কেন বিশ্বের অধিকাংশ ওয়াইনের বোতল ৭৫০ মিলিলিটারের?

750 ml wine bottle: বিশ্বের অধিকাংশ ওয়াইনের বোতল কেন ৭৫০ মিলিলিটারের? এর পেছনে রয়েছে শতাব্দীপ্রাচীন ইতিহাস, ফ্রান্স-ব্রিটেনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক, কাচের বোতল তৈরির প্রযুক্তি এবং ওয়াইন সংরক্ষণের বিজ্ঞান। কীভাবে এই মাপ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পরিণত হলো? আজও কেন তা অপরিবর্তিত রয়েছে?

inscript
৩ মিনিট
কেন বিশ্বের অধিকাংশ ওয়াইনের বোতল ৭৫০ মিলিলিটারের?

মদের দোকানে বা সুপারমার্কেটে চোখ রাখলেই একটি বিষয় সহজেই নজরে পড়ে। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই সাধারণ ওয়াইনের বোতলের ধারণক্ষমতা ৭৫০ মিলিলিটার। প্রশ্ন হলো, কেন ১ লিটার নয়? বা ৫০০ মিলিলিটার নয়? ঠিক ৭৫০ মিলিলিটারই বা কেন? এর উত্তর লুকিয়ে আছে ইতিহাস, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, কাচ তৈরির প্রযুক্তি এবং ওয়াইন সংরক্ষণের বিজ্ঞান—সব মিলিয়েই তৈরি হয়েছে এই মানদণ্ড।

আজকের দিনে ৭৫০ মিলিলিটারের বোতল এতটাই পরিচিত যে অনেকেই মনে করেন, শুরু থেকেই হয়তো এই মাপ নির্ধারিত ছিল। বাস্তবে কিন্তু তা নয়। বহু শতাব্দী আগে ওয়াইন সংরক্ষণ করা হতো মাটির পাত্র, কাঠের ব্যারেল কিংবা পশুর চামড়ার তৈরি থলিতে। কাচের বোতলে ওয়াইন ভরার প্রচলন শুরু হয় অনেক পরে, বিশেষ করে ইউরোপে ১৭০০ ও ১৮০০ শতকে। সেই সময় কাচের বোতল সম্পূর্ণ হাতে তৈরি হতো।

৭৫০ মিলিলিটারের উৎপত্তি নিয়ে একাধিক ব্যাখ্যা রয়েছে। সবচেয়ে জনপ্রিয় ধারণা হলো, সেই সময় কাচশিল্পীরা মুখ দিয়ে ফুঁ দিয়ে বোতল তৈরি করতেন। মানুষের ফুসফুসের গড় ক্ষমতা অনুযায়ী একবারে যতটা বড় বোতল তৈরি করা সম্ভব হতো, তার আয়তন প্রায় ৭৫০ মিলিলিটারের কাছাকাছি ছিল। যদিও ইতিহাসবিদদের মধ্যে এ নিয়ে সম্পূর্ণ ঐকমত্য নেই, তবুও এই ব্যাখ্যাটি দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত।

আরও একটি ব্যাখ্যা মানুষের খাওয়ার অভ্যাসের সঙ্গে যুক্ত। একটি ৭৫০ মিলিলিটারের বোতল থেকে সাধারণত পাঁচ থেকে ছয় গ্লাস ওয়াইন পরিবেশন করা যায়। অতীতে পারিবারিক বা সামাজিক নৈশভোজে এই পরিমাণকে আদর্শ ধরা হতো। ফলে এই মাপের বোতল ব্যবহারিক দিক থেকেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
আদিবাসী নারীদের হাতে তৈরি মহুয়া আজ আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড

Mahua liquor: পৃথিবীতে ফুল থেকে তৈরি হওয়া হাতেগোনা কয়েকটি অ্যালকোহলযুক্ত পানীয়ের মধ্যে মহুয়া অন্যতম। এটি শুধু একটি পানীয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভারতের গভীর জঙ্গল, আদিবাসী সংস্কৃতি এবং এক দীর্ঘ লড়াইয়ের ইতিহাস। কিন্তু জংলি ফুল দিয়ে তৈরি মহুয়া এখন আর স্রেফ ‘কান্ট্রি লিকার’ নয়, বরং হয়ে উঠেছে বৈশ্বিক লাক্সারি ব্র্যান্ড।

তবে ইতিহাসবিদদের মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ সম্ভবত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য। বহু শতাব্দী ধরে ফ্রান্সের বোর্দো অঞ্চল থেকে বিপুল পরিমাণ ওয়াইন রফতানি হতো ব্রিটেনে। কিন্তু তখন ফ্রান্সে ব্যবহার করা হতো মেট্রিক পদ্ধতি, আর ব্রিটেনে প্রচলিত ছিল ইম্পেরিয়াল মাপ। এই দুই ব্যবস্থার মধ্যে হিসাব মেলানো সহজ ছিল না। ২২৫ লিটারের একটি বোর্দো ব্যারেলকে যদি ৭৫০ মিলিলিটারের বোতলে ভরা হয়, তাহলে ঠিক ৩০০টি বোতল তৈরি হয়। আবার সেই ব্যারেলের পরিমাণ ব্রিটিশ ৫০ ইম্পেরিয়াল গ্যালনের সমান। ফলে ব্যবসায়ীদের জন্য হিসাব রাখা এবং পরিবহণ অনেক সহজ হয়ে যায়। ধীরে ধীরে এই মাপই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মানদণ্ডে পরিণত হয়।

পরবর্তীকালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওয়াইন প্রস্তুতকারকেরাও একই মাপ গ্রহণ করতে শুরু করেন। কারণ, একবার কোনো মাপ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেয়ে গেলে উৎপাদন, বোতলজাতকরণ, প্যাকেজিং, পরিবহণ এবং বিক্রি—সবই অনেক সহজ হয়ে যায়। একই ধরনের বোতল ব্যবহার করলে বাক্স, তাক, গুদাম এবং জাহাজে পণ্য সাজানোও সুবিধাজনক হয়।

শুধু বাণিজ্য নয়, ওয়াইনের গুণমান রক্ষার ক্ষেত্রেও ৭৫০ মিলিলিটারের বোতলের একটি বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। অধিকাংশ ওয়াইন কর্ক দিয়ে সিল করা হয়। কর্কের নিচে খুব অল্প পরিমাণ বাতাস থেকে যায়। সেই বাতাসের অক্সিজেন ধীরে ধীরে ওয়াইনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে, যা ওয়াইনের স্বাদ ও সুগন্ধকে সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ৭৫০ মিলিলিটারের বোতলে ওয়াইনের পরিমাণ এবং বাতাসের অনুপাত এমনভাবে থাকে, যাতে দীর্ঘ সময় ধরে ওয়াইন পরিপক্ব হতে পারে এবং তার স্বাদ ভারসাম্য বজায় রাখে।

যদিও ৭৫০ মিলিলিটারই সবচেয়ে জনপ্রিয়, তবুও ওয়াইনের আরও নানা মাপের বোতল রয়েছে। ৩৭৫ মিলিলিটারের হাফ বোতল এক বা দু'জনের জন্য উপযোগী। আবার ১.৫ লিটারের ম্যাগনাম বোতল বিশেষ অনুষ্ঠান বা দীর্ঘদিন সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হয়। এর চেয়েও বড় আকারের বোতল রয়েছে, তবে সেগুলি সাধারণত উৎসব, সংগ্রহ বা প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে তৈরি হয়।

আরেকটি বিষয় অনেকেরই নজরে পড়ে—ওয়াইনের বোতল সাধারণত গাঢ় সবুজ বা বাদামি রঙের হয়। এটিও কেবল নান্দনিকতার জন্য নয়। সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি ওয়াইনের রাসায়নিক গঠন পরিবর্তন করতে পারে, যার ফলে স্বাদ ও গন্ধ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। গাঢ় রঙের কাচ এই আলোকে অনেকটাই আটকে দেয় এবং ওয়াইনকে দীর্ঘদিন ভালো রাখতে সাহায্য করে। তাই আজও অধিকাংশ ওয়াইন প্রস্তুতকারী সংস্থা গাঢ় রঙের কাচের বোতল ব্যবহার করে।

তবে প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে কিছু পরিবর্তনও এসেছে। বর্তমানে স্ক্রু ক্যাপ, হালকা ওজনের বোতল, এমনকি ক্যান বা টেট্রা প্যাকেও ওয়াইন বিক্রি হচ্ছে। তবুও ৭৫০ মিলিলিটারের কাচের বোতল এখনও বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে পরিচিত এবং গ্রহণযোগ্য। কারণ, এটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শতাব্দীপ্রাচীন বাণিজ্য, উৎপাদন ব্যবস্থা, বিজ্ঞান এবং ভোক্তাদের অভ্যাস।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

চিনির বিকল্প স্টেভিয়া! ঘরের বাগানে রাখা যায় যে ‘মধু পাতা’

Stevia benefits: গাছ থেকে সদ্য তোলা কাঁচা পাতা কিংবা রোদে শুকিয়ে নেওয়া পাতা সরাসরি চা বা যেকোনো পানীয়ের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করা যায়। এতে চিনির মতো একই রকম মিষ্টতা পাওয়া যায়। স্টিভিয়ার নির্যাস থেকে তৈরি মিষ্টান্ন ডায়াবেটিস রোগীরা খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধির ঝুঁকি থাকে না বললেই চলে।

ফুটপাথের ধারের সেই খাবার যেভাবে হয়ে উঠল কলকাতার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য

Kolkata Street food history: সুতানুটি-গোবিন্দপুর-কলিকাতার শ্রমজীবী মানুষের তৃপ্তির জন্য জন্ম হয়েছিল ফুটপাতের খাবারের। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের 'সংবাদ প্রভাকর' থেকে হুতোম প্যাঁচার নকশা, এফএও সমীক্ষা থেকে এফএসএসএআই আইন হয়ে ২০২৫ সালে রাসেল স্ট্রিটে প্লাস্টিক-মুক্ত ফুড হাবের জন্ম। কলকাতার স্ট্রিট ফুড আজও এই শহরের প্রাণ। এই শহরের অন্যতম ঐতিহ্য।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি কেন আরশোলার মৃত্যুতে দুঃখ পেয়েছিলেন?

Sanae Takaichi cockroach story: ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ। সরকারি বাসভবনে গভীর রাতে একা কাজ করতে গিয়ে তিনি একটি আরশোলা দেখতে পেয়েছিলেন। সচরাচর আরশোলা দেখলে তিনি চিৎকার করে ওঠেন, কিন্তু সেদিন তিনি সেটিকে মারেননি।

স্ট্রেস কি সবসময় খারাপ? কখন স্বাভাবিক চাপ হয়ে ওঠে মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি?

mental stress: একটি ইঁদুরের উপর পরীক্ষা করতে গিয়ে তারা দেখেছেন, একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত ইঁদুরটির মধ্যে স্ট্রেস বাড়ানোর সঙ্গে তার কাজকর্মের মান আরও উন্নত হয়েছে। কিন্তু নির্দিষ্ট সীমা পার করবার পর পরই তার ফলাফল করার সর্বোচ্চ সম্ভাবনা ক্রমশ কমতে কমতে শেষে সেটা প্রায় শূন্যতে নেমে গিয়েছে।

নিজের সর্বস্ব দিয়ে হাসপাতাল গড়েছিলেন রাধাগোবিন্দ কর

History of RG Kar Medical College and Hospital: আজ যে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল বারবার খবরের শিরোনামে, তার দীর্ঘ ইতিহাস কী? কে ছিলেন রাধাগোবিন্দ কর, যিনি নিজের সম্পত্তি বিক্রি করে গরিব মানুষের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল গড়ে তুলেছিলেন? প্লেগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, বাংলায় চিকিৎসাবিজ্ঞান চর্চা ও সমাজসেবায় তাঁর অবদান আজ কতটা মনে রাখা হয়েছে?

হিরোশিমা-নাগাসাকির আগুন থেকে বেঁচে যাঁরা, কেমন ছিল তাঁদের পরের জীবন?

Hiroshima, Nagasaki: বিস্ফোরণের বহু বছর পর এমিকোর ঘরে মেয়ে এল, আর তারও পর জন্ম নিল এমিকোর নাতনি কাজুমি কুওয়াহারা। নবজাতক নাতনিকে দেখে চিকিৎসকেরা পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, "এই বাচ্চা তিন দিনের বেশি বাঁচবে না।" জিনের ভিতরে লুকিয়ে থাকা কোনো অজানা দুর্বলতা যেন জন্ম থেকেই জাপটে ধরেছিল ছোট কাজুমিকে।

কেন কম ঘুমেও কেউ সুস্থ, কেউ হারাচ্ছেন স্মৃতি? জানালেন গবেষকরা

sleep deprivation and brain health: গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে AQP4 (Aquaporin-4) নামে একটি জিন। এই জিনকে অনেকটা মস্তিষ্কের 'সাফাই কর্মী' বলা যায়। আমরা যখন গভীর ঘুমে থাকি, তখন মস্তিষ্কে শুরু হয় এক বিশেষ পরিষ্কার করার কাজ। সারাদিনে জমে থাকা বর্জ্য এবং আলঝাইমার্স রোগের সঙ্গে যুক্ত ক্ষতিকর প্রোটিন এই সময় ধীরে ধীরে শরীর থেকে বেরিয়ে যেতে সাহায্য করে। আর সেই গুরুত্বপূর্ণ কাজে বড় ভূমিকা পালন করে AQP4 জিন।