মেঘলা দিনের রথের মেলা আজও রঙিন মাটির পুতুলে

Clay Doll : বলাই চিত্রকরের তৈরি পুতুলের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হলো ঘাড়-নাড়া বুড়ো পুতুল। দুই খোল ছাঁচের এই পুতুলের শরীরের ভেতরটা ফাঁপা।

Suvankar Das
৩ মিনিট
মেঘলা দিনের রথের মেলা আজও রঙিন মাটির পুতুলে

শান্ত অপরাহ্ন। উন্মুক্ত প্রান্তরে ঘেরা এক গ্রাম। বসেছে রথের মেলা। হালকা বৃষ্টি হচ্ছে সকাল থেকে। তখনও রথের রশিতে টান পড়েনি। শুধু সাজিয়ে রাখা হয়েছে। বনেদি বাড়িগুলোর থেকে কিছুটা তফাতে থাকা মাটির বাড়ির বাসিন্দাদের মনেও সমান আনন্দ। কাদামাখা রাস্তার দুই ধারে জিলিপির প্যাঁচ তৈরি হচ্ছে। ব্যাবসায়ীরা প্লাস্টিকের চাদরের আচ্ছাদনের তলায় বসে নিজেদের পসরা সাজাচ্ছে। এরই মাঝে নিজের তৈরি ঘাড়নাড়া বুড়ো পুতুলের মধ্যে শেষ তুলির টান দিচ্ছেন ঈষৎ খর্বকায় এক শিল্পী। প্লাস্টিকের ভিড়ে সে একাই মাটির পুতুলের বিপুল সম্ভার নিয়ে বসে রয়েছে। প্লাস্টিকের চাদরে মোড়া তাঁর লোকজ শিল্পসম্ভার। বলাই চিত্রকরের কপালে চিন্তার ভাঁজ।

মধ্যপঞ্চাশের এই শিল্পী মাটির পুতুলের ঐতিহ্যকে বহন করে নিয়ে চলেছে বেলমুড়ির মাকালপুরের রথের মেলায়। সারা বছরে শুধুমাত্র রথের আগেই পুতুল তৈরি করেন তিনি। আর সেই পুতুল নিয়ে রথের মেলায় পসরা সাজিয়ে বসেন। তাঁর তৈরি কাঁচা মাটির রঙিন দুই খোল ছাঁচের পুতুলগুলির মধ্যে গ্রাম্য সারল্য রয়েছে। ফেলে আসা অতীতের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে তাঁর তৈরি মাটির পুতুল। মুদ্রাস্ফীতির এই বাজারে প্রান্তিক শিশুরা যাতে মনের আনন্দে মাটির পুতুল নিয়ে খেলতে পারেন সেই দিকে নজর রেখেই শিল্পী পুতুলের দাম বাড়াননি।

বলাই চিত্রকরের মাটির পুতুলবলাই চিত্রকরের তৈরি পুতুলের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হলো ঘাড়-নাড়া বুড়ো পুতুল। দুই খোল ছাঁচের এই পুতুলের শরীরের ভেতরটা ফাঁপা। আলাদা করে তৈরি করা মাথাটা এই ফাঁপা অংশের মধ্যে সুতো দিয়ে বেঁধে জোড়া হয়েছে। ফলে মাথায় আলতো টোকা মারলেই পুতুলটির ঘাড় নেড়ে ওঠে। বয়সের ভারে নীল-সবুজ জোব্বা পরা ঘাড়-নাড়া বুড়ো পুতুল ন্যুব্জ হয়ে গিয়েছে। মাথা নিচু করে মাটির দিকে চেয়ে রয়েছে তাঁর পুতুল। টানা চোখ, লাল ঠোঁট, কপালে লাল টিকা, মুখে অভয়সুলভ হাসির মিষ্টতা। সাদা দাড়ির মধ্যে প্রজ্ঞার ছোঁয়া। চোঙার মতো দেখতে লাল সবুজ রঙের কাগজের টুপি পরে ঘাড়-নাড়া বুড়ো পুতুল আজও গ্রাম্য জীবনের অংশ।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বাবার কাছে হাতেখড়ি! ৯০ বছর ধরে মাটির পুতুল গড়ছে কালো সূত্রধররা

Bishnupur: এখানকার ৭ থেকে ৮ ইঞ্চি উচ্চতার বর-বউ পুতুলের মধ্যে অনিন্দ্য সৌন্দর্য দেখতে পাওয়া যায়। পশ্চিমবাংলার বিভিন্ন জায়গায় বর-বউ পুতুল তৈরি হয়ে থাকে। কিন্তু বিষ্ণুপুরের এই পুতুলের মধ্যে স্নিগ্ধতা রয়েছে।

দেশী ঘাড়-নাড়া বুড়ো পুতুলের আবার একটি সাহেব সংস্করণও রয়েছে। সেখানে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে কোট পরা পুতুলটি। শরীরী ভাষায় কর্তৃত্ব করার অভিব্যক্তি। অন্যদিকে, কাঁখে কলসি হাতে বালটি নিয়ে এগিয়ে চলা লাল-নীল রঙা শাড়ি পরিহিতা ঘোমটা দেওয়া দুই খোল ছাঁচের তৈরি বউ পুতুল, নারী জীবনের দৈনন্দিন সংগ্রামের কথা বলে চলে। বহু সংগ্রাম শেষে গ্রাম্য নারীরা মুখের সরল অনাবিল হাসিটা ঠিক বজায় রাখতে পারে। এই ভাবটা তাঁর তৈরি পুতুলকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।

ছাঁচের তৈরি বউপুতুলপ্রশ্ন আসে, পরবর্তী প্রজন্ম কি শিখছে? প্রতিবেদকের এই প্রশ্নের উত্তরে শিল্পী আক্ষেপ করে জানান , তিনিই এই শিল্পের শেষ প্রতিনিধি। তাঁর ছেলেরা এই কাজ শেখেনি। তাঁরা কলকাতায় বড়ো কাঠামোর প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত। আগে তালচিনান থেকে দাদা গৌড় চিত্রকরের সঙ্গে এই মেলায় পুতুল নিয়ে আসতেন তিনি। এখন গৌড় চিত্রকর পুতুল তৈরি করা ছেড়ে দিয়েছেন। ফলে মাকালপুরের মেলায় বাংলার লোকসংস্কৃতির ধারাকে একা হাতে আগলে রেখেছেন তিনি।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
এক বৃদ্ধের হাতে জীবিত নাড়াজোলের কাঠের পুতুল শিল্প

Bengal Oldest Craft : বিশ্বনাথ বাবুর কথায় পুতুল সংগ্রাহক কুন্তল কুইল্যা তাঁকে নতুন করে এই পুতুল তৈরি করার অনুপ্রেরণা দিয়ে গিয়েছেন। সেই জন্য আজও এই পুতুল শিল্পটিকে তিনি টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছেন।

রাহুল সাংকৃত্যায়ন তাঁর ভোলগা থেকে গঙ্গা গ্রন্থে প্রাগৈতিহাসিক সমাজে ক্ষমতার কেন্দ্রে মাতৃত্বের জয়জয়কারকে দেখিয়েছিলেন। গোষ্ঠীবদ্ধ পরিবারে মা সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে চলেছে। এমনই চিত্র ফুটিয়ে তুলেছিলেন তিনি। হুগলির শিয়াখালার রামপাড়া ৯৬ বছরের পুরনো রথের মেলায় মৃৎশিল্পী মিতালী চিত্রকরকে দেখে প্রতিবেদকের সেই কথাই মনে পড়ে গেল। পুতুল নিয়ে বসে রয়েছেন শিল্পী। আর তার পাশে রয়েছেন স্বামী, পুত্র, পুত্রবধূ ও নাতি-নাতনি। তাঁরাও ক্রেতাদের সামলাচ্ছেন। মিতালী চিত্রকরের বাড়ি বারুইপাড়ায়। গোয়ালিনী, খুঁকি, ময়ূর, পাখি এবং ঘাড়-নাড়া বুড়ো পুতুলের সম্ভার নিয়ে শিল্পী বসেছেন। তাঁর প্রতিটা পুতুলই দুই খোল ছাঁচের কাঁচা মাটির তৈরি। তার ঘাড়-নাড়া বুড়ো পুতুলকে শিল্পী জরির কাপড় পরিয়েছেন। মাথায় দিয়েছেন সোনালী রঙের মুকুট। টানা চোখ। কপালে বৈষ্ণবী তিলক। বয়সের ভারে ন্যুব্জ হলেও রাজকীয় ভাব অটুট রয়েছে। দুই খোল ছাঁচের ফাঁপা শরীরের সঙ্গে সুতো দিয়ে গলা পর্যন্ত মাথার দিকটা জোড়া হয়েছে। তাঁর তৈরি গোয়ালিনী পুতুলের মধ্যে উত্তর ভারতীয় শৈলীর ছাপ স্পষ্ট। শিশুদের ভিড় জমেছে তাঁর পসরার সামনে।

বেলমুড়ির মাকালপুরের রথের মেলায়নিস্তরঙ্গ পরিবেশে ক্রমেই ভিড় বাড়তে থাকে। শহুরে ক্রমাগত ছুটে চলার উত্তেজনা এখানে নেই। মিতালী চিত্রকর-এর উল্টো দিকে চাকা লাগানো পোড়ামাটির নৌকো ও খেলনা বাটি নিয়ে বসেছেন ফ্যালাপাল। নিরুত্তাপ থেকে ধৈর্য সহকারে গ্রামীণ শৈশবের মুখোমুখি বসে রয়েছেন তিনি। এরই মধ্যে নগর পরিক্রমা করে মেলার মধ্যে কাঠের তৈরি পঞ্চরত্নের রথ প্রবেশ করল।

বাঙালির কাছে রথযাত্রা নিছক ধর্মীয় পরম্পরা নয় তা আদতে শিল্পচেতনার এক অনুপম নিদর্শন। তার স্বতঃস্ফূর্ততা আজও গ্রামীণ বাংলাকে মোহিত করে রেখেছে। এই মেলাখেলার সঙ্গে কলকাতা শহরের তেমন যোগ নেই। আর শহুরে সংস্কৃতি যেভাবে দ্রুত গ্রাস করছে গ্রাম বাংলার চিহ্নগুলিকে, এইসব বিশ্বায়নের চটকদারি বিজ্ঞাপনের ভিড়ে ফুরিয়ে যাবে। ফলে ভয় এইসব লোকজ শিল্প আর প্রান্তিক শিল্পীদের নিয়েও, প্রচারের আলো থেকে আজও যাঁরা দূরে, নিরালায়।

কৃতজ্ঞতা: আকাশ বিশ্বাস

লিখেছেন
Suvankar Das
Suvankar Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ঋত্বিক: ফিরে দেখা

Ritwik Ghatak: আমরা যখন ছোট ছিলাম, মানে ষাটের দশকের সেই শেষ দিকে বা সত্তরের দশকে, তিনি কত না অদ্ভুতভাবে আমাদের প্রভাবিত করতেন। যেমন একদিন আমাদের রবীন্দ্রসদনের সামনে দেখতে পেয়ে তিনি হঠাৎ বললেন, আমাকে একটা ট্যাক্সি ধরে দেবে?

কলকাতায় চালু হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস

West Bengal School of Magic: মুখ্যমন্ত্রী ‘পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক, ইল্যুশন অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস’ স্থাপনের প্রস্তাবে অনুমোদন করেছেন। পুজোর পর উপদেষ্টা কমিটির সদস্যরা বৈঠক করবেন।

বিভূতিভূষণের উপন্যাস কেবল দৃশ্যের নয়, শব্দেরও এক জগৎ তৈরি করে

Bibhutibhushan Bandyopadhyay: বাংলা সাহিত্যে বিভূতিভূষণকে আমরা সাধারণত প্রকৃতির কবি বলেই চিনি। তাঁর বর্ণনায় নদী, মাঠ, বন, আকাশ, ঋতু আর গ্রামীণ জীবনের যে ছবি ফুটে ওঠে, তা নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তাঁর সাহিত্যকে যদি একটু অন্য দিক থেকে দেখা যায়? যদি আমরা শুধু দৃশ্যের দিকে না তাকিয়ে শোনার চেষ্টা করি?

স্ট্যাচু অব লিবার্টি ও আমেরিকার অভিবাসন: আমেরিকার ইতিহাসে আশ্রয়প্রার্থীদের জায়গা কোথায়?

Statue of Liberty: স্ট্যাচু অব লিবার্টির ধারণার সূত্রপাত ১৮৬৫ সালে। ফরাসি রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এদুয়ার্দ দ্য লাবুলে আমেরিকার স্বাধীনতার শতবর্ষ এবং ফ্রান্স-আমেরিকার বন্ধুত্বকে স্মরণ করে স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ধারণা দেন।

এশিয়ার সেরা মিউজিয়ামের স্বীকৃতি পাটনার, কীভাবে বিশ্বসেরাদের টেক্কা দিল বিহার মিউজিয়াম?

Patna Outranks paris: বিশ্বের সেরা ১০০টি মিউজিয়ামের তালিকায় নবম স্থান অর্জন করে কীভাবে ল্যুভর ও মেটের মতো বিখ্যাত জাদুঘরকে পিছনে ফেলে এশিয়ার সেরা মিউজিয়াম হয়ে উঠল পাটনার বিহার মিউজিয়াম?

দেশভাগের ইতিহাসকে নারীর চোখে দেখা: অংশুমান করের ‘হিরণবালা’

Hiranbala Novel Review: বাংলা উদ্বাস্তু-আখ্যানের বড় অংশে দেশভাগের অভিজ্ঞতা এসেছে পুরুষের জীবন, তার মনস্তত্ত্ব ও তার গতিবিধির ভিতর দিয়ে। ‘হিরণবালা’ প্রথমেই এই কাঠামো ভেঙে দেয়। উদ্বাস্তু পরিবারের গল্পে একজন নারীকে নিষ্ক্রিয় বা পরোক্ষ ভূমিকায় না দেখিয়ে, উদ্বাস্তু হওয়ার অভিজ্ঞতাটিকে প্রত্যক্ষভাবে বুনে দেয় নারীটির জীবন। দেশভাগকে প্রায় অদৃশ্য করে হিরণকে উদ্বাস্তু করা শুরু হয় ১৯৪৬ সালে, বিয়ের মধ্য দিয়ে।

সুকুমার রায়ের সঙ্গে চার্লি চ্যাপলিনের ভীষণ মিল পাই: স্বাগতালক্ষ্মী দাশগুপ্ত

Sukumar Ray Literature: কেউ যদি অনেক বড় বয়সেও ছোট থাকতে চায়— যেমন আমি বলি যে আমার বয়স বাড়েনি— আর যদি নিজের বয়সটাকে একই জায়গায় ধরে রাখতে ইচ্ছে করে, তবে মনে হয় সুকুমার রায়ের সমগ্র তাঁর সারাজীবন বিছানার পাশে গীতবিতানের মতোই চিরসঙ্গী হয়ে থাকতে পারে।

বাংলার দেশি খাসির মাংস থেকে চিংড়ি শুঁটকি, জিআই তকমার অপেক্ষায় কোন কোন খাবার?

GI Tag Registration: বাংলার দেশি খাসির মাংস, ইলিশের বিভিন্ন পণ্য ও চিংড়ি শুঁটকি জিআই স্বীকৃতি পেতে চলেছে। আবেদন প্রক্রিয়া এগিয়েছে, আগামী এক বছরের মধ্যে স্বীকৃতি পাওয়ার আশা। কিন্তু জিআই তকমা কী এবং এই স্বীকৃতি পেলে বাংলার উৎপাদকদের কী লাভ হবে?