যুদ্ধের আবহে জ্বালানি দুশ্চিন্তা, কেন ৭ বছর ধরে থমকে ভারতের ‘তেল সুরক্ষা’ ভাণ্ডার?

ওড়িশার জাজপুর জেলার চণ্ডিখোলের কাছে দানকারি পাহাড়ে প্রস্তাবিত ‘স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ’ প্রকল্পটি অনুমোদন পেয়েছিল ২০১৮ সালে।

inscript
৩ মিনিট
যুদ্ধের আবহে জ্বালানি দুশ্চিন্তা, কেন ৭ বছর ধরে থমকে ভারতের ‘তেল সুরক্ষা’ ভাণ্ডার?

পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের আবহে তেলের বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়ছে প্রতিদিনই। এমন পরিস্থিতিতে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা যখন প্রশ্নের মুখে, দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত তেল ভাণ্ডার প্রকল্প গত সাত বছর ধরে প্রশাসনিক জটিলতার ফাঁসে আটকে আছে।

ওড়িশার জাজপুর জেলার চণ্ডিখোলের কাছে দানকারি পাহাড়ে প্রস্তাবিত ‘স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ’ প্রকল্পটি অনুমোদন পেয়েছিল ২০১৮ সালে। লক্ষ্য ছিল, আন্তর্জাতিক সংকটের সময়ে দেশের জন্য অতিরিক্ত তেল মজুত তৈরি করা। কিন্তু প্রায় ৮,৭৪৩ কোটি টাকার এই প্রকল্প এখনও পরিকল্পনা মাত্রই।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
হরমুজে সংকট: কেন তেলের দাম সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে ভারত?

Hormuz Strait Crisis: ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর সরকার তেল আমদানির উপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য ঘোষণা করেছিল। তখন ভারতের তেল আমদানির নির্ভরতা ছিল প্রায় ৭৫ শতাংশ। লক্ষ্য ছিল তা কমিয়ে দুই-তৃতীয়াংশে নামানো। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টো।

ভারত তার চাহিদাকৃত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৮৫ শতাংশের বেশি বিদেশ থেকে আমদানি করে। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বিশেষ করে ইরাক, সৌদি আরব, UAE এবং কুয়েত— ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী। ভারতের আমদানিকৃত তেলের বড় অংশ, প্রায় ৪০ শতাংশেরও বেশি হরমুজ প্রণালী দিয়ে আসে। এ কারণেই হরমুজ প্রণালীকে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুট বলে মনে করা হয়। ফলে যুদ্ধ, কূটনৈতিক সংঘাত বা সমুদ্রপথে সরবরাহ ব্যাহত হলে দেশের জ্বালানি ব্যবস্থাই বিপাকে পড়তে পারে। সেই ঝুঁকি কমাতেই তৈরি করা হয় কৌশলগত তেল ভাণ্ডার; যেখানে জরুরি পরিস্থিতির জন্য বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল মজুত রাখা হয়।

এই মুহূর্তে ভারতের এমন তেল মজুত রয়েছে তিনটি জায়গায়— বিশাখাপত্তনম, ম্যাঙ্গালুরু এবং পাদুরে। সব মিলিয়ে এই ভাণ্ডারগুলোর মোট তেল ধারণক্ষমতা প্রায় ৫.৩৩ মিলিয়ন টন, যা দিয়ে দেশের মাত্র ১০ দিনের চাহিদা মেটানো সম্ভব।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ইরান যুদ্ধ: পশ্চিম এশিয়ার সংবাদমাধ্যমের কভারেজে যে প্রশ্ন উঠছে

Israel Iran tensions: কিছু ইজরায়েলি বিশ্লেষকের মতে, দেশটির রাজনীতিতে প্রায়ই কোনো না কোনো দেশকে ‘শত্রু’ দাবি করে সামনে আনা হয়, যাতে নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলে কঠোর নীতি চালিয়ে যাওয়া সহজ হয়। তাঁদের মতে, এক সময় গাজাকে প্রধান শত্রু হিসেবে দেখানো হতো, লেবাননকেও সেই ফাঁদে ফেলা হয়, আর এখন ইরানকেও সেইভাবেই তুলে ধরা হচ্ছে।

সরকারের পরিকল্পনা ছিল জাজপুরে নতুন ভাণ্ডার তৈরি হলে সেই ক্ষমতা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাবে। নতুন প্রকল্পটির ধারণক্ষমতা ৪ মিলিয়ন টন। এটি তৈরি হলে ভারতের আপদকালীন তেল মজুতের সময়সীমা ১০ দিন থেকে বেড়ে প্রায় ২১ দিনে পৌঁছতে পারে।

প্রশ্ন উঠছে, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকল্প সাত বছরেও শুরু হল না কেন? প্রধান সমস্যা জমি নিয়েই। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা সংস্থা ‘ইন্ডিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভস লিমিটেড’ (ISPRL) ২০১৯ সালেই প্রায় ৪০০ একর জমি চিহ্নিত করেছিল। কিন্তু এখনও পুরো জমি হাতে পায়নি তারা। বর্তমানে প্রায় ২৮৬ একর জমির প্রক্রিয়া চলছে, বাকি অংশ নিয়ে জট কাটেনি।

তার ওপর রয়েছে আরেকটি সমস্যা— প্রস্তাবিত প্রকল্প এলাকার আশেপাশে ১৩টি পাথর খনি রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই এলাকায় ক্রমাগত খনন চলতে থাকলে পাহাড়ের কাঠামোগত স্থিতি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে, যা ভূগর্ভস্থ তেল ভাণ্ডারের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তাই এই খনন বন্ধ করার জন্য স্থানীয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপও চাওয়া হয়েছে। তবে প্রকল্পের পরিকল্পনা পুরোপুরি থেমে নেই। ইঞ্জিনিয়ারিং সংস্থা Engineers India Limited ইতোমধ্যেই এর নকশা তৈরি করে ফেলেছে। টেন্ডার সংক্রান্ত নথিপত্রও প্রস্তুত। এখন অপেক্ষা কেন্দ্রীয় কমিটির চূড়ান্ত অনুমোদনের। জমি হস্তান্তরের সমস্যা মিটে গেলে প্রায় পাঁচ মাসের মধ্যে নির্মাণ কাজ শুরু করা সম্ভব বলে জানা যাচ্ছে।

বিশ্বজুড়ে যখন জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবনা শুরু হয়েছে, তখন ভারতের এই মেগা প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রিতা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলছে। বিশেষ করে পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা বাড়ার প্রেক্ষাপটে এই বিলম্ব আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠছে। কারণ, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে অস্থিরতা বা সরবরাহে ব্যাঘাত দেখা দিলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে ভারতের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়। সেই পরিস্থিতিতে কৌশলগত তেল ভাণ্ডারই হতে পারে সবচেয়ে বড় ভরসা। কিন্তু আপাতত সেই ভরসার প্রকল্পই আটকে রয়েছে কাগজপত্র আর প্রশাসনিক জটের গোলকধাঁধায়।

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

মিডটার্ম নির্বাচন: সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেতে চলেছে ট্রাম্পের বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটরা

US Midterm Elections 2026: ভোটের লড়াইয়ে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যেতে শুরু করেছে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা।

রামলীলার পর কী? কী করবেন বিরোধীরা?

INDIA bloc Unity Under strain: ‘ভোট বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ স্লোগানে ১ নভেম্বর রামলীলা ময়দানে ২১ দল একজোট হলেও মঞ্চ শেষেই ভেতরের টানাপোড়েন স্পষ্ট। বাম নেতাদের বক্তৃতায় প্রাধান্য, ‘ফ্যাসিবাদ’ বিরোধী সুর। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘জাতীয় ভূমিকা’র সতর্কবার্তা। প্রিয়াঙ্কা, সুপ্রিয়া সুলে, সঞ্জয় রাউত বক্তৃতার সুযোগ না পাওয়ায় শরিক-অসন্তোষ।

ট্রাম্পের অভিবাসন নীতিতে বিপাকে ভারতীয়রা, মিডটার্ম নির্বাচনে কতটা প্রভাব পড়বে?

US Midterm Elections 2026: ২০২৬ সালের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ভোটারদের ৬২% ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে। ট্রাম্পের এইচ-১বি ভিসা কড়াকড়ি ও অর্থনৈতিক নীতির জেরে ক্ষোভ বাড়ছে বলে জানাল কার্নেগির সমীক্ষা।

রামলীলার সভার জন্য ক্ষতি হয়েছে ছোট দোকানদারদের, কতটা প্রচার, কতটা সত্যি?

loss claim for Ramlila rally: রামলীলা ময়দানের সমাবেশ ঘিরে ছোট দোকানদারদের ‘২.৫ লক্ষ দোকান বন্ধ’ ও ‘১০-১১ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি’র দাবি আসলে, দিল্লির ব্যবসায়ী সংগঠন সিটিআই-এর অনুমান আসলে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের হিসাবের ভিত্তিতে করা হয়েছে। বিজেপি-কংগ্রেস পাল্টাপাল্টি অভিযোগে এই সংখ্যাগুলি এখন রাজনৈতিক হাতিয়ার।

এসআইআর: মূল টার্গেট ছিল বাংলা?

SIR West Bengal controversy: এসআইআরের নামে বাংলার নাগরিকদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার পরিকল্পনা কতটা সুপরিকল্পিত? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা, বিচারকদের পর্যবেক্ষণ, ডিজিটাল কারচুপি ও সংখ্যালঘুদের লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ কী ইঙ্গিত দিচ্ছে?

শ্রমিক বিক্ষোভের নেপথ্যে আওয়ামী লীগ, বাংলাদেশ সরকারের অভিযোগের বাস্তব ভিত্তি কতটা?

Garment Workers' Protest in Bangladesh: বাংলাদেশে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভ, আন্দোলনের পিছনে আওয়ামী লীগের ইন্ধন রয়েছে বলে অভিযোগ বাংলাদেশ সরকারের। কিন্তু শ্রমিকদের অসন্তোষের নেপথ্যে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, নাকি মূল্যবৃদ্ধি ও প্রকৃত মজুরি কমে যাওয়ার ক্ষোভ? সরকারের দাবির পক্ষে কতটা প্রমাণ রয়েছে?

সকালে জমা বিকেলে খরচ: আইনের শাসনের অবমাননা

Gaighata incident: গাইঘাটার ঘটনার পরমুহূর্তে শাসক দলের মন্ত্রী, নেতাদের প্রতিক্রিয়া পরিষ্কার করে দেয়, বন্দি অভিযুক্তকে হত্যার ঘটনা সরকারি নীতির ('সকালে জমা, বিকালে খরচ')—নগ্ন প্রয়োগ।

৫০ কোটি মানুষ দারিদ্র্যমুক্ত, মোদীর দাবির আড়ালে কোন পরিসংখ্যানগত বিতর্ক?

World Bank's claim about India's poverty decline: বিশ্বব্যাঙ্কের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১১-১২ থেকে ২০২২-২৩-এ ভারতের চরম দারিদ্র্য ২৭.১% থেকে ২.৬%-এ নেমেছে বলে দাবি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সেই পরিসংখ্যানকে রাজনৈতিক প্রচারের কাজেও লাগাচ্ছেন। কিন্তু, পরিসংখ্যানের আড়ালে আসল সত্য কি? কি বলছেন অর্থনীতিবিদরা?