ভোটে হার, হাজতবাস! যে যে কারণে রাজনীতির মসৃণ পিচে ফেরা অনিশ্চিত সদা-বিতর্কিত সিধুর

জেলের ভাত হজম হচ্ছে না সিধুর। (সেটাই তো দস্তুর) হাজতের প্রথম রাতগুলোতে খাবার খাচ্ছেন না নভজ‍্যোৎ সিং সিধু। ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। অনিচ্ছাকৃত খুনের একটি মামলায় বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্ট সিধুর এক বছরের জেলের সাজা ঘোষণা করে অবিলম্বে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু তাঁর আইনজীবী অভিষেক মনু সিংভি শুক্রবার সকালে শীর্ষ আদালতের কাছে আত্মসমর্পণের জন্য সপ্তাহখানেক সময় দেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন। অবশ্য সেই শুনানি শেষ হওয়ার আগেই মত বদলে শুক্রবার বিকেলে পাতিয়ালা আদালতে আত্মসমর্পণ করেন সিধু। স্থানীয় হাসপাতালে স্বাস্থ্য পরীক্ষার পরে সিধুকে জেলে পাঠানোর নির্দেশ দেন মুখ্য বিচারবিভাগীর ম্যাজিস্ট্রেট। এ তো কয়েকদিনের পুরোনো কাসন্দি। কিন্তু তা ঘাঁটার প্রয়োজন হল কেন? শোনা যাচ্ছে, সিধুর জেল যাপনের মেয়াদ কমতে পারে। এতে তাঁর রাজনৈতিক কেরিয়ারের আকাশে যে নতুন সূর্য উদয় হবে না, তা বলাই বাহুল্য। এখন প্রশ্ন হল, জেলের ভাত কতদিন?


জেলযাপন কমার জল্পনা
শীর্ষ আদালত সিধুকে পুরনো মামলায় এক বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে। জল্পনা, তাঁর জেলযাপনের মেয়াদ কমতে পারে। সূত্রের খবর, তাঁর জেলে থাকার মেয়াদ ৮ মাস পর্যন্ত কমতে পারে। তবে এর জন্য অনেক কাঠখড় পুড়বে। প্রথমত, জেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাঁকে ভালো ব্যবহার করতে হবে। পাঞ্জাব সরকারকে একটা ভূমিকা পালন করতে হবে। সিধু কি আগাম আঁচ পেয়ে মানের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন? সেকথায় পরে আসা যাক। আপাতত দেখা যাক, Remission বা সাজায় ছাড় সিধুর ক্ষেত্রে কীভাবে প্রযোজ্য হবে?


সুপ্রিম কোর্ট সিধুকে এক বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে। তিনি জেল ফ্যাক্টরিতে কাজের ফলে স্বাভাবিকভাবে ৪৮ দিনের ছাড় পেতে পারেন। এক জেল আধিকারিক জানিয়েছেন, একজন অপরাধী প্রতি মাসে চারদিন করে রেমিশন পেতে পারে। প্রথম তিন মাস জেলে কাজের জন্য বিনা পারিশ্রমিকে তার ট্রেনিং হবে। এছাড়া জেল সুপারের প্রত্যেক অপরাধীর ৩০ দিনের সাজা কম করার ক্ষমতা রয়েছে। সাধারণত প্রত্যেক অপরাধী এই সুযোগ পেয়ে থাকে। ব্যতিক্রম কোনও অপরাধীর বিশৃঙ্খল আচরণ। কিন্তু সিধুর ক্ষেত্রে কী সুবিধা? ডিরেক্টর জেনারেল অফ পুলিস (জেল) অথবা অ্যাডিশনাল ডিরেক্টর জেনারেল অফ পুলিসের (জেল) ৬০ দিনের থার্ড রেমিশন দেওয়ার বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে এবং রাজনৈতিক অনুমতিসাপেক্ষে এটা সম্ভব। সিধুর ক্ষেত্রে বোধহয় এই সম্ভাবনা সবথেকে বেশি করে উজ্জ্বল। কারণ সেই মান।

 

আরও পড়ুন: মোদি-রাজ্যের ভোটে বড় ফ্যাক্টর, কেন এই সম্প্রদায়কে কাছে টানতে মরিয়া সব দল

 


সিধুর মান-যোগ
পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ভগবন্ত মানের সঙ্গে সিধুর গলায় গলায় সম্পর্ক। সম্প্রতি সেই সম্পর্কে আরও মধু ঢেলেছেন সিধু। তাই জল্পনা, মানের হস্তক্ষেপে সিধুর ভাগ্যের শিকে ছিঁড়তে পারে। পাঞ্জাবে কংগ্রেসের ভরাডুবির পর সিধুর সঙ্গে আপ-এর গলাগলি আরও দৃঢ় ভিতের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়। কিছুদিন আগে সিধুর মুখে মানের প্রশংসা শোনা যায়। প্রশ্ন হল, তিনি অশনি সংকেত পেয়েছিলেন? কংগ্রেস নেতা নভজ্যোৎ সিং সিধু ভগবন্ত মানকে 'সৎ মানুষ' হিসেবে প্রশংসা করেছেন এবং বলেছিলেন যে, তিনি দলীয় লাইনের ঊর্ধ্বে উঠবেন এবং রাজ্যের মাফিয়াদের বিরুদ্ধে যে কোনও পদক্ষেপে পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রীকে সমর্থন করবেন। সে যে নেহাতই কথার কথা নয়, তা প্রমাণ হয়ে গেল। এখন কি সিধুর মাথায় মানের হাত রাখা প্রয়োজন? সময়ই এর উত্তর দেবে।

 


কী নিয়ে বিতর্কে সিধু?
ক্রিকেট থেকে রাজনীতি- সর্বদাই চর্চায় থেকেছেন নভজ্যোৎ সিং সিধু। সিধুকে নিয়ে বিতর্ক কম হয়নি। সেরকম একটি বিতর্কিত মামলায় এবার সুপ্রিম কোর্ট নভজ্যোৎ সিং সিধুকে এক বছরের কারাদণ্ড দিল। জানা গিয়েছে, ১৯৮৮ সালে পথ হিংসা মামলায় সাজা পেলেন কংগ্রেস নেতা নভজ্যোৎ সিং সিধু। সম্প্রতি নির্বাচনে তিনি হেরেছেন। তার কয়েক মাস পরেই এত বড় একটি রায় তার জন্য বিশাল আঘাত। তবে এই রায়ের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ জানানোর সুযোগ আছে তাঁর।

 

১৯৮৮ সালে রাস্তায় এক হট্টগোলে জড়িয়ে পড়েন সিধু ও তাঁর এক সহযোগী। এর ফলে এক ব্যক্তি মারা যান। তাঁর পরিবারের সদস্যরা সিধুর বিরুদ্ধে মামলা করেন। ১৯৮৮ সালের ২৭ ডিসেম্বর পাতিয়ালার একটি পার্কিং স্পট নিয়ে গুরনাম সিংয়ের (৬৫) সঙ্গে বিতণ্ডায় লিপ্ত হন সিধু। অভিযোগ, গুরনাম সিংকে তাঁর গাড়ি থেকে টেনে নামান সিধু ও তাঁর সহযোগী রুপিন্দর সিং সাধু। এরপর তাঁরা তাঁকে আঘাত করতে থাকেন। এতে গুরনাম সিং মারা যান। এরপর জল গড়ায় সুপ্রিম কোর্টে। পরিণতি সিধুকে টেনে নিয়ে এল জেলে।

 

রাজনৈতিক কেরিয়ার
পাঞ্জাব বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস ধরাশায়ী হওয়ায় সিধুর ভাগ্যে বিপর্যয়ের মেঘ ঘনিয়ে আসে। এরপর এই ঘটনা! ট্র্যাকে ফিরতে পারা কি আদৌ সম্ভব হবে?

 

পাঞ্জাবে কেবলমাত্র কংগ্রেস পার্টিই নয়, পরাজিত হয়েছেন খোদ সিধুও। অমৃতসর পূর্ব বিধানসভা কেন্দ্র থেকে আপের জীবনজ্যোৎ কউরের কাছে ৩৯, ৫২০ ভোটে পরাজিত হয়েছেন সিধু। তাঁর প্রাপ্ত ভোটের শতাংশ ৩০.৪৯। কংগ্রেসের এই পোস্টার বয়ের পরাজয়ে যদিও খুব একটা হতবাক হয়নি রাজনৈতিক মহল। একাংশের মত, বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী চরণজিৎ সিং চান্নি এবং নভজ্যোৎ সিং সিধুর অন্তর্দ্বন্দ্ব কংগ্রেসের খারাপ ফলাফলের অন্যতম বড় কারণ। ক্যাপ্টেন অমরিন্দর সিংয়ের পদত্যাগের পর রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলের একাংশ মনে করছিল, নভজ্যোৎ সিং সিধুর হাতেই রাজ্যের ব্যাটন দিতে পারে কংগ্রেস। কিন্তু, আদতে তা হয়নি। চরণজিৎ সিং চান্নিকে মুখ্যমন্ত্রী পদে বসিয়েছিলেন সোনিয়া। এরপরেই দলের অন্দরেই ক্ষোভ-বিক্ষোভের খবর সামনে আসতে থাকে। পাঞ্জাব থেকে ধুয়ে-মুছে সাফে হয়ে যায় কংগ্রেস। এর জেরে পাঞ্জাবের প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি পদ থেকে ইস্তফা দিতে চান সিধু। বলাই বাহুল্য, বাধ্য হন। কারণ শেষ পর্যন্ত সোনিয়ার নির্দিশে তাঁকে দলীয় প্রধানের পদ থেকে ইস্তফা দিতে হয়। নতুন করে রাজনীতিতে ঘুঁটি সাজানোর সময়ই পেলেন না সিধু। এর মধ্যেই তাঁর ঠিকানা হল শ্রীঘর। জেলযাপনের মেয়াদ কমতে পারে, কিন্তু সিধুর কি আর রাজনীতির মসৃণ পিচে ফেরা হবে? যদি তেমনটা হয়, তাহলে সেটা হবে মিরাকল, কামব্যাক নয়।

 

 

More Articles

;