দিল্লির আগে কলকাতা কেন? রুবিওর সফর ঘিরে রাজনৈতিক মহলে জোর আলোচনা
Marco Rubio Kolkata: দিল্লির আগে কেন কলকাতা সফর করলেন মার্কিন বিদেশ সচিব মার্কো রুবিও? ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক, কোয়াড কৌশল, চিনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং পূর্ব ভারতের বাড়তে থাকা কূটনৈতিক গুরুত্ব—এই সব কারণেই কি ভারত সফর রুবিওর? রুবিওর সফর ঘিরে এখন আন্তর্জাতিক মহলে জোর কৌতূহল।
মার্কিন বিদেশ সচিব মার্কো রুবিওর চার দিনের ভারত সফর ঘিরে কূটনৈতিক মহলে ইতোমধ্যেই জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। সফরের শুরুতেই কলকাতায় পৌঁছেছেন তিনি। দীর্ঘ ১৪ বছর পর কোনো মার্কিন বিদেশ সচিবের কলকাতা সফর নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। এর আগে ২০১২ সালে কলকাতায় এসেছিলেন তৎকালীন মার্কিন বিদেশ সচিব হিলারি ক্লিনটন।
এবার সেই শহর থেকেই ভারত সফর শুরু করলেন রুবিও। এই সফরকে বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের নতুন সমীকরণ তৈরি করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে কৌশলগত সহযোগিতা— এই চারটি বিষয়কে কেন্দ্র করেই রুবিওর সফরের মূল আলোচ্যসূচি তৈরি হয়েছে।
শনিবার সকালে কলকাতায় পৌঁছনোর পর প্রথমেই তিনি যান মিশনারিজ অব চ্যারিটির সদর দফতরে। বিশ্বজুড়ে পরিচিত এই প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মাদার টেরেজা। জানা গিয়েছে, ব্যক্তিগতভাবেও এই সফরকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন রুবিও। তিনি নিজেও রোমান ক্যাথলিক হওয়ায় মাদার টেরেজার স্মৃতিবিজড়িত এই স্থান তাঁর সফরে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
China global influence: বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিধর দেশ কি এখন চিন? ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে বাণিজ্য সংঘাত, প্রতিটি বড় ইস্যুতেই কি এখন চিনকে ছাড়া কোনো আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে?
কলকাতায় তাঁর সফরসূচিতে ছিল ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল দর্শনও। যদিও সফরটি সংক্ষিপ্ত, তবু মার্কিন কূটনীতির দৃষ্টিতে কলকাতাকে সফরের সূচনা কেন্দ্র হিসেবে বেছে নেওয়া যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং পূর্ব ভারতের কৌশলগত গুরুত্বও এই সিদ্ধান্তের পিছনে প্রভাব ফেলেছে বলে আন্তর্জাতিক মহলের একাংশের মত।
কলকাতা সফরের পর রুবিও দিল্লিতে গেলেন। সেখানে তাঁর সঙ্গে বৈঠক হওয়ার কথা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের। এই বৈঠকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেতে চলেছে ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য সম্পর্ক। গত কয়েক বছরে দু'দেশের মধ্যে শুল্ক এবং আমদানি-রফতানি নিয়ে একাধিক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে আমেরিকার তরফে ভারতীয় পণ্যের উপর উচ্চ শুল্ক আরোপের ফলে সম্পর্ক কিছুটা ঠান্ডা হয়ে পড়েছিল। এখন সেই পরিস্থিতি কাটিয়ে নতুন করে বাণিজ্য চুক্তির পথ খুঁজতে চাইছে দুই দেশ।
শুধু বাণিজ্য নয়, জ্বালানি ক্ষেত্রেও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করতে চাইছে আমেরিকা। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতার মাঝে ভারতকে স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহের আশ্বাস দিতে পারে ওয়াশিংটন। বিশেষত তরল প্রাকৃতিক গ্যাস এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়ানোর সম্ভাবনাও আলোচনায় থাকতে পারে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Trump Xi Jinping meeting: ইরান যুদ্ধ, তাইওয়ান, বাণিজ্য যুদ্ধ এবং বিশ্ব অর্থনীতির টানাপোড়েনের মধ্যে বেজিংয়ে মুখোমুখি ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিং। এই বৈঠক কি ইরান সংকট কমাতে পারবে? নাকি যুক্তরাষ্ট্র-চিন সম্পর্কের নতুন সমীকরণ তৈরি করবে? বিশ্বের রাজনীতিতে কতটা বড় পরিবর্তন আনতে পারে এই শীর্ষ বৈঠক?
প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও এই সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। গত এক দশকে ভারত-আমেরিকা সামরিক সম্পর্ক অনেকটাই শক্তিশালী হয়েছে। যৌথ সামরিক মহড়া, অস্ত্র ক্রয় এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতা দু'দেশের সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে। এবার সেই সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দিকেই নজর থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষত ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চিনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে আমেরিকার উদ্বেগের কারণে ভারতের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
এই সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, কোয়াড বৈঠক। ভারত, আমেরিকা, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়াকে নিয়ে তৈরি এই কৌশলগত জোট বর্তমানে ইন্দো-প্যাসিফিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ২৬ মে দিল্লিতে কোয়াডের বিদেশমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে যোগ দেওয়ার কথা রুবিওর। সেখানে সামুদ্রিক নিরাপত্তা, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সরবরাহ ব্যবস্থা, প্রযুক্তি সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সফরের পিছনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। সম্প্রতি আমেরিকার সঙ্গে চিনের সম্পর্ক নতুন করে টানাপোড়েনের মধ্যে পড়েছে। অন্যদিকে পাকিস্তানের সঙ্গেও ওয়াশিংটনের যোগাযোগ বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভারতকে আবারও ঘনিষ্ঠ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে ধরে রাখতে চাইছে আমেরিকা। তাই রুবিওর সফরকে অনেকেই 'সম্পর্ক মেরামতির সফর' বলেও ব্যাখ্যা করছেন।
যদিও রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের ঐতিহাসিক সম্পর্ক এবং বহুমুখী কূটনৈতিক নীতি আমেরিকার কাছে কখনও কখনও অস্বস্তির কারণ হয়েছে। তবু বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে ভারতকে ছাড়া এশিয়ায় দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ভারসাম্য তৈরি করা সম্ভব নয়, এই উপলব্ধি ওয়াশিংটনের মধ্যে আরও স্পষ্ট হয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে।
রুবিওর এই সফরে দিল্লির পাশাপাশি আগ্রা এবং জয়পুর সফরও রয়েছে। যদিও সেগুলি মূলত সাংস্কৃতিক এবং কূটনৈতিক সৌজন্যসূচক সফর হিসেবেই দেখা হচ্ছে। তবে ভারতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে মার্কিন প্রশাসনের সংযোগ বাড়ানোর বার্তাও এই সফরের মাধ্যমে তুলে
ধরতে চাইছে আমেরিকা।









