আবের কাওয়াস: প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান মুসলিম মহিলা নিউ ইয়র্কের সিনেটে
Aber Kawas: নিউ ইয়র্কের ১২ নম্বর সিনেট ডিস্ট্রিক্ট থেকে জয়ী হয়ে ইতিহাস গড়লেন আবের কাওয়াস। নিউ ইয়র্ক স্টেট আইনসভায় তিনি প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান এবং প্রথম হিজাব পরিহিত মুসলিম মহিলা প্রতিনিধি।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে মুসলিম ও ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মানুষের প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে নতুন ইতিহাস তৈরি করলেন আবের কাওয়াস। ৩ নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে নিউ ইয়র্কের স্টেট সিনেটের ১২ নম্বর আসনে জয়ী হয়েছেন তিনি। এর ফলে নিউ ইয়র্কের আইনসভায় প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান এবং প্রথম হিজাব পরিহিত মুসলিম মহিলা হিসেবে জায়গা করে নিলেন এই রাজনৈতিক কর্মী। তাঁর এই জয় মার্কিন রাজনীতিতে অভিবাসী, মুসলিম এবং ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক উপস্থিতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।
নিউ ইয়র্কের কুইন্স এলাকার ১২ নম্বর সিনেট ডিস্ট্রিক্ট থেকে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন কাওয়াস। নির্বাচনে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন রিপাবলিকান প্রার্থী হান খোন তো। তাঁকে পরাজিত করেই সিনেটের আসনটি দখল করেন কাওয়াস। নির্বাচনের ফলাফল সামনে আসার পর সামাজিক মাধ্যমে তিনি লেখেন, ‘আমরা ইতিহাস তৈরি করেছি।’ তাঁর এই জয়কে ঘিরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন নিউ ইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি-সহ একাধিক প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতা।
আবের কাওয়াসের রাজনৈতিক উত্থানের পিছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের সামাজিক আন্দোলন ও সংগঠনের কাজ। নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিনে ফিলিস্তিনি অভিবাসী পরিবারে তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা। তাঁর বাবা-মা ১৯৯০-এর দশকে ফিলিস্তিন থেকে আমেরিকায় এসেছিলেন। ফলে অভিবাসী পরিবারের সন্তান হিসেবে ছোটবেলা থেকেই মার্কিন অভিবাসন ব্যবস্থার কঠোর বাস্তবতার সঙ্গে পরিচিত হতে হয়েছিল তাঁকে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Abdul El-Sayed: নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর দলের একাধিক নেতা এল-সায়েদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ইসলামবিদ্বেষী প্রচার চালিয়েছিলেন। তাঁর ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে এনে তাঁকে আমেরিকার নিরাপত্তার পক্ষে বিপজ্জনক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছিল।
কাওয়াসের জীবনে সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলেছিল তাঁর বাবার সঙ্গে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা। তিনি যখন স্কুলে পড়তেন, তখন মার্কিন অভিবাসন দফতর তাঁর বাবাকে আটক করে এবং পরে তাঁকে জর্ডানে ডির্পোট করে। পরিবারের এই বিচ্ছেদ কাওয়াসের জীবনদর্শন ও রাজনৈতিক চিন্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। অভিবাসী পরিবারগুলির অনিশ্চয়তা, প্রশাসনিক হয়রানি এবং পরিবার বিচ্ছিন্ন হওয়ার যন্ত্রণা সম্পর্কে তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে অভিবাসীদের অধিকার রক্ষার আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার পিছনেও এই অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
নির্বাচনী রাজনীতিতে আসার আগে ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন সামাজিক ও শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কাওয়াস। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, অভিবাসীদের অধিকার, আবাসনের সমস্যা, পুলিশি নজরদারি এবং সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছেন তিনি। কম মজুরিতে কাজ করা শ্রমিকদের বেতন বাড়ানোর দাবিতে গড়ে ওঠা ‘ফাইট ফর ১৫’ আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি। তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের কেন্দ্রে রয়েছে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা এবং সরকারি পরিষেবার সুযোগ বাড়ানো।
ফিলিস্তিনের অধিকার রক্ষার আন্দোলনেও কাওয়াস দীর্ঘদিন সক্রিয়। ইজরায়েলের দখলদারির বিরুদ্ধে এবং গাজায় সামরিক অভিযানের বিরোধিতা করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছে, তার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। নিউ ইয়র্কের বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে ইজরায়েলের অধিকৃত এলাকায় বসতি স্থাপনকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার বিরোধিতা করেছেন। ২০২৩ সালে ‘নট অন আওয়ার ডাইম!’ নামে একটি প্রচারাভিযানের সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। এই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল নিউ ইয়র্কের অলাভজনক সংস্থাগুলির করছাড়ের সুবিধা ব্যবহার করে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইজরায়েলি বসতি সম্প্রসারণে অর্থ সাহায্য বন্ধ করা। এই সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব আইনসভায় উঠলেও তা শেষ পর্যন্ত আইনে পরিণত হয়নি।
কাওয়াসের নির্বাচনী প্রচারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল আবাসনের ক্রমবর্ধমান খরচ, সর্বজনীন স্বাস্থ্য পরিষেবা, উন্নত গণপরিবহণ, শ্রমিকের অধিকার এবং অভিবাসীদের নিরাপত্তা। মার্কিন অভিবাসন দফতর আইসিই-র ক্ষমতা ও কার্যকলাপেরও সমালোচনা করেছেন তিনি। স্থানীয় প্রশাসন যাতে কেন্দ্রীয় অভিবাসন দফতরের সঙ্গে সহযোগিতা করে অভিবাসীদের আটক বা বহিষ্কারে সাহায্য না করে, সেই দাবিও তুলেছেন।
এই নির্বাচনে কাওয়াসের পাশে ছিলেন নিউ ইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি, মার্কিন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স এবং কংগ্রেস সদস্য রশিদা তালিব। তিনি ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্টস অফ আমেরিকার সদস্য। জুন মাসে ডেমোক্র্যাটিক দলের প্রাথমিক নির্বাচনেও উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন তিনি।
আমেরিকার রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে অভিবাসী ও মুসলিম জনগোষ্ঠীকে ঘিরে যে সন্দেহ, বিদ্বেষ এবং বৈষম্যের রাজনীতি চলে আসছে, তার মধ্যেই এই জয় নতুন বার্তা দিচ্ছে। বিশেষ করে ফিলিস্তিনের অধিকার নিয়ে সরব একজন রাজনৈতিক কর্মীর নির্বাচিত হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন রাজনীতিতে ইজরায়েল-ফিলিস্তিন প্রশ্নে প্রচলিত অবস্থানের বাইরে গিয়ে কথা বলার যে রাজনৈতিক পরিসর তৈরি হচ্ছে, কাওয়াসের জয় তারই একটি উল্লেখযোগ্য প্রতিফলন।






