কেন ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা ম্যাচে আজও ফিরে আসে ফকল্যান্ডস?
England vs Argentina: ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা ম্যাচে কেন বারবার ফিরে আসে ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ডস যুদ্ধের স্মৃতি? 'লাস মালভিনাস সন আর্জেন্তিনাস' স্লোগানের তাৎপর্য কী? ইতিহাস, রাজনীতি ও জাতীয়তাবাদ কীভাবে আজও বিশ্বকাপের মাঠে এই দুই দেশের প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে প্রভাবিত করে?
বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হওয়া মানেই শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ নয়। দুই দেশের সমর্থকদের কাছে এটি ইতিহাস, রাজনীতি, জাতীয় পরিচয় এবং বহু পুরনো ক্ষতের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক আবেগের লড়াই। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের সেমিফাইনালেও সেই চেনা ছবিই দেখা গেল। মাঠে আর্জেন্টিনা ২-১ গোলে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনালে উঠল। কিন্তু ম্যাচ শেষের পর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে আরেকটি ঘটনা। কয়েকজন আর্জেন্টাইন ফুটবলার 'Las Malvinas Son Argentinas' বা 'মালভিনাস (ফকল্যান্ডস) আর্জেন্টিনার' লেখা একটি ব্যানার হাতে নিয়ে উদযাপন করেন। এরপরই নতুন করে সামনে আসে ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ডস যুদ্ধের ইতিহাস।
ভারতীয়দের কাছে বিষয়টি অনেকেরই অজানা হতে পারে। কিন্তু ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার সম্পর্ক বুঝতে হলে ফকল্যান্ডস বা মালভিনাস দ্বীপপুঞ্জের ইতিহাস জানা জরুরি।
দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরে অবস্থিত ছোট্ট একটি দ্বীপপুঞ্জ ফকল্যান্ডস। আর্জেন্টিনা এই দ্বীপকে 'ইসলাস মালভিনাস' নামে চেনে। দ্বীপটি আর্জেন্টিনার উপকূল থেকে তুলনামূলকভাবে কাছাকাছি হলেও উনিশ শতক থেকে এটি ব্রিটিশ শাসনের অধীনে রয়েছে। আর্জেন্টিনা বরাবরই দাবি করে এসেছে, এই দ্বীপ তাদের ভূখণ্ডের অংশ। অন্যদিকে ব্রিটেনের বক্তব্য, ফকল্যান্ডসের বাসিন্দারা নিজেদের ব্রিটিশ পরিচয়েই দেখতে চান। ফলে এই দ্বীপ নিয়ে দুই দেশের বিরোধ বহু পুরনো।
১৯৮২ সালের ২ এপ্রিল আর্জেন্টিনার সামরিক সরকার হঠাৎ করেই ফকল্যান্ডস দ্বীপে সেনা পাঠিয়ে দখল করে নেয়। তখন দেশটির ক্ষমতায় ছিল সামরিক জান্তা। দেশের অর্থনৈতিক সংকট এবং সরকারের বিরুদ্ধে বাড়তে থাকা জনরোষ থেকে মানুষের দৃষ্টি ঘোরাতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল বলে বহু ইতিহাসবিদ মনে করেন। ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন মার্গারেট থ্যাচার। তিনি দ্রুত সামরিক বাহিনী পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন।
এরপর শুরু হয় মাত্র ৭৪ দিনের এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। সমুদ্র, স্থল এবং আকাশ—তিন দিক থেকেই সংঘর্ষ চলে। শেষ পর্যন্ত ১৪ জুন আর্জেন্টিনা আত্মসমর্পণ করে এবং ব্রিটেন আবার দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায়। যুদ্ধে মোট ৯০৭ জন প্রাণ হারান। তাঁদের মধ্যে ৬৪৯ জন আর্জেন্টিনার সেনা, ২৫৫ জন ব্রিটিশ সেনা এবং তিনজন ফকল্যান্ডসের সাধারণ নাগরিক ছিলেন। আরও শত শত মানুষ আহত হন।
ব্রিটেনে এই জয় মার্গারেট থ্যাচারের জনপ্রিয়তা অনেক বাড়িয়ে দেয় এবং পরের নির্বাচনে তিনি বড় জয় পান। অন্যদিকে আর্জেন্টিনায় পরাজয়ের ধাক্কায় সামরিক সরকারের ভিত্তি নড়ে যায়। জনবিক্ষোভের মুখে শেষ পর্যন্ত সামরিক শাসনের পতন ঘটে এবং দেশে গণতন্ত্র ফিরে আসে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Neymar retirement: বিশ্বকাপ জেতা হলো না, তবু কেন নেইমার আজও কোটি ফুটবলপ্রেমীর হৃদয়ের নায়ক? ফাবেলার দারিদ্র্য থেকে বিশ্বমঞ্চে উঠে এসে কীভাবে তিনি এক প্রজন্মের স্বপ্ন, আবেগ ও নস্টালজিয়ার প্রতীক হয়ে উঠলেন?
যুদ্ধ শেষ হলেও বিরোধ শেষ হয়নি। আজও আর্জেন্টিনা ফকল্যান্ডসকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে। অন্যদিকে ব্রিটেন জানিয়ে এসেছে, দ্বীপের বাসিন্দাদের মতামতই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ফকল্যান্ডসের অধিকাংশ মানুষ ব্রিটেনের সঙ্গেই থাকতে চান। ফলে কূটনৈতিক টানাপোড়েন এখনও বজায় রয়েছে।
এই রাজনৈতিক ইতিহাসই ফুটবল মাঠেও বারবার ফিরে এসেছে। বিশেষ করে ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালকে অনেকেই যুদ্ধ-পরবর্তী প্রতীকী প্রতিশোধ হিসেবে দেখেন।
১৯৮৬ সালের ২২ জুন মেক্সিকো সিটির অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। ফকল্যান্ডস যুদ্ধ শেষ হওয়ার মাত্র চার বছর পর হওয়ায় এই ম্যাচকে অনেকেই দুই দেশের রাজনৈতিক ও মানসিক দ্বন্দ্বের প্রতীক হিসেবে দেখেছিলেন।
ম্যাচের ৫১তম মিনিটে ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক পিটার শিলটনের সঙ্গে লাফিয়ে উঠে দিয়েগো মারাদোনা হাত দিয়ে বল জালে জড়িয়ে দেন। টিউনিশিয়ার রেফারি আলি বিন নাসের সেটিকে গোল হিসেবে স্বীকৃতি দেন, কারণ তিনি এবং লাইন্সম্যান হাতের স্পর্শটি দেখতে পাননি। ম্যাচের পরে মারাদোনা বিখ্যাতভাবে বলেছিলেন, গোলটি হয়েছে 'a little with the head of Maradona and a little with the hand of God'—অর্থাৎ, একটু মারাদোনার মাথা দিয়ে, আর একটু ঈশ্বরের হাত দিয়ে। এরপর থেকেই গোলটি 'হ্যান্ড অব গড' নামে বিশ্বজুড়ে পরিচিত হয়ে যায়।
মাত্র চার মিনিট পর মারাদোনা আরেকটি গোল করেন, যা ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোল হিসেবে স্বীকৃত। নিজের অর্ধ থেকে বল নিয়ে তিনি ইংল্যান্ডের পাঁচজন ডিফেন্ডার এবং গোলরক্ষককে কাটিয়ে একক প্রচেষ্টায় গোল করেন। ফিফা পরে এটিকে 'Goal of the Century' বা শতাব্দীর সেরা গোল হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
আর্জেন্টিনা সেই ম্যাচ ২-১ ব্যবধানে জিতে সেমিফাইনালে ওঠে এবং পরে পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে বিশ্বকাপ জেতে। যদিও মারাদোনা কখনও প্রকাশ্যে বলেননি যে 'হ্যান্ড অব গড' গোলটি ফকল্যান্ডস যুদ্ধের প্রতিশোধ ছিল, ২০০৫ সালে নিজের আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছিলেন যে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে জয়কে তিনি আংশিকভাবে যুদ্ধের পরাজয়ের ক্ষত সারানোর মতো অনুভব করেছিলেন। সেই কারণেই আর্জেন্টিনার বহু সমর্থকের কাছে এই ম্যাচ শুধু একটি ফুটবল জয় নয়, বরং জাতীয় গর্বের প্রতীক হয়ে ওঠে। অন্যদিকে ইংল্যান্ডের সমর্থকদের কাছে 'হ্যান্ড অব গড' এখনও বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত গোল হিসেবে বিবেচিত হয়। ১৯৮৬ সালের সেই ম্যাচ আজও ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা ফুটবল প্রতিদ্বন্দ্বিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে স্মরণ করা হয়।
২০২৬ সালের বিশ্বকাপে দুই দেশ আবার মুখোমুখি হওয়ার আগেই উত্তেজনা ছিল তুঙ্গে। নিরাপত্তা সংস্থাগুলিও এই ম্যাচকে অত্যন্ত স্পর্শকাতর হিসেবে বিবেচনা করেছিল। দুই দেশের কোচই ম্যাচের আগে বারবার বলেন, ফুটবলকে রাজনীতির সঙ্গে না মেশানোই উচিত। এমনকি ফকল্যান্ডস যুদ্ধের বহু প্রাক্তন সেনাও যৌথভাবে আবেদন করেছিলেন, যেন সমর্থকেরা ইতিহাসকে সম্মান করলেও ঘৃণা বা বিদ্বেষ না ছড়ান।
কিন্তু মাঠের লড়াই শেষ হওয়ার পর আবারও রাজনীতি সামনে চলে আসে। আর্জেন্টিনার কয়েকজন ফুটবলার ফকল্যান্ডস নিয়ে রাজনৈতিক বার্তা লেখা ব্যানার হাতে উদযাপন করেন। এই ঘটনাকে ঘিরে বিতর্ক শুরু হয়। কারণ ফিফার নিয়ম অনুযায়ী মাঠের ভেতরে রাজনৈতিক বার্তা প্রদর্শন করা নিষিদ্ধ। যদিও এই বিষয়ে ফিফা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
আর্জেন্টিনার ফুটবলার রদ্রিগো দে পল অবশ্য পরে বলেন, তাঁদের উদ্দেশ্য ইতিহাস ও যুদ্ধের নিহতদের স্মরণ করা, ফুটবলকে রাজনৈতিক বিতর্কে টেনে আনা নয়।
আজকের প্রজন্মের অনেক দর্শকের কাছে ফকল্যান্ডস যুদ্ধ হয়তো ইতিহাসের বইয়ের একটি অধ্যায়। কিন্তু ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার মানুষের কাছে এটি এখনও আবেগ, স্মৃতি এবং জাতীয় পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।






