এখনই গান ছাড়ছেন না অরিজিৎ সিং
Arijit Singh: শুরুতে জল্পনা ছিল তিনি হয়তো পুরোপুরি চলচ্চিত্র নির্মাণের দিকে ঝুঁকছেন। কিন্তু এক্স হ্যান্ডেলে তাঁর ভক্তদের সঙ্গে তাঁর কথপোকথন বলছে অন্য কথা।
সম্প্রতি ভারতের সঙ্গীত জগতে এক অপ্রত্যাশিত ঝড়ের মতো এসেছিল অরিজিৎ সিং-এর ঘোষণা। সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি মাত্র পোস্টে তিনি জানিয়েছিলেন, প্লেব্যাক গায়ক হিসেবে তিনি আর কোনো নতুন কাজ করবেন না। ভক্তদের মনে তখন একটাই প্রশ্ন—কেন? ক্যারিয়ারের মধ্যগগনে থাকা অবস্থায়, মাত্র ৩৮ বছর বয়সে কেন এমন সিদ্ধান্ত?
শুরুতে জল্পনা ছিল তিনি হয়তো পুরোপুরি চলচ্চিত্র নির্মাণের দিকে ঝুঁকছেন। কিন্তু এক্স হ্যান্ডেলে তাঁর ভক্তদের সঙ্গে তাঁর কথপোকথন বলছে অন্য কথা। অরিজিৎ সিং নিজেই তাঁর এই সিদ্ধান্তের পেছনের আসল কারণটি স্পষ্ট করেছেন। এবং সেই কারণটি হলো—একঘেয়েমি বা ‘Boredom’।
‘আমি বোর হয়ে গেছি’
অরিজিৎ সিং তাঁর ব্যক্তিগত এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেল থেকে ভক্তদের প্রশ্নের উত্তরে অত্যন্ত খোলামেলাভাবে কথা বলেছেন। তিনি লেখেন,
এর নেপথ্যে নির্দিষ্ট একটি কারণ নেই। একাধিক কারণ রয়েছে এবং আমি বহুদিন ধরেই করতে চাইছিলাম। অবশেষে সাহস হলো। এর মধ্যে একটি কারণ খুব সাধারণ, আমি খুব দ্রুত বোর হয়ে যাই (I get bored pretty quick)। একারণেই স্টেজে পারফর্ম করার সময় আমি বারবার একই গানের অ্যারেঞ্জমেন্ট বা সুরের বিন্যাস বদলাতে থাকি। তাই আসল ব্যাপারটা হলো—আমি বোর হয়ে গেছি। আমাকে বেঁচে থাকার জন্য অন্য ধরনের মিউজিক করতে হবে।
বছরের পর বছর ধরে একই ধরনের বাণিজ্যিক গান গাওয়ার ক্লান্তি থেকেই যে এই সিদ্ধান্ত, তা তাঁর কথায় স্পষ্ট। তিনি আরও লেখেন,
আমি চাই নতুন কোনো গায়ক আসুক এবং আমাকে সত্যিকারের অনুপ্রেরণা (Motivation) দিক।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Suddhabarata Deb interview: "তিন-চার দশকে আমাদের তরুণ পাঠকের সংখ্যা অসম্ভবভাবে বেড়েছে। প্রায় ৫০ শতাংশের বেশি পাঠক এখন তরুণ প্রজন্ম। আজকের প্রজন্ম পত্রিকা বা খবরের কাগজ কম পড়ে হয়তো, অ্যান্ড্রয়েড ফোনে খবর দেখে নেয়, কিন্তু এতে তাদের বই পড়ার খিদে মেটে না।"
ভবিষ্যতের পরিকল্পনা: শিকড়ে ফেরা
প্লেব্যাক ছাড়লেও গান যে তিনি ছাড়ছেন না, তা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়েছেন অরিজিৎ।
আমি গান বানানো বন্ধ করব না
তিনি আরও লেখেন,
আমি নিজের গান বানাব। আমার নিজের গান নিয়ে আসব।
এবং তিনি নতুন করে আর কোনো কাজ নেবেন না। কিন্তু, তাঁর শেষ প্লেব্যাক যে এখনও মুক্তি পায়নি, তা স্পষ্ট করে দিয়ে তিনি লেখেন,
এখনও কিছু অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি আছে। শেষ করব সেগুলো। অতএব, এ বছরই কিছু রিলিজ পেতে পারেন।
তিনি জানিয়েছেন, তিনি এবার ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের (Indian Classical Music) চর্চায় ফিরে যেতে চান। অরিজিৎ লিখেছেন,
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Narayan Debnath Copyright Case: আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, আগামী ৯ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তারা নারায়ণ দেবনাথের কোনো বই ছাপতে বা বিক্রি করতে পারবে না।
আমি আবার গোড়া থেকে শুরু করতে চাই। আমি নিজের মতো করে গান বানাব। আমি একজন ‘ছোট্ট শিল্পী’ (Small little artist) হিসেবে স্বাধীনভাবে কাজ করতে চাই এবং আরও শিখতে চাই।
অর্থাৎ, বলিউডের গ্ল্যামারাস জগত ছেড়ে তিনি এবার ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট মিউজিক’ বা স্বাধীন সঙ্গীতের জগতে নিজের সৃষ্টিশীলতাকে খুঁজে পেতে চান।
নতুন অধ্যায়: মাইক্রোফোন ছেড়ে মেগাফোন হাতে
প্লেব্যাক ছাড়ার দ্বিতীয় এবং অন্যতম বড় কারণ হলো চলচ্চিত্র পরিচালনা। বিবিসির খবর অনুযায়ী, অরিজিৎ সিং ইতিমধ্যেই পরিচালক হিসেবে তাঁর প্রথম হিন্দি ছবির কাজ শুরু করে দিয়েছেন।
এটি একটি জঙ্গল অ্যাডভেঞ্চারধর্মী সিনেমা। ছবিতে মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করছেন নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকি। শোনা যাচ্ছে, অরিজিৎ-এর ছেলে এবং নওয়াজউদ্দিনের মেয়ে শোরাও এই ছবিতে অভিনয় করছেন। বর্তমানে শান্তিনিকেতনে ছবিটির শুটিং চলছে। ছবির চিত্রনাট্য যৌথভাবে লিখেছেন অরিজিৎ সিং এবং তাঁর স্ত্রী কোয়েল সিং।
ঘনিষ্ঠদের প্রতিক্রিয়া: "অবাক নই, এটা হওয়ারই ছিল"
বলিউডের খ্যাতনামা পরিচালক অনুরাগ বসু, যার ‘বারফি’, ‘জগ্গা জাসুস’, ‘লুডো’-র মতো ছবিতে গান গেয়েছেন অরিজিৎ, তিনি বিবিসি-কে জানান, এই সিদ্ধান্তে তিনি মোটেই অবাক হননি।
অনুরাগ বসু বলেন,
সারা বিশ্ব হয়তো অবাক, কিন্তু আমি বহুদিন ধরেই জানি অরিজিৎ কতটা প্রতিভাবান। গান ছাড়াও সে জীবনে আরও অনেক কিছু করতে চায়। এমনকি ‘বারফি’ সিনেমা বানানোর সময়ও অরিজিৎ আমাকে অনুরোধ করেছিল, সে আমার সহকারী হিসেবে কাজ করতে চায়। সে একটি স্কুল খুলতে চায় এবং শিশুদের সঙ্গে সময় কাটাতে চায়। তাঁর আরও অনেক পরিকল্পনা রয়েছে।
সঙ্গীত পরিচালক জুটি সেলিম-সুলেমান-এর সুলেমানও একই সুরে কথা বলেন। তিনি জানান,
চলচ্চিত্র নির্মাণ অরিজিতের বহুদিনের লালিত স্বপ্ন। যেটার উপর সে এখন পুরোপুরি মনোযোগ দিতে চায়। সে ভীষণ উচ্চাকাঙ্ক্ষী মানুষ, আর আমি তাঁর সিদ্ধান্তকে সম্মান করি।
শিকড়ের টানে মুর্শিদাবাদে
বলিউডে অসামান্য সাফল্য এবং মুম্বাইয়ের গ্ল্যামার সত্ত্বেও অরিজিৎ সিং নিজেকে সেখানকার ইঁদুর দৌড় থেকে সরিয়ে রেখেছেন। তিনি বর্তমানে সপরিবারে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের জিয়াগঞ্জে বসবাস করেন। সেখান থেকেই তিনি তাঁর গানের কাজ, সমাজসেবামূলক উদ্যোগ এবং নিজের প্রযোজনা সংস্থার কাজ সামলান। জিয়াগঞ্জে তিনি একটি অত্যাধুনিক রেকর্ডিং স্টুডিও স্থাপন করেছেন। সম্প্রতি সেলিম মার্চেন্ট সেখানে গিয়ে একটি গান রেকর্ডও করেছেন। স্থানীয় মানুষ এবং বন্ধুদের মতে, অরিজিৎ যতটা বড় মাপের শিল্পী, ঠিক ততটাই উদার মনের মানুষ।
২০০৫ সালে 'ফেম গুরুকুল'-এর মঞ্চ থেকে বাদ পড়া সেই ১৮ বছরের ছেলেটি পরবর্তীকালে পেয়েছেন দুটি জাতীয় পুরস্কার এবং ২০২৫ সালে 'পদ্মশ্রী' সম্মান।
প্লেব্যাক থেকে সরে দাঁড়ালেও, অরিজিৎ কথা দিয়েছেন—গান তিনি থামাবেন না। তবে এবার আর অন্যের সুরে নয়, নিজের শর্তে এবং নিজের সৃষ্টিতে তিনি শ্রোতাদের সামনে আসবেন। ভক্তদের জন্য স্বস্তির খবর এটুকুই যে, হাতে থাকা কিছু পুরনো কাজ শেষ করতে চলতি বছরেও হয়তো বলিউডে তাঁর কিছু নতুন গান শোনা যাবে।
অরিজিৎ সিং প্রমাণ করলেন, তিনি কেবল স্রোতে গা ভাসাতে আসেননি; তিনি এসেছেন নিজের শর্তে শিল্পচর্চা করতে—তা সে গান হোক কিংবা সিনেমা।







