তৃণমূলের বিদ্রোহীদের নতুন ঠিকানা এনসিপিআই, কী এই দল, কোথা থেকে এল?
NCPI: তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদদের নতুন রাজনৈতিক ঠিকানা হয়ে ওঠা এনসিপিআই দলটি কী? কোথা থেকে এল এই দল, কারা এর নেতৃত্বে রয়েছেন, কেন ত্রিপুরা থেকে রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়েছিল, আর কীভাবে একটি প্রায় অচেনা দল হঠাৎ জাতীয় রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এল?
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে আচমকাই এক নতুন নাম আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে— ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া বা এনসিপিআই। কয়েক দিন আগেও এই দলের নাম অধিকাংশ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক কিংবা সাধারণ মানুষের কাছে প্রায় অজানা ছিল। তৃণমূল কংগ্রেসের একাংশ বিদ্রোহী লোকসভা সাংসদ এই দলের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করার ঘোষণা করার পর থেকেই এনসিপিআইকে ঘিরে শুরু হয়েছে তুমুল কৌতূহল।
১৪ জুন সন্ধ্যায় কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদব এবং লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে বৈঠকের পর তৃণমূলের বিদ্রোহী শিবিরের ২০ জন সাংসদ জানান, তাঁরা এনসিপিআই-এ যোগ দিচ্ছেন। তাঁদের দাবি, তাঁরা একটি নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন এবং ভবিষ্যতে আদালতে লড়াই করে তৃণমূল কংগ্রেসের নাম ও প্রতীকের দাবিও জানাবেন।
এই ঘোষণার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, কী এই এনসিপিআই? কোথা থেকে এল দলটি? এর রাজনৈতিক ভিত্তি কতটা শক্তিশালী? আর কেনই বা একটি প্রায় অচেনা দল হঠাৎ জাতীয় রাজনীতির আলোচনায় উঠে এল?
নির্বাচন কমিশনের নথি বলছে, ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া ২০২৩ সালের ২০ জানুয়ারি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়। এটি একটি ‘রেজিস্টার্ড আনরেকগনাইজড পলিটিক্যাল পার্টি’ বা আরইউপিপি। অর্থাৎ দলটি নির্বাচন কমিশনের কাছে নিবন্ধিত হলেও এখনও কোনো স্বীকৃত জাতীয় বা আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের মর্যাদা পায়নি।
দলটির জন্ম পশ্চিমবঙ্গে হলেও রাজনৈতিক আত্মপ্রকাশ হয়েছিল ত্রিপুরায়। সাধারণত নতুন রাজনৈতিক দল নিজেদের রাজ্যেই সংগঠন গড়ে তোলার চেষ্টা করে। কিন্তু এনসিপিআই ভিন্ন পথ বেছে নেয়। দলটির দাবি ছিল, ত্রিপুরা ট্রাইবাল এরিয়াস অটোনমাস ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিল এলাকার জনজাতি সম্প্রদায়ের বঞ্চনা ও প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নকে সামনে রেখে তারা রাজনীতিতে প্রবেশ করছে।
২০২৩ সালের ত্রিপুরা বিধানসভা নির্বাচনে দলটি কয়েকটি আসনে প্রার্থী দেয়। যদিও শুরুতে সাতটি আসনে প্রার্থী দেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও বিভিন্ন কারণে কয়েকটি মনোনয়ন বাতিল হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত দলের প্রতীকে মাত্র দু’জন প্রার্থী নির্বাচনী লড়াইয়ে অংশ নিতে পারেন।
চৌমানু কেন্দ্রে দলের প্রার্থী পান ৫৩৬ ভোট এবং কৈলাসহর কেন্দ্রে পান ২৮৬ ভোট। অর্থাৎ দুই কেন্দ্র মিলিয়ে দলের ঝুলিতে আসে মাত্র ৮২২ ভোট। আরও এক জন এনসিপিআই-সমর্থিত প্রার্থী নির্দল হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৩৭৬ ভোট পেয়েছিলেন। সব মিলিয়ে দলটির সঙ্গে যুক্ত প্রার্থীরা প্রায় ১,২০০ ভোট পেলেও কোনো ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারেননি।
নির্বাচনী ফলাফলের নিরিখে এনসিপিআই কার্যত অদৃশ্যই ছিল। ত্রিপুরার রাজনৈতিক লড়াই তখন মূলত বিজেপি, সিপিএম-কংগ্রেস জোট এবং টিপরা মথার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। সেই প্রেক্ষাপটে এনসিপিআই-এর উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত সীমিত।
দলটির প্রধান কার্যালয় পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া জেলার সাঁকরাইল থানার অন্তর্গত হাটগাছা গ্রামে। দলের ফেসবুক পেজ এবং বিভিন্ন সরকারি নথি থেকে এই তথ্য জানা যায়। আশ্চর্যের বিষয়, বাংলায় নিবন্ধিত হওয়া সত্ত্বেও দলটি প্রথমে পশ্চিমবঙ্গ নয়, ত্রিপুরাকেই রাজনৈতিক পরীক্ষাগার হিসেবে বেছে নিয়েছিল।
ত্রিপুরা নির্বাচনের পরে অবশ্য দলটির কার্যকলাপ প্রায় স্তব্ধ হয়ে যায়। দলের সঙ্গে যুক্ত কয়েক জন প্রাক্তন প্রার্থী পরবর্তীকালে দাবি করেন, ভোটের পর নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কৈলাসহরের প্রার্থী জাহাঙ্গির আলি এক সংবাদমাধ্যমকে জানান, নির্বাচনের সময় কলকাতা থেকে আসা দলের নেতারা তাঁদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখলেও ভোট শেষ হওয়ার পর সেই যোগাযোগ আর বজায় থাকেনি।
সূত্রের দাবি, ত্রিপুরা নির্বাচনের পর দলের ভিতরে আর্থিক ও সাংগঠনিক প্রশ্নে মতবিরোধ তৈরি হয়। ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার প্রস্তাবও নাকি উঠেছিল। কিন্তু পর্যাপ্ত অর্থ এবং সাংগঠনিক শক্তির অভাবে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি।
দলটির নেতৃত্বের দিকে তাকালে দেখা যায়, কোষাধ্যক্ষ হিসেবে রয়েছেন শিউলি কুন্ডু। শুধু কোষাধ্যক্ষ নন, সংগঠনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও তাঁর হাতে রয়েছে। শিউলি কুন্ডুর নাম আরও দু’টি সংস্থার সঙ্গে যুক্ত। একটি ‘বিশ্ববাজার প্রাইভেট লিমিটেড’ এবং অন্যটি ‘পশ্চিমবঙ্গ অসংগঠিত মহিলা কর্মী অ্যাসোসিয়েশন’। এই তিনটি প্রতিষ্ঠানেরই নিবন্ধিত ঠিকানা হাওড়া জেলায়।
দলটির সভাপতি উত্তীয় কুন্ডু, যিনি শিউলি কুন্ডুর স্বামী। সামাজিক মাধ্যমে উত্তীয় কুন্ডুর কিছু রাজনৈতিক যোগাযোগ নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। তাঁর একটি পুরনো ফেসবুক পোস্টে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে তোলা ছবি দেখা গিয়েছিল, যা নিয়ে নানা জল্পনা তৈরি হয়েছে। যদিও সেই ছবি থেকে কোনো রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রমাণ মেলে না।
এনসিপিআই-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন শান্তনু দে। তিনি একসময় দলের ‘ন্যাশনাল অর্গানাইজিং জেনারেল সেক্রেটারি’ পদে ছিলেন। তবে বর্তমানে দলের সাংগঠনিক কাঠামো কতটা সক্রিয়, তা স্পষ্ট নয়।
দলটির নির্বাচনী প্রতীকও বেশ অভিনব। এনসিপিআই-এর প্রতীক হলো ফাউন্টেন পেনের নিব। কিন্তু প্রতীকটি সাধারণ ভোটারের কাছে তেমন পরিচিত হয়ে উঠতে পারেনি, কারণ দলটি এখনও পর্যন্ত কোনো বড় নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য ফল করতে পারেনি।
তবে রাজনৈতিক বাস্তবতায় কখনও কখনও ভোটের সংখ্যা নয়, পরিস্থিতিই একটি দলকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। এনসিপিআই-এর ক্ষেত্রেও যেন সেটাই ঘটেছে। যে দলটি ত্রিপুরা নির্বাচনে হাজার দেড়েক ভোটও পায়নি, যে দলটির সাংগঠনিক অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন ছিল, সেই দলই এখন লোকসভায় তৃণমূলের বিদ্রোহী শিবিরের রাজনৈতিক আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে।
পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তি তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের জেরে দলটি জাতীয় রাজনীতির আলোচনায় উঠে এসেছে। আগামী দিনে আদালত, নির্বাচন কমিশন এবং সংসদীয় রাজনীতির নানা সমীকরণের মধ্যে এনসিপিআই-এর নাম আরও কতটা গুরুত্ব পায়, তা সময়ই বলবে। তবে, যে দলটিকে কয়েক দিন আগেও কেউ চিনত না, সেই এনসিপিআই এখন বাংলার রা
জনৈতিক অভিধানের এক বহুল আলোচিত নাম।






