হাইকোর্টের কড়া নির্দেশ: এবার বইমেলায় বিক্রি করা যাবে না হাঁদা ভোঁদা, নন্টে ফন্টে, বাঁটুল
Narayan Debnath Copyright Case: আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, আগামী ৯ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তারা নারায়ণ দেবনাথের কোনো বই ছাপতে বা বিক্রি করতে পারবে না।
বাঙালির শৈশবের সঙ্গী ‘বাঁটুল দি গ্রেট’, ‘হাঁদা ভোঁদা’ কিংবা ‘নন্টে ফন্টে’-র স্রষ্টা নারায়ণ দেবনাথ প্রয়াত হয়েছেন ২০২২ সালে। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পরেও তাঁর অমর সৃষ্টিগুলোর অধিকার বা মেধাস্বত্ব (Copyright) নিয়ে আইনি লড়াই থামেনি। সম্প্রতি কলকাতা হাইকোর্ট এই লড়াইয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ রায়ের মাধ্যমে নারায়ণ দেবনাথের পরিবারকে বড়সড় স্বস্তি দিয়েছে। বিখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা ‘দেব সাহিত্য কুটির’-এর একটি আবেদন খারিজ করে দিয়ে হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের নিষেধাজ্ঞাই বহাল রেখেছে।
বইমেলার প্রাক্কলে দেওয়া এই রায় প্রকাশনা সংস্থাটির জন্য একটি বড় ধাক্কা, কারণ আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, আগামী ৯ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তারা নারায়ণ দেবনাথের কোনো বই ছাপতে বা বিক্রি করতে পারবে না।
মামলার প্রেক্ষাপট: দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অভিযোগ
এই আইনি বিরোধের সূত্রপাত নারায়ণ দেবনাথের পরিবারের একটি গুরুতর অভিযোগ থেকে। লেখকের স্ত্রী অর্চনা দেবনাথ এবং তাঁর ছেলের অভিযোগ, দেব সাহিত্য কুটির দীর্ঘদিন ধরে প্রয়াত লেখকের কপিরাইট লঙ্ঘন করে আসছে।
পরিবারের দাবি:
১. চুক্তি লঙ্ঘন: ২০১২ সালে নারায়ণ দেবনাথের সঙ্গে দেব সাহিত্য কুটিরের একটি চুক্তি হয়েছিল। সেই চুক্তির মেয়াদ ছিল মাত্র দুই বছর।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Ratan Thiyam: একসময়ের শান্তিনিকেতনের নিত্যযাত্রী রতন থিয়ামের জীবনে রবীন্দ্রনাথ শুধু একজন নাট্যকার নন, এক দার্শনিক মার্গদর্শক।
২. অবৈধ বিক্রি: অভিযোগ, সেই চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও প্রকাশনা সংস্থাটি লেখকের অনুমতি ছাড়াই বছরের পর বছর ধরে তাঁর কমিকস এবং সাহিত্যকর্ম ছাপিয়ে ও বিক্রি করে চলেছে।
৩. রয়্যালটি বঞ্চনা: এই বিপুল বিক্রির বিপরীতে লেখক বা তাঁর পরিবারকে ন্যায্য রয়্যালটি দেওয়া হয়নি।
এই অভিযোগের ভিত্তিতেই তারা আদালতের দ্বারস্থ হন। গত ৯ই জানুয়ারি আলিপুরের জেলা আদালত একটি অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশে প্রকাশনা সংস্থাটিকে নারায়ণ দেবনাথের কোনো কাজ প্রকাশ বা বিক্রির উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে।
নারায়ণ দেবনাথের সৃষ্টি 'হাঁদা ভোঁদা'
হাইকোর্টে প্রকাশনা সংস্থার যুক্তি
কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলার (২২শে জানুয়ারি থেকে শুরু হয়ে গেছে) সময়ে নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকলে বিপুল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে—এই যুক্তি দেখিয়ে দেব সাহিত্য কুটির দ্রুত শুনানির জন্য কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়। বিচারপতি সব্যসাচী ভট্টাচার্য এবং বিচারপতি সুপ্রতিম ভট্টাচার্যের ডিভিশন বেঞ্চে প্রকাশনা সংস্থার আইনজীবী সপ্তাংশু বসু মূলত তিনটি আইনি পয়েন্ট বা যুক্তি তুলে ধরেন:
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Film Industry Politics: আমরা দর্শক হিসেবে কী চাই? কাদের চাই? ‘ইয়েস স্যার’ বলা একদল অনুগত কর্মী, নাকি অনির্বাণ-ঋদ্ধির মতো ক্ষুরধার শিল্পী যারা পর্দায় জাদু তৈরি করতে পারেন? যখন রাজনীতি বা ইগো শিল্পের টুঁটি চেপে ধরে, তখন ক্ষতিটা কোনো নির্দিষ্ট অভিনেতার হয় না, ক্ষতিটা হয় আমাদের—দর্শকদের, বাংলার সংস্কৃতির।
১. উইলের আইনি বৈধতা (Probate Issue): প্রকাশনা সংস্থা যুক্তি দেয় যে, ভারতীয় উত্তরাধিকার আইন, ১৯২৫-এর ২১৩ ধারা অনুযায়ী, বাংলায় কোনো উইলের 'প্রোবেট' (Probate) না পাওয়া পর্যন্ত 'Executor' বা 'Legatee' হিসেবে কেউ কোনো অধিকার দাবি করতে পারেন না। যেহেতু নারায়ণ দেবনাথের উইলের প্রোবেট এখনও হয়নি, তাই তাঁর স্ত্রী ও পুত্র মামলা করার যোগ্য নন।
২. পুরানো মামলার প্রসঙ্গ: তারা জানায়, নারায়ণ দেবনাথ জীবদ্দশায় হাওড়া আদালতে একই বিষয়ে একটি মামলা করেছিলেন, যা পরে তিনি প্রত্যাহার করেন বা খারিজ হয়ে যায়। দেওয়ানি কার্যবিধির (CPC) 'Order IX Rule 9' অনুযায়ী, একই কারণে দ্বিতীয়বার মামলা করা যায় না।
৩. তামাদি দোষ : তাদের মতে, ঘটনাটি অনেক পুরনো, তাই এত বছর পর এই নিয়ে মামলা করা যায় না।
নারায়ণ দেবনাথের সৃষ্টি 'নন্টে ফন্টে'র প্রচ্ছদ
আদালতের পর্যবেক্ষণ ও রায়:
হাইকোর্ট প্রকাশনা সংস্থার সমস্ত যুক্তি খণ্ডন করে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কিছু পর্যবেক্ষণ প্রদান করেছে, যা ভবিষ্যতে কপিরাইট মামলার ক্ষেত্রে নজির হয়ে থাকতে পারে।
১. কপিরাইট লঙ্ঘন একটি ধারাবাহিক অপরাধ: আদালত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে, কপিরাইট লঙ্ঘন কোনো এককালীন ঘটনা নয়। লাতিন পরিভাষা 'De die in diem' (Day to day) ব্যবহার করে আদালত ব্যাখ্যা করে যে, যতদিন অবৈধভাবে বই ছাপা বা বিক্রি হবে, প্রতিটি দিন এবং প্রতিটি মুহূর্ত একটি করে নতুন অপরাধ তৈরি করে। তাই পুরনো মামলা খারিজ হয়েছে বা অনেক সময় কেটে গেছে—এই যুক্তি এখানে খাটে না। বর্তমান মামলাটি সম্পূর্ণ নতুন অপরাধের ওপর ভিত্তি করে করা।
২. উত্তরাধিকারীর অধিকার: প্রকাশনা সংস্থার 'প্রোবেট' সংক্রান্ত যুক্তির জবাবে আদালত জানায়, মামলা দায়েরকারীরা (স্ত্রী ও পুত্র) শুধুমাত্র উইলের এক্সিকিউটর হিসেবেই মামলা করেননি, তাঁরা নারায়ণ দেবনাথের স্বাভাবিক উত্তরাধিকারীও (Natural Heirs)। কোনো সম্পত্তির (এখানে মেধাস্বত্ব) ক্ষতি আটকাতে বা সুরক্ষার জন্য প্রোবেট পাওয়ার অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। উত্তরাধিকারী হিসেবে মামলা চালিয়ে যাওয়ার পূর্ণ অধিকার তাঁদের আছে।
৩. অভিযোগের গুরুত্ব: আদালত উল্লেখ করেছে, যেহেতু মামলাটি এখন প্রাথমিক বা 'অ্যাড-ইন্টেরিম' পর্যায়ে আছে এবং প্রকাশনা সংস্থা এখনও লিখিতভাবে অভিযোগ খণ্ডন করেনি, তাই মামালাকারীর অভিযোগগুলোকেই সত্য বলে ধরে নিতে হবে। লেখকের পরিবারের স্বার্থরক্ষা আদালতের প্রাথমিক দায়িত্ব।
হাইকোর্টের এই রায়ের ফলে আলিপুর জেলা আদালতের নির্দেশই বহাল রইল। এর অর্থ, আগামী ৯ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেব সাহিত্য কুটির নারায়ণ দেবনাথের কোনো বই, কমিকস স্ট্রিপ বা সাহিত্যকর্ম ছাপতে পারবে না। এই নিষেধাজ্ঞা শুধু ফিজিক্যাল বইয়ের দোকান নয়, অনলাইন পোর্টাল এবং ই-কমার্স সাইটের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
তবে আদালত এটিও স্পষ্ট করেছে যে, এই পর্যবেক্ষণগুলো শুধুমাত্র বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞার (Interim Injunction) জন্য প্রযোজ্য। মূল মামলাটি যখন ট্রায়াল কোর্টে বিচার হবে, তখন বিচারক স্বাধীনভাবে এবং এই পর্যবেক্ষণের দ্বারা প্রভাবিত না হয়েই মামলার চূড়ান্ত রায় দেবেন।







