিল্প প্রবেশ করে না, এটা নিয়েই বা রাজ্য সরকার কি পদক্ষেপ নিতে চাইছে? শুধুমাত্রই কি আগের সরকারের দিকে দোষ দিলে কাজ হবে? পরিকাঠামো উন্নয়ন এর জন্য ঠিক কতটা ব্যয় করা হচ্ছে? মমতা যদিও বলছেন শিল্পের ক্ষেত্রে উন্নয়ন হয়েছে, ঘোষণা করছেন, ২৯,৭০৬ কিলোমিটার থেকে ১ লক্ষ ৩৪১ কিলোমিটার রাস্তা তৈরি করেছেন তিনি, কিন্তু তবুও বড় শিল্প তেমন একটা তো আসছে না। ছোট শিল্পের দিকেও খুব একটা নজর দিচ্ছেন না তিনি।

সর্বোপরি, বাংলার সবথেকে বড় সমস্যা এই মুহূর্তে বেকারত্ব। সেই সমস্যার সমাধান করার জন্য মমতা ঘোষণা করেছেন, এ বছর নাকি ১ কোটি ২০ লক্ষ কর্মসংস্থান করবেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, পশ্চিমবঙ্গের চর্ম শিল্প, ডেউচা-পাঁচামি, তাজপুর বন্দর, তথ্যপ্রযুক্তি শিল্প, ছোট মাঝারি শিল্প, ১০০ দিনের কাজ, অশোকনগর তেল প্রকল্প সবদিক মিলিয়ে কয়েক কোটি কর্মসংস্থান করবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু, এই সমস্ত শিল্পের বাস্তবায়ন এখনো বিশবাঁও জলে। মমতার স্বপ্নের তথ্যপ্রযুক্তি শিল্প অর্থাৎ সিলিকন ভ্যালি প্রজেক্টের কতটা উন্নতি হয়েছে সেই নিয়ে তেমন কোনো আপডেট দেয়নি মমতা সরকার। বাকি প্রকল্প গুলি কতটা তাড়াতাড়ি বাস্তবায়িত হবে, সেই নিয়ে এখনও প্রশ্ন রয়েছে। পুরনো প্রকল্পগুলিতে যেভাবে অতিরিক্ত টাকা দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হলো, সেটা যদি অন্য কোনো উন্নয়নমূলক ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হতো তাহলে হয়তো পশ্চিমবঙ্গের আর্থিক উন্নতির জায়গা থাকতো। আসলে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সমস্যা এই একটা জায়গায়। উন্নয়ন এবং প্রকল্প, একসঙ্গে দুটি নিয়েই এগোতে চাইছেন মমতা। কিন্তু দুটিকেই একসাথে চালাতে যেটা লাগবে সেটা হলো টাকা- যা পশ্চিমবঙ্গ সরকার হাতে বাড়ন্ত।

More Articles

;