কাশ্মীরে নিরস্ত্র পর্যটকদের উপর মর্মান্তিক হামলার নেপথ্যে TRF! কারা এই গোষ্ঠী?

Pahalgam Terrorist attack TRF: টিআরএফ সোশ্যাল মিডিয়ায় মগজধোলাইয়ের কাজটি করে। ভারতের বিরুদ্ধে গিয়ে এমন সন্ত্রাসবাদী দলে যোগ দেওয়ার জন্য মানুষদের উস্কানি দেয় টিআরএফ, জানিয়েছিল মন্ত্রক।

inscript
৩ মিনিট
কাশ্মীরে নিরস্ত্র পর্যটকদের উপর মর্মান্তিক হামলার নেপথ্যে TRF! কারা এই গোষ্ঠী?

সাম্প্রতিককালে এত ঘৃণ্য হামলা ভারত দেখেনি। ৩৭০ ধারা বিলোপ, কাশ্মীরকে নতুন পরিচয় দেওয়া, বিধিনিষেধ শিথিল করার পরে, সাধারণ ভারতবাসী ভেবেছিল ভূস্বর্গ নিরাপদ। জীবনের অমূল্য সঞ্চয় বিনিয়োগ করে বিশ্বের অন্যরতম শ্রেষ্ঠ সুন্দর এই অঞ্চলে ঘুরতে যেতে চেয়েছিলেন তাঁরা। মূল্য দিলেন জীবন দিয়ে। বেছে বেছে, গুলি করে হত্যা করা হলো নিরস্ত্র পর্যটকদের। মঙ্গলবার দক্ষিণ কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ের বৈসরনের তৃণভূমিতে পর্যটকদের উপর সন্ত্রাসবাদী হামলায় কমপক্ষে ২৬ জন নিহত হয়েছেন। অভিযোগ উঠেছে, হত্যার আগে প্রতি পুরুষের ধর্মীয় পরিচয় যাচাই করেছিল জঙ্গিরা। আর এই হামলার দায় স্বীকার করেছে দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট (টিআরএফ)। নিষিদ্ধ পাক সন্ত্রাসবাদী সংগঠন লস্কর-ই-তৈবার (এলইটি) একটি শাখা গোষ্ঠী এই টিআরএফ।

২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক টিআরএফ-কে বেআইনি কার্যকলাপ (প্রতিরোধ) আইনের অধীনে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ, সন্ত্রাসীদের নিয়োগ, সন্ত্রাসীদের অনুপ্রবেশ এবং পাকিস্তান থেকে জম্মু ও কাশ্মীরে অস্ত্র আর মাদক পাচারের প্রচারের অভিযোগে 'সন্ত্রাসবাদী সংগঠন' হিসেবে ঘোষণা করে। তখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের জারি করা একটি বিজ্ঞপ্তি থেকে জানা যায়, ২০১৯ সালে এলইটির একটি ছায়া সংগঠন হিসাবে অস্তিত্ব প্রকাশ করে দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক জানিয়েছিল, দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের উদ্দেশ্যে অনলাইনে যুবকদের নিয়োগ করছে। সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের প্রচার, সন্ত্রাসবাদীদের নিয়োগ, সন্ত্রাসবাদীদের অনুপ্রবেশ এবং পাকিস্তান থেকে জম্মু কাশ্মীরে অস্ত্র ও মাদকদ্রব্য পাচারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত রয়েছে দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট। টিআরএফ সোশ্যাল মিডিয়ায় মগজধোলাইয়ের কাজটি করে। ভারতের বিরুদ্ধে গিয়ে এমন সন্ত্রাসবাদী দলে যোগ দেওয়ার জন্য মানুষদের উস্কানি দেয় টিআরএফ, জানিয়েছিল মন্ত্রক।

কেন টিআরএফ-এর জন্ম?

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের মতে, পাকিস্তান কর্তৃক এলইটি-কে দেওয়া এক নতুন নাম ছিল টিআরএফ। লস্কর এবং জইশ-ই-মহম্মদের সঙ্গে একটা ধর্মীয় অর্থ জড়িয়েছিল। পাকিস্তান তা চায়নি। কাশ্মীরের এই জঙ্গিবাদকে স্বতন্ত্র হিসাবে দেখাতে চেয়েছিল এই পাক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী তাই, 'প্রতিরোধ' শব্দটিকেই বেছে নেয় তাঁরা। রেজিস্ট্যান্স বা প্রতিরোধ শব্দটির এক অন্য অভিঘাত রয়েছে সার বিশ্বেই। মন্ত্রকের বিজ্ঞপ্তি থেকে আরও জানা যাচ্ছে, টিআরএফ কমান্ডার শেখ সাজ্জাদ গুলকে ইউএপিএর চতুর্থ তফশিলের অধীনে সন্ত্রাসবাদী হিসাবে মনোনীত করা হয়েছে। সাউথ এশিয়া টেরোরিজম পোর্টাল বলছে, টিআরএফ-এর নেতৃত্বে ছিলেন সাজিদ জাট, সাজ্জাদ গুল এবং সেলিম রেহমানি – সবাই এলইটি-র সঙ্গে যুক্ত। টেলিগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ, টুইটার, ফেসবুক, ট্যামটাম, চিরপওয়ারের মতো সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলির মাধ্যমে এরা মৌলবাদ প্রচার করে এবং কমবয়সি যুবকদের নিয়োগও করে।

টিআরএফ-এর বিরুদ্ধে ভারতের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে জম্মু কাশ্মীরের নিরাপত্তা কর্মী ও সাধারণ নাগরিকদের হত্যার পরিকল্পনা, নিষিদ্ধ সন্ত্রাসবাদী সংগঠনকে সমর্থন করার জন্য অস্ত্রের জোগান দেওয়ার অভিযোগে প্রচুর মামলা আছে। উল্লেখ্য, কাশ্মীর উপত্যকার কয়েকটি গণমাধ্যমকে 'বিশ্বাসঘাতক' বলে দাগিয়ে দিয়ে হুমকি জারি করেছিল টিআরএফ। এই ঘটনার পরে বেশ কয়েকজন সাংবাদিক চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।

'প্রতিরোধ' শব্দটির ব্যবহার

টিআরএফ অনলাইনে সক্রিয় হয়ে ওঠে ৩৭০ ধারা বাতিল হওয়ার পরেই। অনলাইনে ক্রমেই প্রচার বাড়াতে বাড়াতে প্রায় ছয় মাস পরে, টিআরএফ লস্কর ছাড়াও তেহরিক-ই-মিলাৎ ইসলামিয়া, ঘজনবি হিন্দ সহ বিভিন্ন সংগঠনের সংমিশ্রণ হিসাবে সরাসরি কাজ শুরু করে। কেন নিজেদের এমন নবরূপে প্রকাশ করতে হলো লস্করদের? ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্সের (এফএটিএফ) ধরপাকড় ও পরীক্ষা থেকে বাঁচতে এমন এক আড়াল দরকার ছিল যাতে বোঝা যায় এই নামের সঙ্গে ইসলামিক ধর্মীয় উগ্রবাদের সম্পর্ক নেই। এ আসলে জনগণের আন্দোলন। অন্যান্য আরও ছায়া সংগঠনকে এভাবেই মাঠে নামানো হলেও সবচেয়ে সক্রিয় ছিল টিআরএফ। ভারতীয় নিরাপত্তাকর্মীদের মতে, ২০১৯ পরবর্তী কাশ্মীরে, নিরপেক্ষ চেহারার আড়ালে থেকে কাজ করতেই 'প্রতিরোধ' শব্দটিকে সামনে আনা হয় যাতে ইসলামিক নাম থেকে দূরত্ব বজায় রাখা যায়।

২০২০ সালে ঘটা বিভিন্ন হামলার দায় নিতে শুরু করে টিআরএফ৷ উপত্যকায় বিভিন্ন আক্রমণ চলেছে। আগে এই ধরনের হামলা হলেই দায় স্বীকার করতে দেখা যেত লস্কর-ই-তৈবা, জইশ-ই-মহম্মদ এবং হিজবুল মুজাহিদিনের মতো জঙ্গিগোষ্ঠীদের৷ এখন অন্যরা হামলা চালালেও সমস্ত হামলার দায় শুধুমাত্র টিআরএফ-ই স্বীকার করে। টিআরএফ যে ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে তা প্রথম টের পাওয়া যায় যখন জম্মু ও কাশ্মীরের পুলিশ সোপোরে এবং কুপওয়ারার কাছে ওভার গ্রাউন্ড ওয়ার্কারদের (OGWs) একটি ছক ফাঁস করে দেয়। আগে এই শহর ছিল লস্কর-ই-তৈবার ঘাঁটি। তারপর হিজবুল মুজাহিদিন এবং জইশ-ই-মহম্মদ এখানে দাপট বাড়ায়৷ পুলিশ কেরানে নিয়ন্ত্রণ রেখার (এলওসি) কাছে জঙ্গিদের ফেলে দেওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করে। গ্রেফতার হওয়া ওভার গ্রাউন্ড ওয়ার্কাররা জানায়, টিআরএফ-এর জন্য যুবকদের নিয়োগ করছিল তাঁরা। তখন পুলিশ জানিয়েছিল, ২০২২ সালে উপত্যকায় সর্বাধিক সংখ্যক জঙ্গি নিহত হয়েছে টিআরএফ-এর।

২০২৩ সালের মার্চ মাসে, রাজ্যসভায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক জানায়, সেই বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চতুর্থ তফশিল এবং ইউএপিএর প্রথম তফশিলের অধীনে ৫৪ জন সন্ত্রাসবাদী এবং ৪৪টি সন্ত্রাসবাদী সংগঠনকে নিষিদ্ধ করেছে মন্ত্রক। টিআরএফ-সহ চারটি সংগঠনকে সেই বছর ইউএপিএ-র অধীনে সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হিসাবে তুলে ধরা হয়।

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

মানুষ টাকা পেয়ে গেলে ভুলে যাবে, অন্নপূর্ণা যোজনা নিয়ে ক্ষোভ-বিক্ষোভ সম্পর্কে বললেন বিজেপি বিধায়ক সজল

Sajal Ghosh interview: ‘ভয় ছাড়া ভক্তি আসে না’— আইন-শৃঙ্খলা, দুর্গাপূজা বিতর্ক এবং তৃণমূলের দলবদল নিয়ে নিজের মতামত জানালেন বিজেপি নেতা সজল ঘোষ।

ভারতের রাজনীতি কতটা বদলে দিয়েছেন মোদী?

25 years of Narendra Modi: ২৫ বছরে মোদী কতটা বদলে দিয়েছেন ভারতের রাজনীতি? উন্নয়ন, নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক প্রচারের ধরন থেকে শুরু করে গণতন্ত্র, ধর্মীয় মেরুকরণ এবং জাতীয় পরিচয়ের ধারণা—কীভাবে বদলেছে দেশের রাজনৈতিক চালচিত্র?

ব্রাজিল থেকে আমেরিকা যে কারণে দক্ষিণপন্থীদের শাস্তি দিচ্ছে শান্তিকামী মানুষ

The Alt - right Tide Turns: বিশ্বজুড়ে দক্ষিণপন্থী জনতুষ্টিবাদের ভিত্তি কেঁপে উঠেছে। হাঙ্গেরিতে ১৬ বছরের অরবান-শাসনের অবসান, সার্বিয়ায় ছাত্র আন্দোলনের নির্বাচনী বিজয়, ব্রাজিলে প্রথম রাউন্ডে পিছিয়ে থেকেও লুলার জয়, আমেরিকায় মিডটার্মে ডেমোক্র্যাটদের সংসদের দুই কক্ষ দখল, সব মিলিয়ে বিশ্বজুড়ে অতি-দক্ষিণপন্থী জোয়ারে ভাটার সুর। তবে ফ্রান্স, পোল্যান্ড, ইতালিতে দক্ষিণপন্থা এখনও টিকে আছে। সেগুলির বিরুদ্ধেও চলছে জেনজিদের, শ্রমজীবী অভিবাসী মানুষদের বিক্ষোভ।

ডানাছাঁটা ট্রাম্প-নেতানিয়াহু, বিশ্ব রাজনীতি কোন দিকে যাবে?

Trump midterm defeat: আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির পরাজয় এবং ইজরায়েলের নির্বাচনে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানো—দুটি ঘটনাই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই পরাজয়ের পর ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ কী হবে? আমেরিকা-ইজরায়েল সম্পর্কের সমীকরণ কি বদলাবে? আর বিশ্ব রাজনীতিতে তার প্রভাবই বা কতটা পড়বে?

ট্রাম্পের হারের ৫ কারণ: কেন মুখ ফিরিয়ে নিলেন মার্কিন ভোটাররা?

US Midterm Elections: আমেরিকার মিডটার্ম নির্বাচনে বড় ধাক্কা খেল ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি।জীবনযাত্রার খরচ বৃদ্ধি থেকে শুরু করে ট্রাম্পের নীতি—রিপাবলিকানদের ভরাডুবির পাঁচটি মূল কারণ কী কী?

পিস বন্ড কী, কেন দিতে হয়? নেহা বোরার আপত্তিতে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ঔপনিবেশিক আমলের আইন

Peace Bond: শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করলেই কি দিতে হবে পিস বন্ড? AISA-র জাতীয় সভাপতি নেহা বোরার আপত্তিতে নতুন করে বিতর্কে ঔপনিবেশিক আমলের প্রতিরোধমূলক আইন। ব্রিটিশ আমল থেকে স্বাধীন ভারত, CrPC থেকে BNSS—কীভাবে বদলেছে এই আইনি ব্যবস্থা? কেন কাউকে ১০ হাজার টাকার মুচলেকা দিতে বলা হয়? কী বলছে আইন?

রামলীলা ময়দানের সভায় ভিড় দেখাতে এআই ছবি? কতটা সত্যি?

Ramlila Maidan AI image controversy: দিল্লির রামলীলা ময়দানে ১ নভেম্বরের ‘ইন্ডিয়া’ জোটের সমাবেশে ভিড় ও এআই ছবি ব্যবহার নিয়ে বিজেপি ও কংগ্রেসের মধ্যে বিতর্ক তুঙ্গে। ভাইরাল ছবিগুলোর সত্যতা কী?

আবের কাওয়াস: প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান মুসলিম মহিলা নিউ ইয়র্কের সিনেটে

Aber Kawas: নিউ ইয়র্কের ১২ নম্বর সিনেট ডিস্ট্রিক্ট থেকে জয়ী হয়ে ইতিহাস গড়লেন আবের কাওয়াস। নিউ ইয়র্ক স্টেট আইনসভায় তিনি প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান এবং প্রথম হিজাব পরিহিত মুসলিম মহিলা প্রতিনিধি।