সব রোগের একটাই অব্যর্থ দাওয়াই? বিজেপির শরণে গিয়ে যা প্রমাণ করলেন অজিত পাওয়ার
Ajit Pawar and BJP Shiv sena: কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের (ইডি) চাপের মুখে রয়েছে পাওয়ার পরিবার এবং এনসিপির বহু নেতাই।

ভাইপো বড়ই বিড়ম্বনার! দেশিয় রাজনীতিতে দুই প্রান্তে দুই দলেই ভাইপোকে নিয়ে টানাটানি। একদিকে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী তথা বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নানা দুর্নীতির অভিযোগে ডাকাডাকি করে ইডি-সিবিআই। অন্যদিকে ইডি থেকে বাঁচতেই বিরোধী দল ভেঙে শাসক দলে যোগ দিচ্ছেন শরদ পাওয়ারের ভাইপো অজিত পাওয়ার। এমনিতেই মহারাষ্ট্রের রাজনীতি নিয়ে স্বয়ং নস্ত্রাদামুসও কিছু হলফ করে বলতে পারতেন না। আজ যে বিরোধী, কাল সেই শাসক, আজ যে শাসক সেই কাল দলচ্যুত! কে যে কখন কার দলে, কে যে দলের মধ্যেই লুকিয়ে থাকা ভাঙনের বীজ- বোঝা দায়। তবে একটি বিষয় সাফ। বাঁচতে গেলে শরণাপন্ন হতে হবে শাসকের। তাতে আদর্শ, নীতি জলাঞ্জলি যাক- সবকিছু ফেয়ার ইন ওয়ার অ্যান্ড পলিটিক্স! ঠিক গেল বছরই একনাথ শিন্ডে বিদ্রোহী বিধায়কদের নিয়ে গিয়ে নানা কাণ্ড ঘটিয়ে শিবসেনা আর বিজেপির জোট সরকার গড়ে ফেললেন। বাল ঠাকরেকে নিয়ে কাড়াকাড়ি করতে করতে শিবসেনা চিরে দু' ভাগ! উদ্ধব মুখ্যমন্ত্রী রইলেন না, শিন্ডে হয়ে গেলেন রাজ্যের শাসক। এবার ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি (এনসিপি) ভেঙে শিবসেনা-বিজেপির ছাতার তলে চলে এলেন শরদ পাওয়ারের ভাইপো অজিত পাওয়ার। একা এলেন না, সঙ্গে লোকলস্কর নিয়ে এলেন।
হিন্দিতে কথা আছে একটা, ‘হোনি কো কৌন টাল সকতা হ্যায়'। অজিত যে বিজেপিতে যাবেন তা তো একপ্রকার 'হোনি'ই ছিল। সেই ২০১৯ থেকে অজিত পাওয়ার চাইছিলেন বিজেপির সঙ্গে মিলেমিশে সমাজসেবা করতে। ২০১৯ সালে বিধানসভা নির্বাচনের পর বিজেপির সঙ্গে মিলে সরকার গড়তে চেয়েছিলেন অজিত পাওয়ার। কাকা শরদ পাওয়ার বেঁকে বসেন। ৩ দিন মাত্র উপমুখ্যমন্ত্রী পদে থাকতে পান অজিত। তারপর শিবসেনা এনসিপি আর কংগ্রেস জোট করে সরকার গড়ে। ফের উপমুখ্যমন্ত্রী হন অজিত পাওয়ার। তারপর কোথা থেকে কী হইয়া গেল, একনাথ শিন্ডের শিবসেনা আর বিজেপি সরকার গড়ে ফেলল, উপমুখ্যমন্ত্রী থেকে সরাসরি বিরোধী দলনেতা হয়ে যান অজিত পাওয়ার। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই বিজেপি শিবসেনা সরকারের উপমুখ্যমন্ত্রী হয়ে গেলেন শরদ পাওয়ারের ভাইপো। আভাস দিচ্ছিলেন না এমন নয়, মোদির স্তুতি, দলের অনুষ্ঠানে না যাওয়া সবই চালিয়ে গেছেন নিয়ম করে।
অজিত পাওয়ার এবং আটজন এনসিপি বিধায়ক রবিবার বিকেলে রাজভবনে গিয়ে শপথ নিয়েছেন। গত বছর উদ্ধব ঠাকরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডে দাবি করেছিলেন 'আসল' শিবসেনা তাঁরাই। অজিতও বলেছেন আসল এনসিপি তিনিই কারণ তাঁর কাছেই ৩৫ জন এনসিপি বিধায়ক এবং পাঁচজন লোকসভা সাংসদের মধ্যে দু'জনের সমর্থন রয়েছে বলে দাবি। এতদিন শিবসেনা আর বিজেপি মিলে চালাত মহারাষ্ট্র সরকার। এবার জুড়ল এনসিপি। কিন্তু কেন জুড়ল?
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
উদ্ধবকে মুখ্যমন্ত্রিত্ব ছাড়তে হবে কি না, তা সময়ই বলবে। কিন্তু মারাঠা পরিচয়কে সামনে রেখে একটি দল চালানোর গণ্ডি পেরিয়ে, চরম সংকটের মুহূর্তেই নেতা হয়ে উঠলেন তিনি।

কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের (ইডি) চাপের মুখে রয়েছে পাওয়ার পরিবার এবং এনসিপির বহু নেতাই। ঘটনাচক্রে, গত মাসের শেষের দিকে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এনসিপিকে সেচ প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগে আক্রমণ করেন। এনসিপির অধীন মহারাষ্ট্র রাজ্য সমবায় ব্যাঙ্কের দিকেও বেনিয়মের অভিযোগ ওঠে। অজিত পাওয়ার সহ যে ক'জন এনসিপি নেতা গেছেন বিজেপি-শিবসেনা শিবিরে অধিকাংশই রয়েছেন ইডি-র নজরে। ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টির অজিত পন্থী নেতাদের মধ্যে অন্তত তিনজনের বিরুদ্ধে পৃথক পৃথক আর্থিক তছরুপের মামলা রয়েছে। এনসিপির যে আট নেতা মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন, যেমন ছগন ভুজবল, হাসান মুশরিফ, ধনঞ্জয় মুন্ডে, দিলীপ ওয়ালসে পাতিল, ধর্মরাও বাবা আত্রম, অদিতি তাটকরে, অনিল পাতিল এবং সঞ্জয় বনসোডে- অনেকেই ইডির সাঁড়াশির মুখে। ফলে পরিত্রাণ পেতেই দলবদল, বলছেন নিন্দুকরা! খোদ অজিত পাওয়ারের বিরুদ্ধেই রয়েছে অভিযোগ! এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট সম্প্রতি তৎকালীন MSCB (মহারাষ্ট্র স্টেট কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্ক) দ্বারা ২০১০ সালে সাতারার জরান্দেশ্বর সহকারি চিনি কারখানার বিক্রিতে প্রতারণা ও অর্থপাচারের মামলায় চার্জশিট জমা দিয়েছে। বিষয়টিতে জড়িত ছিলেন অজিত। তবে, লক্ষণীয় যে ইডি অজিত পাওয়ার এবং তাঁর স্ত্রী সুনেত্রার নাম কিন্তু চার্জশিটে জোড়েনি।
ইডি এনসিপি নেতা হাসান মুশরিফের কোলাপুরের চিনি কারখানা সার সেনাপতি সান্তাজি ঘোরপাড়ে সুগার ফ্যাক্টরি লিমিটেডের বেনিয়ম সংক্রান্ত তদন্ত চালাচ্ছে। কারখানাটি হাসান মুশরিফের পরিবারের সদস্য এবং আত্মীয়রাই চালান। একাধিক সন্দেহজনক ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা তোলা হয়েছে নানাভাবে। প্রাক্তন অসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রী এবং প্রবীণ এনসিপি নেতা প্রফুল প্যাটেলের নাম জড়িয়েছে প্রয়াত মাদক পাচারকারী ইকবাল মির্চির সম্পদ সম্পর্কিত তদন্তে। প্রফুল প্যাটেল কিন্তু শরদ পাওয়ারের ডানহাত ছিলেন! ছগন ভুজবলকে ইডি ২০১৬ সালে মহারাষ্ট্র সদন কেলেঙ্কারি সংক্রান্ত একটি আর্থিক তছরুপের মামলাতে গ্রেপ্তার করেছিল। ২০১৮ সালে বম্বে হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়েছিলেন তিনি। অর্থাৎ আপাদমস্তক ইডির নিশানায় ডুবে থাকা একটি দল ও নিজেকে বাঁচাতে অজিত পাওয়ারের কাছে সবচেয়ে সহজ ও জনপ্রিয় রাস্তাটিই ছিল খোলা। যে কারণে বিজেপির নেতারা ইডি বা সিবিআইয়ের ডাক পান না, যে কারণে বিজেপি ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধ আদালতেও ওঠে না, সেই একই কারণেই তবে শিবির বদলালেন অজিত? শরদ পাওয়ার কিচ্ছুটি জানলেন না?
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মহারাষ্ট্রের স্টিয়ারিং থাকল একনাথের হাতে। এ কি শুধুই বিজেপির দেওয়া পুরস্কার? বোধহয় না, এটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হলেও একমাত্র কারণ নয়।

নরেন্দ্র মোদি এনসিপি সম্পর্কে বলেছিলেন দল শেষ হয়ে গেছে। দল যে শেষ হয়নি তাঁর প্রমাণ দলবদল করে দিলেন ভাইপো অজিত! এতেই 'খুশি' শরদ! এমন 'মরিয়া প্রমাণ করিল মরে নাই' গোছের উত্তরের আড়ালে তাহলে নিজেকেই ঢাকতে চাইছেন শরদ? নাকি তাঁর গোচরেই হয়েছে সবটা? এবার তাহলে দলের নির্ভরযোগ্য মুখ কে হবেন জানতে চাওতে শরদ পাওয়ার এখনও হাসতে হাসতে বলছেন ‘শরদ পাওয়ার’। অথচ সকলেই জানেন, অশীতিপর শরদ শারীরিক কারণেই আর পারবেন না দলের নেতৃত্ব দিতে। সুপ্রিয়া শুলে বনাম অজিত পাওয়ার লড়াই হবে কিনা এও বড় প্রশ্ন।
অন্যদিকে মহারাষ্ট্রের ইতিহাসে এই প্রথম দুইজন উপমুখ্যমন্ত্রী হবেন। একনাথ শিন্ডের প্রথম উপমুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন দেবেন্দ্র ফড়নবিশ। দল ভেঙে শাসক শিবিরে আসার পুরস্কার স্বরূপ উপমুখ্যমন্ত্রিত্ব তো দিতেই হবে অজিত পাওয়ারকে। তাহলে কি কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পরিষদের রদবদলে দেবেন্দ্র ফড়নবিশকে দিল্লিতেই পাঠানো হবে? এ নিয়ে অবশ্য জল্পনা চলছে।
রাজনৈতিক মহলের বড় অংশই বলছে, এনসিপি দল ভেঙে মহারাষ্ট্রের জোটকে শক্তিশালী করা মূল লক্ষ্য না। পাখির চোখ সেই ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন। বাইরে যতই দেখানো হোক না কেন, মহারাষ্ট্রের রাজনীতির অন্দর বলছে শিন্ডের নেতৃত্বাধীন মহারাষ্ট্র সরকার খুব যে কাজে কাজ করছে তা নয়। বিজেপির দুশ্চিন্তা হচ্ছে ২০২৪ সালে মহারাষ্ট্রে তাদের লোকসভা আসন সংখ্যা ৪১-এর নিচে নেমে যেতে পারে। উদ্ধব ঠাকরের প্রতি মারাঠাদের সহানুভূতি এর অন্যতম কারণ। এনসিপির অনেক দলত্যাগী বিধায়ক এবং নেতাদের তাদের নির্বাচনী এলাকায় যথেষ্ট দাপট রয়েছে, যা লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির সম্ভাবনাকে শক্তিশালী করতে পারে। বিজেপি কাঁটা দিয়েই কাঁটা তুলতে জানে। ফলে অজিত পাওয়ারের বড় ছেলে পার্থ পাওয়ার, যিনি মাভাল থেকে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে হেরে যান, তাকেই শরদ পাওয়ারের মেয়ে সুপ্রিয়া সুলের বিরুদ্ধে প্রার্থী করা হতে পারে।





