জ্বলছে মণিপুর, মরছে মানুষ! আর সিনেমাহলে দেখানো হচ্ছে 'উড়ি; দ্য সার্জিক্যাল স্ট্রাইক'?

Manipur Hindi Movie Uri: শেষ ১৯৯৮ সালে "কুছ কুছ হোতা হ্যায়" দেখানো হয়েছিল মণিপুরে।

inscript
৩ মিনিট
জ্বলছে মণিপুর, মরছে মানুষ! আর সিনেমাহলে দেখানো হচ্ছে 'উড়ি; দ্য সার্জিক্যাল স্ট্রাইক'?

নাটকে লোকশিক্ষা হতো। সে জমানা গত হয়েছে, এখন সিনেমায় জনগণের শিক্ষা হয়। শিক্ষাকে 'সবক' বলে ডাকলেও ভুল হবে না। বিভিন্ন ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা প্রচারের নির্ভরযোগ্য হাতিয়ার এখন হিন্দি সিনেমা। 'জাতীয়তাবাদ' প্রচার, পাকিস্তানকে শিক্ষা দেওয়ার মাহাত্ম্য প্রচার, দেশনেতার গুণাগুণ, অন্য রাজ্যের সরকারকে হেয় প্রতিপন্ন করে ফায়দা লোটা, রামরাজ্য গড়া- সবেতেই বেশ কিছুকাল ধরে হিন্দি সিনেমাকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছে কেন্দ্রের শাসক দল। দেশের স্বাধীনতা দিবসে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন শান্তি ফিরছে মণিপুরে। কীভাবে ফিরছে? ভিকি কৌশলের হাত ধরে! জলন্ত মণিপুরে, অশান্ত মণিপুরে হিংসা থামানোর স্থায়ী কোনও ব্যবস্থা চোখে না পড়লেও সেখানে দেখানো হচ্ছে উড়ি- দ্য সার্জিক্যাল স্ট্রাইক সিনেমাটি! মণিপুরকে স্বাধীনতা দিবসে দেশের উপহার? এখানেই রয়েছে হালকা ট্যুইস্ট!

২০ বছরেরও বেশি সময় পর কোনও হিন্দি সিনেমা এল মণিপুরে। জাতিসংঘর্ষ বিধ্বস্ত মণিপুরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের উপর নির্মিত বলিউডি সিনেমা প্রদর্শিত হলো চুরাচাঁদপুরের একটি অস্থায়ী ওপেন-এয়ার থিয়েটারে। ভিকি কৌশল অভিনীত উড়ি: দ্য সার্জিক্যাল স্ট্রাইক দেখতে মানুষও কম যাননি! এই ভয়াবহ সময়ে মানুষ নিজের নিরাপত্তার কথা না ভেবে সিনেমা দেখবেন, বা সিনেমা দিয়ে কেন্দ্র যে আসলে এসব হিংসা দমনে কতখানি তৎপর তা প্রমাণ করা হবে, এমন ভাবলেনই বা কারা? উত্তর জানলে অবাক হতে হয়!

হামার স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (এইচএসএ) এই সিনেমার স্ক্রিনিংয়ের আয়োজন করে। শেষ ১৯৯৮ সালে "কুছ কুছ হোতা হ্যায়" দেখানো হয়েছিল মণিপুরে। ২০০০ সালের সেপ্টেম্বরে নিষিদ্ধ পিপলস লিবারেশন আর্মির রাজনৈতিক শাখা দ্য রেভল্যুশনারি পিপলস ফ্রন্ট হিন্দি চলচ্চিত্রের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ২০১৬ সালে জম্মু ও কাশ্মীরের উড়িতে একটি সেনা ক্যাম্পে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী পরিচালিত 'সার্জিক্যাল স্ট্রাইক'-এর উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছিল উড়ি। মেইতেই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর এই নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করতেই অস্থির মণিপুর রাজ্যে এই অবস্থাতেও উড়ি সিনেমা দেখানো হলো!

আদিবাসী উপজাতি নেতাদের ফোরামের মুখপাত্র গিঞ্জা ভুয়ালজং জানাচ্ছেন, তাদের শহরে শেষ হিন্দি সিনেমা দেখানো হয়েছে দুই দশকেরও বেশি আগে। মেইতিরা দীর্ঘদিন ধরে হিন্দি সিনেমাকে নিষিদ্ধ করেছে। ২০০০ সালে নিষেধাজ্ঞা জারির এক সপ্তাহের মধ্যে, রাজ্যের ভাষা ও সংস্কৃতিতে বলিউডের নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা করেই নাকি বিদ্রোহীরা রাজ্যের বিভিন্ন সিনেমা হলে হিন্দি সিনেমার প্রায় ৬০০০ থেকে ৮০০০ ভিডিও এবং অডিও ক্যাসেট এবং কমপ্যাক্ট ডিস্ক পুড়িয়ে দেয়। মেইতি গোষ্ঠীগুলির দেশবিরোধী নীতিগুলিকে অস্বীকার করা এবং ভারতের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন করতেই নাকি উড়ি সিনেমা দেখানোর সিদ্ধান্ত! সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, এই সংগঠনটি নিজেদের কুকি উপজাতিদের কণ্ঠস্বর মনে করে। সিনেমা দেখানোর আগে, রাজধানী শহর থেকে ৬৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ওপেন-এয়ার থিয়েটারে জাতীয় সঙ্গীতও বাজানো হয়।

মণিপুরে গত ৩ মে থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মেইতি এবং উপজাতি কুকি সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপক জাতিগত সংঘর্ষ চলছে। এ পর্যন্ত সরকারি হিসেবে ১৬০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। কম করে ৬০,০০০ মানুষ ঘরছাড়া!

ছাত্র সংগঠনটি একটি বিবৃতিতে জানিয়েছে, "এটি মেইতেই সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এবং মেইতিপন্থী মণিপুর রাজ্য সরকারের প্রতি আমাদের অনাস্থা এবং বিরোধিতা দেখানোর জন্যই আয়োজিত। কয়েক দশক ধরে আদিবাসীদের পরাধীন করে রেখেছে মেইতেইরা।" মণিপুরের জঙ্গি গোষ্ঠী, বেশিরভাগই মেইতেই, স্বাধীনতা দিবস বয়কটের ডাক দেয়। মেইতেই অধ্যুষিত ইম্ফল উপত্যকার বেশিরভাগ অংশই বন্ধ ছিল এবং সকলে স্বাধীনতা দিবস উদযাপনও করেননি। কুকি-অধ্যুষিত পাহাড়ে কিন্তু অনেকেই মেইতেই বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলির ডাকা বয়কটের বিরোধিতা করে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে। আদিবাসী সংগঠন বলছে, দেশবিরোধী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলি থেকে তাদের স্বাধীনতা ঘোষণা করতে এবং কুকি-জোমি-হামার-মিজো আদিবাসীদের উপর নজরদারি চালানো মেইতেইপন্থী মুখ্যমন্ত্রী এন বীরেন সিংয়ের বিরোধিতা করতেই সিনেমা দেখানোর বন্দোবস্ত।

মেইতেইদের প্রতি কেন্দ্র সরকার 'নরম' বলেই বীরেন সিংয়ের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বা মণিপুরের এই হিংসাও থামানোর চেষ্টা হচ্ছে না- এই অভিযোগের ঠিক উল্টোপ্রান্তে গিয়ে আদিবাসীরাই যে আসলে দেশকে ভালোবাসেন তার প্রমাণ দিতে হচ্ছে? মেইতেইদের সন্ত্রাসের রূপ সামনে আনতেই কি আদিবাসীদের এই জাতীয়তাবাদের ভাবের ঘরে 'সার্জিক্যাল স্ট্রাইক'? নাহলে, যে পাহাড়ি কুকি-মিজো-নাগা গোষ্ঠীদের সঙ্গে উপত্যকার মেইতেইদের মূল জাতিগত সমস্যা, সেখানে নিজেদের সত্ত্বা বাঁচাতে হিন্দি সিনেমাকেই, তাও 'দেশাত্মবোধক' সিনেমাকেই কেন বেছে নিতে হচ্ছে? মণিপুর যে দেশেরই অংশ, তা প্রমাণ করতে হচ্ছে আদিবাসীদের! বিচ্ছিন্নতা বা সন্ত্রাস নয়, আসলে সীমান্তের আদিবাসীরাও দেশের 'সঙ্গে'ই আছে- এই প্রমাণ করেই যদি জাতীয়তাবাদের গীত চরমে গাইতে হয়- প্রশ্ন তো উঠবেই। না কি, এও আসলে সরকারেরই এক নীতি, মণিপুরের আদিবাসীদের মধ্যে গেরুয়া শিকড় ছড়াতেই কি উড়িকে হাতিয়ার করতে হচ্ছে? উত্তর আশা করা যায় ২০২৪-এর আগে মিলবেই!

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

EXCLUSIVE: শেষদিকে দল পরিচালনায় গ্যাপ ছিল, অভিষেকের অফিসও ঠিকঠাক ম্যানেজ করা হয়নি: কুণাল

Kunal Ghosh on Abhishek Banerjee: ইন্সক্রিপ্টের ‘অনিন্দ্য এবং’ পডকাস্টে অভিষেক প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে কুণাল জানিয়েছেন, শেষ পর্যায়ের দল পরিচালনায় আরও ‘সতর্কতা’ প্রয়োজন ছিল। তাঁর দাবি, অভিষেকের অফিসও সব সময় ঠিকভাবে পরিচালিত হয়নি।

মমতা-অভিষেকের দল পরিচালনায় বিরাট গ্যাপ তৈরি হয়েছিল: ইনস্ক্রিপ্ট পডকাস্টে আর কী বললেন কুণাল?

Kunal Ghosh Interview: বিধানসভা ভোটে বিপর্যয়ের পরে প্রতীক, নাম হারিয়ে কার্যত দিশাহারা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল। তার মধ্যেও ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই জারি রয়েছে। যদিও দলের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহে মমতার কাছাকাছির বৃত্ত ক্রমশ সঙ্কুচিত হয়েছে। নন্দীগ্রামের উপনির্বাচনে মুখ পুড়েছে। এই প্রেক্ষিতে আসন্ন পুরভোটে কেমন করবে তৃণমূল? ঘুরে দাঁড়ানোর কোনও সম্ভাবনা আছে? অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী? বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে যা বললেন দলের বিধায়ক এবং অন্যতম মুখপাত্র কুণাল ঘোষ।

এসআইআর: বাংলায় ভোটার যাচাইয়ের প্রভাব মুসলিম এলাকাগুলিতে ছ’গুণ বেশি, বলছে পরিসংখ্যান

Bengal Voter List Review: পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা যাচাইয়ে বিচারাধীন ভোটারদের ক্ষেত্রে মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলিতেই প্রভাব বেশি পড়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, এই এলাকাগুলিতে ভোটার যাচাইয়ের প্রভাব অন্যান্য এলাকার তুলনায় প্রায় ছ’গুণ বেশি। এই পার্থক্য কীভাবে তৈরি হলো, কোন এলাকার ভোটাররা বেশি প্রভাবিত হলেন এবং এর পিছনে কী কারণ রয়েছে?

এসআইআর বির্তক: যে খবর স্বাভাবিক হওয়ার কথা, সেটাই আজ বিস্ময়

Gyanesh Kumar, SIR and Election Commission: এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কেন প্রক্রিয়া চালানো হল? জ্ঞানেশ কুমার কীভাবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হলেন? ২০২৩ সালে আইন বদলে প্রধান বিচারপতিকে নির্বাচন কমিশনার বাছাইয়ের কমিটি থেকে সরানো হল কেন? এতদিন এই প্রশ্নগুলি গণমাধ্যম তুলল না কেন?

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।