শক্তিমান থেকে আলিফ লায়লা, আরতি পালের মাটির পুতুল কেন এত জনপ্রিয়?

Arati Pal : আশি ও নব্বই দশকে দূরদর্শনে সম্প্রচারিত জনপ্রিয় ধারাবাহিকের চরিত্রগুলোকে নির্ভর করে আরতি পাল পুতুল তৈরি করেছেন। এর মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হল:  শক্তিমানের পুতুল।

Suvankar Das
৩ মিনিট
শক্তিমান থেকে আলিফ লায়লা, আরতি পালের মাটির পুতুল কেন এত জনপ্রিয়?

সাদা ধুতি পাঞ্জাবির ওপরে হলুদ উত্তরীয়র ঢেউ। মুখে হাল্কা লাজুক হাসি। চন্দন চর্চিত কপাল। মাথায় টোপর। পাশে বসে থাকা রমণীর স্থূল শরীরে আনন্দের অভিব্যক্তি খেলা করে যায়। তার, গলায় মালা। মাথায় মুকুট। টানা টানা চোখ ও গোলাকার মুখমণ্ডল। কপালে চন্দন-প্রলেপ। এভাবেই বাংলার চিরাচরিত বর-বউ-এর পুতুল তৈরি করেছেন হুগলী জেলার শ্রীরামপুর রাজ্যধরপুরের বর্ষীয়ান শিল্পী আরতি পাল। আজ নয়, বহু বছর ধরেই তিনি জড়িত আছেন মৃৎশিল্পের সঙ্গে।

বর বউ-এর পুতুল

অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বাংলার শিশুদের জন্য মাটির পুতুল তৈরি করে চলেছেন পঁয়ষট্টি বছরের আরতি দেবী। তাঁর পুতুলের বিশেষত্ব হল স্নিগ্ধতা। পুতুলগুলির মধ্যে রয়েছে 'দেখামাত্রই ভালো লেগে যাওয়া'- র মতো আনন্দের ভাব। ছোটোবেলায় পিতা নারায়ণচন্দ্র পাল ও পিসি সরলা পালের কাছে পুতুল তৈরির কৌশল শিখেছিলেন আরতি দেবী। তারপর দশকের পর দশক ধরে বংশপরম্পরায় এই মৃৎশিল্পকে আজও বাঁচিয়ে রেখেছেন তিনি। তাঁর তৈরি পুতুলগুলো নিজেদের অভিব্যক্তি দিয়ে মানব-মনের সঙ্গে কথা বলে চলে। আর এখানেই শিল্পীর সার্থকতা! তাঁর তৈরি পুতুলগুলির মধ্যে এমন এক নিষ্পাপ সরলতা থাকে, যা দেখামাত্রই ভালো লেগে যায় সবারই।

প্রধানত, গড়ে সাড়ে চার থেকে পাঁচ ইঞ্চি উচ্চতার পুতুল তৈরি করে থাকেন আরতি পাল। তাঁর তৈরি নারী পুতুলগুলির মধ্যে অন্যতম হল, কৃষক রমণী, কুয়ো থেকে জল তোলা বউ। আরতি পাল এই পুতুলগুলির মধ্যে দিয়ে মেয়েদের দৈনন্দিন জীবনকে প্রকাশ করতে চেয়েছেন। ছেলেদের পুতুলের মধ্যে রয়েছে, হাঁটু পর্যন্ত ধুতি পরে মাথায় ঝুড়ি-ভর্তি সবজি নিয়ে চলা মধ্যবয়সি লোক। রয়েছে, গোল লাল রঙের টুপি ও গোল গলা খাঁকি উর্দি পরা পুতুলরূপী পুলিশ। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, বিশেষত ছেলে পুতুলগুলির মধ্যে অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সমাজ-জীবনের স্পষ্ট ছাপ ফুটে উঠেছে। শুধু মানুষের পুতুল-ই নয়, চারপাশের প্রকৃতিও মিলেমিশে রয়েছে তাঁর তৈরি পুতুলের মধ্যে। যেমন, কাঠবেড়ালি, কচ্ছপ, বক, ব্যাঙ, ঘোড়া, ইঁদুর, গরু, খরগোশ, গাছ ইত্যাদি পুতুলও আরতি পাল তৈরি করে থাকেন।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মেঘলা দিনের রথের মেলা আজও রঙিন মাটির পুতুলে

Clay Doll : বলাই চিত্রকরের তৈরি পুতুলের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হলো ঘাড়-নাড়া বুড়ো পুতুল। দুই খোল ছাঁচের এই পুতুলের শরীরের ভেতরটা ফাঁপা।

আরতি পালের তৈরি পুতুল

আশি ও নব্বই দশকে দূরদর্শনে সম্প্রচারিত জনপ্রিয় ধারাবাহিকের চরিত্রগুলোকে নির্ভর করে আরতি পাল পুতুল তৈরি করেছেন। এর মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হল: শক্তিমানের পুতুল। মুকেশ খান্না অভিনীত এই চরিত্রটি গ্রাম বাংলায় যে বিশেষ প্রভাব ফেলেছিল তার নিদর্শন আজও দেখা যায় আরতী পালের তৈরি শক্তিমান পুতুলের মধ্যে। অন্যদিকে আলিফ লায়লার ধারাবাহিকের দৈত্য ও পরী চরিত্রগুলোকে মাটির পুতুলে রূপান্তরিত করেছেন তিনি। পাশাপাশি, মহাভারতের কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ, পিতামহ বিশ্বের শরশয্যা, দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ, গঙ্গা ও শান্তনুর প্রণয়, এইসবই মাটির পুতুলে ফুটিয়ে তুলেছেন আরতি দেবী। তাঁর পুতুলের মধ্যে রামায়ণের কয়েকটি দৃশ্যও দেখতে পাওয়া যায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল রাম-রাবণের যুদ্ধ, সীতাহরণ, রামের বনবাস ইত্যাদি।

আরতি পালের তৈরি পুতুল

বাংলার জনপ্রিয়তম পুতুলগুলির মধ্যে অন্যতম হলো, হাতে হুকো নিয়ে বসে থাকা ঘাড় নাড়া বুড়ো দাদু। আরতি পালও ঘাড় নাড়া দাদুর পুতুল তৈরি করেন। কিন্তু তাঁর তৈরি পুতুলটির মধ্যে সমাজের উচ্চ বর্ণের এক ধরনের আভিজাত্যের ভাব লক্ষ্য করা যায়। আরতি পালের তৈরি পুতুলটিকে দেখতে স্থূল চেহারার। গলায় পইতে। কপালে বৈষ্ণবীও টিকা। শ্বেত শুভ্র দাড়ি নিয়ে মাথা উঁচু করে বসে রয়েছে। এছাড়াও তিনি বাংলার আরেকটি জনপ্রিয় পুতুল আহ্লাদ-আহ্লাদীও তৈরি করে থাকেন।

মৃৎশিল্পী আরতি পাল

চিরাচরিত সমাজ জীবনে যে সকল শ্রমজীবী মানুষ বিভিন্ন পেশার মাধ্যমে সমাজের ভিতকে আরো জোরদার করে তোলেন সেইসব চরিত্রদের দেখাও পাওয়া যায় আরতি পালের পুতুলের ভেতর। যেমন, ব্যান্ড পার্টি, পোস্ট ম্যান, আইসক্রিম বিক্রেতা, ফুচকাওয়ালা, ট্রাফিক পুলিশ, সবজি বাজার নিয়ে বসা যুবক, সৈনিক, এ সবই সমাজের বিভিন্ন স্তরের ভিন্ন ভিন্ন জীবিকার মানুষের কথা বলে চলে। প্রসঙ্গত, সৈনিকের পুতুলটি তৈরির ক্ষেত্রে ১৯৬২ সালের ভারত-চিন যুদ্ধ তাঁকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। তাঁর পুতুলের মধ্যে ভারতের সৈনিকের পাশাপাশি চিনের সৈনিকও দেখতে পাওয়া যায়। প্রসঙ্গত জানাই, আগে মাটি দিয়ে যুদ্ধের ট্যাংক তৈরি করতেন আরতি দেবী!

ব্যান্ড পার্টির পুতুল

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, তাঁর তৈরি বেশিরভাগ পুতুলই এক খোল ছাঁচের। কেবল হাতে হুকো নিয়ে ঘাড় নাড়া বুড়ো পুতুল এবং বর-বউ পুতুলের মতো কয়েকটি পুতুল তৈরির ক্ষেত্রে দুই কুল ছাঁচ ব্যবহার করা হয়। মাটির মিশ্রণের ক্ষেত্রে বেলে-দোয়াসের ওপর ভরসা রাখেন আরতি পাল। ব্যবহার করেন বাজার চলতি রঙ। বছরে শুধুমাত্র ঝুলনযাত্রা উপলক্ষে মাটির পুতুল তৈরি করেন আরতি দেবী। শিল্পীর কথায়, ঝুলন যাত্রা উপলক্ষে প্রায় পঞ্চাশ রকমেরও বেশি মাটির পুতুল তৈরি হয়। রাজ্যধরপুর অঞ্চলের অন্যান্য শিল্পীদেরও পুতুল তৈরির ক্ষেত্রে এক বিশেষ অনুপ্রেরণা ক্রমাগত যুগিয়ে চলেছেন মৃৎশিল্পী আরতি পাল!

লিখেছেন
Suvankar Das
Suvankar Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।