দিলজিৎ দোসাঞ্জ: যে শিল্পী ক্ষমতার সামনে মাথা নত করতে শেখেননি
Diljit Dosanjh: গত কয়েক বছরে বিনোদন জগতের চেনা ছক ভেঙেছেন দিলজিৎ দোসাঞ্জ। আজ কোটি কোটি মানুষের কাছে তাঁর একটি বড় পরিচয় তৈরি হয়েছে— আপসহীন, স্পষ্টবক্তা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার এক বিদ্রোহী শিল্পী।
বিশ্বমঞ্চে পঞ্জাবি লোকসঙ্গীতকে পৌঁছে দেওয়া গ্লোবাল পপস্টার কিংবা বলিউডের প্রথম সারির অভিনেতা— দিলজিৎ দোসাঞ্জকে চেনার জন্য এই বিশেষণগুলিই যথেষ্ট হতে পারত। যদি তিনি বাকি অভিনেতা, সঙ্গীতশিল্পীদের মতো শুধুমাত্র গ্ল্যামার দুনিয়ায় এক নিরাপদ ইমেজ ধারণ করে থাকতেন। গত কয়েক বছরে বিনোদন জগতের সেই চেনা ছক ভেঙেছেন তিনি। আজ কোটি কোটি মানুষের কাছে তাঁর একটি বড় পরিচয় তৈরি হয়েছে— আপসহীন, স্পষ্টবক্তা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার এক বিদ্রোহী শিল্পী।
তাঁর অভিনীত নতুন সিনেমা ‘সতলুজ’ (Satluj) নিয়ে দেশজুড়ে যে তীব্র তোলপাড় শুরু হয়েছে, তা দিলজিতের এই ‘বিদ্রোহী’ সত্তাকে আরও একবার খবরের শিরোনামে নিয়ে এসেছে।
ছবিটি পঞ্জাবের মানবাধিকার কর্মী জসবন্ত সিং খালরার জীবন এবং নব্বইয়ের দশকের পঞ্জাবের এক অন্ধকার ইতিহাসের উপর ভিত্তি করে তৈরি। দীর্ঘ ৪ বছর ধরে সেন্সর বোর্ডের (CBFC) সঙ্গে লড়াই করার পর, কোনো কাটছাঁট ছাড়াই গত ৩ জুলাই ২০২৬-এ ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ZEE5-এ সিনেমাটি মুক্তি পেয়েছিল। কিন্তু মুক্তির মাত্র দুদিন কাটতে না কাটতেই, ৫ জুলাই আচমকা ভারত থেকে উধাও হয়ে যায় এই ছবি! বর্তমানে ভারতীয় দর্শকরা আর এটি দেখতে পাচ্ছেন না। স্ক্রিনে লেখা উঠছে, “পরবর্তী নির্দেশ না আসা পর্যন্ত এটি ভারতে দেখা যাবে না।” যদিও বিদেশের দর্শকরা এখনও এটি দেখতে পাচ্ছেন।
পরিচালক হানি ত্রেহানের এই ছবিটির আসল নাম প্রথমে ছিল ‘Ghallughara’ (গণহত্যা), পরে নাম বদলে রাখা হয় ‘Punjab 95’ এবং শেষ পর্যন্ত নাম হয় ‘সতলুজ’। সিনেমাটির গল্প গড়ে উঠেছে আশির ও নব্বইয়ের দশকে পঞ্জাবে খালিস্তানি জঙ্গি দমনের নামে পুলিশের একাংশের ক্ষমতার অপব্যবহারকে কেন্দ্র করে। মানবাধিকার কর্মী জসবন্ত সিং খালরা প্রমাণ করেছিলেন যে, পুলিশ হাজার হাজার মানুষকে ‘নিখোঁজ’ করে ভুয়া এনকাউন্টার করেছে এবং তাদের লাশ ‘অজ্ঞাতপরিচয়’ হিসেবে গোপনে পুড়িয়ে ফেলেছে। শুধুমাত্র অমৃতসরের তিনটি শ্মশান ঘেঁটে তিনি ২০৯৭টি এমন গোপন সৎকারের প্রমাণ পেয়েছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৯৫ সালে জসবন্ত সিং খালরাকেও পুলিশ সাদা পোশাকে অপহরণ করে এবং নির্মম অত্যাচার চালিয়ে খুন করে। এই রূঢ় সত্যকে পর্দায় হুবহু তুলে ধরার কারণেই সেন্সর বোর্ড ছবিটির উপর ১২৭টি কাট বা বাদ দেওয়ার নির্দেশ জারি করেছিল। কিন্তু দিলজিৎ ও পরিচালক স্পষ্ট জানিয়ে দেন, একটি ফ্রেম কাটা হলেও তাঁরা ছবির প্রচার করবেন না। শেষমেশ ওটিটি-তে ছবিটির ‘গরিলা রিলিজ’ হলেও ভারতের তথ্য-সম্প্রচার মন্ত্রক "নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার" আশঙ্কায় এর স্ট্রিমিং বন্ধ করে দেয়। ছবিটি ভারত থেকে সরিয়ে নেওয়ার পরেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন দিলজিৎ। সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি গর্জে উঠে লেখেন, “I challenge the darkness” (আমি এই অন্ধকারকে চ্যালেঞ্জ করছি)। তিনি স্পষ্ট বলেন, যা অতীতে জসবন্ত সিং খালরার সঙ্গে হয়েছিল, আজ ঠিক সেটাই তাঁর বায়োপিকের সঙ্গেও করা হলো— অর্থাৎ কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা। একটি লাইভ সেশনে দিলজিৎ আত্মবিশ্বাসের সুরে বলেন, “আমি জানতাম এমনটাই হবে। কিন্তু লোকে ডাউনলোড করে রেখে দিয়েছে, ব্লক করে কী লাভ?” পঞ্জাবের ইতিহাস তুলে ধরার জন্য এই ছবিতে দিলজিৎ কোনো পারিশ্রমিক বা ফি নেননি।
যখন কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন দিলজিৎ (২০২০-২১)
দিলজিৎ দোসাঞ্জের এই প্রতিবাদী রূপ কিন্তু নতুন নয়। ২০২০-২১ সালে যখন দিল্লির সিংঘু বর্ডারে কেন্দ্রীয় সরকারের তিনটি কৃষি আইনের বিরুদ্ধে কৃষকেরা আন্দোলনে নামেন, তখন দিলজিৎ ছিলেন অন্যতম প্রধান মুখ।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Diljit Dosanjh Satluj: ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ZEE5-এ কোনো কাটছাঁট ছাড়াই ৩ জুলাই মুক্তি পেয়েছিল দিলজিৎ দোসাঞ্জ অভিনীত ‘সতলুজ’। কিন্তু মাত্র দুদিন কাটতে না কাটতেই, ৫ জুলাই আচমকা ভারত থেকে উধাও হয়ে গেল এই ছবি! কেন একটি সিনেমাকে রিলিজের মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এভাবে ভারতের ওটিটি প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে দিতে হলো? কী এমন আছে এই ছবির গল্পে?
তিনি শুধু সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেই ক্ষান্ত থাকেননি, নিজে সরাসরি সিংঘু বর্ডারে গিয়ে আন্দোলনকারী কৃষকদের মাঝে বসেছিলেন। কৃষকদের শীতের পোশাক ও গরম কাপড়ের জন্য তিনি ১ কোটি টাকা দান করেন। এই আন্দোলনের সময় বলিউড অভিনেত্রী কঙ্গনা রানাওয়াতের সঙ্গে তাঁর টুইটার যুদ্ধ দেশজুড়ে আলোড়ন ফেলেছিল। কঙ্গনা এক প্রবীণ আন্দোলনকারী মহিলাকে নিয়ে কটূক্তি করলে দিলজিৎ তার কড়া জবাব দেন। এই ঘটনার পর অনেকে তাঁকে ‘খালিস্তানি’ বা দেশবিরোধী বলে আক্রমণ করলেও, পঞ্জাব ও হরিয়ানার মানুষের কাছে তিনি ‘হিরো’ হয়ে ওঠেন। এই আন্দোলনের সমর্থনে তিনি ‘Attwadi’ নামের একটি গানও করেছিলেন, যা কৃষকদের অনানুষ্ঠানিক অ্যান্থেম হয়ে উঠেছিল।
কনসার্টে খালিস্তানি পতাকার বিরোধিতা
বিদেশে দিলজিতের কনসার্ট মানেই লাখো মানুষের ভিড়। কিন্তু মে ২০২৬-এ কানাডার ক্যালগেরি এবং আমেরিকার সান ফ্রান্সিসকোর কনসার্টে কিছু মানুষ প্রো-খালিস্তানি পতাকা নিয়ে বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করলে দিলজিৎ সঙ্গে সঙ্গে গান থামিয়ে দেন।
তিনি স্টেজ থেকে সরাসরি মাইকে বলেন, “আমার কাজ শুধু এন্টারটেইন করা, রাজনীতি নয়।” তিনি স্পষ্ট করে দেন যে কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডার জন্য তাঁর কনসার্টের মঞ্চ ব্যবহার করা যাবে না। এর ফলে খালিস্তানি সমর্থক গোষ্ঠীগুলি তাঁকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলে হুমকি দিলেও, দিলজিৎ নিজের অবস্থানে অনড় থাকেন। তিনি বলেন, তিনি দুই চরমপন্থী পক্ষের (উগ্র জাতীয়তাবাদী এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী) থেকেই গালি খান, কিন্তু তিনি কোনো রাজনীতির সঙ্গে নেই, তিনি শুধুই একজন শিল্পী।
ভারত-পাক সীমান্ত পেরিয়ে শিল্পীর স্বাধীনতা: ‘সর্দার জি ৩’
২০২৫ সালে মুক্তি পাওয়া ‘সর্দার জি ৩’ (Sardaar Ji 3) সিনেমাটিতে পাকিস্তানি অভিনেত্রী হানিয়া আমিরের সঙ্গে অভিনয় করে ভারতে বড় বিতর্কের মুখে পড়েন দিলজিৎ। সেই সময় ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা তুঙ্গে থাকায় ভারতের বিভিন্ন সিনেমা সংগঠন এই ছবি বয়কটের ডাক দেয় এবং ছবিটি ভারতে রিলিজ হতে দেওয়া হয়নি। কিন্তু দিলজিৎ নিজের সিদ্ধান্তের জন্য কোনো অনুশোচনা প্রকাশ করেননি। তিনি বুক চিতিয়ে বলেছিলেন, “দেশগুলির মধ্যে যুদ্ধ চলতে পারে, কিন্তু শিল্প সবাইকে এক করে। আমি কোনো নির্দিষ্ট দেশের নই, আমি এই ধরিত্রীর (Mother Earth) সন্তান।”
আইন বা প্রশাসনের ভুল নিয়মের সামনে মাথা নত করা দিলজিতের স্বভাবে নেই। চণ্ডীগড় কনসার্টে শব্দের মাত্রা (Noise Pollution) নির্ধারিত সীমার বাইরে যাওয়ায় প্রশাসন আইনি নোটিশ পাঠালে দিলজিৎ পালটা প্রশ্ন তোলেন— শহরের যেসব জায়গায় মদ বা অন্যান্য নেশার ব্যবসা চলে, সেখানে কেন শব্দদূষণ নিয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না? কেন শুধু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানকে টার্গেট করা হয়?
হায়দরাবাদ কনসার্টে প্রশাসন থেকে তাঁর গানের লিরিক্সে থাকা ‘মদ’ বা ‘পার্টি’ সংক্রান্ত শব্দ বাদ দিতে বলা হলে দিলজিৎ মঞ্চ থেকেই গর্জে উঠে বলেন, “আগে শহরে অ্যালকোহল ব্যান করুন, গান নয়!” সরকারের এই দ্বিমুখী নীতিকে তিনি প্রকাশ্য মঞ্চে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন।
২০২৪ সালের জুন মাসে আমেরিকার বিখ্যাত ‘দ্য টুনাইট শো স্টারিং জিমি হ্যালন’-এ প্রথম ভারতীয় হিসেবে পারফর্ম করতে গিয়ে দিলজিৎ শুধু গানই গাননি, বরং বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে ১৯১৪ সালের ঐতিহাসিক ‘কোমাগাতা মারু’ (Komagata Maru) ঘটনার কথা উল্লেখ করেন। ব্রিটিশ আমলে পঞ্জাবি শিখদের উপর হওয়া বর্ণবাদী অত্যাচার ও সংগ্রামের ইতিহাস আমেরিকার টেলিভিশনে তুলে ধরেন তিনি।
দিলজিৎ দোসাঞ্জ সবসময় পঞ্জাবের সংস্কৃতি, ভাষা এবং ঐতিহ্যকে গর্বের সঙ্গে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেন— তা সে কোচেলা (Coachella) মিউজিক ফেস্টিভ্যাল হোক বা মেট গালা (Met Gala)। তিনি বারবার প্রমাণ করেছেন, নিজের কেরিয়ার বা ব্যবসার ক্ষতি করে হলেও তিনি প্রতিবাদ করতে ভয় পান না।
আজ ‘সতলুজ’ সিনেমাটি ব্যান হওয়ার পর তিনি যেভাবে সিস্টেমের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে লড়াই করছেন, তা আবারও প্রমাণ করে যে দিলজিৎ শুধু বিনোদন দেওয়ার জন্য বাঁচেন না, প্রয়োজনে সমাজের রূঢ় বাস্তবকে সকলের সামনে স্পষ্ট ভাবে তুলে ধরতেও তিনি সমান পারদর্শী। আর এই আপসহীন, নির্ভীক স্বভাবের জন্যই দিলজিত দোসাঞ্জের নতুন নাম ‘রেবেল স্টার’।







